15-06-2026 09:03:19 am
Link: https://bigyan.org.in/banglar-kitpatanga-bhumika

মেরু অঞ্চলের মানুষেরা মাঝে মাঝে উদীয়মান বা অস্তায়মান সূর্যের দিকে তাকালে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান। আকাশে একটা সূর্যের বদলে দেখা যায়, সূর্যের দু’ধারে আরো দুটো উজ্জ্বল বিন্দু! এর একটা কাব্যিক নাম রয়েছে, sun dog বা সূর্যসঙ্গী কুকুর।
ভালো করে দেখলে দেখা যাবে, এই দুটি বিন্দু একটা বলয়ের (ring) উপর রয়েছে। এই উজ্জ্বল বিন্দু কিম্বা বলয় কিন্তু সুদূর মহাকাশে কোথাও তৈরী হচ্ছে এমন নয়। এটা তৈরী হয় আমাদেরই বায়ুমণ্ডলে।
আগের অংশে আমরা দেখেছিলাম কিভাবে এই বলয়টা তৈরি হয়। মূলত, মেঘের মধ্যে বরফের দানা পেরোতে গিয়ে আলোর পথ বেঁকে যাওয়ার ফলে এই বলয়ের সৃষ্টি। ইস্কুলের পাঠ্যবইয়ে পড়া প্রিজম-এর ভিতর দিয়ে আলোর প্রতিসরণ (refraction) প্রকৃতিতে ধরা দেয় এই পুঞ্জীভূত আলোর বলয় হিসেবে।
কিন্তু বলয়ের মধ্যে দুটো বিন্দু বাকিদের থেকে উজ্জ্বল হয়ে যায় কীভাবে সেটা বুঝতে এখনো বাকি। সেই গল্পই থাকবে এই অধ্যায়ে।
আগের অংশে দেখানো হয়েছিল কিভাবে সূর্যের চারিদিকে এই আলোর বলয়ের সৃষ্টি হয়। সাধারণত বরফের দানাগুলো যখন ছোট হয়, তাদের বিভিন্ন দিকে মুখ করে থাকার সমান সম্ভাবনা রয়েছে। তাই উপরে-নিচে-ডাইনে-বাঁয়ে, যেখান থেকেই আলো বেঁকে চোখে আসছে, সেই আলোটাই আমরা দেখতে পাই। এই প্রতিসাম্যের (symmetry) কারণে গোলাকার কিছু তৈরী হয়।
আর যেহেতু 22° কোণে সবথেকে বেশী আলো বাঁক নেয়, তাই ওই কোণে গোলাকার কিছুটা একটা বলয় (ring) আকারে ধরা দেয়।
কিন্তু বলয়ের মধ্যে দুটো বিন্দু বেশী উজ্জ্বল কেন? প্রতিসাম্য-টা (symmetry) ভাঙলো কীকরে? তার কারণ, বরফের দানাগুলো বড় হয়ে গেলে আর যেকোনো দিকে মুখ করে থাকতে পারেনা।
চোখ বুজে কল্পনা করো, আকাশে লক্ষ লক্ষ প্রিজম ভাসছে। কিন্তু তাদের চ্যাপ্টা দিকগুলো সব জমির সাথে সমান্তরাল (parallel)।
কিসের চাপে বরফের দানাগুলো জমির দিকে মুখ করে থাকে, সেটা বুঝতে হলে আমাদের পাঠ্যবইয়ে ফিরে যেতে হবে। চলন্ত তরল পদার্থের মধ্যে ভাসমান একটা বস্তুর উপর কী ধরণের বল সৃষ্টি হয়, সেইটা দেখতে হবে।
খুব সহজ করে বললে, বরফের দানাগুলো জমির সমান্তরাল (parallel) হয়ে যায় যাতে প্যারাসুটের মত ভেসে থাকতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায়, এই অবস্থায় ওদের drag coefficient সবথেকে বেশী। অর্থাৎ, এই অবস্থায় ওদের ভেসে থাকা সবথেকে সহজ।
আরেকটু তলিয়ে দেখলে, বরফের দানাগুলো যখন উপর থেকে নিচে পড়ছে, ওদের সাপেক্ষে বাতাস উঠছে নিচ থেকে উপরে। সেই বাতাসকে বরফের বাধা পেরিয়ে উঠতে হয়। ধরা যাক, বরফটা সামান্য কাত হয়েছে ছবির মত। বাতাস যখন খুব তাড়াতাড়ি দুধার পেরিয়ে যায়, সেই দুধারে নিম্নচাপ তৈরি হয়। আর মাঝখানে তৈরী হয় উচ্চচাপ। এটা বার্নুলি নীতি (Bernoulli’s principle) থেকে দেখা যায় — যেখানে গতি বেশি, সেখানে চাপ কম। সেই চাপজনিত বলের ফলে যে টর্ক (torque) তৈরী হয়, তার একটা প্রবণতা থাকে যেদিকে কাত হয়ে আছে, তার উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার।
ব্যাস, এই কারণেই বেশিরভাগ বরফের দানা জমির সমান্তরাল হয়ে পড়ে। আর সেই দানা থেকে প্রতিসরিত (refracted) আলো আসে চোখে। সূর্য যখন উঠছে বা নামছে, তখন সূর্যের আলো প্রায় একটা রেখা থেকে আসছে মনে হয়। কিন্তু আগের অংশে আমরা দেখেছি কেন একটা বিশেষ কোণ থেকে আসা আলো বাকিসব কোণের থেকে বেশি উজ্জ্বল লাগে — যে কারণে 22° কোণে একটা বলয় তৈরী হয়। একই কথা সেই রেখার জন্যেও খাটে। 22° কোণ থেকে আসা আলো বাকি আলোর থেকে বেশী উজ্জ্বল লাগে।
অর্থাৎ, বলয় আর রেখার সংযোগস্থলে রয়েছে দুটো বিন্দু। সেই দুটো বিন্দুই সূর্যের পাশে দুটো সূর্য হিসেবে ধরা দেয়। এটাই সূর্যসঙ্গী কুকুরের (sun dog) রহস্য। দুটো আলোকবিন্দু যেগুলো এতটাই তীব্র, এতটাই স্পষ্ট, যে মনে হয় তারা আলোর ভিড় থেকে এগিয়ে এসে নিজেকে আলাদা করে দেখাতে চাইছে।
এইভাবে, আকাশে দেখা সূর্যের সাথে অনুভূমিক ভাবে উপস্থিত উজ্জ্বল আলোকবিন্দুর পেছনে কাজ করে বায়ুগতিবিদ্যার সূক্ষ্ম নিয়ম, চাপ–বেগের সম্পর্ক, আর ষড়ভুজাকার বরফ-কেলাসের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতার প্রবণতা—সব মিলিয়ে প্রকৃতি এখানে এক অনবদ্য পদার্থবিদ্যার নাটক উপস্থাপন করে।
এই ধরণের জিনিস কেন উচ্চ অক্ষাংশে (high latitudes) বেশী প্রতীয়মান হয়?
নিচের দিকের এলাকায় সূর্যের তাপে বাতাস সারাক্ষণ ওপর-নিচ করে (যাকে বলে convection eddies)। ফলে বরফের দানাগুলো বাতাসে কাগজের টুকরোর মতো এলোমেলো ওলটপালট খেতে থাকে। অর্থাৎ যে গল্পটা আগে বললাম, সেটা শান্ত বাতাসের গল্প। অশান্ত বাতাসে সেটা ঘেঁটে যায়।
একমাত্র মেরু অঞ্চলের দিকে মাটির বরফ প্রচণ্ড ঠান্ডা হওয়ায় সেখানকার বাতাস একদম ভারী ও শান্ত থাকে। কোনো ওলটপালট হাওয়া না থাকায় বরফের চ্যাপ্টা দানাগুলো বাতাসে একদম সোজা হয়ে, নিখুঁতভাবে সমান্তরালভাবে ভেসে থাকতে পারে।
আরেকটা ব্যাপার হলো, আমরা কিন্তু এতক্ষণ যেসব বরফের দানার কথা বলছি, তারা তৈরি হয় মেঘমুলুকে, অর্থাৎ প্রায় কুড়ি থেকে তিরিশ হাজার ফুট ওপরে। নিচের অক্ষাংশে সেসব বরফের দানা নামতে নামতে একটার সাথে আরেকটার ধাক্কা লেগে ভেঙে যায়, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বা দলা পাকিয়ে যায়। ওইরকম নিখুঁত ষড়ভুজাকার প্রিজম থাকে না। তাই অত পরিষ্কার প্রতিসরণের ফল এদের মধ্যে দিয়ে দেখা যায় না।
কিন্তু মেরু অঞ্চলে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে মাটির কাছাকাছি বাতাসের জলীয় বাষ্পই জমে বরফ হয়ে যায় (যাকে আমরা diamond dust বলি)।
বাতাস একদম শান্ত থাকায় এই বরফ-কণাগুলো খুব ধীরে ধীরে এবং নিখুঁতভাবে তৈরি হওয়ার সুযোগ পায়। এগুলো দেখতে হয় একদম নিখুঁত ছয় কোণা কাঁচের থালার মতো, যার গা মসৃণ আর স্বচ্ছ। যখন সূর্যের আলো এই নিখুঁত কাঁচের ওপর পড়ে, তখন কোনো আলো নষ্ট বা ছিটকে যায় না। সরাসরি প্রতিসরিত হয়ে তীরের মতো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়।
অর্থাৎ প্রায় ল্যাবরেটরির মত প্রিজম (prism) একদম চোখের স্তরে দেখা যায় মেরু অঞ্চলে। ফলে এই নকল সূর্যও সেখানে স্পষ্ট দেখা যায়।
খেয়াল করলে দেখা যায়, এই সান ডগের ভেতরে লুকিয়ে আছে সূক্ষ্ম রঙের খেলা।
প্রিজমের ভেতর দিয়ে আলো ভাঙতে ভাঙতে সেখানে ফুটে ওঠে রামধনুর ছোঁয়া—ভেতরের দিকে হালকা লালচে, বাইরের দিকে নীলাভ আভা। আলো এখানে শুধু উজ্জ্বল নয়, রঙিনও।
এখন প্রশ্ন: হঠাৎ এই রং-এর উদয় হয় কোথা থেকে? কেনই বা লাল ভেতরে, নীল বাইরের দিকে? আমরা জানি, সাদা আলোর এই সাতটা রঙে ভেঙে যাওয়া সাধারণ কাচের আয়তঘনাকার স্ল্যাবে দেখা যায় না। কিন্তু প্রিজমের মতো বিচ্ছুরক মাধ্যমে সাদা আলোর ভেঙে যাওয়া আমাদের অতি পরিচিত ঘটনা।
যেকারণে রামধনু তৈরি হয়, এখানেও গল্পটা একই — শুধু জলের ফোঁটার বদলে বরফের দানা বসালেই হবে। যে কোন প্রতিসারক মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক (refractive index) তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (wavelength) উপর নির্ভরশীল। আপতিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি বাড়ে, মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক সেক্ষেত্রে কমে। নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে কম, তাই মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক তার জন্য বেশি। সাদা কথায়, নীল আলো লাল আলোর তুলনায় বেশি বেঁকে যায়, তাই তাদের আলাদা আলাদা দেখা যায়।
তবে রামধনুর মতো তীব্র রঙ আলাদা করে দেখা যায় না, কারণ বরফ-দানাগুলো স্থির হয়ে নেই, তারা সামান্য এদিক–ওদিক ঘোরে।
আমরা যখন একদম ভোরে সূর্যোদয় বা বিকেলে সূর্যাস্তের সময় আকাশের দিকে তাকাই, তখন দেখতে পাই নকল সূর্যদুটি ঠিক 22 ডিগ্রি রঙিন বৃত্তটার গায়ের ওপর চমৎকার দুটি রত্নের মতো চড়ে বসে আছে। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে এর রূপ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
এর কারণ হলো, সূর্য যখন দিগন্তের কাছাকাছি থাকে, তখন তার আলোকরশ্মি বাতাসে ভাসমান বরফের চ্যাপ্টা কাঁচগুলোকে একদম সোজাসুজি বা সমান্তরালভাবে আঘাত করে। এই সোজা পথে আলোর বিচ্যুতি বা বাঁক নেওয়ার পরিমাণ হয় সবথেকে কম, যা ঠিক 22 ডিগ্রি (কারণটা আগের অংশে বলা হয়েছে)। কিন্তু বেলা যত বাড়তে থাকে এবং সূর্য আকাশ জুড়ে যত উঁচুতে উঠতে শুরু করে, আলোর এই সরল পথটাও তত জটিল হয়ে যায়।
এখন সূর্যের আলো আর বরফের চ্যাপ্টা চাকতিগুলোর মধ্য দিয়ে সোজাসুজি যেতে পারে না। তাকে ওপর থেকে নিচের দিকে বেশ কোণাকুণি বা বাঁকা পথ ধরে কাঁচের ভেতর দিয়ে গলতে হয়। এই কোণাকুণি ভ্রমণের কারণে আলো কাঁচের ভেতরে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হয়, যা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্রাভেইস এফেক্ট’ (Bravais effect) নামে পরিচিত।
সূর্য যত ওপরে ওঠে, আলোর এই অতিরিক্ত বাঁকের কারণে সান ডগ দুটি আর 22 ডিগ্রির সেই চেনা বৃত্তের ওপর ধরে রাখা যায় না। তারা আস্তে আস্তে বলয়ের সীমানা ভেঙে বাইরের দিকে ছিটকে যেতে শুরু করে। সূর্য যখন আকাশে বেশ উঁচুতে, ধরা যাক 45 ডিগ্রি কোণে থাকে, তখন নকল সূর্য দুটি আসল সূর্য থেকে প্রায় 32 ডিগ্রি দূরে সরে যায়। অর্থাৎ, আলোর বলয়-র বৃত্তটা তার নিজের জায়গায় স্থির থাকলেও, সূর্যের এই দুই মায়াবী প্রহরী বৃত্ত ছেড়ে ক্রমশ দুই পাশে দূরে চলে যায়।
একসময় আকাশে সূর্য অনেক উঁচুতে উঠে গেলে এই কোণাকুণি আলোর খেলাটাই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। নকল সূর্যগুলোও আস্তে আস্তে বাতাসে মিলিয়ে যায়।
আবার একই সজ্জায় থাকা বরফের দানার সজ্জা থেকেই জন্ম নেয় আরেকটি অপূর্ব আকাশঘটনা – সৌর স্তম্ভ বা সোলার পিলার (Solar Pillar)। আলোর বলয় বা পারহেলিয়া (parhelia) যেখানে সূর্যের দু’পাশে অনুভূমিকভাবে আলোর ঘনীভবন ঘটায়, সোলার পিলার সেখানে সূর্যের উপর বা নীচে একটি উল্লম্ব আলোর স্তম্ভ তৈরি করে। প্রথম দর্শনে মনে হয়, যেন সূর্য নিজেই আকাশে আলো দিয়ে একটি সোজা দণ্ড এঁকে রেখেছে।
সোলার পিলারের ভৌত ভিত্তি প্রতিসরণ নয়, বরং প্রধানত প্রতিফলন (reflection)। এখানেও মূল ভূমিকায় থাকে সেই একই প্লেট-আকৃতির ষড়ভুজাকার বরফের দানা, যেগুলি বার্নুলি ক্রিয়ার প্রভাবে অনুভূমিকভাবে স্থিতিশীল হয়ে থাকে।
এই কেলাসগুলির উপরের ও নীচের সমতল তল দুটি কার্যত আয়নার মতো আচরণ করে। সূর্য যখন দিগন্তের খুব কাছে থাকে—সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময়—তখন সূর্যের আলো এই অনুভূমিক বরফের উপরিতল বা নীচের তলে পড়ে প্রতিফলিত হয়।
কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় কাজ করে। সব বরফের দানাগুলো নিখুঁতভাবে ভূমির সাথে সমান্তরাল থাকে না; তাদের বেশকিছু ভূমির সাথে অল্প কোণ করে আন্দোলিত হতে থাকে। আর বিভিন্ন উচ্চতায় থাকা অসংখ্য কেলাসের নীচের অনুভূমিক সমতল পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত আলো আমাদের চোখে পৌঁছায় ভিন্ন ভিন্ন কোণে।
এই অসংখ্য প্রতিফলিত আলোকরশ্মি আমাদের চোখে মিলিত হয়ে একটি ধারাবাহিক উল্লম্ব রেখার মতো প্রতীয়মান হয়। বাস্তবে সেখানে কোনও একটানা আলোর দণ্ড নেই—বরং লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র প্রতিফলনের সমষ্টিই চোখে পড়ে একটি আলোর স্তম্ভ হিসেবে। এটাই সোলার পিলার। এখানে লক্ষণীয় পার্থক্যটি হলো: (১) সান ডগ তৈরি হয় মূলত বরফের দানার পার্শ্বতল দিয়ে আলো প্রতিসৃত হওয়ার ফলে; (২) আর সোলার পিলার তৈরি হয় বরফের দানার সমতলপৃষ্ঠ (উপরিতল বা নীচের তল) থেকে আলো প্রতিফলিত হওয়ার কারণে। তাই সোলার পিলারে সাধারণত রামধনুর মতো রঙ দেখা যায় না। আলো ভাঙে না, শুধু প্রতিফলিত হয়। ফলে সোলার পিলারের রঙ প্রায়শই সূর্যের রঙের মতোই হয়—সূর্যাস্তে লালচে বা কমলা, সূর্যোদয়ে সোনালি।
সূর্যের মতোই চাঁদও কখনও কখনও আকাশে একা থাকে না। গভীর রাতে, যখন পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তখন হঠাৎ দেখা যেতে পারে—চাঁদের দু’পাশে মৃদু দুটি আলোকবিন্দু, ঠিক সূর্যের সান ডগের মতোই বিন্যাসে দাঁড়িয়ে আছে। এই রহস্যময় দৃশ্যের নাম মুন ডগ (Moon Dog), বৈজ্ঞানিক ভাষায় যাকে বলা হয় পারাসেলিন (Paraselene)।
নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার পরিচয়। Paraselene শব্দটি এসেছে গ্রীক ভাষা থেকে: para অর্থাৎ “পাশে”, selene অর্থাৎ “চাঁদ”, অর্থাৎ, “চাঁদের পাশে চাঁদ”। ভৌত প্রক্রিয়ার দিক থেকে মুন ডগ আর সান ডগের মধ্যে প্রায় কোনও পার্থক্য নেই। এখানেও মূল ভূমিকায় থাকে উচ্চ বায়ুমণ্ডলের সেই একই ষড়ভুজাকার প্লেট-আকৃতির বরফের দানাগুলি, যেগুলি বার্নুলি ক্রিয়ার প্রভাবে অনুভূমিকভাবে সজ্জিত থাকে। পার্থক্য কেবল আলোর উৎসে, এখানে সূর্যের বদলে আলো আসে চাঁদ থেকে। চাঁদের আলো আসলে সূর্যালোকেরই প্রতিফলন, তাই তার তীব্রতা সূর্যের তুলনায় অনেক কম। এই কারণেই মুন ডগ সাধারণত অনেক বেশি সূক্ষ্ম, মৃদু এবং প্রায়শই বর্ণহীন বা দুধসাদা দেখায়। রামধনুর মতো রঙ খুব কমই চোখে পড়ে, কারণ মানুষের চোখের রঙ অনুভব করার ক্ষমতা কম আলোতে অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়।
তবু জ্যামিতি বদলায় না। বরফ দানার পার্শ্বতল দিয়ে চাঁদের আলো প্রতিসৃত হয়ে ঠিক সেই একই 22 ডিগ্রি কৌণিক দূরত্বে আলোর ঘনীভবন ঘটায়। ফলে পূর্ণিমার রাতে চাঁদের ডান ও বাঁ দিকে, একই উচ্চতায়, দুটি ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট আলোকবিন্দু দেখা যেতে পারে—এই হলো মুন ডগ।
যেদিন আকাশে মুন ডগ দেখা যায়, সেদিন প্রায়ই চাঁদের চারপাশে 22° চান্দ্র (lunar) আলোর বলয়–ও দেখা যায়। তখন চাঁদকে ঘিরে একটি ফিকে আলোকবলয়, আর তার দু’পাশে দুটি আলোকবিন্দু—পুরো দৃশ্যটি যেন রাতের আকাশে আঁকা এক নীরব জ্যামিতিক চিত্র।
এইভাবে সূর্য হোক বা চাঁদ—আলোর উৎস বদলালেও আকাশের নিয়ম বদলায় না। একই বরফের দানা, একই প্রতিসরণ ও প্রতিফলনের আইন, একই কৌণিক জ্যামিতি – দিনের বেলায় তৈরি করে সান ডগ, আর রাতের বেলায় জন্ম দেয় তার শান্ত, ধ্যানমগ্ন সহচর মুন ডগ। আকাশ তখন বুঝিয়ে দেয় – পদার্থবিদ্যার নিয়ম বদলায় না, শুধু আলো বদলালে তার প্রকাশভঙ্গি বদলায়।
এভাবেই একই ধরনের বরফের দানা, একই বায়ুমণ্ডলীয় পরিবেশ—কেবল আলোর সঙ্গে তাদের পারস্পরিক ক্রিয়ার ধরন বদলালেই—আকাশে জন্ম নেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন আলোকঘটনা। কোথাও অনুভূমিক দিকে উজ্জ্বল বিন্দু, কোথাও উল্লম্ব আলোর স্তম্ভ। প্রকৃতি যেন একই উপকরণ দিয়ে আলাদা আলাদা আলোকভাস্কর্য গড়ে তোলে। এই কারণে সান ডগ কিংবা মুন ডগ, সোলার বা লুনার আলোর বলয় এবং সোলার পিলার – সব একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, আকাশ কোনও এলোমেলো শিল্পী নয়। সে একই সঙ্গে একজন দক্ষ পদার্থবিদ, এক জন সূক্ষ্ম জ্যামিতিবিদ এবং এক জন নিঃশব্দ শিল্পী, যে আলো, বরফ আর বাতাস দিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন চিত্র এঁকে চলেছে।
তথ্যসূত্র
[1] 22° Halo, Hyperphysics
[2] What are sundogs and how do they form, space.com
[3] What are sundogs? Rainbows beside the sun, almanac.com
[4] Moon dogs, alamanac.com
[5] What is a moon halo?, space.com
লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।
Scan the above code to read the post online.
Link: https://bigyan.org.in/banglar-kitpatanga-bhumika