07-07-2026 20:47:22 pm
Link: https://bigyan.org.in/microplastics-in-fish

কথায় আছে, মাছে-ভাতে বাঙালি। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার পাতে থাকা সেই মাছটার ভেতরে আসলে কী লুকিয়ে আছে? আপনার প্লেটে থাকা মাছটির শরীরে এমন কিছু লুকিয়ে থাকতে পারে, যা আপনি খালি চোখে দেখতে পাবেন না—তা জীবাণু নয়, গতানুগতিক কোনো বিষও নয়, বরং ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।
প্লাস্টিক আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। হালকা, টেকসই এবং সস্তা হওয়ার কারণে এটি সর্বত্র ব্যবহৃত হয়—প্যাকেজিং থেকে পোশাক, ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, সবকিছুতেই এর উপস্থিতি। কিন্তু এই সুবিধার একটি মূল্য আছে। গত কয়েক দশকে প্লাস্টিক উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পরিবেশে এর সঞ্চয়। আজ প্লাস্টিক দূষণ আর শুধুমাত্র নান্দনিক সমস্যা নয়; এটি সম্ভবতঃ পৃথিবীর অন্যতম বিস্তৃত পরিবেশগত হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

এই প্লাস্টিক দূষণের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। এগুলি অত্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যাদের খালি চোখে দেখা যায় না।

কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি এই আকারেই তৈরি হয়, যেমন ফেসওয়াশে ব্যবহৃত মাইক্রোবিড। আবার অনেক ক্ষেত্রে বড় প্লাস্টিকের বস্তু সূর্যালোক, তাপ এবং ভৌত প্রভাবের কারণে ধীরে ধীরে ভেঙে গিয়ে এই ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়।
এদের ক্ষুদ্র আয়তনের কারণে এগুলি সহজেই পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং জলজ প্রাণীরা অনেক সময়ই এগুলিকে খাদ্য ভেবে গ্রহণ করে। কিন্তু মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিপদ শুধু এর আয়তনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর আচরণেও লুকিয়ে আছে। এগুলি অনেকটা ছোট স্পঞ্জের মতো কাজ করে এবং সেই কারণে নানা ক্ষতিকর পদার্থ আকর্ষণ ও বহন করতে পারে। এই ক্ষতিকর পদার্থবিষাক্ত রাসায়নিক, ভারী ধাতু, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অণুজীবও হতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো এদের বিস্তার। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু শহর বা সমুদ্রতীরেই সীমাবদ্ধ নয়; পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চল, মাউন্ট এভারেস্ট থেকে অ্যান্টার্কটিকা পর্যন্ত, সর্বত্রই এর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। নদীগুলি এই বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলি একদিকে স্থলভাগ থেকে প্লাস্টিক বহন করে সমুদ্রে নিয়ে যায়, অন্যদিকে আবার পলিতে এই কণাগুলিকে সাময়িকভাবে জমা রাখে।
ভারতের মতো দেশে এই সমস্যা আরও তীব্র কারণ এখানে জনসংখ্যার চাপ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে কাজ করে। প্রচুর প্লাস্টিক বর্জ্য সঠিকভাবে নিষ্পত্তি না হয়ে নদী ও অন্যান্য মিঠা জলের উৎসে পৌঁছে যায়। অথচ ভারতে অধিকাংশ গবেষণা এখনও সমুদ্রকেন্দ্রিক, ফলে মিঠা জলের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।
এই অবহেলা উদ্বেগজনক, কারণ মিঠা জলের পরিবেশ শুধু প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ নয়, এগুলি আমাদের জীবনের ভিত্তি। জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জীবিকা নির্বাহ এবং মানবস্বাস্থ্যের সঙ্গে এদের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই পরিবেশে বসবাসকারী প্রাণীদের মধ্যে মাছ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। খাদ্যগ্রহণ ও পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সময় তারা অজান্তেই মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে, যার কিছু অংশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীরে জমা হতে থাকে।
এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি গোষ্ঠী হলো ছোট দেশীয় মাছ বা Small Indigenous Fish Species (SIS)। মৌরলা, পুঁটি, টেংরা প্রভৃতি মাছ এই গোষ্ঠীর অন্তর্গত। এসব মাছের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলি প্রায়শই সম্পূর্ণ মাছ হিসেবেই খাওয়া হয়। ফলে পরিপাকতন্ত্রসহ শরীরের অন্যান্য অংশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকও মানুষের খাদ্যের অংশ হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। তার ওপর, দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে এই মাছগুলি নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ এবং পুষ্টিগুণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে মাছগুলি পুষ্টির জন্য এত মূল্যবান, সেগুলিই আবার খাদ্যে অপেক্ষাকৃত বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক সরবরাহ করতে পারে, এই সম্ভাবনাই আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

দুঃখজনকভাবে, এই মাছগুলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণা ভারতে এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: যে মাছ আমাদের খাদ্যের একটি অপরিহার্য অংশ, তার সঙ্গে আমরা আর কী গ্রহণ করছি?
ওডিশার মহানদী নদীতে আমাদের গবেষণায় আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। যা আমরা পেয়েছি, তা শুধুমাত্র দূষণের একটি সাধারণ চিত্র নয়; বরং এটি দূষণ, পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্যের মধ্যে একটি জটিল সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
(চলবে)
সূত্র:
লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।
Scan the above code to read the post online.
Link: https://bigyan.org.in/microplastics-in-fish