যুক্তকর

পুরাতন লইয়াই বর্ত্তমান গঠিত, অতীতের ইতিহাস না জানিলে বর্ত্তমান ও ভবিষ্যৎ অজ্ঞেয়ই রহিবে। পুরাতন ইতিহাস উদ্ধার করিতে হইলে সেকালে সর্ব্বসাধারণের দৈনন্দিন জীবন কিরূপে অতিবাহিত হইত, তাহা জানা আবশ্যক। লোক-পরম্পরায় শুনিয়াছিলাম, দেড় হাজার বৎসর পূর্ব্বের জীবন্ত চিত্র এখনও অজন্তার গুহামন্দিরে দেখিতে পাওয়া যায়। আজকাল পথ অনেক সুবিধা হইয়াছে ; কিন্তু বহুবৎসর পূর্ব্বে যখন অজন্তা দেখিতে গিয়াছিলাম, তখন রাস্তাঘাট বিশেষ কিছুই ছিল না। রেল-ষ্টেশন হইতে প্রায় একদিনের পথ। বাহন গোরুর গাড়ি। অনেক কষ্টের পর অজন্তা পৌঁছিলাম। মাঝখানের পার্ব্বত্য নদী পার হইয়া দেখিলাম, পর্ব্বত খুদিয়া গুহাশ্রেণী নির্ম্মিত হইয়াছে ; ভিতরের কারুকার্য্যের পরাকাষ্ঠা। গুহার প্রাচীর ও ছাদে চিত্রাবলী অঙ্কিত ; তাহা সহস্রাধিক বৎসরেও ম্লান হয় নাই। দরবার চিত্রে দেখিলাম, পারস্য দেশ হইতে দূত রাজদর্শনে আসিয়াছে। অন্য স্থানে ভীষণ সমর চিত্র। তাহাতে একদিকে অস্ত্রশস্ত্রে ভূষিতা নারীসৈন্য যুদ্ধ করিতেছে ! আর এক কোণে দেখিলাম, দুইখানা মেঘ দুই দিক হইতে আসিয়া প্রহত হইয়াছে। ঘূর্ণায়মান বাষ্পরাশিতে মূর্ত্তি ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহারা পরস্পরের সহিত ভীষণ রণে যুঝিতেছে। এই দ্বন্দ্ব সৃষ্টির প্রাক্কাল হইতে আরম্ভ হইয়াছে ; এখনও চলিতেছে, ভবিষ্যতেও চলিবে। প্রতিদ্বন্দ্বী আলো ও আঁধার, জ্ঞান ও অজ্ঞান, ধর্ম্ম ও অধর্ম্ম। যখন সবিতা সপ্ত অশ্বযোজিত রথে আরোহণ করিয়া সমুদ্রগর্ভ হইতে পূর্ব্বদিকে উত্থিত হইবেন, তখনই আঁধার পরাহত হইয়া পশ্চিম গগনে মিলাইয়া যাইবে।

আর একখানি চিত্রে রাজকুমার প্রাসাদ হইতে জনপ্রবাহ নিরীক্ষণ করিতেছেন। ব্যাধি-জর্জ্জরিত, শোকার্ত্ত মানবের দুঃখ তাঁহার হৃদয় বিদ্ধ করিয়াছে। কি করিয়া এই দুঃখপাশ ছিন্ন হইবে, তিনি আজ রাজ্য ও ধনসম্পদ পরিত্যাগ করিয়া তাহার সন্ধানে বাহির হইবেন। আজ মহাসংক্রমণের দিন।

অর্দ্ধ-অন্ধকার-আচ্ছন্ন গুহামন্দিরের বাহিরে আসিয়া দেখিলাম, পর্ব্বতগাত্রে প্রশান্ত বুদ্ধমূর্ত্তি খোদিত রহিয়াছে। সুখ-দুঃখের অতীত শান্তির পথ তাঁহারই সাধনার ফলে উন্মুক্ত হইয়াছে।

সম্মুখে যতদূর দেখা যায়, ততদূর জনমানবের কোন চিহ্ন দেখা যায় না। প্রান্তর ধূ-ধূ করিতেছে। অতীত ও বর্ত্তমানের মধ্যে অকাট্য ব্যবধান, পারাপারের কোন সেতু নাই। গুহার অন্ধকারে যাহা দেখিয়াছিলাম, তাহা যেন কোন স্বপ্নরাজ্যের পুরী। অশান্ত হৃদয়ে গৃহে ফিরিলাম।

ইহার কয় বৎসর পর কোনো সম্ভ্রান্ত জনভবনে নিমন্ত্রিত হইয়াছিলাম। সেখানে অনেকগুলি চিত্র ছিল ; অন্যমনস্কভাবে দেখিতে দেখিতে হঠাৎ একখানা ছবি দেখিয়া চমকিত হইলাম। এই ছবি তো পূর্ব্বে দেখিয়াছি – সেই গুহামন্দিরের প্রশান্ত বুদ্ধমূর্ত্তি ! চিত্রে আরও কিছু ছিল যা পূর্ব্বে দেখি নাই। মূর্ত্তির নীচেই একখানা পাথরের উপরে নিদ্রিত শিশু, নিকটেই জননী ঊর্ধ্বোত্থিত যুক্তকরে পুত্রের মঙ্গলের জন্য বুদ্ধদেবের আশীর্ব্বাদ ভিক্ষা করিতেছে। যিনি সমস্ত জীবের দুঃখভার গ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনিই মায়ের দুঃখ দূর করিবেন। অমনি মানস-চক্ষে আর একটি দৃশ্য দেখিলাম। বোধিবৃক্ষতলে উপবাসক্লিষ্ট মুমূর্ষু গৌতম। দুস্থজন দেখিয়া সুজাতার মাতৃহৃদয় উথলিত। দেখিতে দেখিতে অতীত ও বর্ত্তমানের মাঝখানে মমতা ও স্নেহরচিত একটি সেতু গঠিত হইল এবং সেকাল ও একালের ব্যবধান ঘুচিয়া গেল।

আমার পার্শ্বে একজন বিদেশী বলিলেন – দেখো, দেবতার মুখ কিরূপ নির্ম্মম – একদিকে মাতার এত আগ্রহ, এত স্তুতি, কিন্তু দেবতার কেবল নিশ্চল দৃষ্টি ! এই অবোধ নারী প্রস্তর-মূর্ত্তির মুখে কিরূপে করুণা দেখিতে পাইতেছেন ?

তখন প্রকৃতির উপাসক জ্ঞানীদের কথা মনে হইল। এই অবোধ মাতা ও অজ্ঞাতবাদী বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে কি এতই প্রভেদ ?

প্রকৃতিও কি ক্রূর নয় ? তাহার অকাট্য অপরিবর্ত্তনীয় লৌহের ন্যায় কঠিন নিয়মশৃঙ্খলে কয়জনে মমতা দেখিতে পায় ? অনন্তশক্তি চক্র যখন উদ্ধতবেগে ধাবিত হয় তখন তাহা দ্বারা পেষিত জীবগণকে তুলিয়া লয় ?

সকলে প্রকৃতির হৃদয়ে মাতৃস্নেহ দেখিতে পান না। আমরা যাহা দেখি তাহা ত আমাদের মনের প্রতিকৃতি মাত্র। যাহার উপর চক্ষু পড়ে তাহা কেবল উপলক্ষ্য। কেবল প্রশান্ত গভীর জলরাশিতেই প্রকৃত প্রতিবিম্ব দেখিলে দেখা যায়। এই বিত্রস্ত জলরাশির ন্যায় সদা-সংক্ষুব্ধ হৃদয়ে কিরূপে নিশ্চল প্রতিমূর্ত্তি বিম্বিত হইবে ?

যাঁহার ইচ্ছায় অনন্ত বারিধি বাত্যাতাড়নে ক্ষুব্ধ হয় কেবল তাঁহার আজ্ঞাতেই জলধি শান্তিময়ী মূর্ত্তি ধারণ করে। কে বলিবে ঐ অবোধ মাতার হৃদয় এক শান্তিময় করস্পর্শে কমনীয় হয় নাই ?

আমরা যাহা দেখিতে পাই না, পুত্রবাৎসল্যে অভিভূত ধ্যানশীলা জননী তাহা দেখিতে পান। তাঁহার নিকট ঐ প্রস্তরমূর্ত্তির পশ্চাতে স্নেহময়ী জগজ্জনীর মূর্ত্তি প্রতিভাসিত ! দেখিতে দেখিতে আমার মনে হইল যেন ঊর্ধ্ব হইতে অমৃত ক্ষীরধারা পতিত হইয়া মাতা ও সন্তানকে শুভ্র ও পবিত্র করিয়াছে।

অনেক সময়ে এক অপূর্ণতা আসিয়া পৃথিবীর সৌন্দর্য্য ও সজীবতা অপহরণ করে। আলো ও অন্ধকার, সুখ ও দুঃখ-মিশ্রিত দৃশ্য অসামঞ্জস্যহেতু অশান্তিপূর্ণ হয় ; অথচ আলো ও অন্ধকারের সমাবেশ ভিন্ন সুচিত্র হয় না। কেবল আলো কিম্বা কেবল অন্ধকারে চিত্র অপরিস্ফুট থাকে। যে-দৃশ্যের কথা উল্লেখ করিলাম, উহার ন্যায় জীবনচিত্র অনেক সময় সৌন্দর্য্যহীন হয়। ঐ চিত্রের ন্যায় একটি শিশু কিম্বা নারীর ঊর্দ্ধোত্থিত বাহুতে সমস্ত দৃশ্য পরিবর্ত্তিত হইয়া যায়। আলো ও ছায়, সুখ ও অপরিহার্য্য দুঃখ তখন স্ব-স্ব নির্দিষ্ট স্থানে সমাবিষ্ট হয়। তখন সেই দুইখানি উত্তোলিত যুক্তহস্ত হইতে কিরণ-রেখা অন্ধকার ভেদ করিয়া সমস্ত দৃশ্য জ্যোতির্ম্ময় করে।

Facebook Comments
(Visited 1 times, 1 visits today)
 

পাঁচমেশালী

'অ্যাস্ট্রোস্যাট' : জ্যোতির্বিদ্যার জগতে ভারতের অনন্য ​অবদান


বিভাগ: পদার্থবিদ্যার কিছু বিস্ময়, প্রযুক্তি বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের খবর (2016-02-01)

ভারত কৃত্রিম উপগ্রহ ' অ্যাস্ট্রোস্যাট' পাঠালো মহাকাশে। সেই সাথে সূচনা হলো ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগের। এই উপগ্রহের পিছনে কিছু চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক ভাবনার কথা শোনাচ্ছেন টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের জ্যোতির্বিদ অধ্যাপক মৈয়াঙ্ক ভাহিয়া।

আরো দেখো

 
 

তুমি যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর লেখা পেতে চাও অথবা তোমার যদি এমন কোনো প্রশ্ন থাকে যেটা তুমি কোনো বইতে বা ইন্টারনেটে খুঁজে পাওনি, তাহলে এই ফর্মটির মাধ্যমে আমাদের কাছে প্রশ্ন পাঠাও।

নিয়মাবলী

হোমওয়ার্ক জাতীয় প্রশ্ন পাঠাবে না।

ভালো প্রশ্নের উদাহরণ:

  1. নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে আমরা বিন্দুভর কেন ব্যবহার করি?
  2. গাছ মাটি থেকে জল কিভাবে টানে?
  3. ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে কিভাবে আক্রমণ করে?

আমরা যে ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেব না:

  1. ২ আর ২ যোগ করলে কত হয়?
  2. Autotroph কাদের বলে?

আর তুমি যদি বিজ্ঞানে লেখা পাঠাতে চাও, তাহলে এই ফর্মে প্রশ্ন করার কোনো দরকার নেই। এই পাতাতে লেখা পাঠানোর জন্য সমস্ত তথ্য পাবে: http://bigyan.org.in/oldabout/tosubmitarticles/

তোমার সঠিক ই-মেইল পাঠাও । ভুল ই-মেইল দেওয়া হলে, আমরা উত্তর দেব না।


*
 
*
 
*
 
স্কুলে পড়ি কলেজে / বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি গবেষণার সাথে যুক্ত শিক্ষক চাকুরিজীবী অন্যান্য

*

 
*
তুমি যদি কোনো না জানা প্রশ্নের উত্তর জানতে চাও তাহলে "প্রশ্নোত্তর" এ ক্লিক কর, আর যদি কোনো বিষয়ে লেখা পেতে চাও, তাহলে "লেখার বিষয়"-এ ক্লিক কর |
প্রশ্নোত্তর লেখার বিষয়
 
*
নীচের বাক্সতে বাংলায় অথবা ইংরেজিতে তোমার প্রশ্ন লেখ।
 
*
পদার্থবিদ্যা (Physics) জীববিদ্যা (Biology) রসায়ন (Chemistry) গণিত (Mathematics) রাশিবিদ্যা (Statistics) Other
 
*
 
*
 
*
 
স্কুলে পড়ি কলেজে / বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি গবেষণার সাথে যুক্ত শিক্ষক চাকুরিজীবী অন্যান্য

*

 
 
 
*
 
*
 
*
 
স্কুলে পড়ি কলেজে / বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি গবেষণার সাথে যুক্ত শিক্ষক চাকুরিজীবী অন্যান্য

*

 
 
 

বিজ্ঞান আপডেট

তোমার ইনবক্সে বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক খবরাখবর

 

তুমি যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর লেখা পেতে চাও অথবা তোমার যদি এমন কোনো প্রশ্ন থাকে যেটা তুমি কোনো বইতে বা ইন্টারনেটে খুঁজে পাওনি, তাহলে এই ফর্মটির মাধ্যমে আমাদের কাছে প্রশ্ন পাঠাও।

নিয়মাবলী

হোমওয়ার্ক জাতীয় প্রশ্ন পাঠাবে না।

ভালো প্রশ্নের উদাহরণ:

  1. নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে আমরা বিন্দুভর কেন ব্যবহার করি?
  2. গাছ মাটি থেকে জল কিভাবে টানে?
  3. ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে কিভাবে আক্রমণ করে?

আমরা যে ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেব না:

  1. ২ আর ২ যোগ করলে কত হয়?
  2. Autotroph কাদের বলে?

আর তুমি যদি বিজ্ঞানে লেখা পাঠাতে চাও, তাহলে এই ফর্মে প্রশ্ন করার কোনো দরকার নেই। এই পাতাতে লেখা পাঠানোর জন্য সমস্ত তথ্য পাবে: http://bigyan.org.in/oldabout/tosubmitarticles/

তোমার সঠিক ই-মেইল পাঠাও । ভুল ই-মেইল দেওয়া হলে, আমরা উত্তর দেব না।


*
 
*
 
*
 
স্কুলে পড়ি কলেজে / বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি গবেষণার সাথে যুক্ত শিক্ষক চাকুরিজীবী অন্যান্য

*

 
*
তুমি যদি কোনো না জানা প্রশ্নের উত্তর জানতে চাও তাহলে "প্রশ্নোত্তর" এ ক্লিক কর, আর যদি কোনো বিষয়ে লেখা পেতে চাও, তাহলে "লেখার বিষয়"-এ ক্লিক কর |
প্রশ্নোত্তর লেখার বিষয়
 
*
নীচের বাক্সতে বাংলায় অথবা ইংরেজিতে তোমার প্রশ্ন লেখ।
 
*
পদার্থবিদ্যা (Physics) জীববিদ্যা (Biology) রসায়ন (Chemistry) গণিত (Mathematics) রাশিবিদ্যা (Statistics) Other
 
*
 
*
 
*
 
স্কুলে পড়ি কলেজে / বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি গবেষণার সাথে যুক্ত শিক্ষক চাকুরিজীবী অন্যান্য

*

 
 
 
*
 
*
 
*
 
স্কুলে পড়ি কলেজে / বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি গবেষণার সাথে যুক্ত শিক্ষক চাকুরিজীবী অন্যান্য

*

 
 
 

বিজ্ঞান আপডেট

তোমার ইনবক্সে বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক খবরাখবর

 
top