24-09-2026 09:43:36 am
Link: https://bigyan.org.in/franck-laue-nobel-concealment

কোপেনহেগেনের রাস্তায় তখন ট্যাংকের শব্দ, বুটের ধুপধাপ, আর এক অদৃশ্য আতঙ্কের ছায়া। 1940 সালের সেই এপ্রিলের সকাল—নাৎসি বাহিনী শহরে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু শহরের এক কোণে, নীল্স বোর ইনস্টিটিউট-এর ভেতরে ঘটছিল এক নীরব কিন্তু অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কাহিনী। সেখানে লুকিয়ে রাখা ছিল দুই জার্মান নোবেলজয়ী ম্যাক্স ভন লাওয়ে (Max von Laue) এবং জেমস ফ্রাঙ্ক-এর (James Franck) সোনার নোবেল পদক। এই পদক শুধু ধাতুর টুকরো ছিল না; এগুলোর উপর খোদাই করা নামই ছিল তাদের বিপদের কারণ। যদি নাৎসিরা এগুলো খুঁজে পেত, তবে তা শুধু সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত নয়, প্রাণঘাতী পরিণতিরও কারণ হতে পারত।
কারণ ততদিনে নাৎসিরা ঘোষণা করে দিয়েছে, জার্মানদের নোবেল পদক নেওয়া বা রাখা চলবে না। আর এই দুই জার্মান বিজ্ঞানী ততদিনে নাৎসিদের ঘোর শত্রু হয়ে গেছে।
এর পেছনে অবশ্য একটি বড় ইতিহাস আছে।
বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে জার্মানিতে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছিল নাৎসিবাদ। যে দেশ একসময় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সারা পৃথিবীতে সম্মান পেত, সেই দেশই ধীরে ধীরে স্বৈরশাসনের ছায়ায় ঢেকে যেতে লাগল।
1933 সালে হিটলার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি আরও বদলে গেল। বই পোড়ানো শুরু হলো। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলো শত শত ইহুদি অধ্যাপক ও গবেষককে। গবেষণাগারেও ঢুকে পড়ল রাজনীতি। কোনো বৈজ্ঞানিক ধারণা সত্য কি না, তা আর শুধু পরীক্ষার ফল দেখে বিচার করা হতো না। বিজ্ঞানীর ধর্ম, বংশপরিচয় বা রাজনৈতিক মতও সেখানে গুরুত্ব পেতে শুরু করল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানতে বাধ্য করা হলো তথাকথিত ‘ফ্যুরার নীতি’ (Führerlass)। সেখানে যুক্তি, আইন বা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে হিটলারের ইচ্ছাকেই সর্বোচ্চ বলে ধরা হতো।

ফলে জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা বড় বিপদের মুখে পড়ে। অনেকেই তখন নীরব ছিলেন। কেউ ভয়ে, কেউ সুবিধার আশায়। কিন্তু সবাই নীরব থাকেননি। কিছু বিজ্ঞানী সাহস করে প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জেমস ফ্রাঙ্ক এবং ম্যাক্স ভন লাওয়ে।

তাঁরা শুধু বিজ্ঞানী ছিলেন না, ছিলেন স্বাধীন চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ এবং বৈজ্ঞানিক সততার পক্ষে। সেই কারণেই তাদের নাৎসিদের রোষের খপ্পরে পড়তে হয়।
নাৎসি জার্মানিতে যখন বর্ণবৈষম্য রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত হচ্ছিল, তখন খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস দেখিয়েছিলেন। জেম্স ফ্রাঙ্ক ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন।
1933 সালে হিটলার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পরই তিনি প্রতিবাদস্বরূপ গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এটি ছিল একটি বিরল এবং সাহসী সিদ্ধান্ত। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

কিন্তু দেশ বদলালেও তাঁর নৈতিক অবস্থান বদলায়নি। 1945 সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পথে। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হিরোশিমায় বোমা নিক্ষেপের প্রায় দুই মাস আগে ফ্রাঙ্ক কয়েকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন। ইতিহাসে এটি “ফ্রাঙ্ক রিপোর্ট” নামে পরিচিত। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জাপানের কোনো শহরে সরাসরি বোমা না ফেলে আগে জনশূন্য কোনো স্থানে এর শক্তি প্রদর্শন করা হোক। উদ্দেশ্য ছিল ভয়াবহ প্রাণহানি এড়ানো এবং জাপানকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত সেই পরামর্শ মানা হয়নি। ইতিহাস অন্য পথে এগিয়েছে। তবুও “ফ্রাঙ্ক রিপোর্ট” আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিজ্ঞানীরা শুধু নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন না। অনেক সময় তাঁরা সেই জ্ঞানের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। জেমস ফ্রাঙ্ক এবং তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছিলেন, বিজ্ঞান ও মানবতা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। প্রকৃত বিজ্ঞানীর দায়িত্ব সত্যের পাশাপাশি মানবকল্যাণের পক্ষেও দাঁড়ানো।
নাৎসি জার্মানির অন্ধকার সময়ে ম্যাক্স ভন লাওয়ে ছিলেন যুক্তি ও বিবেকের এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
1933 সালে তিনি জার্মান ফিজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন। সেবছর তাঁর উদ্বোধনী ভাষণ অনেককে চমকে দিয়েছিল। তিনি গ্যালিলিওর ওপর হওয়া নিপীড়নের সঙ্গে আইনস্টাইনের তত্ত্বের বিরুদ্ধে নাৎসিদের আক্রমণের তুলনা করেন। তাঁর বার্তা ছিল স্পষ্ট — বিজ্ঞানকে রাজনৈতিক মতাদর্শের অধীন করা মানে সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। ভন লাওয়ে বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান কোনো জাতি, বর্ণ বা ধর্মের সম্পত্তি নয়। সত্যকে বিচার করতে হয় প্রমাণ দিয়ে, মানুষের পরিচয় দিয়ে নয়।
তখন নাৎসি সমর্থক কিছু বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদকে ‘ইহুদি পদার্থবিজ্ঞান’ (Jewish Deutsche Physik) বলে আক্রমণ করছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, জার্মানির জন্য আলাদা ‘জার্মান পদার্থবিজ্ঞান’ (Deutsche Physik) গড়ে তুলতে হবে। এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন জোহানেস স্টার্ক।

ভন লাওয়ে এই চিন্তার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি তাঁর প্রভাব ও মর্যাদা ব্যবহার করে স্টার্ককে প্রুশিয়ান বিজ্ঞান একাডেমির নিয়মিত সদস্যপদ পাওয়া থেকে বিরত রাখেন। এর জন্য তাঁকে মূল্যও দিতে হয়। 1933 সালের শেষদিকে তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি উপদেষ্টা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি পিছিয়ে যাননি। চাপের কাছে মাথা নত করেননি। তিনি জানতেন, নীরবতা অনেক সময় অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
ভন লাওয়ের জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বিজ্ঞানীর কাজ শুধু গবেষণাগারে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা নয়। প্রয়োজনে সত্য, মানবতা এবং স্বাধীন চিন্তার পক্ষেও দাঁড়াতে হয়। সেই কারণেই ম্যাক্স ভন লাওয়ে শুধু একজন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী নন। তিনি ছিলেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জ্ঞান, সাহস এবং বিবেকের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
জেমস ফ্রাঙ্ক ছিলেন ইহুদি, আর ফন লাউ ছিলেন হিটলারের প্রকাশ্য সমালোচক। কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে তারা দুজনেই ছিলেন সুপারস্টার। তাদের বৈজ্ঞানিক অবদানের জন্য দুজনেই নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।
জেমস ফ্রাঙ্ক 1925 সালে ফিজিক্সে নোবেল পান, ইলেকট্রনের সাথে পরমাণুর সংঘর্ষসংক্রান্ত ‘ফ্রাঙ্ক-হার্টজ পরীক্ষা’র মাধ্যমে কোয়ান্টাম তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণের জন্য। আর ম্যাক্স ফন লাউ 1914 সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল অর্জন করেন ক্রিস্টাল বা কেলাসের মাধ্যমে এক্স-রে বিচ্ছুরণ (X-ray diffraction) আবিষ্কার করে। তাঁদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এবং কঠিন পদার্থের গঠন বোঝার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। ফলে বিজ্ঞান বিশ্বে দুজনেই হয়ে উঠেছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।
কিন্তু সেই নোবেলগুলোই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। কারণ হিটলার তখন নোবেলের ঘোর বিরোধী।
1936 সালে নোবেল কমিটি শান্তি পুরস্কারের জন্য কার্ল ফন অসিয়েৎস্কি (Carl von Ossietzky) নামের এক জার্মান সাংবাদিক ও শান্তিকামী আন্দোলনকারীকে মনোনীত করে। অসিয়েৎস্কি ছিলেন হিটলারের চরম বিরোধী এবং নাৎসিদের গোপন সামরিক প্রস্তুতি ফাঁস করার অপরাধে তিনি তখন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন। হিটলার এই সিদ্ধান্তকে জার্মানির অপমান এবং নাৎসি শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন। চরম ক্ষুব্ধ হয়ে 1937 সালে হিটলার এক জরুরি ফরমান জারি করেন (Führererlass), যার মাধ্যমে যেকোনো জার্মান নাগরিকের জন্য নোবেল পুরস্কার গ্রহণ বা এর কোনো স্বীকৃতি নিজেদের কাছে রাখা চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নোবেল পুরস্কারের জায়গায় চালু করা হয় হিটলারের নিজস্ব ‘জার্মান ন্যাশনাল প্রাইজ’।
দুই বিজ্ঞানীর চরিত্র থেকেই নিশ্চই স্পষ্ট হয়েছে যে এরা দুজনেই হিটলারের মর্জিমতো চলার লোক ছিলেন না। নিজের সোনার মেডেল দুটো নাৎসি সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তাঁদের ছিল না। কিন্তু ঘরে রাখাও ছিল সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের আমন্ত্রণ। তাই ফ্রাঙ্ক ও ফন লাউ গোপনে সিদ্ধান্ত নেন তাঁদের ২৩ ক্যারেট সোনার তৈরি নোবেল মেডেল দুটোকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার।

নিরপেক্ষ দেশ ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অবস্থিত ‘নিলস বোর ইনস্টিটিউট’ ছিল তখন বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের এক বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল। বিখ্যাত পদার্থবিদ নিলস বোর নিজে ছিলেন এই ইনস্টিটিউটের প্রধান এবং হিটলারের রোষানলে পড়া বিজ্ঞানীদের সহায়তায় সর্বদা প্রস্তুত। তাই আন্তর্জাতিক সীমানা পার করে অতি গোপনে মেডেল দুটোকে কোপেনহেগেনে নিলস বোরের কাছেই নিরাপদ হেফাজতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু তাতেও রেহাই নেই।
1940 সালের 9 এপ্রিল নাৎসি জার্মানি হুট করেই কোনো সতর্কবার্তা ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ডেনমার্ক আক্রমণ করে বসে এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো দেশটি দখল করে নেয়। হঠাৎ এই আগ্রাসনে নিলস বোর ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা চরম আতঙ্কে পড়ে যান। কারণ যে শান্তিময় ডেনমার্ককে তাঁরা সবচেয়ে নিরাপদ ভাবছিলেন, সেখানেই এখন নাৎসি সৈন্যদের বুটের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, ইনস্টিটিউটে লুকিয়ে রাখা ওই দুটো সোনার মেডেলের গায়ে স্পষ্ট করে খোদাই করা ছিল মেডেলের মালিকদের নাম—ম্যাক্স ফন লাউ এবং জেমস ফ্রাঙ্ক! নাৎসি বাহিনী তল্লাশি চালিয়ে এই মেডেলের সন্ধান পেলে কার পরিণতি কী হবে, তা ভেবে তাঁদের শিউরে ওঠার অবস্থা হলো।
আরও একটা ব্যাপার ছিল এখানে। হিটলারের এই আগ্রাসী যুদ্ধের ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন পড়েছিল। জার্মানির ব্যাংকে জমে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তখন প্রায় শূন্যের কোঠায়, আর নাৎসিদের তৈরি করা কাগুজে নোট ‘রাইখসমার্ক’ নিতে কোনো বিদেশি রাষ্ট্র রাজি হচ্ছিল না। ট্যাংক, প্লেন আর গোলাবারুদ বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল—যেমন সুইডেনের লোহা বা চিলির তামা কিনতে হলে অন্যান্য দেশ কেবল নগদ খাঁটি সোনা বা ডলার দাবি করছিল। তাই নাৎসিদের যুদ্ধবাজ মেশিন সচল রাখতে পুরো জার্মানি তো বটেই, এমনকি দখল করা দেশগুলোর ব্যাংক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, অলঙ্কার—সব জায়গা থেকে সোনা বাজেয়াপ্ত করা তারা শুরু করেছিল। এই অবস্থায় কোনো জার্মান নাগরিকের মেডেলের সোনা বাইরে পাচার হওয়ার খবর পেলেই নাৎসিরা তাকে দেশদ্রোহী হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিত।

এই সংকটময় সময়ে এগিয়ে এলেন রসায়নবিদ জর্জ দ্য হেভেসি। তিনি ছিলেন হাঙ্গেরির একজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী। রেডিওঅ্যাক্টিভ ট্রেসার পদ্ধতির পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর নাম আজও বিজ্ঞানজগতে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এই কাজের জন্য তিনি 1943 সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

তবে সেই মুহূর্তে তাঁর সামনে ছিল এক ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। নোবেল পদক দুটিকে কীভাবে নিরাপদে রাখা যায়? মাটির নিচে পুঁতে রাখা যেতে পারত। কিন্তু তাতেও ঝুঁকি ছিল। কোনো দিন খুঁজে পাওয়া গেলে সব গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যেত।
হেভেসি বুঝলেন, আরও বুদ্ধিদীপ্ত কিছু করতে হবে। তখন তাঁর মাথায় এলো এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কৌশল। পদকগুলোকে এমনভাবে লুকিয়ে রাখতে হবে, যাতে সেগুলো সবার চোখের সামনেই থাকে, অথচ কেউ চিনতে না পারে।
এই পরিকল্পনার নায়ক ছিল একটি অদ্ভুত রাসায়নিক মিশ্রণ—অ্যাকোয়া রিজিয়া। নামের মধ্যেই তার বিশেষত্ব লুকিয়ে আছে। লাতিন ভাষায় Aqua Regia অর্থ “রাজাদের জল”। কারণ এটি এমন একটি তরল, যা সোনার মতো “রাজকীয়” ধাতুকেও দ্রবীভূত করতে পারে। অ্যাকোয়া রিজিয়া তৈরি হয় দুটি শক্তিশালী অ্যাসিড মিশিয়ে। এক ভাগ ঘন নাইট্রিক অ্যাসিড এবং তিন ভাগ ঘন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড।
সাধারণ অবস্থায় সোনা (Au) অত্যন্ত নিষ্ক্রিয়। আলাদা অবস্থায় এদের কোনোটিই সোনাকে গলাতে পারে না। কিন্তু একসঙ্গে মিশলে তাদের ক্ষমতা সম্পূর্ণ বদলে যায়। নাইট্রিক অ্যাসিড প্রথমে সোনার পরমাণু থেকে ইলেকট্রন কেড়ে নেয়, অর্থাৎ সোনার আয়নে (Au³⁺) জারিত করে। এরপর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড থেকে আসা ক্লোরাইড আয়ন সেই সোনার আয়নকে ঘিরে ফেলে। ফলে তৈরি হয় একটি স্থিতিশীল ও দ্রবণীয় যৌগ (chloroauric acid বা tetrachloroaurate(III) (HAuCl4))। সোনা ধীরে ধীরে কঠিন ধাতু থেকে দ্রবণের অংশ হয়ে যায়। সরলীকৃত বিক্রিয়াটি হলো—
Au + 3HNO₃ + 4HCl → HAuCl₄ + 3NO₂ + 3H₂O
সেটিই মূলত chloroauric acid-এর দ্রবণ। বিক্রিয়ার সময় বাদামি রঙের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বের হয়। আর দ্রবণটি ধীরে ধীরে কমলা-হলুদ রঙ ধারণ করে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এখানে কোনো একক রাসায়নিক পদার্থ কাজটি করে না। একটি পদার্থ সোনাকে জারিত করে, আর অন্যটি সেই সোনাকে দ্রবণে ধরে রাখে। দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার যৌথ কাজেই অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। এই কারণেই অ্যাকোয়া রিজিয়া রসায়নের একটি চমৎকার উদাহরণ। কখনও কখনও একা কেউ যা পারে না, একসঙ্গে কাজ করলে তা সম্ভব হয়ে ওঠে।
এবার চলুন, ফিরে যাই কোপেনহেগেনের সেই ঐতিহাসিক দিনে। বাইরে তখন নাৎসি সৈন্যদের বুটের শব্দ। একের পর এক রাস্তা ও ভবন দখল হয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক সেই সময়েই, একটি ল্যাবরেটরির ভেতরে চলছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক লড়াই। জর্জ দ্য হেভেসি ধীরে ধীরে নোবেল পদক দুটিকে অ্যাকোয়া রিজিয়ার মধ্যে দ্রবীভূত করছিলেন।
যুদ্ধের গর্জনের মাঝেও রসায়ন নিজের নীরব কাজ করে চলেছিল। কিছুক্ষণ পর আর কোনো পদক রইল না। সোনার সেই ভারী, চকচকে চাকতিগুলো রূপ নিল একটি সাধারণ কমলা-হলুদ রঙের তরলে। ইতিহাস যেন গলে মিশে গেল একটি কাচের বোতলের ভেতর।
হেভেসি বোতলটি ল্যাবরেটরির একটি সাধারণ তাকের ওপর রেখে দিলেন। কোনো তালা নয়। কোনো গোপন কুঠুরি নয়। একেবারে সবার চোখের সামনেই। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নাৎসি সৈন্যরা ইনস্টিটিউট তল্লাশি করল। তারা কাগজপত্র দেখল। ঘর খুঁজল। ল্যাবরেটরি ঘুরে দেখল। কিন্তু সেই বোতলটির দিকে তাদের বিশেষ নজরই গেল না। তারা খুঁজছিল স্বর্ণের পদক। অথচ পদকগুলো তখন তাদের চোখের সামনেই ছিল। শুধু অন্য রূপে।

এরপর কেটে গেল কয়েকটি দীর্ঘ বছর। যুদ্ধ শেষ হলো। ইউরোপ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করল। হেভেসিও আবার সেই ল্যাবরেটরিতে ফিরে এলেন। আশ্চর্যের বিষয়, তাকের ওপর রাখা বোতলটি এখনও অক্ষত ছিল। যেন যুদ্ধ, সময় আর ইতিহাস—কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
এরপর শুরু হলো আরেকটি রসায়নের গল্প। দ্রবণ থেকে আবার সোনা পৃথক করা হলো। ধীরে ধীরে সেই দ্রবীভূত সোনা ফিরে পেল তার কঠিন রূপ। পরে সেই সোনা পাঠানো হলো রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসে। সেখানেই নতুন করে তৈরি করা হলো নোবেল পদক দুটি। অবশেষে পদকগুলো ফিরে গেল তাদের প্রকৃত মালিকদের কাছে। 1952 সালে জেমস ফ্রাঙ্ক আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পুনর্নির্মিত নোবেল পদক গ্রহণ করেন। ম্যাক্স ভন লাওয়েও ফিরে পান তাঁর পদক।
এই গল্প শুধু একটি রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি বিজ্ঞানের সৃজনশীল শক্তির এক অসাধারণ উদাহরণ। এখানে কোনো নতুন যন্ত্র ছিল না। কোনো গোপন প্রযুক্তিও ছিল না। ছিল শুধু রসায়নের একটি পরিচিত বিক্রিয়া এবং একজন বিজ্ঞানীর অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি। এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান শুধু পরীক্ষাগারের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো বিজ্ঞান হয়ে ওঠে সাহসের ভাষা। কখনো হয়ে ওঠে মানবতার রক্ষাকবচ। আর কখনো কখনো, একটি সাধারণ কাচের বোতলও ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান গুপ্তধনের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
সূত্রসমূহ:
কথায় আছে: History repeats itself। ইতিহাস পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। ইতিহাসের কোনো কোনো ঘটনার সাথে পরবর্তী বা পূর্ববর্তী কোন ঘটনার মূল সুর অদ্ভুতভাবে মিলে যেতে দেখা যায়। ১৯৩৩ সালে ম্যাক্স ভন লাওয়ে গ্যালিলিওর ওপর চার্চের নিপীড়নের সঙ্গে আইনস্টাইনের তত্ত্বের বিরুদ্ধে নাৎসি আক্রমণের তুলনা করেছিলেন। কয়েক বছর পরে বের্টোল্ট ব্রেখট লিখলেন তাঁর বিখ্যাত নাটক লাইফ অব গ্যালিলিও। ব্রেখট মূল নাটকটি শুরু করেন ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে। ডেনমার্কে তখন তিনি নির্বাসিত। শেষ হয় ১৯৩৯ সালের শুরুর দিকে। তার ঠিক এক বছর পরেই ঘটে ছিল নীলস বোরের কোপেনহেগেন ইনস্টিটিউটে উপরোক্ত অধ্যায়।
ব্রেখটের নাটকে দেখা যায়, গ্যালিলিওর নিষিদ্ধ পাণ্ডুলিপি তাঁর ছাত্র আন্দ্রিয়া সীমান্ত পেরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রহরীরা তার সব জিনিসপত্র তল্লাশি করে, কিন্তু হাতে ধরা বইটির দিকে তাকায় না। সত্য তাদের চোখের সামনেই ছিল, তবু তারা তাকে দেখতে পায়নি। অনেকটা সেই অ্যাকোয়া রিজিয়ার বোতলের মতো, যেখানে নাৎসি সৈন্যদের চোখের সামনেই লুকিয়ে ছিল দুটি নোবেল পদক। এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি চিরন্তন সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। শক্তি, ক্ষমতা, নিপীড়ন—কোনোটিই জ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে দীর্ঘদিন থামিয়ে রাখতে পারে না। ধর্মীয় কর্তৃত্ব পারেনি গ্যালিলিওকে থামাতে। নাৎসিবাদ পারেনি আইনস্টাইন, ফ্রাঙ্ক বা ভন লাওয়ের উত্তরাধিকার মুছে দিতে। কারণ শেষ পর্যন্ত সব অস্ত্রকেই হার মানতে হয় মানুষের চিন্তা ও নৈতিক শক্তির কাছে। তাই ব্রেখটের নাটকের শেষে ছাত্র আন্দ্রিয়ার আক্ষেপ—“Unhappy the land that has no heroes” (দুর্ভাগা সেই দেশ, যেখানে কোনো বীর নেই।। এর উত্তরে গ্যালিলিওর সেই অমর উক্তি আজও সমান প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে—
“No. Unhappy the land that is in need of heroes.” (না। দুর্ভাগা সেই দেশ, যে দেশের বীরের প্রয়োজন হয়।)। অর্থাৎ, যে সমাজে সত্য বলার জন্য বীরের প্রয়োজন হয়, সেই সমাজই আসলে সংকটে। সত্যিই, যে সমাজে স্বাধীন চিন্তা, প্রশ্ন করার অধিকার এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা স্বাভাবিক বিষয়, সেখানে বীরের প্রয়োজন পড়ে না। গ্যালিলিও, ভন লাওয়ে, ফ্রাঙ্ক কিংবা হেভেসির কাহিনী শেষ পর্যন্ত আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে যায়।
ম্যাক্স ভন লাওয়ে কেলাসে (crystal) এক্স-রে তরঙ্গের অপবর্তন (diffraction) আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। তিনি দেখান যে এক্স-রশ্মি যখন কেলাসের ভেতর প্রবেশ করে, তখন সেগুলো নির্দিষ্ট কোণে ছড়িয়ে পড়ে।
যেমন, একটি নতুন ব্লেড এর দুটি ধারালো প্রান্ত মুখোমুখি রেখে একটি লেজারের আলো (লাল / সবুজ যাই রংয়ের হোক) সেই ফাঁকের মধ্য দিয়ে গেলে সামনের দেয়ালের আলোর এক বিশেষ নকশা তৈরি করে। আলো ও অন্ধকারের পটিগুলো পরপর সাজানো অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়।

এই ফাঁকগুলো অত্যন্ত সামান্য ব্যবধানে একইভাবে সাজানো থাকলে নকশার ধরন বদলে যায়। অর্থাৎ কেলাসের মধ্যের পরমাণুগুলির মধ্যে সূক্ষ্ম এইরকম ফাঁক দিয়ে এক্স-রশ্মি গেলেও এক অপবর্তন নকশা তৈরী হয়।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, কেলাসের ভেতরের পরমাণুগুলো নিয়মিতভাবে সাজানো থাকে। এই অপবর্তন নকশা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো পদার্থের ভেতরের অণু-পরমাণুর বিন্যাস নির্ণয় করতে সক্ষম হন। এই আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিদ্যায় 1914 সালে নোবেল পুরস্কার পান বিজ্ঞানী ভন লাউয়ে।
জেমস ফ্রাঙ্ক (গুস্তাভ হার্টজের সঙ্গে) পরিচিত Franck–Hertz পরীক্ষার জন্য। 1924 সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার যৌথভাবে প্রদান করা হয় জেমস ফ্রাঙ্ক এবং গুস্তাভ লুইডিগ হার্টজ-কে।
এই পরীক্ষাটি খুব সহজভাবে বুঝলে এমন—ধরা যাক, আমরা একটি ইলেকট্রনকে ধীরে ধীরে শক্তি দিচ্ছি। আর সেই শক্তি পেয়ে ইলেকট্রনটি এগোচ্ছে একটি গ্যাসের পরমাণুর দিকে। এরকম ইলেকট্রন ঝাঁকে ঝাঁকে এগিয়ে আসছে ঐ পরমাণুর দিকে। প্রথমে ইলেকট্রনগুলো পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়েও খুব একটা শক্তি হারায় না (স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ), কিন্তু একটি নির্দিষ্ট শক্তির মানে পৌঁছালে হঠাৎ তারা অনেকটা শক্তি হারিয়ে ফেলে।

এর মানে কী? এর মানে হলো, পরমাণুতে থাকা ইলেকট্রন ইচ্ছেমতো যেকোনো পরিমাণ শক্তি গ্রহণ করে না; বরং পরমাণুর মধ্যে থাকা কোন ইলেকট্রন যদি এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরের তফাতের শক্তি ঐ ধেয়ে আসা কোন ইলেকট্রন থেকে পাওয়ার উপক্রম হয়, তখনই কেবল শক্তির স্থানান্তর ঘটে (অস্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ)। তাই বাইরে থেকে ধাবমান কোন ইলেকট্রনের শক্তি যদি ক্রমশ বাড়ানো যায়, শক্তির নির্দিষ্ট কিছু কিছু মানের ক্ষেত্রে পরমাণুর ভেতরের ইলেকট্রন নির্দিষ্ট ‘ধাপে ধাপে’ শক্তি গ্রহণ করে—এগুলোই হলো কোয়ান্টাইজড শক্তিস্তর। অর্থাৎ, যখন বাইরের ইলেকট্রন পরমাণুর ভেতরের ইলেকট্রনের এক শক্তিস্তর থেকে বেশী শক্তির কোন স্তরে যাওয়ার মত নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি নিয়ে আসে, তখনই পরমাণুস্থ ইলেকট্রনটি সেই শক্তি শোষণ করে চলে যায় বেশী শক্তির সেই স্তরে এবং বাইরের ইলেকট্রন শক্তি হারায়। পরে ঐ উত্তেজিত ইলেকট্রন আবার তার আগের শক্ত স্তরে ফিরে এলে বর্জিত সেই শক্তি আলো হিসেবে বেরিয়ে আসে। যেমন ছবিতে নিয়ন গ্যাসের কমলা আভা দেখা যাচ্ছে।
জর্জ দ্য হেভেসি রেডিওঅ্যাক্টিভ ট্রেসার পদ্ধতিতে দেখান যে, তেজস্ক্রিয় আইসোটোপকে “ট্রেসার” হিসেবে ব্যবহার করে কোনো পদার্থ শরীরের ভেতরে বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কীভাবে চলাচল করে তা অনুসরণ করা যায়। এই কাজ আধুনিক নিউক্লিয়ার মেডিসিন, জৈব রসায়ন এবং পরিবেশবিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দেয়। ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলা যাক। রেডিওঅ্যাক্টিভ ট্রেসার বা রেডিওলেবেল বলতে এমন একটি কৃত্রিম যৌগকে বোঝায়, যা প্রাকৃতিক কোনো পদার্থের মতোই হলেও তার এক বা একাধিক পরমাণুর জায়গায় একটি তেজস্ক্রিয় পরমাণু (রেডিওনিউক্লাইড) বসানো থাকে। এই তেজস্ক্রিয় পরমাণু ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে হতে বিশেষ সংকেত দেয়, যার সাহায্যে বিজ্ঞানীরা সহজেই বুঝতে পারেন কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক থেকে উৎপন্ন পদার্থে রূপান্তরের সময় কোন গতিপথ ধরে বিক্রিয়াটি এগোচ্ছে। ফলে সহজে সেই গতিপথ অনুসরণ করা যায় এবং বিক্রিয়ার প্রকৃত প্রক্রিয়া বোঝা সম্ভব হয়। এই পদ্ধতিকে রেডিওলেবেলিং বা রেডিওট্রেসিং বলা হয়, যা আসলে আইসোটোপ লেবেলিং-এরই একটি তেজস্ক্রিয় রূপ। জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, যেখানে জীবন্ত দেহের মধ্যে পদার্থের চলাচল বা ব্যবহার অনুসরণ করা হয়, এই ধরনের পরীক্ষাগুলিকে সাধারণত রেডিওআইসোটোপ ফিডিং এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়।
লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।
Scan the above code to read the post online.
Link: https://bigyan.org.in/franck-laue-nobel-concealment