28-09-2026 12:05:22 pm

print

 
বিজ্ঞান - Bigyan-logo

বিজ্ঞান - Bigyan

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের এক বৈদ্যুতিন মাধ্যম
An online Bengali Popular Science magazine

https://bigyan.org.in

 

মহানদীর বুকে এক সকাল: অদৃশ্য দূষণের খোঁজে


%e0%a6%85%e0%a6%ad%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%81-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4
অভিমান্যু মহান্ত

(ICAR- Central Institute of Freshwater Aquaculture)

 
%e0%a6%a1-%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%b0
ড. জিতেন্দ্র কুমার সুন্দরায়

(ICAR- Central Institute of Freshwater Aquaculture)

 
30 Sep 2026
 

Link: https://bigyan.org.in/banglar-keetpatanga-boltar-jibon-rahasya

%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%8f%e0%a6%95-%e0%a6%b8%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%85%e0%a6%a6%e0%a7%83%e0%a6%b6

ভোর তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। চারপাশ অন্ধকার। অধিকাংশ মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আমরা ব্যস্ত দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে জলভর্তি বোতল বা পিকনিকের ব্যাগ তুলছি না গাড়িতে। একে একে তোলা হচ্ছে খালি নমুনা সংগ্রহের পাত্র, জলের গুণমান পরিমাপের যন্ত্র, সেচ্চি ডিস্ক (জলের স্বচ্ছতা মাপার একটি সহজ বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম), নোটবুক, জিপিএস এবং আরও নানা সরঞ্জাম। 

সময় তখন রাত তিনটে। 

গন্তব্য—মহানদী।

নদী যখন গল্প বলে 

নদীকে আমরা সাধারণত দেখি পানীয় জল, মাছ, কৃষি কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস হিসেবে। কিন্তু একজন গবেষকের কাছে নদী শুধু জলধারা নয়, বরং একটি জীবন্ত নথি। তার প্রতিটি স্রোত, প্রতিটি জলকণা, প্রতিটি তীর আশপাশের পরিবেশের গল্প বহন করে। 

সেই গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে এমন এক দূষণের চিহ্ন, যা খালি চোখে দেখা যায় না। সেই অদৃশ্য দূষণের নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক্স (microplastics)।

পাঁচ মিলিমিটারের থেকেও ছোট প্লাস্টিক কণাগুলি আজ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে—সমুদ্রে, নদীতে, মাটিতে, এমনকি বাতাসেও। দৈনন্দিন ব্যবহারের প্লাস্টিক ধীরে ধীরে ভেঙে কিংবা শিল্পকারখানা, শহরের বর্জ্য এবং নিকাশি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র কণাগুলি নদীতে এসে পৌঁছায়। একবার নদীতে ঢুকে পড়লে এগুলো স্রোতের সঙ্গে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। মাছ, অন্যান্য জলজ প্রাণী এমনকি খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেও পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে [1]। 

তাই নদীর জলে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলি কোথা থেকে আসছে, কীভাবে ছড়াচ্ছে এবং নদীর বিভিন্ন অংশে এদের উপস্থিতি কেমন, এসব বোঝা আজ পরিবেশ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এই কারণেই সেদিন আমাদের লক্ষ্য ছিল মহানদীর তিনটি ভিন্ন স্থানে গিয়ে জল সংগ্রহ করা এবং নদীর স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচক (indicators) পরিমাপ করা।

নদীর কোনখানে খোঁজ নেব 

এই ধরণের গবেষণায় শুধু জল নিয়ে ফিরে এলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। নদীর ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও জানা জরুরি। এগুলো অনেক সময় বোঝাতে সাহায্য করে দূষণ কীভাবে নদীর এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে এই তিনটি স্থান বেছে নেওয়া হয়নি এলোমেলোভাবে।

মহানদীর তিনটি নমুনা সংগ্রহস্থলের অবস্থান। (Credit — অভিমন্যু মহান্ত ও জিতেন্দ্র কুমার সুন্দরায়)

প্রথম স্থানটি ছিল জগৎপুর অঞ্চলের কাছে। 

উপগ্রহচিত্র এবং স্থানীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছিলাম, এই অঞ্চলের আশেপাশে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন নদীর জল প্রায়শই নানা ধরনের দূষণের চাপে থাকে। তাই মানুষের কার্যকলাপ নদীর উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার জন্য এই স্থানটি আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

দ্বিতীয় স্থানটি ছিল কটকের ঐতিহাসিক বালিযাত্রা মাঠের কাছাকাছি। 

এই অঞ্চলের বিশেষত্ব হল এর নিকটবর্তী তালদণ্ডা খাল। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বয়ে আসা জল শেষ পর্যন্ত এই খালের মাধ্যমে মহানদীতে এসে মেশে। ফলে শহুরে বর্জ্য নদীর জলের উপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটি ধারণা পাওয়ার জন্য এই স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় স্থানটি ছিল উজানের দিকে, ধবলেশ্বর মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল। 

তুলনামূলকভাবে কম জনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় মানুষের প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই এই স্থানটি আমাদের কাছে একটি তুলনামূলক মানদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারত। নদীর বিভিন্ন অংশের তথ্য পাশাপাশি রাখলে বোঝা সহজ হয়, কোন পরিবর্তনগুলি প্রাকৃতিক আর কোনগুলি মানুষের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

নদীর জলে নেমে পরিমাপ 

ভোর সাড়ে চারটা নাগাদ আমরা পৌঁছাই প্রথম স্থানে। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমেই কাজ শুরু করা যায়নি। নদীর কাছে পৌঁছাতে আমাদের পেরোতে হয়েছে সরু গ্রামীণ পথ, ঝোপঝাড়ে ঘেরা কাঁচা রাস্তা, এবং অসমতল জমি। হাতে ভারী যন্ত্রপাতি, কাঁধে নমুনা সংগ্রহের সরঞ্জাম, যাত্রার শেষ অংশটা করতে হয়েছে হেঁটেই।

নদীর ধারে পৌঁছে বুঝলাম, আসল চ্যালেঞ্জ তখনও বাকি।

তীরজুড়ে ছড়িয়ে ছিল পিচ্ছিল পাথর। তাদের উপর শ্যাওলা জমে থাকায় সামান্য অসাবধানতাতেই পিছলে পড়ার সম্ভাবনা। স্থানীয় মানুষজন এই অংশে নিয়মিত স্নান করেন, কাপড় কাচেন এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কাজেও নদীর জল ব্যবহার করেন। কোমরসমান জলে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা যেমন কঠিন, তার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পরিমাপ করাও মোটেই সহজ নয়।

মহানদী থেকে জলের নমুনা সংগ্রহ। (Credit — অভিমন্যু মহান্ত)

তবু তথ্য সংগ্রহ থেমে থাকতে পারে না।

প্রতিটি স্থান থেকে আমরা প্রায় তিরিশ লিটার জল সংগ্রহ করেছি। এই জল পরে গবেষণাগারে নিয়ে গিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি নদীর স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকও পরিমাপ করেছি। জলের তাপমাত্রা, পরিবাহিতা (conductivity), দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণ (Total Dissolved Solids) এবং অন্যান্য পরিমাপ থেকে নদীর পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এই তথ্যগুলি পরে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিশ্লেষণের ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, নদীর বিভিন্ন পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দূষণের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।

নদীর স্বচ্ছতা বোঝার জন্য আমরা ব্যবহার করেছিলাম সেচ্চি ডিস্ক (Secchi disc)। সাদা-কালো রঙের গোলাকার এই চাকতিটিকে ধীরে ধীরে জলের মধ্যে নামানো হয়। একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় সেটি আর খালি চোখে দেখা যায় না। সেই গভীরতাই নথিভুক্ত করা হয়। একই নিয়ম মেনে এই পরিমাপ করলে বিভিন্ন নদী বা একই নদীর বিভিন্ন অংশের স্বচ্ছতার তুলনা করা যায়। নদীর জলে ভাসমান কণা, পলি বা শৈবালের পরিমাণ সম্পর্কে এই পরিমাপ একটি প্রাথমিক ধারণা দেয়।

সেচ্চি ডিস্ক (Credit — By U.S. Army Corps of Engineers)

নদীর স্রোতের গতিও মাপতে হয়েছে। এর জন্য প্রথমে নদীর একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব ফিতে দিয়ে মেপে নেওয়া হয়। তারপর একটি ছোট ভাসমান বস্তু জলে ছেড়ে দিয়ে সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে কত সময় লাগছে, তা নথিভুক্ত করা হয়। এই তথ্য থেকে স্রোতের বেগ নির্ণয় করা যায়। নদীর স্রোত কত দ্রুত, তার উপর অনেক সময় নির্ভর করে নদীতে ভেসে আসা সূক্ষ্ম কণা বা দূষক কত দ্রুত এবং কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষণার ফাঁকে ফাঁকে 

এই সমস্ত কাজের মাঝেই সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তে উঠতে শুরু করেছে।

দ্বিতীয় স্থানে পৌঁছানোর সময় মহানদীর রূপ ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। সকালের সোনালি আলো জলের উপর পড়ে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছিল। দূষণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েও কিছু মুহূর্তের জন্য কাজ ভুলে শুধু প্রকৃতিকে উপভোগ করতে ইচ্ছে হচ্ছিল।

এমন দৃশ্য দেখলে বিশ্বাসই করতে ইচ্ছে হয় না যে এই নদীর বুকেই হয়তো খালি চোখে অদৃশ্য অগণিত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ভেসে বেড়াচ্ছে। অনেক সময় নদীকে যতটা নির্মল দেখায়, বাস্তবে তার জল ততটা নির্মল নাও হতে পারে। সেই কারণেই শুধু চোখে দেখে নদীর স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না; তার জন্য দরকার বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ।

মহানদীর বুকে সূর্যোদয়। (Credit — অভিমন্যু মহান্ত)

দ্বিতীয় স্থানেও একইভাবে জল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন পরিমাপ সম্পন্ন করে আমরা রওনা দিলাম শেষ গন্তব্যের দিকে।

তৃতীয় স্থানটি ছিল ধবলেশ্বর মন্দির সংলগ্ন এলাকা। সকাল গড়িয়ে যাওয়ায় সেখানে তখন মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেছে। অনেকে নদীতে স্নান করছেন, কেউ পূজা দিচ্ছেন, কেউ আবার নদীর ধারে বসে গল্প করছেন। আমাদের দেখে তাঁদের কৌতূহলের শেষ ছিল না।

“কী পরীক্ষা করছেন?”

“এত জল নিয়ে কী হবে?”

“নদীতে কি কোনো সমস্যা হয়েছে?”

প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসছিল। আমরা যতটা সম্ভব সহজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে নদীর জল দেখতে পরিষ্কার হলেই সবসময় তা দূষণমুক্ত হয় না। এমন অনেক দূষক রয়েছে, যেগুলো এত ছোট যে সাধারণ চোখে দেখা যায় না। সেগুলো শনাক্ত করার জন্যই আমাদের এই নমুনা সংগ্রহ।

এই কথাগুলো বলতে গিয়েই বারবার মনে হচ্ছিল, গবেষণা শুধু গবেষণাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদীর স্বাস্থ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহই আমাদের কাজের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ মহানদী শুধু একটি নদী নয়। এই নদীর উপর নির্ভর করে পানীয় জল, কৃষি, মৎস্যচাষ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা। নদীর স্বাস্থ্য ভালো থাকলে তবেই এই জীবনধারাও সুস্থ থাকবে।

সবশেষে তৃতীয় স্থান থেকেও নমুনা সংগ্রহ শেষ হলো। প্রতিটি বোতলে নমুনা সংগ্রহের স্থান, সময় এবং নম্বর লিখে সাবধানে সংরক্ষণ করা হলো। মাঠে কাজ করার সময় এই তথ্যগুলোর গুরুত্ব অনেক। একটি লেবেলে সামান্য ভুলও পরে পুরো বিশ্লেষণকে বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই প্রতিটি ধাপেই সতর্কতা অপরিহার্য।

দুপুরের দিকে আমরা গবেষণাগারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। অনেকের ধারণা, নদী থেকে নমুনা সংগ্রহ করাই বুঝি গবেষণার সবচেয়ে কঠিন অংশ। বাস্তবে কিন্তু সেটাই কেবল শুরু।

এরপর গবেষণাগারে…

গবেষণাগারে ফিরে প্রতিটি নমুনা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে প্রসেস করা হয়। প্রথমে জলের মধ্যে থাকা বিভিন্ন কণা আলাদা করা হয়। এরপর বিশেষ ধরনের ফিল্টারের সাহায্যে অতি সূক্ষ্ম কণাগুলি সংগ্রহ করা হয়। তারপর একে একে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয় মাইক্রোস্কোপের নিচে। দেখতে একই রকম হলেও সব কণাই যে প্লাস্টিক, তা নয়। তাই সন্দেহজনক কণাগুলিকে পরে আরও উন্নত বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় সেগুলি সত্যিই প্লাস্টিক কি না এবং হলে কী ধরনের প্লাস্টিক।

সকালবেলার কয়েক ঘণ্টার মাঠপর্যায়ের কাজের পর গবেষণাগারে চলে দিনের পর দিন ধৈর্যসহকারে পরীক্ষা। একটি নমুনা বিশ্লেষণ করতেই কখনও কখনও কয়েক দিন লেগে যায়। তাই নদীর ধারে যে কাজটা কয়েক ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায় বলে মনে হয়, তার আসল গল্প শুরু হয় গবেষণাগারের নীরব ঘরগুলিতে।

গবেষণাগারের সেই দীর্ঘ বিশ্লেষণ শেষে আমরা দেখতে পেলাম, মহানদীর তিনটি স্থান থেকেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। নদীর যে অংশটি বাইরে থেকে একেবারে পরিষ্কার বলে মনে হয়েছিল, সেখানেও এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলি ছিল। আবার শিল্পাঞ্চল বা শহরের প্রভাব বেশি এমন এলাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি দূষণের ইঙ্গিতও মিলেছে। অর্থাৎ, নদীর জলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি কেবল একটি স্থানের সমস্যা নয়; মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

মহানদী নদীর মাইক্রোপ্লাস্টিক (Credit — অভিমন্যু মহান্ত)

তবে এই গবেষণার উদ্দেশ্য শুধু নদীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে কি না, সেটুকু জানা নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই কণাগুলি নদীতে কোথা থেকে আসছে, কীভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে, এবং শেষ পর্যন্ত নদীর জীবজগতের উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু মাইক্রোপ্লাস্টিক গুনলেই হয় না। মাঠে দাঁড়িয়ে আমরা যে তাপমাত্রা, জলের স্বচ্ছতা, স্রোতের বেগ কিংবা অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ করি, সেগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই সব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় নদীর কোন পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার প্রবণতা বেশি, আর কোন পরিস্থিতিতে সেগুলি সহজে ভেসে অন্যত্র চলে যেতে পারে। নদীকে তাই আমরা শুধু একটি জলধারা হিসেবে দেখি না; এটিকে একটি পরিবর্তনশীল জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে বোঝার চেষ্টা করি।

এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু পরিবেশবিদদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মহানদী ও তার উপনদীগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষের পানীয় জল, কৃষিকাজ, মৎস্যসম্পদ এবং জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। যদি এই নদীতে দূষণের প্রকৃতি ও উৎস সম্পর্কে আমরা সঠিকভাবে জানতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে দূষণ কমানোর পরিকল্পনা করাও অনেক সহজ হবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো এমন তথ্য তুলে ধরা, যা নীতিনির্ধারক, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ, সবাইকে আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

সেদিন ভোর তিনটায় ঘুম ভেঙে আমরা যে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তা শেষ হয়েছিল গবেষণাগারে। কিন্তু নদীর গল্প সেখানেই শেষ নয়। মহানদী প্রতিনিয়ত বয়ে চলেছে, আর তার সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলেছে মানুষের জীবন, জীবিকা এবং কখনও কখনও আমাদের অদৃশ্য ফেলে যাওয়া দূষণের চিহ্ন। সেই চিহ্নগুলিকে খুঁজে বের করা, তাদের উৎস বোঝা এবং নদীকে আরও সুস্থ রাখার পথ খুঁজে বের করাই আমাদের গবেষণার লক্ষ্য।

মহানদীর তীরে কাটানো সেই সকাল আমাদের কাছে শুধু একটি নমুনা সংগ্রহের দিন নয়। সেটি ছিল এমন এক দিনের স্মৃতি, যেদিন আমরা আবারও বুঝেছিলাম, প্রকৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ গল্প চোখে দেখা যায় না। সেগুলো পড়তে হয় বিজ্ঞান, ধৈর্য এবং কৌতূহল দিয়ে।

অন্যান্য টুকিটাকি:

[১] খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্যে কিভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকস ঢুকে পড়ছে, সেই নিয়ে জানতে এই লেখাটি দেখুন:

পাতে মাছ, সাথে প্লাস্টিক

লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।

Scan the above code to read the post online.

Link: https://bigyan.org.in/banglar-keetpatanga-boltar-jibon-rahasya

print

 

© and ® by বিজ্ঞান - Bigyan, 2013-26