সেই গোয়েন্দা গল্পগুলো মনে পড়ে যেখানে দেখা যাবে অপরাধের ঘটনাস্থলে একাধিক লোক উপস্থিত ছিল? যেখানে শেষ সিনে গোয়েন্দা একে একে সাব্যস্ত করবেন যে উপস্থিত সবাই তাদের ছাপ রেখে গেছে? এবং শেষকালে বেরোবে যে সকলের অলক্ষ্যে আরো একজন উপস্থিত ছিলেন যার কথা কেউ টের পায়নি, যে কোনো স্পষ্ট চিহ্ন ছেড়ে যায়নি, কিন্তু বাকিদের বাদ দিলে তাকেই দোষী হতে হবে?
এরকমই একটা গল্প হয়েছিল 1894 সালে রসায়নের জগতে।
মৌল আবিষ্কারের খেলা
কেমিস্ট্রি বা রসায়নকে যদি এক কথায় বলতে হয়, তাহলে সেটা বিভিন্ন বিক্রিয়া নিয়ে পড়াশোনা। বিক্রিয়ার শেষে তৈরী হয় বিভিন্ন যৌগ (compounds)। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যৌগগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে তাদের মধ্যেকার মৌলগুলো (element) চিহ্নিত করা হচ্ছিল। একে একে “আবিষ্কার” হলো হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন। রসায়ন গবেষণাতে হঠাৎ একটা জোয়ার এলো।

এত মৌল আবিষ্কার হচ্ছিল যে বিজ্ঞানীরা ভাবতে বসলেন, আর কত আবিষ্কার হওয়া বাকি? এক রাশ মৌলের মেলা নাকি মৌলগুলোকে একটা ছন্দে সাজানো যায়, সেই নিয়ে তর্কবিতর্ক শুরু হলো। রুশ বিজ্ঞানী মেন্ডেলিভ একটা টেবিল ছেপে বসলেন যেখানে মৌলগুলোকে বিশেষভাবে সাজিয়ে উনি দেখালেন যে কিছু মৌলের মধ্যে মিল রয়েছে। তারা একইভাবে বিক্রিয়া করে। এই টেবিলটাকে আমরা আজ পিরিয়ডিক টেবিল (periodic table) নামে জানি।
একই মৌলের দুটো রূপ?
এই হলো পটভূমিকা। এমন অবস্থায় এক অভিজাত বংশ থেকে আসা পদার্থবিজ্ঞানী লর্ড র্যালে (Lord Rayleigh) একটা অদ্ভুত চিঠি পাঠালেন Nature পত্রিকায়। একটা ছোট্ট চিঠি। যার সারবস্তু হলো, যা দেখছি, বুঝতে পারছি না। কেউ যদি এর মাথামুন্ডু উদ্ধার করতে পারে, তাহলে আমি বাধিত থাকবো।
উনি বাতাস থেকে নাইট্রোজেন বার করার চেষ্টা করছিলেন। বাতাসে থাকে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, বাষ্প। নাইট্রোজেন বার করার জন্য বাতাস থেকে অক্সিজেনটাকে উনি হটাচ্ছিলেন দুভাবে:
- একবার উনি তামা ব্যবহার করছিলেন:
- একবার অ্যামোনিয়া ব্যবহার করছিলেন:
বাতাসকে তামা বা অ্যামোনিয়া দিয়ে চালানোর ফলে উপরের বিক্রিয়ার কারণে বাতাস থেকে অক্সিজেন বেরিয়ে যাচ্ছিল। বাকি কার্বন ডাইঅক্সাইড বা বাষ্প দুটো পদ্ধতিতেই একইভাবে হটাচ্ছিলেন উনি। সবশেষে নাইট্রোজেনের পড়ে থাকার কথা।

মুশকিল হলো, দুভাবে পাওয়া নাইট্রোজেনের ওজনে (ওজনের ঘনত্বে) সামান্য তফাৎ দেখা যাচ্ছিল। প্রথম পদ্ধতিতে পাওয়া নাইট্রোজেনকে কোনো কারণে দ্বিতীয় পদ্ধতিতে পাওয়া নাইট্রোজেনের থেকে বেশি ভারী লাগছিল। তফাৎটা এমনিতে খুব কম (1/1000 অংশ) কিন্তু পরীক্ষায় যতটা ভুলচুক হতে পারে (error bounds) সেই দিয়ে ওই তফাৎটাকে বোঝানো যায় না।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে পাওয়া নাইট্রোজেনের কিছুটা বাতাস থেকে আসছে, কিছুটা অ্যামোনিয়া থেকে (উপরের বিক্রিয়াটার কারণে)। প্রথম পদ্ধতিতে পুরো নাইট্রোজেনটাই আসছিল বাতাস থেকে। কিন্তু নাইট্রোজেন তো নাইট্রোজেন, বাতাস থেকে এলে খামোকা অ্যামোনিয়া থেকে পাওয়া নাইট্রোজেনের থেকে ভারী হয়ে যাবে কেন?
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চিঠি লিখলেন লর্ড র্যালে। এই চিঠিটা ওনার একটা বিশেষ দিককে উন্মোচিত করে। উনি পরীক্ষার ফলাফলটা দেখে প্রথমেই নতুন আবিষ্কার ঘোষণা করে বসলেন না। ওনার প্রথম ধারণা ছিল, নিশ্চই কিছু ভুল করছি, খালি ভুলটা ধরতে পারছি না। উনি যা যা ভুল হতে পারে সন্দেহ করেছিলেন, সেগুলোকে বাদ দিতে কী করেছেন, তাও লিখলেন। যেমন, প্রথম পদ্ধতিতে গরম তামা দিয়ে পাঠানো হচ্ছিলো বাতাসটাকে। সেই গরম তামা তৈরী করা হয়েছিল কপার অক্সাইডের উপর হাইড্রোজেন পাঠিয়ে :
এই বিক্রিয়া থেকে যদি কিছু অবশিষ্ট হাইড্রোজেন পড়ে থাকে? সেই সম্ভাবনা দূর করতে উনি অক্সিজেন-মুক্ত বাতাসটাকে আবার কপার অক্সাইড-এর উপর দিয়ে পাঠালেন। তাতে কিছু অবশিষ্ট হাইড্রোজেন ধরা পড়লো না।
উনি এটাও ভাবলেন, তবে কি দ্বিতীয় পদ্ধতিতে নাইট্রোজেনের মধ্যে ওজনে হালকা কিছু ভ্যাজাল রয়ে যাচ্ছে? চিঠির শেষে এক লাইন উনি জুড়ে দিলেন মিনমিনে গলায় — এরকম কি হতে পারে যে ভ্যাজাল নয়, নাইট্রোজেন-টাই অন্যরকম?
কোমর বেঁধে খোঁজ
লর্ড র্যালের চিঠির পর স্যার উইলিয়াম র্যামসে (Sir William Ramsay) যা করেছিলেন, তা বিজ্ঞান জগতের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। র্যালে ছিলেন মূলত একজন পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি নিখুঁত পরিমাপের ওপর জোর দিতেন। পরীক্ষার ভুল ছাড়াও উনি যে সম্ভাবনার কথা ভাবছিলেন, সেটা নাইট্রোজেনেরই অন্য কোনো রূপ।
কিন্তু র্যামসে ছিলেন একজন রসায়নবিদ। তিনি সন্দেহ করলেন যে বাতাসের মধ্যে হয়তো নতুন কোনো গ্যাস লুকিয়ে আছে। এই গ্যাসের উপস্থিতির কারণেই বাতাস থেকে পাওয়া নাইট্রোজেনকে আপাতদৃষ্টিতে বেশি ভারী লাগছে। কারণ যাকে শুধু নাইট্রোজেন ভাবা হচ্ছে, সেটা শুধু নাইট্রোজেন নয়। তাতে হয়তো এমন গ্যাস আছে যার কথা এখনো অব্দি কেউ টের পায়নি। রহস্য গল্পের সেই অদৃশ্য আততায়ী। অ্যামোনিয়া থেকে পাওয়া বিশুদ্ধ নাইট্রোজেনে সেই অদৃশ্য গ্যাস নেই, তাই সেটাকে হালকা লাগছে।
র্যালের অনুমতি নিয়ে র্যামসে নিজের মতো করে পরীক্ষা শুরু করলেন। র্যালে বাতাস থেকে অক্সিজেন সরানোর জন্য তামা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু র্যামসে আরও এক ধাপ এগিয়ে বাতাস থেকে নাইট্রোজেনটাকেও পুরোপুরি সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন।নাইট্রোজেন সাধারণত কোনো কিছুর সাথে বিক্রিয়া করে না। কিন্তু খুব গরম ম্যাগনেসিয়াম ধাতুর সাথে বিক্রিয়া করে ‘ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রাইড’ () তৈরি করে:
র্যামসে প্রথমে তামা ব্যবহার করে বাতাস থেকে অক্সিজেন সরিয়ে ফেললেন। এরপর অবশিষ্ট গ্যাসকে উত্তপ্ত ম্যাগনেসিয়াম কুঁচির ওপর দিয়ে বারবার প্রবাহিত করলেন। ফলে নাইট্রোজেন গ্যাস ম্যাগনেসিয়ামের সাথে আটকে গেল এবং গ্যাসের আয়তন কমতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, একটি ছোট বুদবুদ গ্যাস রয়ে গেছে যা কোনোভাবেই আর বিক্রিয়া করছে না।
র্যামসের এই পরীক্ষা থেকে বেরোলো যে নাইট্রোজেন সরিয়ে ফেলার পর বাতাসের প্রায় 1% অংশ বাকি থেকে যাচ্ছে। তিনি যখন এই অবশিষ্ট গ্যাসের ঘনত্ব মেপে দেখলেন, দেখা গেল এটি সাধারণ নাইট্রোজেনের চেয়ে অনেক বেশি ভারী। এই ভারী গ্যাস-টা মিশে থাকার ফলেই বাতাস থেকে পাওয়া নাইট্রোজেন-কে বেশী ভারী লাগছিল।

এটি যে কোনো পরিচিত গ্যাস নয়, তা প্রমাণ করার জন্য র্যামসে স্পেকট্রোস্কোপ ব্যবহার করলেন। যখন এই গ্যাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হলো, তখন সেটি থেকে লাল এবং সবুজ রঙের কিছু বিশেষ রেখা দেখা গেল, যা আগে কখনো কোনো মৌলের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। এটিই ছিল অকাট্য প্রমাণ যে তারা একটি নতুন মৌলিক গ্যাস আবিষ্কার করেছেন। যে গ্যাস কারো সাথে বিক্রিয়া করে না।

উপসংহার
র্যালে এবং র্যামসের ব্যক্তিত্ব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। র্যালে ছিলেন শান্ত ও সতর্ক, আর র্যামসে ছিলেন দ্রুত ও সাহসী। তা সত্ত্বেও তারা অত্যন্ত চমৎকারভাবে একসঙ্গে কাজ করেন। 1894 সালের আগস্ট মাসে তারা যৌথভাবে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে তাদের এই গবেষণাপত্র জমা দেন।
তারা সদ্য আবিষ্কৃত এই গ্যাসের নাম দেন আর্গন (Argon)। গ্রিক শব্দ ‘Argos’ থেকে এটি এসেছে, যার অর্থ হলো ‘অলস’ বা ‘নিষ্ক্রিয়’। যেহেতু এই গ্যাসটি কোনো রাসায়নিকের সাথেই বিক্রিয়া করছিল না, তাই এই নাম।
এই আবিষ্কার পর্যায় সারণীতে একটি নতুন গ্রুপ বা স্তম্ভের জন্ম দেয়, যাকে আমরা এখন নিষ্ক্রিয় গ্যাস (noble gases) হিসেবে জানি। আর্গন আবিষ্কারের পর র্যামসের মাথায় ভূত চাপে। একে একে উনি হিলিয়াম, নিয়ন, ক্রিপটন এবং জেনন আবিষ্কার করে বসলেন।

1904 সালের নোবেল পুরস্কার জুড়ে ছিল দুজনের এই অসামান্য অবদান। সেবছর লর্ড র্যালেকে পদার্থবিজ্ঞানে এবং স্যার উইলিয়াম র্যামসেকে রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। একই আবিষ্কারের জন্য একই বছরে দুটো ভিন্ন বিষয়ে নোবেলের এরকম নজির আর নেই।
প্রচ্ছদের ছবি: Vanity Fair পত্রিকায় লর্ড র্যালে-র ছবি (1899)
লেখার ভিতরের ছবি: বিদিশা সিনহা
বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার: অমলেশ রায়
