08-08-2026 06:12:04 am
Link: https://bigyan.org.in/banglar-keetpatanga-pangapal

শব্দ কী দেখা যায়? সেতার, বাঁশি কিংবা তবলার শব্দ দেখতে কিরকম? অসাবধানে মেঝেতে পড়ে একটা গ্লাস ভেঙে গেলে যে শব্দ হয়, তার থেকে সেটা কিভাবে আলাদা?
আমরা সাধারণত শব্দকে কান আর মস্তিষ্কের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হিসেবে ধরে নিই। কানে কিছু একটা ঢুকছে, মস্তিষ্ককে নাড়া দিয়ে সেটা একটা অনুভূতির সৃষ্টি করছে। সেই কিছু একটা কোনো এক উৎস থেকে শুরু হয়ে বাতাসের মাধ্যমে ভেসে এসেছে।
এমনিতে ভেসে আসা জিনিসটাকে দেখা যায় না। কিন্তু সেটা এমনভাবে কাগজে কলমে ধরা যায় যাতে সেটা দেখার আওতায় চলে আসে। খুব সহজেই দেখা যায় কেন সেতারের শব্দকে সুরেলা বলে মনে হয় আর রাস্তার জ্যামে বিরক্ত গাড়িচালকদের প্যাঁপোটাকে কোলাহল লাগে।
যেকোনো শব্দের জন্ম হতে গেলে প্রথমে একটা কাঁপুনির দরকার হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে আমরা বলি ‘কম্পন’ বা ভাইব্রেশন।
বিশ্বাস না হলে, আপনি যখন নিজের মুখে কথা বলছেন, তখন গলার ঠিক মাঝখানটায় হাত দিয়ে দেখুন। একটা মৃদু কাঁপুনি টের পাচ্ছেন তো?

কিংবা একটা হাতঘণ্টা বাজিয়েই আলতো করে তার গায়ে আঙুল ছোঁয়ান, দেখবেন আঙুলটা কেমন ঝিনঝিন করছে।

এই যে কাঁপাকাঁপি, এখান থেকে শব্দের শুরু।
কিন্তু এই কাঁপুনিটা ঘরের এক কোণ থেকে আমাদের কান পর্যন্ত হেঁটে আসে কীভাবে? এর জন্যে শুরুর কাঁপুনিটাকে আরেকটা কাঁপুনিতে পরিণত হতে হয়।
একটা উপমা দেওয়া যাক। ধরুন, আপনি একটা শান্ত পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে টপ করে একটা ঢিল ছুড়লেন। কী হবে?
ঢিলটা যেখানে পড়ল, ঠিক সেখান থেকে গোল করে জলের ঢেউ চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে, তাই না?

অর্থাৎ একটা বিচলিত অবস্থা একটা উৎস থেকে শুরু হয় এবং জলের উচ্চতার বাড়া কমার মাধ্যমে শান্ত পুকুরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই বাড়া কমারই আরেক নাম ঢেউ বা তরঙ্গ।
বাতাসের গল্পটাও ঠিক একই রকম। কোনো বাদ্যযন্ত্রের তার যখন কেঁপে ওঠে, তখন সে তার চারপাশে থাকা বাতাসের অণুগুলোকে একটার ওপর আরেকটা ঠেলে দেয়।

বাতাসের এই একবার ধাক্কা খাওয়া আর একবার ফাঁকা হওয়া—এই চাপের বাড়া কমার ঢেউটাই সেকেন্ডে প্রায় ৩৪০ মিটার স্পিডে ছুটে এসে যখন আমাদের কানের পর্দায় টোকা মারে, আমাদের মগজ তখন চট করে বলে ওঠে, “আরে! একটা শব্দ হলো তো!”
শব্দ নাহয় হলো কিন্তু গোলমাল আর গানের সুরের মধ্যে তফাতটা কোথায়? আমাদের মগজ কিন্তু ভীষণ চালাক, সে অলসভাবে জ্যামিতিক নকশা খুঁজতে ভালোবাসে। সুর আর বেসুরের মূল রহস্যটা লুকিয়ে আছে শব্দের এই তরঙ্গের চেহারার মধ্যে।
সুর হলো একধরণের মিলিটারী কুচকাওয়াজ। আপনি যখন কোনো বাদ্যযন্ত্রে সুন্দর একটা স্বর শোনেন, তখন বাতাসের অণুগুলো একদম সুশৃঙ্খল একটা মিলিটারী প্যারেডের মতো, সমান দূরত্ব আর নির্দিষ্ট বিরতি মেনে ছন্দে ছন্দে আপনার কানের পর্দায় ধাক্কা দেয়। একে বলে পর্যায়বৃত্ত তরঙ্গ (Periodic wave)।
নিচের ছবিটা এরকম একটা পর্যায়বৃত্ত তরঙ্গের ছবি। ছবিতে X অক্ষে রয়েছে সময় আর Y অক্ষে রয়েছে বাতাসের চাপ। যখন বাড়ছে, সমান উচ্চতা অব্দি বাড়ছে। একই দূরত্ব পর পর একই উচ্চতা পাওয়া যাচ্ছে। পুকুরের জলের তরঙ্গের ক্ষেত্রে এই উচ্চতা হলো জলের উচ্চতা; শব্দের ক্ষেত্রে ছবির উচ্চতা আসলে বাতাসের চাপের মান দেখাচ্ছে। অর্থাৎ এটাই সুরেলা শব্দের ছবি।

আর কোলাহল হলো এক ধরণের জ্যামিতিক বিশৃঙ্খলা। যখন মেঝেতে গ্লাসটা ভাঙল, তখন চারপাশের বাতাস কোনো নিয়মকানুন না মেনে এলোমেলোভাবে ছটফট করতে শুরু করে। এই বিশৃঙ্খল তরঙ্গের কোনো নির্দিষ্ট ছন্দ বা সুর থাকে না। হাজারটা উল্টোপাল্টা কম্পন একসাথে এসে আমাদের কানে আছড়ে পড়ে বলেই মগজ বিরক্ত হয়ে একে ‘ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে আওয়াজ’ বা গোলমাল বলে দেগে দেয়। সেই শব্দকে গ্রাফে আঁকলে তার ছবিটা খানিকটা এইরকম হবে।

তবে আসল বাদ্যযন্ত্র থেকে যখন সুর ভেসে আসে, সেই শব্দের ছবিতে ছন্দ থাকলেও ছন্দটা উপরের ছবির মতো সোজাসাপ্টা নয়। কোনো বাদ্যযন্ত্র যখন একটা মূল সুর তৈরি করে, তার সাথে সাথে আরও কিছু হালকা, মিহি উপরি-সুর তৈরি হয়, বিজ্ঞানের ভাষায় যাদের বলে ‘উপসুর’ (Overtones)। এই উপসুরগুলোর চমৎকার গাণিতিক অনুপাতের কারণেই পিয়ানো আর সেতারে একই স্বর বাজালেও কান তাদের আলাদা মিষ্টি টেক্সচার (texture) বা ‘টিম্বার’ (timbre) ধরে ফেলতে পারে।
বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে শব্দের ছবি এরকম হতে পারে। একটা টিউনিং ফর্ক-এ (tuning fork) ধাক্কা মারলে যে শব্দ তৈরী করে, সেটা উপরে দেওয়া হলো। সেটাই ছন্দবদ্ধ শব্দের সবথেকে সহজ ছবি। তুলনায় অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের ছন্দটা অনেক বেশি জটিল।

নানারকম জটিল যন্ত্র বানিয়ে বাতাসকে বশ করে যে ছন্দবদ্ধ শব্দ তৈরী করা যায়, এটা মানুষের মাথায় এলো কীভাবে? উত্তরটা সহজ — আজকে আমরা পিয়ানো বা সিন্থেসাইজারে যে জটিল সুর শুনি, মানুষ কিন্তু একদিনে তা বানায়নি। সুরের মধ্যে যে একটা ছন্দ রয়েছে, সেটা মানুষ হয়তো আবিষ্কার করেছিল একদম আচমকাই।
হাজার হাজার বছর আগে আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা প্রথম বাদ্যযন্ত্র বানিয়েছিল খুব সহজ কিছু জিনিস দিয়ে—হয়তো হাততালি, পায়ের ধপধপ আওয়াজ, কিংবা পশুর হাড় ফুটো করে বানানো একটা আদিম বাঁশি। তখন তারা না জেনেই বাতাসের বায়ুস্তম্ভের বিজ্ঞানটা কাজে লাগিয়ে ফেলেছিল।
এরপর ব্রোঞ্জ যুগে মানুষ যখন ধাতু গলাতে শিখল, তখন তৈরি হলো করতাল আর ঘণ্টার মতো খটখটে আওয়াজের যন্ত্র। আর শিকারের ধনুকের ছিলা টানলে যে একটা সুন্দর ‘টং’ করে আওয়াজ হয়, সেই আইডিয়া থেকেই একসময় জন্ম নিল সেতার, তানপুরা আর হার্পের মতো তারের যন্ত্র।
শিল্প বিপ্লবের যুগে এসে পিয়ানোর মতো জটিল মেকানিক্যাল যন্ত্র তৈরি হলো, আর বিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষ বাতাস কাঁপানোর ঝক্কিটাই বাদ দিয়ে দিল! ইলেকট্রিক গিটার বা সিন্থেসাইজারে কোনো সাউন্ডবক্স থাকে না; সেখানে তারের কম্পনকে সরাসরি বিদ্যুতের তরঙ্গে রূপান্তর করে স্পিকার দিয়ে বাতাস কাঁপানো হয়।
এবার দেখা যাক, নানারকম বাদ্যযন্ত্রে বাতাসকে ছন্দবদ্ধভাবে কাঁপানো হয় কীকরে। মূলত তিনভাবে মানুষ বাতাসকে নিজের ইশারায় নাচায়। এই কৌশলের ওপর ভিত্তি করেই বাদ্যযন্ত্রের তিনটে আলাদা ঘরানা তৈরি হয়েছে।
সেতার, গিটার, ভায়োলিন কিংবা আমাদের মাটির একতারা-দোতারা—এদের সবার বুকেই বাঁধা আছে কয়েকটি টানটান তার। আঙুলের মৃদু টোকা বা মিজরাবের আঘাতে এই তারগুলো কেঁপে উঠলেই সুরের শুরু। কিন্তু ভেবে দেখুন, একটা পাতলা সুতো বা তার যদি বাতাসে একা একা কাঁপে, সে কি খুব বেশি হাওয়াকে নাড়া দিতে পারবে? একদমই না। তারের একার আওয়াজ ভীষণ ক্ষীণ।
এই সমস্যার সমাধান করে একটা ফাঁপা কাঠের বাক্স, যাকে আমরা বলি ‘সাউন্ডবক্স’। সেতারের নিচের লাউয়ের খোল বা গিটারের কাঠের বডিটাই হলো এই জাদুর বাক্স। তারের ছোট্ট কম্পনটি মুহূর্তের মধ্যে স্থানান্তরিত হয় এই বিশাল কাঠের তলে। কাঠ তখন তার বিপুল আয়তন নিয়ে ভেতরের ও চারপাশের একরাশ বাতাসকে একসাথে তোলপাড় করে কাঁপিয়ে দেয়। আর তখনই মৃদু টোকাটি এক গম্ভীর, মিষ্টি ও জোরালো সুরে পরিণত হয়ে আমাদের কান পর্যন্ত ছুটে আসে।

বাঁশি বা সানাইয়ের মতো বায়ুযন্ত্রের ভেতরে আবার কোনো তার বা চামড়ার বালাই নেই। এখানে সরাসরি কাঁপানো হয় বাতাসকে। একজন বংশীবাদক যখন বাঁশির মুখে ফুঁ দেন, তখন বাতাসের সেই ধারাটি বাঁশির ভেতরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ছোট ছোট ঘূর্ণি বা ‘ভর্টেক্স’ তৈরি করে। এই ঘূর্ণিগুলো হলো বাঁশির সুরের আসল ‘ইঞ্জিন’।
তবে এই ঘূর্ণিগুলো একা একা কেবল একটা ফিসফিসে আওয়াজই তৈরি করতে পারত। আসল ম্যাজিকটা ঘটে যখন এই ঘূর্ণির ধাক্কায় বাঁশির নলের ভেতরে আটকে থাকা বাতাসটি এক নিপুণ ছন্দে দেয়ালে দেয়ালে বাধা পেয়ে সামনে-পেছনে কাঁপতে শুরু করে। এই কাঁপুনির ফলে নলের ভেতরে তৈরি হয় একটি স্থির তরঙ্গ (Standing Wave)। এই স্থির তরঙ্গটি তখন এক কড়া মাস্টারের মতো কাজ করে—সে বাইরের এলোমেলো ঘূর্ণিগুলোকে নিজের তালে তাল মিলিয়ে নিখুঁত একটা কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সিতে বেঁধে ফেলে।

কিন্তু একই বাঁশি থেকে আলাদা আলাদা সুর বের হয় কীভাবে? এর রহস্য লুকিয়ে আছে বাঁশির গায়ে থাকা ছোট ছোট ছিদ্রগুলোতে। বাদক যখন আঙুল দিয়ে একেকটি ছিদ্র বন্ধ করেন বা খোলেন, তখন আসলে তিনি বাঁশির ভেতরের সেই স্থির তরঙ্গের দৈর্ঘ্যটা কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেন। বাতাস যখন কম জায়গা পায়, তখন স্থির তরঙ্গটি খুব দ্রুত কাঁপতে থাকে—তৈরি হয় তীক্ষ্ণ ও চড়া সুর। আবার সব ছিদ্র বন্ধ করে দিলে বাতাস লম্বা জায়গা জুড়ে ধীরলয়ে স্থির তরঙ্গ তৈরি করে, যার ফলশ্রুতিতে আমরা পাই এক গম্ভীর ও উদাস করা সুর।

ঢাক, ঢোল কিংবা ড্রামসের মতো বাদ্যযন্ত্রে সুর তৈরি হয় টানটান চামড়ার বুকে কাঠি বা হাতের আঘাত থেকে। আঘাত লাগামাত্রই সেই চামড়াটি বিষম বেগে ওলটপালট হয়ে কাঁপতে থাকে। তবে সাধারণ ড্রাম বা ঢাকের আওয়াজ আমাদের ছন্দ দেয় ঠিকই, কিন্তু তা থেকে পিয়ানো বা সেতারের মতো সুনির্দিষ্ট কোনো বা সুর চট করে বের হয় না। কারণ চামড়ার কম্পনগুলো বড্ড এলোমেলো হয়।
এখানেই আমাদের উপমহাদেশের ‘তবলা’ এক পরম বৈজ্ঞানিক বিস্ময়। তবলার চামড়ার ঠিক মাঝখানে যে কালো গোল অংশটি আমরা দেখি, যাকে বলে ‘গাব’ বা ‘স্যাঁহী’, সেটি স্রেফ কোনো নকশা নয়। লোহাচূর্ণ আর ভাতের আঠা দিয়ে তৈরি এই কালো অংশটি তবলার চামড়ার নির্দিষ্ট কিছু জায়গাকে ভারী করে তোলে। এর ফলে, আঘাত করার পর চামড়াটি আর দশটা ঢাকের মতো এলোমেলো না কেঁপে, অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও জ্যামিতিক নিয়মে কাঁপতে বাধ্য হয়। আর ঠিক এই কারণেই তবলার চাঁটি থেকে এমন এক সুরেলা ও মধুর ধ্বনি বের হয়, যা পৃথিবীর অন্য কোনো ড্রামে মেলা ভার।

গানের সুর যখন আমাদের কানে এসে পৌঁছায়, আমাদের কানের পর্দাটি কিন্তু কেবল একটি নির্দিষ্ট নিয়মে কাঁপে না। কারণ বাতাস তো সব সুর একসাথে তালগোল পাকিয়ে আমাদের কানের ভেতর ঠেলে দেয়। তাহলে আমরা আলাদা করে গিটার, ড্রামস আর গায়কের গলা চিনতে পারি কীভাবে?
এখানেই রয়েছে প্রকৃতির সবচেয়ে বড় চমক। আমাদের কানের গভীরে শামুকের খোলসের মতো দেখতে একটা অঙ্গ আছে, যার নাম ‘কক্লিয়া’। এর ভেতরে রয়েছে একটি পর্দা, যা অবিকল একটা পিয়ানোর মতো কাজ করে (আসলে একটা পিয়ানোর উল্টো — পিয়ানো অনেকগুলো সুর মেশায়, কক্লিয়া সেগুলোকে আলাদা করে)। এই পর্দাটির শুরুটা খুব শক্ত আর শেষটা বেশ নরম ও চওড়া।

যখন কোনো জটিল সুর বা একাধিক নোটের মিশ্রণ কানের ভেতর পৌঁছায়, তখন পর্দার আলাদা আলাদা অংশ একসাথে কেঁপে ওঠে। উচ্চ সুরের জন্য পর্দার শুরুর অংশ আর গম্ভীর বা খাদের সুরের জন্য ভেতরের অংশটি সাড়া দেয়। অর্থাৎ, বাতাস যে সুরগুলোকে একসাথে মিশিয়ে পাঠিয়েছিল, আমাদের কান নিখুঁত এক পদার্থবিদ্যার নিয়মে তাদের আবার আলাদা আলাদা করে ভেঙে ফেলে।
পদার্থবিজ্ঞান আমাদের শেখায় কীভাবে বাতাস কাঁপছে, আর সঙ্গীত আমাদের শেখায় সেই কম্পনকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়। কোলাহল আর সুরের মধ্যকার এই যে অদৃশ্য সেতু, এটাই সম্ভবত মানব সভ্যতার সবচেয়ে সুন্দর ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার।
প্রচ্ছদ এবং অন্যান্য ছবি: বিদিশা সিনহা
লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।
Scan the above code to read the post online.
Link: https://bigyan.org.in/banglar-keetpatanga-pangapal