পূব আকাশে সূর্য ওঠে, আলো ছড়ায়, ছায়া লম্বা হয়। প্রকৃতির এই চেনা ছন্দে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু কোনও কোনও দিন হঠাৎ আকাশ যেন নিজের কথাই অস্বীকার করে বসে।
হঠাৎ একথা উঠলো কেন?

একদিন দেখলাম হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছবি। শিরোনাম ছিল সূর্যের পাশে আরেক সূর্য, বা দুইপাশে দুই সূর্য। রাশিয়ার কোন এক জায়গায় এমন দেখা যাচ্ছে।
সূর্য দিগন্তের কাছে আসতেই দেখা গেছিল এই নান্দনিক ঘটনা। সূর্যের ডুপ্লিকেটগুলো সূর্যের মতোই দীপ্ত, সূর্যের মতোই স্থির, এবং সূর্যের সঙ্গে একই ছন্দে এগিয়ে চলে। মুহূর্তে মনে হয় — তবে কি আকাশে দুই বা তিনটি সূর্য?
এই প্রশ্ন যতটা রোমাঞ্চকর, তার উত্তর ততটাই বিজ্ঞানসম্মত। দুটো কি তিনটে সূর্য নয়, একটা সূর্যের আলোই আমাদের চোখকে ফাঁকি দিচ্ছে।
সূর্যের সঙ্গী কুকুর
আকাশে সূর্যের মত উজ্জ্বল আলোকবিন্দুর এই আবির্ভাব সান ডগ (Sun Dog) নামে পরিচিত। আর বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এর নাম পারহেলিয়ন (Parhelion)।
“Parhelion” শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে। para অর্থাৎ “পাশে”, helios অর্থাৎ “সূর্য”, দুইয়ে মিলে “সূর্যের পাশে সূর্য”। ইংরেজি নাম Sun dog আরও কাব্যিক। এই নামকরণের পেছনে একটি প্রাচীন বিশ্বাস কাজ করেছে বলে ধারণা করা হয় (যদিও এই ধারণাটা অনেকগুলো সম্ভাবনার একটা)।
গ্রিক পুরাণে দেবতাদের পিতা ও আকাশের অধিপতি জিউস (Zeus) যখন আকাশপথে তাঁর কুকুরদের নিয়ে বিচরণ করতেন, তখন সূর্যের পাশে প্রায়ই দুটি উজ্জ্বল আলোকবিন্দু দেখা যেত। মানুষের কল্পনায় এই আলোদুটিই যেন সূর্যের সঙ্গী হয়ে চলা দুটি ‘নকল সূর্য’। সেই বিশ্বাস থেকেই সূর্যের সহচরদের ‘সান ডগ’ নামে ডাকা শুরু হয় — অর্থাৎ, সূর্যসঙ্গী কুকুর।
সূর্যের চারিপাশে আলোকবলয়
খুব ভালো করে দেখলে দেখা যাবে, সূর্যের পাশের এই দুই নকল সূর্য একটা বলয়ের (arc) অংশ। গোটা বলয়টা ওই দুটো জায়গার তুলনায় খুব ফিকে, প্রায় দেখাই যায় না।
কিন্তু সূর্য যখন দিগন্তের থেকে কিছুটা উপরে, কখনও কখনও সূর্যের চারপাশে এক সম্পূর্ণ আলোকবৃত্ত দেখা যায়। সেটা এতটাই মসৃণ, এতটাই সমান যে মনে হয়, অদৃশ্য কোনো শিল্পী যেন আকাশের ক্যানভাসে নিখুঁত কম্পাস বসিয়ে আলো দিয়ে একটি বৃত্ত এঁকে দিয়েছেন।

সেই আলোকবৃত্ত কখনও হালকা রামধনুর রঙে ছোঁয়া, কখনও আবার প্রায় দুধসাদা। এই নীরব, পরিমিত সুন্দর ঘটনাটির নাম হ্যালো (Halo)।
সবচেয়ে বেশি যে হ্যালোটির সঙ্গে আমাদের পরিচয়, সেটির নাম (22 ডিগ্রি) হ্যালো। এই আলোকবলয়টি সূর্যের কেন্দ্র থেকে ঠিক
কৌণিক দূরত্বে তৈরি হয়, তাই এই নাম। আশ্চর্যের বিষয়, এই দূরত্ব কখনও কমে না, কখনও বাড়ে না — আকাশে তখন সূর্য আর সেই আলোকবৃত্তের সম্পর্কটা হয়ে ওঠে নিখুঁত এক জ্যামিতিক সংলাপ, যেখানে সৌন্দর্য আর অঙ্ক একসঙ্গে কথা বলে।

মেঘের রাজ্যে আলোর পথবদল
সান ডগ কিংবা হ্যালো কীভাবে তৈরি হয়, সেটা বুঝতে হলে পৃথিবীর মাটিতে থাকলে চলবে না। যাই চলো পৃথিবী থেকে প্রায় ছয় থেকে বারো কিলোমিটার উপরে। সেখানে বাতাস পাতলা, তাপমাত্রা খুব কম, আর মেঘ মানে জলবিন্দু নয়, বরং বরফ। এই উচ্চতায় ভাসে পাতলা cirrostratus মেঘ। এগুলো দেখতে যেন আকাশে দুধের পর্দা।

এই মেঘের ভেতর থাকে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বরফ-কণা। এদের প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা করে খুব সাধারণ মনে হয়—কিন্তু তারা সবাই মিলে সৃষ্টি করে এক অসাধারণ দৃশ্য।
জল জমে যখন বরফ হয়, সেই বরফের একটা নির্দিষ্ট গঠন থাকে। ডিপ ফ্রিজে জল রাখলে যে গঠন তৈরী হয়, সেই গঠনের কথা বলছি না। বরফের মধ্যে জলের অণুগুলো যেভাবে সাজানো থাকে, সেটাকে দেখতে অনেকগুলো ষড়ভুজকে (hexagon) একটার উপর একটা চাপালে যেরকম হবে, সেইরকম।

অণুগুলো এইভাবে সজ্জিত হওয়ার ফলে আকাশে থাকা বরফের দানাগুলোও এক একটা ষড়ভুজ হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই দানাগুলোকে বলে কেলাস (crystal), এবং এদের অণুগুলো একটা কেলাসীয় গঠনে (crystal structure) সাজানো রয়েছে।
সূর্য থেকে আসা একটা আলোকরশ্মি যখন এই বরফের দানার একটি পাশ দিয়ে ঢোকে, তখন সেটা বেঁকে যায়। এই ঘটনাটাকে আমরা বলি প্রতিসরণ (refraction)। আলো এক পাশ দিয়ে ভেতরে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে এবং প্রত্যেকবার মাধ্যম পরিবর্তনের ফলে বেঁকে যায়।

দুইবার বাঁক নেওয়ার ফলে রশ্মিটির দিক যায় বদলে। আমাদের চোখে যখন এই পথ বদলে যাওয়া রশ্মি এসে পৌঁছয়, তখন সে রশ্মি শুরুতে কোন দিক থেকে আসছিল, চোখ তো সেটা জানে না। সে আলোর নতুন পথের ভিত্তিতেই আলোর উৎসটাকে নির্ণয় করে। এইভাবে আমাদের চোখ ধোঁকা খেতে পারে। কিন্তু ধোঁকা খেয়ে একটা বলয় দেখে কীভাবে বা নকল সূর্যই বা দেখে কীভাবে, সেই গল্পে আসতে হলে একটু অঙ্ক কষতে হবে।

আলোর পথ বদলানোর জ্যামিতি
আলোকরশ্মির এই দিক বদলের পরিমাণকে বলা হয় বিচ্যুতি কোণ (Angle of Deviation)। নিচের ছবিতে সেটা দিয়ে দেখানো হয়েছে। এরকম ছবি তোমরা পাঠ্যবইয়ে দেখে থাকবে — একটা প্রিজম (prism) দিয়ে আলো কীভাবে যায়, সেইটা পড়ার সময়।

আকাশে এরকম লক্ষ লক্ষ বরফের দানা ভাসমান রয়েছে, তারা বিভিন্নভাবে হেলে থাকে। ফলে সূর্যের লক্ষ লক্ষ আলোকরশ্মি এই দানাগুলোর উপর বিভিন্ন কোণে এসে পড়ে ( রেখার সাথে এই কোণটাকে বলে আপতন কোণ, ছবিতে i দিয়ে দেখানো হয়েছে)। সেই আলোকরশ্মি যখন বরফের মধ্য দিয়ে যায়, তখন প্রতিসরণের (refraction) কারণে রশ্মিগুলো বিভিন্ন কোণে বেঁকে যায়। অর্থাৎ প্রতিটি রশ্মির বিচ্যুতি কোণ (
) আলাদা হয়।

এই বিচ্যুতি কোণের () সাথে শুরুর আপতন কোণের (
) একটা সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। সেইটা করতে হলে একটু জ্যামিতি, একটু পদার্থবিদ্যা কাজে লাগাতে হবে। প্রথমে জ্যামিতিটা দেখা যাক। নিচে আলো বেঁকে যাওয়ার ছবিটা আবার দেওয়া হলো।

লক্ষ্য করে দেখো:
একটি চতুর্ভূজ। ফলে, চারটে কোণের যোগফল হবে
।
এবং
এই দুটো তো অভিলম্ব বা
রেখা, ফলে ওই দুটো যে কোণ তৈরী করছে, তাদের যোগফল
। তাহলে বাকি দুটো কোণের যোগফলও তাই হবে, অর্থাৎ
।
একটি ত্রিভুজ। ফলে, তার তিনটি কোণের যোগফল হবে
। অর্থাৎ,
।
উপরের দুটো সমীকরণ মিলে দাঁড়ায়, ।
এবার, আলো মোট কতটা বাঁকছে দেখা যাক। প্রথমবার বাঁকছে সমান, দ্বিতীয়বার বাঁকছে
সমান। তাহলে মোট যতটা বাঁকছে, সেটা হলো:
এটা আমাদের প্রথম সমীকরণ।
এবার পদার্থবিদ্যা লাগানোর সময় এসেছে। বাতাস থেকে বরফে যাওয়ার সময় প্রতিসরণের ফলে আলোর পথটা বদলায় স্নেলের সূত্র (Snell’s law) মেনে:
যেখানে হলো বায়ুতে রশ্মির আপতন কোণ (angle of incidence) এবং
হলো বরফ-কেলাসের ভিতরে রশ্মির প্রতিসরণ কোণ (angle of refraction)। এইটা দ্বিতীয় সমীকরণ। এর ফলে, প্রথম সমীকরণে
এবং
আর দুটো স্বাধীন স্বত্ত্বা থাকছে না, দুজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরী হচ্ছে।
প্রথম আর দ্বিতীয় সমীকরণটাকে মিলিয়ে একটু অঙ্ক কষলে পাওয়া যাবে একটা ফর্মুলা যেটা বিচ্যুতি কোণটার সাথে শুরুর আপতন কোণের একটা সম্পর্ক স্থাপন করে। সেই অঙ্কটা পাঠককে কষতে বলা হচ্ছে, কিন্তু শেষের ফর্মুলাটা হবে এইরকম:
, যেখানে
আর ষড়ভুজের জ্যামিতি ভাবলে
এটা একটা ভজঘট ফর্মুলা কিন্তু এই ফর্মুলাটাকে যদি গ্রাফে আঁকা হয়, সেটা দেখতে অনেকটা ইংরেজি ‘‘ অক্ষরের মতো হবে।

এই ‘‘ এর একদম নিচের বিন্দুটিতে
-এর মান
আর
-এর মান প্রায়
[1]। এই
-এর মানটাই হলো ন্যূনতম বিচ্যুতি (Minimum Deviation)।
লক্ষ্য করো, গ্রাফে এই বিন্দুটির আশেপাশের অংশটি বাকি গ্রাফটার তুলনায় বেশ সমতল (flat)। এর মানে হলো, দানাগুলো যদি কিছুটা ভিন্ন কোণেও (যেমন থেকে
এর মধ্যে) হেলে থাকে, তবুও তারা আলোকরশ্মিকে প্রায় একই কোণে (
) বাঁকিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, গ্রাফের খাড়া অংশগুলোতে অল্প আপতন কোণের পরিবর্তনেই আলোর বিচ্যুতি অনেক বেশি বদলে যায়, ফলে আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সংখ্যক আলোক রশ্মি একই সাথে আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়। আলোকরশ্মির এই জটলা বা পুঞ্জীভবন (bunching) এর কারণেই আকাশের ওই নির্দিষ্ট অংশটি আমাদের কাছে উজ্জ্বল একটা আলোর উৎস হিসেবে ধরা দেয়।
তাই, এই কোনও কাকতালীয় ভাবে পাওয়া কোণ নয়। এটি বরফের ভৌত ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত।
যখন মাটি থেকে বেশ কিছুটা উপরে বরফ দানাগুলি এলোমেলোভাবে ঘোরে (randomly oriented), তখন আমরা সূর্যের চারদিক ঘিরে দেখি একটি পূর্ণ হ্যালো অর্থাৎ দিগন্তের কাছে আলোর এক বলয় (ring)। বলয় কেন?

নিখুঁত গোল বলয় কেন
যদি একটি মাত্র বরফ দানা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির থাকত, তবে আমরা আকাশে কেবল একটি আলোর বিন্দু দেখতাম। কিন্তু বায়ুমণ্ডলে অগুন্তি বরফের দানা থাকে এবং তারা সবদিকে এলোমেলোভাবে মুখ করে থাকে। যেহেতু দানাগুলো সব সম্ভাব্য দিকে ঘুরে আছে, তাই যিনি দেখছেন তাঁর চোখের সাপেক্ষে সব দিক থেকেই এমন কিছু দানা পাওয়া যাবে যারা ঠিক ন্যূনতম বিচ্যুতি অবস্থানে রয়েছে।
তাই সেই দর্শকের চোখকে কেন্দ্র করে এবং সূর্যকে অক্ষ ধরে যদি তিনি কোণে একটি শঙ্কু (Cone) কল্পনা করেন, তবে ঐ শঙ্কুর পরিধির ওপর যেখানেই বরফের দানা থাকুক না কেন, তাদের মধ্য দিয়ে একইভাবে প্রতিসারিত আলো তাঁর চোখে পাঠাবে।

যেহেতু দানাগুলো এলোমেলোভাবে সব দিকে ছড়ানো, তাই এই বিচ্যুতি সব দিক থেকে (উপরে, নিচে, ডানে, বামে) সমানভাবে ঘটে। এই জ্যামিতিক প্রতিসাম্যের (symmetry) কারণেই আমরা একটি বিচ্ছিন্ন বিন্দু না দেখে সূর্যের চারদিকে একটি পূর্ণ বৃত্তাকার বলয় বা হ্যালো (halo) দেখি।
বলয় তো হলো, কিন্তু সূর্য যখন প্রায় অস্তায়মান, ওই বলয়ের মধ্যে দুটো বিন্দুকে বাকিদের থেকে বেশি উজ্জ্বল লাগে। এতটাই যে সূর্যের পাশে দুটো নকল সূর্য দেখা যাচ্ছে মনে হয়। সেইটা কেন হয়, তার পিছনেও কিছু মজার পদার্থবিদ্যা আর অঙ্ক লুকিয়ে আছে। সেই গল্প থাকবে পরের পর্বে।
প্রচ্ছদের ছবির সূত্র: Wikipedia (By ChelOis – Own work, CC BY-SA 4.0)
তথ্যসূত্র:
[1] 22° Halo, Hyperphysics
[2] What are sundogs and how do they form, space.com[3] What are sundogs? Rainbows beside the sun, almanac.com
