03-09-2026 06:30:22 am
Link: https://bigyan.org.in/a-pilgrimage-to-carl-sagans-cosmos

করোনাভাইরাস সংকটের চরম মুহূর্তে আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত তথ্যচিত্র সিরিজ ‘কসমস’-এর তৃতীয় পর্ব।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান (Carl Sagan) সৃষ্ট এই সিরিজটি যখন টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছিল, তখন এর উপস্থাপক ছিলেন নীল ডিগ্র্যাস টাইসন (Neil deGrasse Tyson) এবং প্রযোজক ছিলেন কার্ল সাগানের স্ত্রী অ্যান ড্রুয়ান (Ann Druyan)।

অনুষ্ঠানটি প্রকৃতির নানা বিস্ময়কে বিজ্ঞান ও যুক্তির চোখ দিয়ে দেখার এক দারুণ সুযোগ করে দেয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ‘কসমস: পসিবল ওয়ার্ল্ডস’ সিরিজটি নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখার এক চমৎকার সুযোগও আমার হয়েছিল।

মানব সভ্যতার সেই চরম সংকটের সময়েই আমার এবং আমার স্ত্রী পায়েল বিশ্বাসের মনে হয়েছিল যে বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রচারের অন্যতম পথিকৃৎ ‘কসমস’ সিরিজের স্রষ্টা কার্ল সাগানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করা উচিত। তাঁর কাজই আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছিল। নয়াদিল্লির মতি নগরে আমাদের তৎকালীন বাড়ির আশেপাশে নিয়মিত অগণিত পাখি দেখতাম, হঠাৎ করে তার সৌন্দর্য নতুন করে আমাদের চোখে ধরা দিয়েছিল।
এই গল্পটি সেই যাত্রাটি নিয়ে। কার্ল সাগানের কাছে পাওয়া চোখ দিয়ে তার কর্মস্থল এবং আশপাশের জায়গাগুলোকে দেখার চেষ্টা করেছিলাম।
আমেরিকা ভ্রমণের পরিকল্পনা করা এক কথা, আর সেটিকে বাস্তবায়িত করা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। মহামারীর কারণে তখন ভিসা প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং মার্কিন সরকারের বিধিনিষেধের ফলে ভিসা পাওয়া এক প্রকার অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল।
কিন্তু আমরা হাল ছাড়িনি।
ভিসা প্রক্রিয়ার অস্বাভাবিক দেরির কারণে সব প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথিপত্র গুছিয়ে 2025 সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিতে পেরেছিলাম। পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন, সব মিলিয়ে আমাদের দীর্ঘ চার বছর সময় লেগেছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশাল দেশ যেখানে দেখার মতো প্রচুর আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে। আমরা শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক রাজ্যের ওপরই মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাদের ভ্রমণ নিউ ইয়র্ক সিটি ও আপস্টেট নিউ ইয়র্কের ইথাকা (Ithaca) শহর, এই দুটো জায়গাতে সীমাবদ্ধ ছিল।
আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইথাকার কর্নেল ইউনিভার্সিটি (Cornell University) ভ্রমণ করা। এখানে কার্ল সাগান তাঁর গবেষণা ও শিক্ষকতা করেছিলেন। লেক ভিউ সিমেট্রিতে (Lake View Cemetery) তাঁর সমাধিস্থল দর্শন করা, কর্নেল ল্যাবরেটরি অফ অর্নিথোলজি (Cornell Lab of Ornithology) এবং ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির (Wildlife Conservation Society) সাথে যুক্ত চিড়িয়াখানাগুলো, যেমন ব্রঙ্কস (Bronx Zoo) এবং সেন্ট্রাল পার্ক চিড়িয়াখানা (Central Park Zoo), এগুলো ঘুরে দেখা, মোটামুটি এরকম একটা পরিকল্পনা ছিল। অবশ্যই, নিউ ইয়র্ক সিটির ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্রগুলো দেখার প্রবল ইচ্ছাও আমাদের ছিল।
তাই পাঁচ বছরের দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি এবং আরও অনেক আগে থেকে লালন করা আমেরিকা যাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে আমরা 2025 সালের 8ই মে কুয়েত (Kuwait) হয়ে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
ভারত থেকে ওড়া তখন নিরাপদ ছিল না কারণ তখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চরম সামরিক উত্তেজনা চলছিল এবং পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না পারায় অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা পথ পরিবর্তন করা হয়েছিল। অবশেষে তিন মহাদেশ পেরিয়ে একদিনের যাত্রা শেষে আমরা 2025 সালের 9ই মে বিকেলে নিউ ইয়র্কে পৌঁছলাম।
প্রথম দিনটি মূলত ম্যানহাটনের (Manhattan) হোটেলে বিশ্রামেই কেটেছিল। বলাই বাহুল্য, সেখানে দেখা বিশ্ববিখ্যাত আকাশচুম্বী বাড়িগুলোর দৃশ্য ছিল ঠিক তেমনই, যেমনটা আমরা ‘বিগ অ্যাপল’ (নিউ ইয়র্ক শহর-এর ছদ্মনাম) সম্পর্কে কল্পনা করেছিলাম। রাতে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম সেরে আমরা 10ই মে নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে ইথাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।
নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে ইথাকা পর্যন্ত বাস ভ্রমণটি ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
যাত্রাপথে প্রচুর পাখির পাশাপাশি চারপাশের গাছপালাগুলোকেও বেশ আলাদা মনে হচ্ছিল। রাস্তা দিয়ে বাস এগিয়ে যাওয়ার সময় গাছের সারির ফাঁক দিয়ে দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারলাম, আঁকাবাঁকা রাস্তার বাঁকের কারণেই সমতলের ওই গাছগুলোকে উঁচু পাহাড়ের মতো লাগছিল—আসলে পাহাড়টি ছিল স্রেফ এক দৃষ্টিভ্রম।
সেদিন সন্ধ্যায় ইথাকায় পৌঁছে আমরা আমাদের হোটেল ‘মিডো কোর্ট ইন’ (Meadow Court Inn)-এর চারপাশেই নানা পাখি দেখতে পেলাম। সন্ধ্যার সেই সময়টিতে এক অপূর্ব আনন্দময় অনুভূতি আমাদের ঘিরে ধরলো। দীর্ঘ চার বছরের পরিকল্পনার পর আমরা অবশেষে ইথাকায় পৌঁছাতে পেরেছি এবং তিন মহাদেশ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমেরিকান গ্রামাঞ্চলের দৃশ্য ও শব্দগুলো সরাসরি উপভোগ করছি। ইথাকায় প্রথম দিন আমরা যে পাখিগুলো দেখেছিলাম তার মধ্যে ছিল আমেরিকান রবিন (American Robin), ব্লু জে (Blue Jay), রেড কার্ডিনাল (Red Cardinal) এবং টার্কি ভালচার (Turkey Vulture)।
পরের দিন, 11ই মে 2025, আমরা ইথাকার লেক ভিউ সিমেট্রিতে কার্ল সাগানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গেলাম।
সমাধির সঠিক অবস্থানটি খুঁজে পাব কি না, তা নিয়ে আমরা কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা খুব দ্রুতই সেটি খুঁজে পাই, কারণ এটি ইহুদি সমাধিস্থলে অবস্থিত ছিল যা স্পষ্টভাবে শনাক্ত সনাক্ত করা হয়েছিল।

আধুনিক ইতিহাসের যে মানুষটি জেরাল্ড ডারেলের পাশাপাশি আমার চিন্তাধারাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন, তাঁর শেষ শয্যার মুখোমুখি হওয়া আমার জন্য ছিল এক অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত। কার্ল সাগানের ‘কসমস’ (Cosmos), ‘দ্য ড্রাগনস অফ ইডেন’ (The Dragons Of Eden), ‘শ্যাডোস অফ ফরগটেন অ্যানসেস্টরস’ (Shadows Of Forgotten Ancestors)-এর মতো বই পড়ে এবং তাঁর ‘কসমস’ সিরিজসহ অসংখ্য বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার দেখে বছরের পর বছর ধরে আমি এই স্থানটি দর্শন করার স্বপ্ন দেখেছি।
আমরা আমাদের সাথে করে অনেক শ্রদ্ধার্ঘ্য নিয়ে গিয়েছিলাম। সেগুলোকে এক এক করে তাঁর সমাধিতে অর্পণ করি। সেখানে আগে থেকেই নীল মার্বেল, একটি বই এবং ‘প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ রূপ হলো দয়া’ লেখা একটি ছোট চিহ্নের মতো স্মারক সাজানো ছিল। আমরা সেখানে ভারতীয় মুদ্রা, আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একটি হাতে লেখা কার্ড, প্রচুর ফুল এবং একটি রুদ্রাক্ষের মালা অর্পণ করি।

এছাড়াও, 2025-এর শুরুতে প্রয়াগরাজের কুম্ভ মেলায় গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গম থেকে সংগৃহীত জল আমরা সেখানে ঢালি। এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল কারণ কার্ল সাগান যখন ক্যান্সারে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, তখন গঙ্গার তীরে একদল মানুষ তাঁর আরোগ্যের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন।
আমি যখন সেখানে তাঁর ‘রিফ্লেকশনস অন আ মোট অফ ডাস্ট’ (Reflections On A Mote Of Dust) বা “ধূলিকণার ওপর প্রতিফলন” ভাষণটি বাজাচ্ছিলাম, তখন সেটি ছিল এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত। এই ভাষণটি মানুষের সমস্ত অহংকারের মহাজাগতিক তুচ্ছতাকে তুলে ধরে এবং প্রতিটি প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। একে পৃথিবীর পরিবেশগত চেতনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আহ্বান হিসেবে গণ্য করা হয়। আমরা ‘কসমস’ থেকে সেই রেকর্ডিংটিও বাজিয়েছিলাম যেখানে কার্ল সাগান বলেন,
‘মহাবিশ্ব আমাদের ভেতরেও রয়েছে, আমরা নক্ষত্রের উপাদান দিয়ে তৈরি, আমরাই হলাম মহাবিশ্বের নিজেকে জানার একটি মাধ্যম।’ (‘The cosmos is also within us, we are made of star stuff, we are a way for the cosmos to know itself)।

কার্ল সাগানের সমাধিতে আড়াই ঘণ্টা যে কীভাবে কেটে গেল, তা আমরা টেরই পাইনি। লেক ভিউ সিমেট্রি অনেক প্রজাতির পাখি এবং কাঠবিড়ালিরও অভয়ারণ্য। সেখানে থাকাকালীন আমরা সেসবও দেখতে পেয়েছিলাম। এই সমাধিস্থলের এক পাশ থেকে কাইউগা লেকও (Cayuga Lake) দেখা যায়।
ইথাকায় অসংখ্য জলপ্রপাত রয়েছে। আমাদের ইথাকা জলপ্রপাত ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় টঘানোক (Taughannock) জলপ্রপাত দেখার সুযোগ হয়েছিল। এই দ্বিতীয় জলপ্রপাতটা উচ্চতায় নায়াগ্রা জলপ্রপাতের চেয়েও বড়। দুটি স্থানই পাখি দেখার জন্য চমৎকার। সেখানে ‘আমেরিকান রবিন’ পাখিদের সর্বত্র দেখা যাচ্ছিল, ছিল ‘রেড কার্ডিনাল’-ও।
আমাদের জন্য আরও একটি স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল যখন আমরা কর্নেল ইউনিভার্সিটির ‘কার্ল সাগান ইনস্টিটিউট’ (Carl Sagan Institute) পরিদর্শন করি। কার্ল সাগানের অফিসে যাওয়া এবং সেই অফিসের জানালার বাইরের দৃশ্যটি দেখা ছিল এক স্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা! 1976 থেকে 1996 সাল পর্যন্ত গবেষক এবং অধ্যাপক কার্ল সাগান এই দৃশ্যটাই দেখতেন!
এই ইনস্টিটিউট-এর প্রধান হলেন ডক্টর লিসা কাল্টেনেগার (Dr Lisa Kaltenegger)। আমাদের ডক্টর কাল্টেনেগারের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল।

কীভাবে কার্ল সাগান এবং অ্যান ড্রুয়ানের (Ann Druyan) সমস্ত প্রাণীর সাথে আমাদের ঐক্যের দর্শনের মাধ্যমে ‘কসমস’ সম্পর্কে আমাদের ধারণা তৈরি করেছিলেন এবং কীভাবে এই উপলব্ধি আমাদের সকল প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়, সেই নিয়ে কথা হলো।
ডক্টর জো লার্নার পন্টেরিও (Dr Zoe Learner Ponterio) আমাদের কর্নেল ইউনিভার্সিটির ‘স্পেসক্রাফট প্ল্যানেটারি ইমেজ ফেসিলিটি’ (Spacecraft Planetary Image Facility, SPIF) ঘুরিয়ে দেখান। সেখানে ভয়েজার-১ (Voyager I) এবং ভয়েজার-২ (Voyager II) দ্বারা তোলা সৌরজগতের গ্রহগুলোর আসল ছবিসহ মহাকাশযানের পাঠানো অনেক ছবি রাখা ছিল।

কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে আমরা পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমরা সচেতন ছিলাম যে এটি আমেরিকার অন্যতম অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিখ্যাত ‘আইভি লিগ’ (Ivy League)-এর অন্তর্ভুক্ত। কার্ল সাগান ছাড়াও বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman) এবং হান্স বেথে (Hans Bethe) এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানটি অত্যন্ত চমৎকার, চারপাশে রয়েছে প্রচুর সবুজ প্রাকৃতিক গাছপালা । কর্নেল ইউনিভার্সিটির মাসকট হলো ‘গ্রাউন্ডহগ’ (Groundhog বা Marmorata monax)। এটা ‘উডচাক’ (Woodchuck) নামেও পরিচিত। আমরা ক্যাম্পাসে এই বন্য প্রাণীটিকে সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম — একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে এমন একটি বন্য প্রাণীর দর্শন ছিল অত্যন্ত মনোরম ও আকর্ষণীয়।
আমাদের ইথাকা ভ্রমণের একটা অংশ ছিল কর্নেল ল্যাব অফ অর্নিথোলজি পরিদর্শন। এই ল্যাবটি পক্ষীবিজ্ঞান এবং প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের একটি প্রধান গবেষণা কেন্দ্র।

আমরা ল্যাবের বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রদর্শনী দেখার পাশাপাশি ‘স্যাপসাকার উডস (Sapsucker Woods)’-এ পাখি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনশ একরের এই অভয়ারণ্য ক্যাম্পাসেরই একটা অংশ। এখানে পাখি দেখার জন্য পাঁচ মাইলেরও বেশি হাঁটা পথ রয়েছে। তার মধ্যে বনাঞ্চল ও জলাভূমির ওপর দিয়ে তৈরি কাঠের পথও রয়েছে, এবং ল্যাবের পাশেই একটি হ্রদও আছে।
ইয়েলো বেলিড স্যাপসাকার (Yellow Bellied Sapsucker) পাখির নামানুসারে এই অভয়ারণ্যটির নামকরণ। 230টিরও বেশি প্রজাতির পাখি এখানে নথিভুক্ত রয়েছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে ব্লু জে (Blue Jay), কমন গ্র্যাকল (Common Grackle), স্টার্লিং (Starling), পাইলিয়েটেড উডপেকার (Pileated Woodpecker), আমেরিকান গোল্ডফিঞ্চ (American Goldfinch), ব্ল্যাক ক্যাপড চিকাডি (Black Capped Chickadee), রেড উইংড ব্ল্যাকবার্ড (Red Winged Blackbird) এবং হোয়াইট ব্রেস্টেড নাথহ্যাচ (White Breasted Nuthatch) সহ অসংখ্য পাখি পর্যবেক্ষণ করেছি। তাদের সাথে খাবার সংগ্রহের দলে যোগ দিয়েছিল ধূসর কাঠবিড়ালিরা (Grey Squirrel)। এরা খাবারের জায়গায় বারবার আসা-যাওয়া করছিল। ক্যানাডা গিজ (Canada Geese)-এর সেই মায়াবী ডাক শুনে আমরা তাদের সন্ধানে গেছিলাম এবং হ্রদের মধ্যে তাদের দেখতে পাই; সাথে অস্প্রে (Osprey)-র মতো শিকারি পাখিদেরও আকাশে উড়তে দেখা গিয়েছিল।
কর্নেল ল্যাব অফ অর্নিথোলজিতে অনেক সুন্দর সাইনবোর্ড এবং শিক্ষামূলক প্রদর্শনী রয়েছে। এর মধ্যে পাখি শনাক্তকরণহীন একটি চিত্র রয়েছে যেখানে জেমস প্রসেক (James Prosek) নামক এক শিল্পীর উক্তি ছিল কোনো কিছুর নাম জানা আর কোনো কিছুকে জানার মধ্যে ফারাক নিয়ে যা আমাকে পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যানের একটি উক্তি মনে করিয়ে দিয়েছিল : “তুমি পৃথিবীর সব ভাষায় একটি পাখির নাম জানতে পারো, কিন্তু জানার শেষে তুমি সেই পাখিটি সম্পর্কে আসলে কিছুই জানবে না। তুমি শুধু বিভিন্ন জায়গার মানুষ সম্পর্কে জানবে এবং তারা পাখিটিকে কী নামে ডাকে তা জানবে। তাই চলো, আমরা পাখিটির দিকে তাকাই এবং দেখি সে কী করছে—সেটাই আসল কথা। আমি জীবনের খুব শুরুতেই কোনো কিছুর নাম জানা এবং কোনো কিছুকে জানার মধ্যে পার্থক্যটা শিখে নিয়েছিলাম।”

কর্নেল ইউনিভার্সিটি এবং কর্নেল ল্যাব অফ অর্নিথোলজিতে এমন সাইনবোর্ডগুলো দেখাও ছিল এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। এক জায়গায় দেখলাম স্বীকার করা হয়েছে যে এই স্থানগুলো মূলত আদিবাসী আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের ছিল। আমেরিকা যখন উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল, সেই সময় ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীরা তাদের বিতাড়িত করেছিল। এই স্বীকারোক্তিটা দেখা ছিল এক অত্যন্ত গভীর উপলব্ধির মুহূর্ত।
ইথাকা থেকে নিউ ইয়র্ক সিটিতে ফিরে আসার পর আমাদের আরও অনেক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে (American Museum Of Natural History) আমরা প্রকৃতির নানারকমের বিস্ময় প্রত্যক্ষ করি। এর মধ্যে হেইডেন প্ল্যানেটোরিয়ামের (Hayden Planetarium) মহাজাগতিক বিস্ময়গুলো ছিল অন্যতম। সেখানে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ডক্টর নীল ডিগ্র্যাস টাইসনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল।

আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির প্রদর্শনীগুলো সত্যিই অর্থবহ এবং শিক্ষামূলক। কিন্তু প্রদর্শনের জন্য রাখা অনেক মৃত প্রাণী দেখে মন খারাপও হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষও এটি স্বীকার করে যে এই ধরনের সংগ্রহ একটি ভিন্ন যুগের অংশ ছিল ।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টি (Statue of Liberty) এবং এলিস আইল্যান্ড (Ellis Island) থেকে ফেরার পথে আমরা ব্যাটারি পার্কে (Battery Park) একটি বন্য টার্কি (wild turkey) দেখতে পাই। দেখলাম এগুলোকে নিয়ে আঙ্কে ফ্রোলিখ (Anke Frohlich) নামে একজন জার্মান বন্যপ্রাণী ফটোগ্রাফার গবেষণা করছিলেন। এছাড়াও আমরা নিউ ইয়র্ক সিটির বিশাল সেন্ট্রাল পার্কেও (Central Park) অনেক পাখি এবং কচ্ছপ দেখেছি। এই জায়গাটাকে সত্যিকার অর্থেই একটি জনাকীর্ণ মহানগরীর মাঝখানে এক ‘শহুরে অরণ্য (Urban wilderness)’ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।
ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির (Wildlife Conservation Society) ভাইস প্রেসিডেন্ট মিস্টার কিথ লোভেট (Vice President Keith Lovett) আমাদের ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানা এবং সেন্ট্রাল পার্ক চিড়িয়াখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এই চিড়িয়াখানাগুলোতে দেখার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এর মধ্যে ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানার মাদাগাস্কার প্রদর্শনী এবং কাঠামোগত ও জৈবিকভাবে বৈচিত্র্যময় কঙ্গো গোরিলা ফরেস্ট (Congo Gorilla Forest) প্রদর্শনী এবং সেন্ট্রাল পার্ক চিড়িয়াখানার কোডিয়াক ভাল্লুক ও পেঙ্গুইন উল্লেখযোগ্য।
ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানা বন্যপ্রাণী সংরক্ষক জর্জ শ্যালারকে (George Schaller) কঙ্গো, রুয়ান্ডা এবং উগান্ডায় তাঁর অনন্য ফিল্ড রিসার্চ গবেষণায় সহায়তা করেছিল [1]। ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানায় প্রদর্শিত তাঁর বইগুলো ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণ কাজের এক বলিষ্ঠ প্রমাণ। এই সংস্থাটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে এবং নিঃসন্দেহে ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানা বিশ্বের সেরা চিড়িয়াখানাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
চিড়িয়াখানায় আমরা কঙ্গোর তরুণ ওটা বেঙ্গার (Ota Benga) কোনো স্মৃতিচিহ্ন খুঁজছিলাম। 1906 সালে বর্ণবাদী মানসিকতা থেকে তাঁকে খাঁচাবন্দি করে রাখা হয়েছিল এবং বনমানুষদের সাথে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত কিছু খুঁজে পেলাম না। একজন মানুষকে এভাবে অপমান করার সেই ইতিহাস ও চিড়িয়াখানার ভূমিকা নিয়ে আজকেও বিতর্ক থেকে গেছে।
সব মিলিয়ে, ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি পরিচালিত এই ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানাকে আমাদের বেশ পেশাদার বলেই মনে হয়েছে। এরা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সত্যিই দারুণ কাজ করছে!
আমরা জাতিসংঘের সদর (United Nations Headquarters) দপ্তরসহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থানও ঘুরে দেখি। সেখান থেকে আমরা জাতিসংঘের সমর্থিত জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্মারক সংগ্রহ করি। এছাড়াও আমরা নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি (New York Public Library) এবং টাইমস স্কয়ার(Times Square) ভ্রমণ করি। তবে টাইমস স্কোয়ারে আমরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত প্রাণীদের দেখতে পাই — একটি ব্লু অ্যান্ড গোল্ড ম্যাকাও (Blue And Gold Macaw), একটি কাকাতুয়া (Salmon Crested Cockatoo) এবং একটি বোয়া কনস্ট্রিক্টরকে (Boa Constrictor) পর্যটকদের সাথে ছবি তোলার জন্য ঘোরানো হচ্ছিল। নিউ ইয়র্কের অত্যন্ত আইকনিক একটি ল্যান্ডমার্কের তীব্র কোলাহল ও আলোকসজ্জার মাঝে এই দৃশ্যটি ছিল খুবই বেমানান। আশা করা যায় যে, বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা সচেতনতার মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বন্যপ্রাণী বিনোদনের নামে প্রাণীদের ব্যাপক ব্যবহার ও অপব্যবহার বন্ধ হবে। ভারতে ‘ওয়ার্ল্ড অ্যানিমাল প্রটেকশন (World Animal Protection)’-এর মতো সংস্থাগুলো এই বিষয়ে কিছু বড় পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আমরা আশা করি এটি অব্যাহত থাকবে।
আমাদের ভ্রমণের শেষ দর্শনীয় স্থান ছিল সেন্ট প্যাট্রিকস ক্যাথেড্রাল গির্জা। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, মার্কিন ডলারে লেখা ‘In God We Trust’ কথাটি যেন শুধু কাগজে-কলমে আটকে না থাকে। এই বিশ্বাস যেন সত্যিই পুরো পৃথিবীকে সব প্রাণীর জন্য আরও নিরাপদ ও সুন্দর করে তোলে।
অন্যান্য টুকিটাকি:
[1] জর্জ শ্যালার (George Schaller) একজন বিখ্যাত আমেরিকান জীববিজ্ঞানী এবং বন্যপ্রাণী সংসংরক্ষক। ওনাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফিল্ড বায়োলজিস্ট হিসেবে গণ্য করা হয়।
উনি আফ্রিকাতে পর্বতের গোরিলাদের (Mountain Gorillas) ওপর যুগান্তকারী গবেষণা চালান। গোরিলারা যে সহিংস প্রাণী, সেই ধারণা ওনার গবেষণার ফলেই ভাঙে এবং গোরিলা সংরক্ষণের পথ প্রশস্ত হয়।
লেখাটি অনলাইন পড়তে হলে নিচের কোডটি স্ক্যান করো।
Scan the above code to read the post online.
Link: https://bigyan.org.in/a-pilgrimage-to-carl-sagans-cosmos