17-08-2026 04:04:20 am
Link: https://bigyan.org.in/bangla-keetpatanga-neule-pokar-janma-rahasya

আমরা যখন “পদার্থবিজ্ঞান” শব্দটি শুনি, তখন সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে সূত্র, সমীকরণ, পরীক্ষাগার আর নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। অনেকের কাছেই পদার্থবিজ্ঞান মানে হলো পরীক্ষার খাতায় সংখ্যার হিসাব মেলানো। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, পদার্থবিজ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং আমাদের চারপাশের পৃথিবীটাই যেন এক বিশাল পরীক্ষাগার, যেখানে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য পদার্থবিজ্ঞানের ঘটনা ঘটে চলেছে।
প্রকৃতির দিকে একটু মন দিয়ে তাকালেই দেখা যায়, বিজ্ঞানের সৌন্দর্য কোনো গবেষণাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী নয়। কখনও তা ফুটে ওঠে সূর্যের আলোয়, কখনও মেঘের বিন্যাসে, আবার কখনও লুকিয়ে থাকে আমাদের নিত্যসঙ্গী স্মার্টফোনের ভেতরে।
বিজ্ঞানী আর সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য সম্ভবত জ্ঞানের নয়, কৌতূহলের। দুজনেই একই দৃশ্য দেখেন, কিন্তু বিজ্ঞানী একটি অতিরিক্ত প্রশ্ন করেন—“এমনটা কেন হলো?” সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান, আর সেই অনুসন্ধানই আমাদের নিয়ে যায় বিজ্ঞানের কাছে।
সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এমন তিনটি দৃশ্য আমার চোখে পড়েছিল, যেগুলো প্রথমে নিছক সুন্দর বলে মনে হলেও পরে একেকটি অসাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের পাঠে পরিণত হয়। একটি রংধনু, কিছু মেঘ, আর একটি রহস্যময় সবুজ আলোর বিন্দু—এই তিনটি ঘটনা আমাকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছিল, প্রকৃতি আসলে কত বড় শিক্ষক।
রংধনু আমরা সবাই দেখেছি। সাধারণত বৃষ্টির পরে আকাশে দেখা যায় রঙিন এক খিলান। ছোটবেলায় আমরা অনেকেই বিশ্বাস করতাম যে রংধনুর শেষপ্রান্তে হয়তো কোনো গুপ্তধন লুকিয়ে আছে। বড় হওয়ার পরে জানি, বাস্তবে তেমন কিছু নেই। তবুও রংধনুর সৌন্দর্য আমাদের বিস্মিত করে।
2025 সালের জুলাই মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে গিয়েছিলাম। জেনেভা হ্রদের ওপর নৌকাভ্রমণের সময় বিখ্যাত জেট দ’ও (Jet d’Eau) ফোয়ারাটিকে দেখছিলাম। বিশাল এই ফোয়ারাটি প্রায় 140 মিটার উচ্চতায় জল ছুড়ে দেয়। দূর থেকে দেখতে অনেকটা আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করা কোনো জলস্তম্ভের মতো লাগে।

বিকেলের দিকে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে নেমে এসেছে, তখন হঠাৎ একটি অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ল। ফোয়ারার জলকণার মধ্যে একটি উজ্জ্বল রংধনু তৈরি হয়েছে। কিন্তু এটি ছিল না সাধারণ রংধনুর মতো। পুরো খিলানটি দেখা যাচ্ছিল না। বরং ফোয়ারার জল যেদিকে বাতাসের প্রভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, কেবল সেই দিকেই রংধনুর একটি অংশ দৃশ্যমান ছিল। মনে হচ্ছিল যেন রংধনুটি ফোয়ারার গায়ে ঝুলে আছে অথবা জলকণার সঙ্গে ভেসে চলেছে।
এই দৃশ্যের পেছনে রয়েছে আলোর এক অসাধারণ খেলা।
সূর্যের সাদা আলো যখন একটি ক্ষুদ্র জলবিন্দুর মধ্যে প্রবেশ করে, তখন তা প্রতিসরিত হয় (refraction)। এরপর জলবিন্দুর ভেতরে প্রতিফলিত হয়ে আবার বাইরে বেরিয়ে আসে (internal reflection)। এই যাত্রাপথে আলোর বিভিন্ন রং ভিন্ন ভিন্ন কোণে বেঁকে যায়। ফলে সাদা আলো ভেঙে যায় নানা রঙে।
ফোয়ারার প্রতিটি জলবিন্দু যেন একটি ক্ষুদ্র প্রিজমের মতো কাজ করছিল। কোটি কোটি জলবিন্দু একসঙ্গে একই কাজ করায় আমরা রংধনুটি দেখতে পেয়েছিলাম।
বৃষ্টির সময় জলকণা আকাশের বিশাল অংশে ছড়িয়ে থাকে, তাই বড় রংধনু দেখা যায়। কিন্তু ফোয়ারার ক্ষেত্রে জলকণাগুলি সীমাবদ্ধ ছিল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে। ফলে সম্পূর্ণ রংধনুর বদলে কেবল একটি অংশই দৃশ্যমান হয়েছিল।
রংধনু সম্পর্কে আরেকটি মজার তথ্য হলো, এটি আসলে কোনো বস্তু নয়। আপনি যদি কিছুটা সরে যান, রংধনুটিও যেন আপনার সঙ্গে সরে যাবে। কারণ তখন আপনার চোখে অন্য জলবিন্দু থেকে আসা আলো প্রবেশ করবে। তাই রংধনুর শেষপ্রান্তে পৌঁছানো কখনোই সম্ভব নয়।
সেদিন জেনেভার সেই ফোয়ারা আমার কাছে শুধু একটি পর্যটন আকর্ষণ ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল আলোর পদার্থবিজ্ঞানের এক জীবন্ত প্রদর্শনী।
আমাদের মধ্যে অনেকেই মেঘ দেখতে ভালোবাসি। কখনও মেঘকে হাতির মতো লাগে, কখনও পাহাড়ের মতো, কখনও আবার ভাসমান তুলোর মতো। কিন্তু মেঘ কেবল সৌন্দর্যের বস্তু নয়; এগুলো বায়ুমণ্ডলের ভেতরে চলতে থাকা নানা প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান চিহ্ন।
2025 সালের ডিসেম্বর মাসে হিমাচল প্রদেশের শিমলায় ছিলাম। শীতের সকালে আকাশের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। অসংখ্য সরু সাদা মেঘ আকাশ জুড়ে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, যেন সবগুলো একটি দূরবর্তী বিন্দু থেকে চারদিকে বিস্তার লাভ করেছে।

প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, মেঘগুলো কোনো একটি জায়গায় মিলিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়।
রেললাইনের দিকে তাকালে যেমন সমান্তরাল দুটি লাইন দূরে গিয়ে মিলিত হয়েছে বলে মনে হয়, মেঘের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। এটিই পারস্পেকটিভের প্রভাব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, মেঘগুলো এমন সুন্দর সমান্তরাল রেখার মতো হলো কীভাবে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরে।
পৃথিবীর উপরের স্তরে প্রবাহিত হয় জেট স্ট্রিম (jet stream) নামে পরিচিত অত্যন্ত দ্রুতগতির বায়ুপ্রবাহ। এই বায়ুর গতি ঘণ্টায় কয়েকশো কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। শীতকালে এই জেট স্ট্রিম পশ্চিম হিমালয়ের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
উচ্চ বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা এত কম থাকে যে মেঘের কণাগুলো মূলত বরফের ক্ষুদ্র স্ফটিক। দ্রুতগতির বায়ুপ্রবাহ এই স্ফটিকগুলোকে টেনে লম্বা ও সরু ব্যান্ডে সাজিয়ে দেয়।
এর সঙ্গে যোগ হয় হিমালয়ের প্রভাব। পাহাড়ের ওপর দিয়ে বায়ুপ্রবাহ অতিক্রম করার সময় বায়ুমণ্ডলে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। এই তরঙ্গগুলোকে বলা হয় বায়ুমণ্ডলীয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (atmospheric gravity wave) — কারণ পাহাড় চড়ে পুনরায় নিচে নামার জন্য দায়ী আমাদের পরিচিত মাধ্যাকর্ষণ।
ফলে মেঘগুলো আরও সুশৃঙ্খল বিন্যাস লাভ করে এবং আকাশে তৈরি হয় এক অপূর্ব নকশা।
আমরা যখন সেই মেঘের দিকে তাকাই, তখন আসলে অদৃশ্য বায়ুপ্রবাহের দৃশ্যমান ছাপ দেখছি। প্রকৃতি যেন অদৃশ্য বাতাসকে দৃশ্যমান করে তুলেছে মেঘের তুলিতে।
এবার আসা যাক তৃতীয় ঘটনায়।
আজকের দিনে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছবি তোলা, ভিডিও করা, স্মৃতি ধরে রাখা—সবকিছুই এখন এই ছোট্ট যন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব।
পুরীর সমুদ্র সৈকতে বসে একদিন রাতে একটি উজ্জ্বল আলোর ছবি তুলছিলাম। ছবি দেখার সময় লক্ষ্য করলাম, আলোর উৎস থেকে কিছুটা দূরে একটি ক্ষুদ্র সবুজ বিন্দু দেখা যাচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ক্যামেরার কোনো সমস্যা হয়েছে। কিন্তু পরে বুঝলাম, বিষয়টি অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

এই সবুজ বিন্দুটি আসলে একটি “ঘোস্ট ইমেজ”।
স্মার্টফোনের ক্যামেরার ভেতরে একাধিক লেন্স থাকে। প্রতিটি লেন্সের পৃষ্ঠ থেকে অল্প পরিমাণ আলো প্রতিফলিত হয়। যখন খুব উজ্জ্বল আলো ক্যামেরায় প্রবেশ করে, তখন সেই আলো বারবার বিভিন্ন লেন্সের মধ্যে প্রতিফলিত হতে থাকে। এর ফলে তৈরি হয় অতিরিক্ত প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু এই প্রতিচ্ছবি সবুজ কেন?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে তরঙ্গের জগতে।
আধুনিক স্মার্টফোনের লেন্সে বিশেষ অ্যান্টি-রিফ্লেকশন কোটিং ব্যবহার করা হয়। এই কোটিং অত্যন্ত পাতলা স্তর দিয়ে তৈরি। আলো এই স্তরগুলির মধ্যে প্রতিফলিত হলে হস্তক্ষেপ (interference) ঘটে।
কিছু তরঙ্গ একে অপরকে বাতিল করে দেয়, আবার কিছু তরঙ্গ টিকে থাকে। লেন্সের নকশার কারণে লাল ও নীল আলোর প্রতিফলন তুলনামূলকভাবে বেশি কমে যায়, কিন্তু সবুজ আলোর ক্ষেত্রে তা কম হয়। ফলে বহুবার প্রতিফলনের পরে সবুজ আলো তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
তাই ছবিতে দেখা যায় সেই রহস্যময় সবুজ বিন্দু।
অর্থাৎ, একটি সাধারণ মোবাইল ফোনের ক্যামেরার মধ্যেও লুকিয়ে আছে তরঙ্গ অপটিক্সের চমৎকার প্রয়োগ।
রংধনু, মেঘ এবং স্মার্টফোনের সবুজ বিন্দু—এই তিনটি ঘটনা প্রথমে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, তিনটিই আমাদের একই শিক্ষা দেয়।
প্রকৃতি কথা বলে বিজ্ঞানের ভাষায়।
রংধনু শেখায় আলোর প্রতিসরণ ও বিচ্ছুরণ। মেঘ শেখায় বায়ুমণ্ডলের গতিশীলতা। আর স্মার্টফোনের সবুজ বিন্দু শেখায় তরঙ্গের হস্তক্ষেপ ও আধুনিক প্রযুক্তির সূক্ষ্ম প্রকৌশল।
বিজ্ঞান সবসময় গবেষণাগারে জন্ম নেয় না। অনেক সময় তার শুরু হয় একটি সাধারণ প্রশ্ন থেকে—“এমনটা কেন হলো?”
হয়তো পরের বার তুমি আকাশে কোনো অদ্ভুত মেঘ দেখবে, হঠাৎ একটি রংধনু চোখে পড়বে, অথবা মোবাইলে ছবি তুলতে গিয়ে কোনো অদ্ভুত আলোর বিন্দু দেখতে পাবে। তখন একটু থেমে প্রশ্ন করো—“কেন?”
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই হয়তো তুমি আবিষ্কার করবে, আমাদের চারপাশের পৃথিবী আসলে এক বিশাল পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষাগার—যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য পরীক্ষা নীরবে চলতে থাকে, আর প্রকৃতি নিজেই আমাদের শিক্ষক হয়ে ওঠে।
লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।
Scan the above code to read the post online.
Link: https://bigyan.org.in/bangla-keetpatanga-neule-pokar-janma-rahasya