কোভিড-১৯ সামাল দেওয়ার পথ কিরকম দেখতে

বিভাগ: জীবন বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের খবর (June 19, 2020)

 
 
 

করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা হয়, এরকম একটা ল্যাব-এর দৈনন্দিন কার্যকলাপের এক ঝলক।


সেদিন বিকেলটা বেশ গুমোট গরম ছিল, সিসিএমবি (CCMB, হায়দরাবাদ) ক্যাম্পাস তখন প্রায় নিশ্চুপ। এই কোভিড-১৯ আতঙ্কের মধ্যেই, আমি দিব্যা ভেদাগিরির সঙ্গে বায়োসেফটি লেভেল-৩ (বিএসএল-৩) গবেষণাগারের দিকে যাচ্ছিলাম। এখানে দিব্যা এবং তাঁর দলের সদস্যরা বেশ কিছুদিন ধরে করোনাভাইরাস সার্স-কভ২-কে কৃত্রিমভাবে সংখ্যায় বাড়ানোর চেষ্টা করছে (grow করা)। সেই করোনাভাইরাস সার্স-কভ২-ই যেটা বর্তমান কোভিড-১৯ অতিমারীর জন্য দায়ী।
দিব্যা এখন ডঃ কৃষ্ণান এইচ হার্শান-এর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করে। তাঁর কাজের মূল বিষয় হলো ফ্ল্যাভিভাইরাস গোত্রের ভাইরাস আর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মধ্যে নানা রকমের টানাপোড়েনগুলো। ফ্ল্যাভিভাইরাস বিশেষ ধরণের এক শ্রেণীর ভাইরাস, এর মধ্যে ডেঙ্গু এবং জিকা ভাইরাসও আছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে করোনাভাইরাস সার্স-কভ২ সংক্রান্ত গবেষণাকে, আর সেইজন্যই দিব্যার পিএইচডি-র কাজ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। ভাইরাস নিয়ে গবেষণার প্রথম ধাপ হলো গবেষণাগারে যথেষ্ট পরিমাণে সেই ভাইরাস গজানো। এটা করতে না পারলে টিকা তৈরী কিংবা সম্ভাব্য ওষুধ পরীক্ষা করা কোনোটাই সম্ভব হবেনা।

বিএসএল-৩ গবেষণাগারকে একপ্রকার পবিত্র জায়গা বলা যেতে পারে। শুধুই রোগ-সৃষ্টিকারী ছোঁয়াচে জীবাণুদের এখানে কালচার করা হয়। নিরীহ ই. কোলাই (E. coli) ব্যাক্টেরিয়ার মতো জীবাণু অনেক জীববিদ্যার গবেষণাগারেই এখন তৈরী হয়। কিন্তু জীবাণু ছোয়াঁচে হলে সুরক্ষার জন্য অনেক নিয়মনীতি রয়েছে। বিএসএল-৩ গবেষণাগার সেইসব নিয়মনীতি মেনে চালানো হয়।

যুদ্ধসাজ চাপিয়ে ল্যাব-এ পদার্পণ

বিএসএল-৩ গবেষণাগারে ঢুকতে হলে
এইভাবে ঢুকতে হয়। (সূত্র: CCMB, হায়দরাবাদ)

বিএসএল-৩ ল্যাব-এর ভিতর যাত্রা শুরু হয় একগুচ্ছ চেঞ্জরুম-এর ভিতর দিয়ে। চেঞ্জরুম, অর্থাৎ পোশাক পরিবর্তনের পালা। একেকটা ঘরে ঢোকামাত্র, বাতাসের চাপ কমতে থাকে, আর দেহে সুরক্ষার কবচ (Personal Protective Equipment বা PPE) পড়তে থাকে। বাতাসের চাপকে বাইরের তুলনায় কম রাখা হয় যাতে সবসময় বাইরের পরিষ্কার বাতাস ভিতরে আসতে পারে। তবে খুব কম না, ৩০Pa মতো, আপনি হয়তো লক্ষ্যও করবেন না। তবে একটা গুরুগম্ভীর ব্যাপার যে হতে চলেছে, সেটা টের পাওয়া যায় PPE-র বহর দেখে – পায়ের মোড়ক, স্পেশাল জুতো, তারপর সেই জুতোর মোড়ক, ল্যাব কোট, তার ওপর সার্জিকাল গাউন, হাতে গ্লাভস, চোখে গগলস, সর্বোপরি N95 মাস্ক এবং মাথা ঢাকার ব্যবস্থা। অর্থাৎ, বাতাস যতই পরিষ্কার হোক, দেহের কোনো অংশ সেই বাতাসের সংস্পর্শে যেন না আসে। গবেষক যাতে বাইরের ধুলোময়লা ভিতরে আনতে না পারেন কিংবা ভিতরে সংক্রামিত হয়ে বাইরে না যান, তাই এই ব্যবস্থা।

কোষ কালচার করা, অর্থাৎ জীবদেহের
বাইরে টিকিয়ে রাখা। (সূত্র: CCMB, হায়দরাবাদ)

শেষমেষ প্রবেশ করলাম বিএসএল৩-র ভিতর। প্রথমেই চোখে পড়লো উজ্জ্বল আলো আর ঝাঁ-চকচকে স্টেইনলেস স্টিল-এর আসবাবপত্র। টিপটপ গবেষণাগার, তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা সেট করা আছে। আরেকজোড়া গ্লাভস চড়িয়ে এগোলাম ইনকিউবেটর-এর দিকে। এখানে কিছু ছোট প্লেট-এর খুপরিতে সার্স-কভ২ ভাইরাস তাদের ধারক কোষের (host cell) ওপর বেড়ে উঠছে। ভাইরাসের যাতে বেড়ে উঠতে অসুবিধে না হয়, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস-এ রাখা, কার্বন ডাইঅক্সাইড ৫ শতাংশে। পুষ্টি যোগান দেওয়া হয়েছে একটা টমেটো-লাল দ্রবণের মাধ্যমে (নাম DMEM), তাতে প্রোটিন দেওয়া হয়েছে এবং এক ছটাক অ্যান্টিবায়োটিক্স যাতে ব্যাকটেরিয়া দূরে থাকে।

ভাইরাস আর ধারক কোষের ধস্তাধস্তি

ভাইরাসকে প্রায় জীবন্ত বলা চলে। যতটা সম্ভব কম সারবস্তু নিয়ে জীবন্ত থাকা যায়, তাই নিয়ে চলেছে সে। প্রোটিন আর লিপিড স্তরের আড়ালে জিনগত তথ্যসম্ভার, ব্যাস এইটুকুই। সাইজে সে বাড়েনা কিংবা বিপাকও (metabolism) হয়না তার, শুধু সংখ্যায় বেড়ে চলে। যে ধারকের ওপর বাড়ছে, তার প্রোটিন যন্ত্রকে কব্জা করে নিজের বেড়ে ওঠার কাজে লাগায়। সার্স-কভ২ সেইসব কোষে প্রবেশ করতে পারে যারা একটা বিশেষ ধরণের ACE প্রোটিন প্রকাশ করে। এখানে তাদের বেড়ে ওঠার জন্য আফ্রিকান গ্রীন বাঁদরের বৃক্কের এপিথেলিয়াল (epithelial) কোষ দেওয়া হয়েছে। এগুলো বাজারে ভেরো কোষ (Vero cells) হিসেবে পাওয়া যায়।

ভেরো কোষগুলোর সার্স-কভ২-র খপ্পরে পড়ে কি দশা হলো, সেই খোঁজ নিতে কয়েকদিন ছাড়াই দিব্যা ল্যাব-এ আসছে। DMEM দ্রবণের রং পরিবর্তন হওয়া মানে তার pH পাল্টেছে। এইটা হলে হয় ওকে ইনকিউবেটর-এ কার্বন ডাইঅক্সাইড-এর পরিমাণ ঠিক করতে হবে, নয়তো নতুন করে DMEM দিতে হবে। আজকে ও ছটা-খুপরি-যুক্ত একটা প্লেট বার করলো ইনকিউবেটর থেকে। এতে এক সপ্তাহ আগে ভেরো কোষে এক কোভিড-১৯ রোগীর স্যাম্পল দিয়ে সংক্রমণ করা হয়েছিল।

ইনকিউবেটর থেকে বার করা হলো রোগীর স্যাম্পল দিয়ে সংক্রমণ করা ভেরো কোষ। (সূত্র: CCMB, হায়দরাবাদ)

DMEM-এর রং ঠিকই ছিল, তাই ও সরাসরি কোষের স্বাস্থ্য নির্ণয় করতে সেগুলোকে মাইক্রোস্কোপের নিচে ফেললো। ভেরো কোষগুলো খুপরির দেয়ালে চ্যাপ্টা হয়ে সেঁটে থাকে, তাদের আকৃতি যেমন-খুশি।

স্বাভাবিক ভেরো কোষকে মাইক্রোস্কোপ-এ ফেললে এইরকম লাগে। (সূত্র: CCMB, হায়দরাবাদ)

কিন্তু দিব্যা যে কোষগুলো দেখছিলো, তাদের বেশিরভাগই দেয়াল থেকে ছেড়ে গেছে আর ছোট ছোট গুলি (globule) হয়ে ভেসে আছে। ওর কথায়, “এগুলো মৃত কোষ”। রোগীর স্যাম্পল তার মানে ভেরো কোষে সংক্রমণ ঘটিয়ে সেগুলোকে মেরে ফেলেছে।

মাইক্রোস্কোপ-এ সংক্রমিত ভেরো কোষের ছবি। (সূত্র: CCMB, হায়দরাবাদ)

এইবার RT-PCR দিয়ে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

সার্স-কভ২ ভাইরাস-এর পরিবর্তন হতে পারে

RT-PCR দিয়ে ভাইরাসের জিনগত মালমশলা, অর্থাৎ তার আরএনএ, দেখা যায়। যে কোনো জীবের আরএনএ-র মতো ভাইরাসের আরএনএ-র মধ্যেও চার ধরণের অণু আছে – adenine (A), uracil (U), cytosine (C) আর guanine (G)। কিন্তু অন্যান্য ভাইরাসের সাথে তুলনা করলে সার্স-কভ২-এর আরএনএ ক্রমবিন্যাস ঢের বেশি লম্বা, প্রায় তিরিশ হাজার A, U, C আর G আছে এতে। এই ক্রমবিন্যাসটা পড়েই ধারক কোষের প্রোটিন তৈরির কারখানা থেকে ভাইরাসের প্রোটিন তৈরী হয়, একেবারে ধারক কোষের মধ্যেই। সেই প্রোটিন ভাইরাসের আরএনএ-র প্রতিলিপি বানায় এবং প্রোটিন আর লিপিড খোলসে (membrane) পুড়ে বানিয়ে ফেলে নতুন ভাইরাস কণা। এই আরএনএ ক্রমবিন্যাসের পরিবর্তন (mutation) হতে পারে যার ফলে তার থেকে তৈরী প্রোটিনও পাল্টে যেতে পারে। এইভাবে বিবর্তন করে করে ভাইরাস ধারকের সাথে যুদ্ধে নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এই বিবর্তনের ফলে ভাইরাস কতটা ক্ষতিকারক, তার পরিবর্তন হতে পারে। কখনো তার থেকে সৃষ্ট রোগের ভয়াবহতা কমে আসে। কখনো অন্যকিছু হতে পারে, আবার কিছু নাও হতে পারে।

একটা টিকা সার্স-কভ২-এর বিরুদ্ধে তখনই কার্যকরী হবে যখন সেটা এই ভাইরাস-এর সবরকম কিংবা নিদেনপক্ষে বেশিরভাগ সংস্করণের (strain) মোকাবিলা করতে পারবে। ওষুধ কার্যকরী কিনা সেটা পরখ করতে হলেও একই ব্যাপার। ভাইরাসের যত প্রকারান্তর হয়, তার মধ্যে যতগুলো সম্ভব তৈরী করতে হবে এবং তাদের ওপর ওষুধ প্রয়োগ করে দেখতে হবে। এর জন্য ভাইরাসের কয়েক লক্ষ প্রতিলিপি বানাতে হবে, অন্তত কয়েকশো রোগীর থেকে স্যাম্পল নিয়ে, যাতে ভাইরাসের যতগুলো সম্ভব প্রকারান্তর ধরা পড়ে। এই কাজটাই অন্তত দু-তিন মাসের ধাক্কা।

RT-PCR-এর প্রস্তুতি

ছটা-খুপরি-যুক্ত প্লেট নিয়ে যাওয়া হলো একটা ঘেরা জায়গার ভিতর (biosafety hood)। তাতে HEPA ফিল্টার বসানো যেটা বাতাস বেরোনোর আগে সব ভাইরাস ছেঁকে নেয়।

RT-PCR-এর প্রস্তুতি। (সূত্র: CCMB, হায়দরাবাদ)

এখানে ঘড়ির কাঁটা খুব ধীরে চলে। যে কোনো কাজের আগে উপরিতল আর যন্ত্রপাতিগুলো ব্লিচ, অ্যালকোহল আর আলট্রাভায়োলেট রশ্মি দিয়ে সাফ করা হয়। তারপর খুপরিগুলো থেকে কয়েকশো মাইক্রোলিটার DMEM দ্রবণ টিউবে সংগ্রহ করা হয়, তার মধ্যে কিছু সংক্রমিত, কিছু নয়। ভাইরাসের দুটো সুরক্ষার স্তর আছে, বাইরের লিপিড দ্বিস্তর (fatty membrane), আর ভিতরের প্রোটিন ক্যাপসিড যার সাথে আরএনএ যুক্ত রয়েছে।

করোনাভাইরাস-এর গঠন। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: https://www.scientificanimations.com / CC BY-SA)

RT-PCR এই আরএনএ-র খোঁজ করে। অতএব বাইরের স্তরগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতে হয়। অ্যালকোহল আর ডিটারজেন্ট-এ বাইরের লিপিড স্তর গুলে যায়, ছিদ্র হয় প্রোটিন স্তরে। এরপর কোষের ভিতরের মালমশলা সযত্নে চালান করা হয় একটা ম্যাট্রিক্স-এর ওপর, যাতে আরএনএ আটকা পড়ে যায়। এরপর স্যাম্পলটা ধুয়ে ফেলা হয় যাতে কোনোরকম লবণ, অ্যালকোহল বা ডিটারজেন্ট পড়ে না থাকে, থাকলে RT-PCR-এ ঝামেলা হবে। ধুয়েটুয়ে দিব্যা ওই ম্যাট্রিক্স-এ জল দিলো যাতে আরএনএ দ্রবীভূত হয়ে যায়। এই দ্রবণেই চলবে RT-PCR-এর বিক্রিয়াগুলো। এমনিতে যে কোনো গবেষণাগারেই এটা একটা সাধারণ কাজ, কিন্তু এখানে অত্যধিক সাবধানে কাজটা করতে হয় যাতে বাতাসে এরোসল তৈরী না হয় বা এদিকওদিক ছিটকে না যায়।

বাকি কাজটা

ভাইরাস যেহেতু আর সক্রিয় নেই, স্যাম্পলটাকে বিএসএল-৩ গবেষণাগারের কড়া সুরক্ষার মধ্যে রাখার প্রয়োজন নেই। বিএসএল-২ ল্যাব-এ বাকি কাজটা করা যায়। সেখানে সুরক্ষার কড়াকড়ি অপেক্ষাকৃত কম। জলে দ্রবীভূত আরএনএ স্যাম্পলটাকে দিব্যা বিএসএল-৩ আর বিএসএল-২ ল্যাব-এর মাঝামাঝি একটা বদ্ধ জায়গায় রেখে দিলো। ওরা জায়গাটাকে পাসবক্স (passbox) বলে। এখানে স্যাম্পলটাকে আরেকবার আল্ট্রাভায়োলেট (UV) রশ্মির তলায় ফেলা হয়। শেষে ঘেরা জায়গার ভিতর কাজের জায়গাটা আর যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে তারপর UV মেরে আমরা বেরিয়ে এলাম বিএসএল-৩ গবেষণাগার থেকে। জবরজং PPE থেকে বেরোতে পেরে একরাশ স্বস্তি পেলাম। গাউন, মাথার মোড়ক, গগলস সব রিসাইক্লিং-এর জন্য গেল। সেখানে post-autoclaving করা হবে যাতে কোনো জীব অবশিষ্ট থাকলে কড়া তাপ আর চাপের দ্বৈত প্রয়োগে বিনষ্ট হয়ে যায়। ল্যাব কোট গেল UV ট্রিটমেন্ট-এর জন্য আর N95 মাস্ক, গ্লাভস, জুতো, পায়ের মোড়ক সব গেল খরচের খাতায়। অবশ্যই, যাই ফেলা হোক না কেন, আগে autoclave করা হবে।

বাড়ির দিকে রওনা দিলাম আমি, দিব্যাও হাওয়া খেতে বেরোলো। সন্ধ্যের দিকে দিব্যা RT-PCR চালিয়ে দেখলো তার স্যাম্পল-এ সার্স-কভ২-র আরএনএ-র A, U, G আর C ক্রমবিন্যাস দেখতে পাওয়া যায় কিনা। রাতে ফোনে দিব্যা-র মেসেজ পেলাম – “স্যাম্পলগুলো পজিটিভ।” একটা স্যাম্পল তৈরী হলো, এরকম আরো অনেক তৈরী হলে পরে টিকা কিংবা ওষুধের কার্যকারিতা সাব্যস্ত করা যাবে।

(লেখাটি প্রথম IndiaBioscience-এ প্রকাশিত হয়েছিল। মূল লেখাটি ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন বিজ্ঞান টিমের অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায়।)

Facebook Comments
(Visited 1 times, 1 visits today)

Tags: , ,