04-11-2026 10:35:20 am
Link: https://bigyan.org.in/plant-multiple-stress-response

জুন মাসের শেষ সপ্তাহ। বাগেরহাটের একটি ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে আছে তরুণ একটি ধানগাছ। দূর থেকে মনে হবে, তপ্ত দুপুরে সে কেবল বাতাসে দুলছে। কিন্তু তার শরীরের ভেতরে চলছে বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই।
কয়েক সপ্তাহ বৃষ্টি হয়নি। মাটিতে পানির পরিমাণ কমে গেছে। উপরন্তু উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত পানি শিকড়ের স্বাভাবিক পানি ও পুষ্টি গ্রহণে বাধা দিচ্ছে। দুপুরের তাপমাত্রা প্রায় 38 ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর সঙ্গে যদি রোগজীবাণু বা পুষ্টির ঘাটতি যুক্ত হয়, তাহলে ধানগাছটিকে একই সময়ে কয়েকটি বিপদের মুখোমুখি হতে হয়।
খরা, তাপদাহ, লবণাক্ততা, রোগ ও পুষ্টির ঘাটতি — প্রকৃতির ময়দানে এসব চাপ প্রায়শই একা আসে না। কখনো তারা একই সঙ্গে আসে, কখনো একটির পর আরেকটি। তখন উদ্ভিদ কি প্রতিটি বিপদের সঙ্গে আলাদা করে লড়ে, নাকি সব সংকেত মিলিয়ে একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেয়?
একাধিক প্রতিকূলতার এই সংযোগকেই বিজ্ঞানীরা বলেন মাল্টিপল স্ট্রেস নেক্সাস (multiple stress nexus) বা সহজ বাংলায়, বহু চাপের সংযোগজাল।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উদ্ভিদের ওপর একটি করে চাপ প্রয়োগ করে গবেষণা করেছেন। কখনো শুধু খরা, কখনো শুধু লবণাক্ততা, আবার কখনো শুধু তাপদাহ বা রোগজীবাণুর আক্রমণ। এসব গবেষণা থেকে আমরা উদ্ভিদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি।
ধরা যাক মাটিতে পানি কমে গেল। তখন উদ্ভিদ এমন কিছু রাসায়নিক সংকেত উৎপন্ন করে যার ফলে পাতার সূক্ষ্ম ছিদ্র বা পত্ররন্ধ্র আংশিক বন্ধ হয়ে যায়। এতে পানি কম বের হয়। লবণাক্ত মাটিতে উদ্ভিদ ক্ষতিকর সোডিয়াম আয়নকে নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রয়োজনীয় পটাসিয়াম আয়ন ধরে রাখার চেষ্টা করে। অতিরিক্ত তাপে কোষের প্রোটিন ও কোষ ঝিল্লি (cell membrane) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই উদ্ভিদ ক্ষতি সামলানোর বিশেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে। রোগজীবাণু আক্রমণ করলে আবার ভিন্ন ধরনের সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতিটা এতটা গোছানো থাকে না। খরার সঙ্গে তাপদাহ দেখা দিতে পারে। লবণাক্ততার সঙ্গে যোগ হতে পারে পানির সংকট। পুষ্টির ঘাটতি উদ্ভিদকে দুর্বল করে রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে দুটি চাপ একসঙ্গে এলে তাদের প্রভাব শুধু আলাদা আলাদা ক্ষতির যোগফল হয় না, বরং তারা পরস্পরের প্রভাব বদলে দিতে পারে।
উদ্ভিদ আমাদের মত হাঁটতেও পারে না, তাই বিপদ দেখে স্থানও বদলাতে পারে না। তাকে খুব দ্রুত পরিবেশের পরিবর্তন বুঝতে হয় এবং সেই অনুযায়ী মানিয়েও নিতে হয়। যেমন, মাটিতে পানি কমে গেলে বা লবণ বেড়ে গেলে শিকড়ের কোষ প্রথমে সেই পরিবর্তন টের পায়। তারপর কোষ থেকে কোষে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
এই বার্তার একটি অংশ বহন করে ক্যালসিয়াম নামক আয়ন। মানুষের শরীরে যেমন ঘণ্টা বাজলে সবাই সতর্ক হয়, তেমনি উদ্ভিদের কোষে ক্যালসিয়ামের ওঠানামা বিপদের ঘণ্টার মতো কাজ করতে পারে। আরেক ধরনের অণু হলো রিঅ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিজ বা ROS। বেশি হলে এগুলো কোষের ক্ষতি করে, কিন্তু অল্প ও নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় বিপদের বার্তা পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। অনেকটা আগুনের ধোঁয়া যেমন একই সঙ্গে ক্ষতির চিহ্ন ও সতর্কসংকেতের কাজ করে, ঠিক সেইরকম।
এর সঙ্গে বৈদ্যুতিক সংকেত, পানি চলাচলের পরিবর্তন এবং উদ্ভিদ-হরমোন যুক্ত হয়। ফলে শিকড়ে অনুভূত পানির সংকটের খবর পাতায় পৌঁছাতে পারে। পাতা তখন পানি হারানো কমায়, বৃদ্ধির হার ধীর করে, এবং ক্ষতি সামলানোর প্রস্তুতি নেয়। পুরো ব্যবস্থাটি যেন উদ্ভিদের শরীরজুড়ে বিস্তৃত একটি জৈব ইন্টারনেট।
এবার একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ধাপে ধাপে দেখা যাক। ধরা যাক, ধানগাছের ফুল আসার সময় মাটিতে পানির ঘাটতি দেখা দিল এবং একই সঙ্গে কয়েক দিন তীব্র গরম পড়ল। দুটো চাপ একসাথে আসার ফলে গাছের মধ্যে খানিকটা এইরকম কিছু ঘটনা ঘটে:
একাধিক বিপদের সংকেত একসঙ্গে এলে উদ্ভিদকে সীমিত পানি, শক্তি ও পুষ্টি কোথায় ব্যয় করবে, সেইটা ঠিক করতে হয়। এই সমন্বয়ে উদ্ভিদ-হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খরার সময় অ্যাবসিসিক অ্যাসিড নামক হরমোন পানি সাশ্রয়ে সাহায্য করে। রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড, জ্যাসমোনিক অ্যাসিড ও ইথিলিনের মতো হরমোন কাজ করে।
তবে এগুলো আলাদা সুইচ নয়। একটি হরমোনের বার্তা অন্যটির কাজ বাড়াতে বা কমাতে পারে। তাই উদ্ভিদকে বারবার সমঝোতা করতে হয় — পানি বাঁচাবে, নাকি পত্ররন্ধ্র খুলে খাদ্য তৈরি করবে? দ্রুত বাড়বে, নাকি শক্তি সঞ্চয় করে প্রতিরক্ষা গড়বে? বর্তমান বিপদ সামলাবে, নাকি ফুল ও বীজ তৈরির জন্য সম্পদ রাখবে?
জনপ্রিয় বিজ্ঞানের ভাষায় এই সমন্বয়কেন্দ্রকে উদ্ভিদের ওয়ার রুম বা যুদ্ধের কক্ষ বলা যায়। সেখানে কোনো একক সেনাপতি নেই। শিকড়, পাতা, হরমোন, কোষের সংকেত এবং জিনের কার্যক্রম মিলেই সিদ্ধান্ত তৈরি করে। প্রয়োজনে উদ্ভিদের বৃদ্ধি কমে যায়, পত্ররন্ধ্রের আচরণ বদলায় এবং কোষের ক্ষতি কমাতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষা সক্রিয় হয়।
দুটি চাপ একসঙ্গে এলে তিন ধরনের ফল দেখা যেতে পারে।
প্রথমত, তাদের ক্ষতি মোটামুটি যোগ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একটি চাপ অন্যটির ক্ষতি বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন খরায় পত্ররন্ধ্র বন্ধ হওয়ার পর তাপদাহ এলে পাতার শীতলীকরণ ক্ষমতা কমে গিয়ে তাপের ক্ষতি বেড়ে যায়।
তৃতীয়ত, কখনো প্রথম চাপের কারণে আগে থেকেই সক্রিয় হওয়া প্রতিরক্ষা দ্বিতীয় চাপের ক্ষতি কিছুটা কমাতে পারে।
এই ফল আবার সব জাত বা সব বয়সের গাছে এক হয় না। কোন চাপ আগে এসেছে, কত দিন স্থায়ী হয়েছে, এবং ফুল আসা বা দানা ভরার মতো কোন পর্যায়ে আঘাত করেছে — এসব বিষয় ফলাফল বদলে দেয়। তাই জীববিজ্ঞানে এক যোগ এক কখনো দুই, কখনো দুইয়ের চেয়ে বেশি, আবার কখনো কম।
গত কয়েক দশকে খরা-সহনশীল, লবণাক্ততা-সহনশীল বা তাপ-সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে বড় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে শুধু একটি চাপ সহ্য করতে পারা যথেষ্ট নাও হতে পারে। একটি ধানজাত পরীক্ষাগারে খরা সহ্য করলেও, মাঠে খরার সঙ্গে তাপদাহ বা লবণাক্ততা যুক্ত হলে তার প্রতিক্রিয়া বদলে যেতে পারে।
তাই নতুন জাত নির্বাচনের সময় বাস্তব মাঠের সম্মিলিত চাপ বিবেচনা করা জরুরি। গবেষণাগারের পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চল, মৌসুম ও মাটিতে পরীক্ষা করতে হবে। আধুনিক জিনগত বিশ্লেষণ, দ্রুত বৈশিষ্ট্য পরিমাপ, জিন সম্পাদনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মাঠের আবহাওয়া — সব তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এমন বৈশিষ্ট্য খুঁজছেন যা একাধিক বিপদের মধ্যেও গাছকে স্থিতিশীল ফলন দিতে সাহায্য করবে।
ভবিষ্যতের শক্তিশালী ফসল কোনো অলৌকিক গাছ নয় যে সব বিপদকে সম্পূর্ণ হারিয়ে দেবে। বরং সেটি পরিবেশের পরিবর্তন দ্রুত বুঝবে, প্রয়োজনমতো পানি ও শক্তি ব্যবহার করবে, ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করবে, এবং চাপের মধ্যেও গ্রহণযোগ্য ফলন ধরে রাখবে।
বিকেলের আলো নেমেছে। বাগেরহাটের সেই তরুণ ধানগাছটি এখনো বাতাসে দুলছে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, তার শিকড় ও পাতার মধ্যে কত সতর্কবার্তা চলাচল করছে। সে শুধু লবণ, খরা বা তাপের সঙ্গে আলাদা আলাদা যুদ্ধ করছে না; সে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সব সংকেত মিলিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।
তাই আগামী দিনের প্রশ্ন শুধু ‘এই ধান কতটা খরা-সহনশীল?’ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘খরা, তাপ, লবণাক্ততা বা রোগ একসঙ্গে এলে ধানটি কতটা ভালোভাবে টিকে থেকে ফলন দিতে পারবে?’
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই রয়েছে বহুবিধ চাপের সংযোগজালের রহস্য। আর সেই রহস্য বুঝতে পারা জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচ্ছদের ছবির সূত্র : Ankit Rainloure (pexels.com)
তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন:
লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।
Scan the above code to read the post online.
Link: https://bigyan.org.in/plant-multiple-stress-response