12-08-2026 06:08:15 am
Link: https://bigyan.org.in/banglar-keetpatanga-shramik-piprer-janmo-rahasya

একসময় মাছচাষ পুরোপুরি অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করত। আকাশ দেখে আবহাওয়া বোঝা, জলের রং দেখে মাছের অবস্থা আন্দাজ করা, কিংবা মাছ খাবার খাচ্ছে কি না তা চোখে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া এভাবেই চলত মৎস্যচাষ। কিন্তু অন্যান্য জায়গার মতো মৎস্যচাষেও এখন ধীরে ধীরে যোগ দিচ্ছে এক নতুন “সহকারী”, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI)।
শুনতে অবাক লাগলেও, আজকের দিনে এমন প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে যা মাছের খিদে লাগা, জলে অক্সিজেন কমে যাওয়া, এমনকি রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনাও আগে থেকে আন্দাজ করতে পারে!
ধরা যাক, একটি বড় মাছের ট্যাংকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু সবদিন কি মাছ সমানভাবে খাবার খায়? না। কখনও আবহাওয়া বদলায়, কখনও জলের তাপমাত্রা কমে যায়, কখনও মাছ অসুস্থ হয়। তখন অতিরিক্ত খাবার জলে নষ্ট হয় এবং জল দূষিত করে।
এখন অনেক আধুনিক ট্যাংকে জলের নিচে ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। সেই ক্যামেরা মাছের চলাফেরা দেখে বোঝার চেষ্টা করে মাছ সত্যিই ক্ষুধার্ত কি না। যদি মাছ ধীরে সাঁতার কাটে বা খাবারের দিকে না আসে, তাহলে AI বুঝতে পারে যে এখন খাবার কম দেওয়া উচিত। ফলে খাবারও বাঁচে, জলের গুণমানও ভালো থাকে।
এই ধরণের ক্যামেরা শুধু দেখতে পায় না, চিনতেও পারে। বিভিন্ন রকমের আলোয় বিভিন্ন রকমের মাছ দেখে অভ্যস্ত এই ক্যামেরাগুলো। জলের মধ্যে উদ্ভিদ বা বুদবুদের মাঝে কোনটা মাছ, সেটা চিনতে তাদের ভুল হয় না। ফ্রেম ধরে ধরে তারা বুঝতে পারে, মাছের ঝাঁকের চলার প্রবণতা কোন দিকে — খাবারের দিকে নাকি বিপরীতে।

মানুষ যেমন জ্বর এলে দুর্বল হয়ে পড়ে, মাছের ক্ষেত্রেও তেমন আচরণে পরিবর্তন আসে। অসুস্থ মাছ সাধারণত আলাদা হয়ে যায়, ধীরে সাঁতার কাটে বা জলের উপরিভাগে উঠে আসে।
AI-ভিত্তিক ক্যামেরা ও সেন্সর এই অস্বাভাবিক আচরণ ধরতে পারে। বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার মাছের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে কম্পিউটারকে “শেখান” কোন আচরণ স্বাভাবিক আর কোনটি রোগের লক্ষণ। এর ফলে অনেক সময় রোগ ছড়ানোর আগেই সতর্কবার্তা পাওয়া যায়।
উপগ্রহের ছবিও এখন মৎস্যচাষে ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে অনেক জায়গায় পুকুর বা ঘেরের সংখ্যা এত বেশি যে সব জায়গা ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা কোন এলাকায় কতখানি জলাশয় আছে, কোথায় মাছচাষ হচ্ছে, এমনকি কোথায় জল কমে যাচ্ছে তাও বোঝার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে এই ধরনের গবেষণায় দেখা গেছে যে মহাকাশ থেকে তোলা ছবি ব্যবহার করে মাছচাষের অঞ্চল শনাক্ত করা সম্ভব। এতে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে সুবিধা হয়।
শুধু ট্যাংকে নয়, সমুদ্রে মাছ ধরার কাজেও AI ব্যবহার শুরু হয়েছে। এখন কিছু স্মার্টফোন অ্যাপ আবহাওয়া, ঢেউয়ের অবস্থা এবং মাছের সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। ফলে জেলেরা নিরাপদে মাছ ধরতে যেতে পারেন এবং অযথা জ্বালানি নষ্টও কম হয়।
ভারতের কিছু স্টার্টআপ ইতিমধ্যেই এই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। তারা চাষিদের মোবাইলে তথ্য পাঠিয়ে জানায় কখন খাবার দিতে হবে, কখন জল পরিবর্তন করা দরকার, বা কখন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। যেমন ভারতের ‘এমকৃষি ফিশারিজ’ অ্যাপটি স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে জেলেদের সম্ভাব্য মাছের অবস্থান জানিয়ে দেয়, যা জ্বালানি বাঁচায়।
AI খুব শক্তিশালী প্রযুক্তি হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উন্নত ক্যামেরা, সেন্সর ও কম্পিউটার ব্যবস্থার খরচ অনেক বেশি। ছোট চাষিদের পক্ষে সবসময় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা সহজ নয়।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের অভাব। কম্পিউটারকে শেখাতে প্রচুর তথ্য দরকার হয়। কিন্তু সব মাছের রোগ বা আচরণের পর্যাপ্ত তথ্য এখনও সংগ্রহ করা যায়নি।
ভাবা যায়, একদিন হয়তো এমন মাছের ট্যাঙ্ক তৈরি হবে যেখানে অধিকাংশ কাজই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে। সেন্সর নিজেই জলের মান মাপবে, AI খাবার নিয়ন্ত্রণ করবে, আর মোবাইল ফোনে আগে থেকেই রোগের সতর্কবার্তা চলে আসবে।
শুনতে যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগলেও, এই পরিবর্তন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের মৎস্যচাষ আরও লাভজনক, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই হয়ে উঠতে পারে।
প্রচ্ছদের ছবির সূত্র: MongaBay
লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।
Scan the above code to read the post online.
Link: https://bigyan.org.in/banglar-keetpatanga-shramik-piprer-janmo-rahasya