প্রথম ক্যামেরাদের আজব গল্প

বিভাগ: দৈনন্দিন জীবনে রসায়ন, পদার্থবিদ্যার কিছু বিস্ময়, প্রযুক্তি বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের খবর (July 10, 2020)

 
 
 

ছবি আঁকতে তো রং ব্যবহার করতে হয়, ছবি তুলতেও কি তাই? প্রথম ছবি যেভাবে তোলা হয়েছিল, তা কিন্তু অন্য কথা বলে।


একসময় নিজের ছবিকে বন্দী করে রাখা একমাত্র রাজারাজড়াদের পক্ষেই সম্ভব ছিল। ভাড়া করা পোর্ট্রেইট আর্টিস্ট রাজার অবয়ব তার তুলিতে ফুটিয়ে তুলতো। আজ আমরা মুড়িমুড়কির মতো নিজের ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে তুলছি। এর মাঝে কিন্তু অনেকগুলো ধাপ পেরোতে হয়েছে। এখনকার ডিজিটাল ছবির আগে ছিল কোড্যাক্রোম পদ্ধতিতে রঙ্গীন ছবি, তার আগে ছিল জেলাটিন পদ্ধতিতে ছোট নেগেটিভ থেকে পাওয়া সাদা-কালো ছবি, তার আগে ছিল প্ল্যাটিনাম প্রিন্ট, ডিমের সাদা দিয়ে প্রিন্ট, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই ইতিহাসের সুতো গোটাতে গোটাতে পিছিয়ে গেলে এক সময় আসবে ড্যাগেরোটাইপ। ফরাসী আর্টিস্ট লুই ড্যাগের (Louis Daguerre)-এর সৃষ্ট এক অভিনব পদ্ধতিতে একটা প্লেট-এর ওপর ম্যাজিকের মতো একটা ছবি বন্দী হয়ে যেত। সেই ড্যাগেরোটাইপ নতুন করে আজকের বৈজ্ঞানিকদের উৎসাহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কি এই ড্যাগেরোটাইপ? সেই গল্পে যেতে হলে আগে “ছবি তোলা” জিনিসটাকে একটু কাটাছেঁড়া করতে হবে। একটা ছবি তোলার পিছনে দুটো ঘটনা কাজ করে। যার ছবি তুলছি, তার থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে একটা পর্দার ওপর পড়বে (কিছু ক্ষেত্রে বস্তুটা থেকেই আলো আসতে পারে, যেমন প্রদীপের শিখা)। সামনের বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলো গিয়েই পড়বে, চারিপাশের অন্যান্য আলো সেখানে ঢুকতে পাবে না। দ্বিতীয়ত, আলো-টা সেই পর্দার ওপর একটা স্থায়ী ছাপ ফেলে যাবে।

ড্যাগেরোটাইপ-এর পূর্বসূরি: ক্যামেরা অবসকিউরা

প্রথম সমস্যাটার সমাধান অপেক্ষাকৃত সহজ। একটা বাক্সে আলপিন-সাইজের একটা ফুটো করে দৃশ্যের দিকে সেই বাক্সটাকে তাক করলেই হলো। আলো যেহেতু সোজা পথে যায়, সামনের দৃশ্য থেকে প্রতিফলিত আলো বাক্সের ফুটো দিয়ে ঢুকে উল্টো দিকে অর্থাৎ বাক্সের পিছনের দেয়ালে সেই দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করবে। সেই প্রতিচ্ছবি অবিকল সামনের দৃশ্যের মতোই হবে, খালি উল্টে দেওয়া। অর্থাৎ মাথা নিচে, পা উপরে। নিচের ছবিতে দেখো এটা কিভাবে সম্ভব। এই ক্যামেরার সাফল্যের জন্য পারিপার্শ্বিক আলোকে যতটা সম্ভব ঢুকতে না দেওয়া যায় ভালো কারণ সেই আলো বাক্সের দুধারের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে পিছনের দেয়ালের ছবিটা ঘেঁটে দিতে পারে। যেমন, পারিপার্শ্বিক আলো আটকাতে একটা কাপড়ের ছাউনি দেওয়া যায় বাক্সটার ওপর, অবশ্যই ফুটোটাকে না আটকে।

ক্যামেরা অবসকিউরা (সূত্র)

একে বলে পিনহোল ক্যামেরা (pinhole camera) বা ক্যামেরা অবসকিউরা (camera obscura)। শুধু এটুকু হলে আমরা প্রথাগতভাবে যাকে ক্যামেরা বলে বুঝি, সেইটা হবে না কারণ এতে ছবির কোনো স্থায়িত্ত্ব নেই। কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যবহার করা হতো স্রেফ ছবি আঁকার শর্টকাট পদ্ধতি হিসেবে। এই ছবি আঁকাকে প্রায় চিটিং বলা যেতে পারে। চোখে দেখে ছবি না এঁকে ক্যামেরা অবসকিউরা-র পর্দায় যে ছবি পড়ছে, তার ওপর ছবি পড়াকালীন পেন্সিল বুলিয়ে নেওয়া যায়। অর্থাৎ ক্যামেরা-টা এক্ষেত্রে হবে একটা মানুষ সাইজের ঢাউস বাক্স, একটা ঘরই বলা যায়। সেই ঘরে আর্টিস্ট-মশাই ঘাপটি মেরে বসে থাকবেন। যেই ঘরের দেয়ালের ফুটো দিয়ে উল্টোদিকের দেয়ালে ছবি পড়বে, আর্টিস্ট তার ওপর পেন্সিল বুলিয়ে নেবেন। ব্যাস, সামনের দৃশ্য হটিয়ে নিলেও ছবি পাকাপাকিভাবে রয়ে গেল দেয়ালে।

ক্যামেরা-র আড়ালে আর্টিস্ট (সূত্র)

এখানেই লুই ড্যাগের ও তাঁর কিছু অগ্রজদের কেরামতি। তাঁরা ওই আর্টিস্ট-কে নিষ্প্রয়োজন করে দিলেন। এমন এক প্লেট বানালেন যাতে সরাসরি সামনের দৃশ্য স্থায়ীভাবে বন্দী হয়ে যাবে। এটাই ড্যাগেরোটাইপ।

ছবি আসলে রাসায়নিক বিক্রিয়া

ভালো ড্যাগেরোটাইপ তৈরী করাটা সেইসময় রীতিমতো দক্ষতার ব্যাপার ছিল। ম্যানুয়াল পড়ে প্লেট বানালেও যেমনটি চাই, সেরকম স্পষ্ট ছবি আসবে, তার গ্যারান্টি ছিল না। তবে পদ্ধতি একটা নথিবদ্ধ আছে। প্রথমে তামার প্লেটে রুপোর একটা স্তর পড়বে, সেটা আয়োডিন গ্যাস-এর সংস্পর্শে এসে সিলভার আয়োডাইড তৈরী করবে।

এই সিলভার আয়োডাইড স্তরটাই যাকে বলে ফটোসেনসিটিভ স্তর। আলো পড়লে সিলভার আয়োডাইড কিছুটা ভেঙ্গে যায় এবং গুটলি গুটলি রুপো পড়ে থাকে। যে আলোটা পড়লো, এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে ছাপ রেখে যায় প্লেটের ওপর (আরো বিশদে পরে আসছি)। এবার এই আলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে শুধু সামনের দৃশ্য থেকে প্রতিফলিত আলোই পড়ে প্লেটের ওপর। কিন্তু আলো নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি আমরা আগেই দেখেছি: ক্যামেরা অবসকিউরা-র বাক্সটা। সেই বাক্সে ফুটোর উল্টোদিকের পর্দায় ওই প্লেট-টা বসিয়ে দিলেই হলো।

এইভাবে ড্যাগেরোটাইপ প্লেটটা ক্যামেরা-র বাক্সে বসে সামনের দৃশ্যকে ধরাশায়ী করে ফেলে। একে বলে এক্সপোজ করা। অর্থাৎ প্রয়োজনমতো প্রতিফলিত আলো ড্যাগেরোটাইপ প্লেট-এ গিয়ে পড়লো। এক্সপোজ করার পর ক্যামেরা-র ফুটো বন্ধ করে একটা অন্ধকার ঘরে এনে প্লেটটাকে বার করা হয়। সেই প্লেট-এ কিন্তু তখনও কিছুই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এবার প্লেটটাকে গ্যাসীয় অবস্থায় মার্কারি বা পারদের সংস্পর্শে আনা হয়। রুপোর গুটলিগুলোর ওপর গ্যাসীয় অবস্থার পারদ গিয়ে জাঁকিয়ে বসে সলিড হয় এবং রুপো-পারদ মিশ্রণ তৈরী করে। এবার ছবিটা স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায় প্লেট-এর ওপর।

ড্যাগেরোটাইপ প্লেট-কে বাক্সে ঢুকিয়ে মার্কারি বা পারদের সংস্পর্শে আনা হচ্ছে। ওখান থেকে বেরোলেই প্লেট-এ ছবি দেখা যাবে। (সূত্র)

বাকি কাজগুলো করা যাতে ছবিটা আর এক্সপোজ না হয়। অর্থাৎ, নতুন করে আলো পড়লেও আর কোনোরকম রাসায়নিক বিক্রিয়া না হয়। প্লেটটাকে সোডিয়াম থায়োসালফেট দ্রবণে চোবানো হয় যাতে পড়ে থাকা সিলভার আয়োডাইড ধুয়ে যায়। এটাকে বলে ফিক্সিং। ছবিটাকে পাকাপাকিভাবে প্লেটে বন্দী করা হলো। সবশেষে একটা সোনার পুরু স্তর বসানো হয় যাতে ছবিটা আরো স্পষ্ট দেখা যায়, আরো দীর্ঘস্থায়ী থাকে।

শেষের ছবিতে ঠিক কি রইলো

এতো সব কাণ্ডের পর ছবির প্লেটে যেটা পড়ে থাকে, সেটা হলো হরেক সাইজের, হরেক আকারের রুপো-পারদ ন্যানোমিটার-সাইজ দানা। কিছু জায়গায় গায়ে গায়ে ঘেঁষে জটলা পাকিয়েছে, কিছু জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ন্যানোমিটার সাইজের একটা পিঁপড়ে যদি প্লেটের ওপর চড়ে বেড়াতো, তাকে অনেক পাহাড়-পর্বত পেরোতে হতো (এরকম পিঁপড়ে বাস্তবে হয়না, ডেয়ো পিঁপড়েগুলোর গড় সাইজ এক ন্যানোমিটার-এর দশ লক্ষ গুণ)। তবে আমরা খালি চোখে সেসব দেখতে পাইনা। যেটা দেখি, সেটা হলো একটা ছবি। যে সে ছবি নয়, যে দৃশ্যে প্লেটটা এক্সপোজ করা হয়েছিল, অবিকল তার কপি।

এটা কিভাবে হলো? সেই গবেষণা করার রসদ ঊনবিংশ শতাব্দীতে ছিলনা। আলো পড়ে একটা বিক্রিয়া হলো, সেই বিক্রিয়ার অবশিষ্টকে পাকাপাকিভাবে সেট করে দিলে, এই নতুন ছবিতে আলো পড়লে আগের দৃশ্যটা চোখে ধরা দেয়, এটুকু জানাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখন সেই গবেষণা সম্ভব। মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট-এর সহযোগে কিছু বিজ্ঞানী সেই গবেষণা করলেন [২]।

নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট-এ রয়েছে এই ড্যাগেরোটাইপ-টা। নাম Desert near Alexandria। (সূত্র)

সে গবেষণার উদ্দেশ্য শুধু এককালের ক্যামেরার রহস্যভেদ নয়, তার আধুনিক কিছু প্রয়োগও রয়েছে। মোদ্দা সমস্যা হলো এইটা বার করা: একটা ধাতুর এবড়োখেবড়ো উপরিতল, যেখানে উঁচুনিচুগুলো ন্যানোমিটার সাইজের, তাতে আলো এসে পড়লে সেই আলো কিভাবে ছড়িয়ে পড়বে। ছড়িয়ে পড়া আলোর মধ্যে কোনদিকে নীল বেশি থাকবে, আর কোনদিকে লাল, এইরকম সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেরিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা।

সাধারণত আমরা যখন রঙ্গীন কিছু দেখি, সেটাতে থাকে কিছু পিগমেন্ট (pigment) বা রঞ্জক পদার্থ। সেই রঞ্জক পদার্থ আলোর কিছু রং শুষে নেয়, অর্থাৎ দৃশ্যমান আলোর কিছু ওয়েভলেংথ বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য শুষে নেয়, ফলে আমরা যেটা দেখি সেটা বাকি রঙ্গের আলোর মিশ্রণ। যেমন, রঞ্জক পদার্থ যদি আলোর লাল অংশটা পুরো শুষে নেয়, তাহলে আমরা বাকি যে আলো দেখি (মূলত নীল আর সবুজ), সেটা সম্মিলিতভাবে আমাদের কাছে হলুদ মনে হয়। তখন, আমরা রঞ্জক পদার্থটাকে হলুদ রঞ্জক পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত করি।

আলোর বর্ণচ্ছটা। এর থেকে লাল অংশটা বাদ দিলে যা পড়ে থাকে, তাকে হলুদ লাগে। নিচের সংখ্যাগুলো ন্যানোমিটার-এ তরঙ্গদৈর্ঘ্য। অর্থাৎ, আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৭৪০ থেকে ৬২৫ ন্যানোমিটার-এর মধ্যে হলে, তাকে লাল রং মনে হয়।

কিন্তু কোনো কিছু রঙ্গীন দেখতে হলে রঞ্জক পদার্থ ব্যবহার করতে হবে, তার কোনো মানে নেই। অর্থাৎ আলোর কিছু রং শুষে নিতে হবে, সেরকম না হলেও চলবে। আলোর মধ্যে কিছু রং বা কম্পাঙ্ক অন্যভাবেও বাদ দেওয়া যায়। একটা ধাতুর এবড়োখেবড়ো উপরিতল সেরকমই একটা রং-বিয়োজক পদ্ধতি। সেই ধাতুর ওপর আলো পড়লে কিছু রং বা কম্পাঙ্ক যদি সরাসরি ফেরত না এসে ডাইনে বাঁয়ে ছড়িয়ে যায়, যে আলোটা সরাসরি আমাদের চোখে ফেরত আসবে, তাতে ওই রংগুলো নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। অর্থাৎ আমরা দেখবো বাকি আলোর বাকি রংগুলো। কেল্লা ফতে!

ভেবে দেখুন মজাটা। লাল, নীল, সবুজ, এইসব রং আলাদা করে না বুলিয়ে একটা গোটা ছবি তৈরী করা যায়। স্রেফ একটা ধাতুর প্লেট দিয়ে, যাতে ন্যানোমিটার সাইজের উঁচু-নিচু রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর ড্যাগেরোটাইপ-এ ঠিক এইটাই করা হলো। এক্সপোজ করার পর প্লেট-এ যে রুপো-পারদ দানাগুলো পড়ে রইলো, তারাই আলোর কিছু রংকে এদিকওদিক ছড়িয়ে এবং প্রয়োজনমতো সরিয়ে দিয়ে একটা গোটা ছবিকে প্রস্ফুটিত করে ফেললো।

বিজ্ঞানীরা এই আলোর বিচ্ছুরণ বা স্ক্যাটারিং (scattering) ঠিক কিরকম হয়, সেই সন্ধানে নামলেন। ভাবনাটা এইরকম যে সঠিক তত্ত্ব বা থিওরিটা বার করতে পারলে, এর সাহায্যে রংবিহীন “কালার প্রিন্টিং” করার একটা নিখুঁত প্রযুক্তি বেরিয়ে আসবে। সেকালে যেটা শিল্পের পর্যায়ে ছিল, সেটাই এখন অব্যর্থ বিজ্ঞান হয়ে যাবে।

রং পাল্টানো ছবি

ড্যাগেরোটাইপ-এর মূল নীতিটা এইরকম: যত বেশি আলো পড়বে, তত বেশি ঘেঁষাঘেঁষি করে রুপোর দানা তৈরী হবে, তত পারদের জমাট বাধার সুযোগ কম হবে। অতএব যেসব জায়গায় বেশি আলো পড়েছে, সেখানে রুপো-পারদ মিশ্রণে তৈরী দানার সাইজ ছোট। কম আলো পড়া জায়গাতে রুপোর দানা সংখ্যায় কম ও অনেক ছড়িয়ে ছিটিয়ে, অতএব একেকটা দানার ওপর অনেকটা পারদ জমে ঢোল হয়ে উঠতে পারে। দানার সাইজ এখানে বড়। অর্থাৎ এক কথায়, বেশি আলো পড়লে ছোট দানা, কম আলোতে বড়। ছোট-বড় মিলিয়ে যত দানা প্লেটে রয়েছে, তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছবিটা তৈরী হচ্ছে।

এতগুলো সাইজের দানা, কিছু কাছাকাছি কিছু দূরে দূরে, এদের সম্মিলিত প্রভাব কি, সেই অঙ্কটা কষার চাঁদ-ধরা চেষ্টায় বিজ্ঞানীরা গেলেন না। একটা অপেক্ষাকৃত সহজ অঙ্ক দিয়ে শুরু করলেন। দিনের ঝাঁঝাঁ রোদ্দুরে ছবি তুলতে গিয়ে আমরা অনেকেই লক্ষ্য করেছি, পিছনের আকাশটা ছবিতে সাদা হয়ে যায়। এটাকে বলে ওভার-এক্সপোজার। অতিরিক্ত আলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ড্যাগেরোটাইপ-এ এই ওভার-এক্সপোজার-এর ফলে যে রংটা দেখা যায় সেটা নীলচে।

ড্যাগেরোটাইপ-এ ওভার-এক্সপোজ হওয়ার ফলে নীলচে আকাশ (সূত্র)

ওভার-এক্সপোজার-এর চরম কেসটাই ধরলেন বিজ্ঞানীরা। ধরা যাক, গোটা প্লেটটাকেই আকাশের দিকে তাক করে ওভার-এক্সপোজ করা হয়েছে। তাহলে প্লেট-এর সব জায়গাতেই দানার সাইজ এবং বিন্যাস মোটামুটি একই। সাইজটা মোটামুটি ছোটর দিকে এবং কোনো একটা দানার বেঢপ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। এক্ষেত্রে যে কোনো একটা দানাকে নিয়ে তার ওপর আলো পড়লে কি হয়, সেই অঙ্কটা কষলেই হবে।

একটা দানাকে প্লেটে বসা গোলার্ধ বা হেমিস্ফিয়ার (hemisphere) ভেবে নিয়ে তার ওপর আলো পড়লে কি হয়, সেটা ম্যাক্সওয়েল-এর তড়িচ্চুম্বকীয় সূত্র ধরে কষলেন বিজ্ঞানীরা। তারা আলাদা করে মেপেওছিলেন দানার গড় সাইজ কি হয়ে থাকে। সেই সাইজ বসিয়ে দেখা গেল, বিচ্ছুরিত আলোর দুটো বিশেষ তরঙ্গদৈর্ঘ্য ইনটেনসিটি (intensity) বা তেজস্বীতা বেশি: একটা নীল রঙ্গে, আরেকটা লাল। নীলের তেজ বেশি সরাসরি প্লেটটাকে দেখলে, লালের তেজ বেশি প্লেটটাকে চোখের সাথে আড়াআড়িভাবে ধরলে।

উপরের ছবিটা যাকে বলে স্ক্যাটারিং প্রোফাইল। ছবিটা গবেষণাপত্রটি থেকে নেওয়া [২]। বাঁদিকের-টা নীল রঙ্গের আলোর প্রোফাইল আর ডানদিকের-টা লাল আলোর। নীল আলোর ইনটেনসিটি বা তেজস্বীতা প্লেট-এর উল্লম্বদিকে সবথেকে বেশি। লাল আলোর ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি তেজস্বীতা প্লেট-এর সমান্তরাল দিকে।

বাস্তবেও সেটাই হয়। ওভার-এক্সপোজ করা ড্যাগেরোটাইপ-কে সরাসরি দেখলে নীলচে লাগে কিন্তু ধার থেকে দেখলে লালের আভা দেখা যায়। একই ছবি বিভিন্ন কোণ থেকে দেখলে রং বদলায়।

এইভাবে অংক কষে দেখানো গেলো যে একটা একাকী দানাই বিচ্ছুরণের মাধ্যমে রং সৃষ্টি করতে সক্ষম। বাস্তবের সাথে সেই অংককে মেলানোও গেল। বিজ্ঞানীরা এরপর দানার সাইজ, তাতে রুপোর তুলনায় পারদ বেশি থাকলে কি হবে, সোনার পরতের প্রভাব, ইত্যাদিও বিশ্লেষণ করলেন। উৎসাহী পাঠকদের জন্য নিচে গবেষণাপত্রটার খোঁজ দেওয়া হলো।

এবার এই অংককে আরো কঠিনতর করে অনেক দানার সম্মিলিত প্রভাবে আসলে ড্যাগেরোটাইপ-এ কিরকম অপটিকাল রেসপন্স (optical response) হচ্ছে, সেই “ছবি”-টা ফুটিয়ে তুলতে হবে। তবে বিজ্ঞানীরা একটা কথা স্বীকার করেছেন। ন্যানোপার্টিকেল গবেষণার আধুনিক সব হাতিয়ার ছাড়াই ঊনবিংশ শতাব্দীতে ড্যাগের-এর মতো পথিকৃৎ-রা যা কামালটা দেখিয়েছিলো, সেটার ওপর তাঁরা গবেষণা করতে পেরে যেন হাতে চাঁদ পেয়েছেন। রং ছাড়া রং সৃষ্টির এই খেলাতে যে এতদূর যাওয়া সম্ভব, সেটা হয়তো তাঁদের কল্পনাতেও আসতো না।

(প্রচ্ছদের ছবি: লুই ড্যাগের-এর নিজের ছবি জাঁ-ব্যাপতিস্তে সাবাতিয়ে-ব্লো-র তোলা, সূত্র)

তথ্যসূত্র

[১] ফটোগ্রাফি-র ইতিহাস নিয়ে জানতে জর্জ ইস্টম্যান হাউস-এর এই অসাধারণ ভিডিও সিরিজ-টা দেখুন: https://www.youtube.com/watch?v=me5ke7agyOw&list=PL4F918844C147182A । নিউ ইয়র্ক-এর রচেস্টার শহরে অবস্থিত এই মিউজিয়াম-এ ড্যাগেরোটাইপ-এর একটি বিশাল সংগ্রহ রয়েছে।

[২] Nineteenth-century technology: The plasmonic properties of daguerreotypes, Schlather, Gierl, Robinson, Centeno, Manjavacas, PNAS, 2019 Jul 9;116(28):13791-13798. doi: 10.1073/pnas.1904331116.

Facebook Comments
(Visited 1 times, 24 visits today)

Tags: ,