ওজোন বা O3 কে আণবিক অক্সিজেন বা O2 -এর অস্থিরমতি ভাই বলা চলে। যেখানে বাতাস থেকে প্রাণভরে অক্সিজেন নিয়ে আমাদের জীবন চলে, সেই বাতাসেই খুব বেশি ওজোন থাকলে জীবনের মতো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ফুসফুসের খুব তাড়াতাড়ি বারোটা বেজে যেতে পারে।
এর কারণ হলো, ওজোন নামক তিন অক্সিজেন পরমাণু সমৃদ্ধ গ্যাসটি রাসায়নিক দিক থেকে খুব ক্রিয়াশীল। তাপমাত্রা বাড়ালে, কিম্বা খুব বেশি ঘনত্বে সেটা একটা অক্সিজেন পরমাণু ছেড়ে দিয়ে শান্ত দুই পরমাণু সমৃদ্ধ অক্সিজেন অণুতে ফেরত যায়। কিন্তু মাঝখান থেকে কাউকে একটা অতিরিক্ত অক্সিজেন দান করে (oxidize করে) যায়। সেটা ধাতু হতে পারে আবার জৈব পদার্থও হতে পারে। যে জিনিসটার সাথে ক্রিয়া করে, তার রাসায়নিক চরিত্র পাল্টে সেটার সমূহ ক্ষতি করতে পারে। যেমন, ছোট এককোষী জীবাণুকে খতম করে দিতে পারে।
কিন্তু সেই একই ওজোন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরের দিকে কীভাবে যেন একটা স্তর বানিয়ে আমাদের সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে আগলে রাখছে। সেটা কীভাবে সম্ভব হলো? ওই ওজোনটা ভেঙে অক্সিজেন হয়ে যাচ্ছে না কেন?
সেটা বুঝতে হলে আমাদের নিচের পরিচিত বায়ুমণ্ডল ছেড়ে উপরের দিকে উঠতে হবে। যেভাবে বাতাসের অণুগুলো ওঠে।
ওজোন নামক তিন অক্সিজেন পরমাণু সমৃদ্ধ গ্যাসটি রাসায়নিক দিক থেকে খুব ক্রিয়াশীল।
বায়ুমণ্ডলে উপরদিকে গেলে কি তাপমাত্রা কমে?
কোনো একটা জায়গায় আশেপাশের তুলনায় গরম বেড়ে গেলে সেখান থেকে অতিরিক্ত তাপ অনেকভাবে ছড়াতে পারে। এই তাপ ছড়ানোর একটা পদ্ধতিকে বলে পরিচলন (convection)। এখানে তাপ পরিবহন হয় তরল বা গ্যাসের মাধ্যমে। তরল বা গ্যাসকে একদিক থেকে গরম করলে সেই দিককার ছটফটে অণুগুলো অন্যদিকে চলে যায়। এইভাবে তাপ ছড়িয়ে যায় সর্বত্র। কেটলিতে জল গরম করলে যেরকম নিচের গরম জল উপরে চলে যায়।
পৃথিবীর উপরও এরকম একটা ব্যাপার ঘটে। পৃথিবীপৃষ্ঠের বিকিরণের ফলে নিচের দিকের বাতাস গরম হয়। কিন্তু কেটলির জলের মতো সেটা আবদ্ধ জায়গার তরল নয়। সেটা গরম হওয়ার সাথে সাথে উপরে ওঠার সময় ছড়িয়ে পড়ে। আমরা এর ফলে যেটা দেখি, সেটা হলো: যত উপরে উঠছি তাপমাত্রা কমছে, বাতাসের চাপ কমছে। মাউন্ট এভারেস্ট -এর মাথায় তাই বরফ, শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য তাই অক্সিজেন মাস্ক লাগে।
কিন্তু এটা গেল আমাদের পরিচিত বায়ুমণ্ডল। যেটাকে বলে ট্রপোমণ্ডল (troposphere)। প্রায় ন-কিমি উঁচু মাউন্ট এভারেস্ট ছাড়িয়ে আরো কিছুটা উপরে গেলে উচ্চতার সাথে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার গল্পটা শেষ হয়ে যায়। শুরু হয় পরের স্তর (স্ট্র্যাটোমণ্ডল বা stratosphere)।
ঠিক কোনখান থেকে সেই পরের স্তর শুরু হয়, সেটা নির্ভর করছে কোন অক্ষাংশে (latitude) আছি তার ওপর। বিষুবরেখায় 20 কিমি কিম্বা মেরুর কাছে 7 কিমি উপরে উঠলে হঠাৎ করে বাতাসের চলনটা পাল্টে যায়। বাতাসের উপরে যাওয়ার প্রবৃত্তিতে বাধা পড়ে। তার কারণ — আরো উপরে উঠতে থাকলে তাপমাত্রা কমে না, উল্টে বাড়তে থাকে। কেন বাড়তে থাকে, তার মূলে রয়েছে এই ওজোন স্তর।
স্ট্র্যাটোমণ্ডল বা stratosphere-এ উপরে উঠতে থাকলে তাপমাত্রা কমে না, উল্টে বাড়তে থাকে।
অস্থির স্থিতাবস্থা
ওজোন স্তর একটা স্তর হিসেবে কীভাবে রয়েছে, সেই রসায়নটা 1930 সালে বাতলেছিলেন এক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সিডনি চ্যাপম্যান। তিনি দেখিয়েছিলেন যে ওজোন স্তরে ওজোন সৃষ্টি এবং ধ্বংস দুটোই ক্রমাগত হয়ে চলেছে।
ওজোন সৃষ্টি হয় দুটো ধাপে। প্রথমে দুই পরমাণু সমৃদ্ধ অক্সিজেন অণু ভেঙে যায়:
এই অণু ভাঙার কাজটা করে উচ্চ শক্তির অতিবেগুনি রশ্মি যেটাকে উপরের সমীকরণে দিয়ে দেখানো হয়েছে। আরো সঠিকভাবে বললে, অতিবেগুনি রশ্মির সেই অংশটা যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য 240 nm এর নিচে। এটা মূলত অতিবেগুনি রশ্মির UV-C অঞ্চলে পড়ে।
কিন্তু মুক্ত অক্সিজেন পরমাণু বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকতে পারে না। সে আণবিক অক্সিজেনের সাথে মিলে তৈরি করে ওজোন:
এই দ্বিতীয় বিক্রিয়াতে কিছুটা শক্তি তাপ হিসেবে নির্গত হয়। এটাই স্ট্র্যাটোমণ্ডলে তাপের উৎস।
কিন্তু সদ্য তৈরি হওয়া ওজোন মোটেই স্থায়ী নয়। মাঝারি শক্তির অতিবেগুনি রশ্মি (240 থেকে 310 nm – অতিবেগুনি রশ্মির UV-C এবং UV-B অংশ) এসে পড়লে এই ওজোন অণুই আবার ভেঙে যায়:
এখান থেকে যে মুক্ত অক্সিজেন বের হয়, সেটা আবার আগের প্রক্রিয়ায় অন্য অক্সিজেন অণুর ঘাড়ে চেপে আবার ওজোন তৈরি করে।
অতএব ওজোন সৃষ্টি আর ধ্বংস, এই দুইয়ের শেষে ওজোন স্তরটা একটা অস্থির স্থিতাবস্থায় থাকে। মাঝখান থেকে আমাদের জন্য ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি শোষিত হয়ে তাপে পরিণত হয়।
এই প্রক্রিয়াটাকে বিজ্ঞানী চ্যাপমানের নামে চ্যাপম্যান সাইকেল (Chapman Cycle) বলে।
ওজোন সৃষ্টি আর ধ্বংস, এই দুইয়ের শেষে ওজোন স্তরটা একটা অস্থির স্থিতাবস্থায় থাকে।
ওজোন স্তরের স্থায়িত্ব
আমরা দেখলাম, স্ট্র্যাটোমণ্ডলে ওজোন সৃষ্টির ফলে তাপ নির্গত হয়। ফলে এই স্তরটাতে এলে তাপমাত্রা উচ্চতার সাথে আর কমতে থাকে না। তাই বাতাসের অণুগুলোও ট্রপোমণ্ডল থেকে স্ট্র্যাটোমণ্ডলে উঠে আরো উপরে উঠে যায় না। সেগুলো ধীরে ধীরে স্ট্র্যাটোমণ্ডলেই বিষুবরেখা থেকে মেরুর দিকে বইতে থাকে (কেন বয়, পাঠক এই নিয়ে আরো জানতে চাইলে Brewer Dobson circulation নিয়ে খোঁজ করে দেখতে পারেন)।
বাতাসের এই ধীরগামী পার্শ্ববর্তী চলনকেই আমরা একটা স্তর হিসেবে দেখি। এই চলনের সময় ওজোন সৃষ্টি – ধ্বংস দুইই হয় এবং দুটোতেই অতিবেগুনি রশ্মির ভিন্ন অংশ শোষণ করে।
কিন্ত এছাড়াও আরেকটা বিক্রিয়া ওজোনকে পাকাপাকিভাবে আণবিক অক্সিজেনে ভেঙে ফেলতে পারে। সেটার জন্য একটা অনুঘটকের প্রয়োজন হয়। যদি অনুঘটক হয়, তাহলে বিক্রিয়াটা হবে এইরকম:
এখানে হলো ক্লোরিন (
), নাইট্রোজেন অক্সাইড (
) বা হাইড্রক্সিল (
) মুক্ত মূলক (free radical)। আলোর কারণে যে ওজোন ভেঙে ফেলার স্বাভাবিক বিক্রিয়া, তার থেকে এই ভাঙনের ধরণটা আলাদা। এর শেষে আর মুক্ত অক্সিজেন তৈরি হয় না, যে মুক্ত অক্সিজেন আবার ওজোন সৃষ্টি করতে পারতো।
এমনিতে এই বিক্রিয়াটা হয়তো অল্পই হতো, কারণ বাতাসে এই -এর পরিমাণ কম। এই ধরনের মুক্ত মূলক বাতাসে একা একা থাকে না। কোনো একটা যৌগের মধ্যে আবদ্ধ অবস্থায় থাকে। ক্লোরিন মুক্ত মূলক যেমন আটকে থাকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের (
) মধ্যে।
কিন্তু একসময় ফ্রিজ এসিতে ব্যবহৃত ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) এই ধরনের মুক্ত মূলকের সাপ্লাই বাড়িয়ে দিয়ে ওজোন স্তরে ওজোনের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছিল। সাধারণ ভাষায় বললে, ওজোন স্তরে ফুটো হতে বসেছিল। তবে আমরা এই ধরনের রাসায়নিকগুলোর ব্যবহার কমিয়ে সেই সংকট ঠেকাতে পেরেছি। সেই সংগ্রামের কথা আরো জানতে এই লেখাটি পড়তে পারো।
আলোর কারণে যে ওজোন ভেঙে ফেলার স্বাভাবিক বিক্রিয়া, তার থেকে ক্লোরোফ্লুরোকার্বনের কারণে ভাঙনটা আলাদা।
ওজোন স্তর এসেছে প্রাণের হাত ধরে
ওজোন স্তর যেমন প্রাণকে টিকিয়ে রাখে, এই স্তরটা কিন্তু সৃষ্টিও হয়েছে প্রাণের কারণেই। খেয়াল করে দেখো, ওজোন সৃষ্টির জন্য কিন্তু বাতাসে অক্সিজেনের ক্রমাগত সাপ্লাই চাই।
একসময় সেই সাপ্লাই ছিল না, তাই পৃথিবীর উপরে এই সুরক্ষাকবচও ছিল না। ডাঙার প্রাণীর তাই সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির থেকে কোনো রেহাই ছিল না, সে কারণে ডাঙার প্রাণীও তখন আসেনি সেভাবে।
ধীরে ধীরে স্বভোজী প্রাণের (autotroph) উদ্ভব যত বাড়লো, তাদের থেকে নির্গত অক্সিজেন গিয়ে জমা পড়ল বায়ুমণ্ডলে। তৈরি হলো পৃথিবীর উপর এই সুরক্ষাকবচ যেটা আরো বিবিধ রকমের পরভোজী (heterotroph) প্রাণের জন্ম দিল।
এখন এই সুরক্ষাকবচ ছাড়া এতরকম প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। তাই সৌরমণ্ডলে পৃথিবীর বাইরে অন্যত্র প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করা দুষ্কর।
যেমন, মঙ্গলগ্রহের কিন্তু এরকম কোনো সুরক্ষাকবচ নেই। তাই সেখানে যারা বসতি গড়ার কথা ভাবছে, তাদের আলাদা করে উচ্চশক্তির অতিবেগুনি রশ্মির থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং সমাধান বার করতে হবে।
তথ্যসূত্র ও অন্যান্য টুকিটাকি:
[1] Environment and health: 3. Ozone depletion and ultraviolet radiation, CMAJ. 2000 Oct 3; 163(7): 851–855.
[2] Basic ozone layer science, EPA
[3] Twenty questions and answers about the ozone layer, NOAA
[4] Harrison, R. M. (2007). Principles of Environmental Chemistry. United Kingdom: RSC Publishing.