রতনলাল ব্রহ্মচারী: আচরণ পাঠের ব্যতিক্রমী গবেষক


বিভাগ: জীবন বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও সমাজ (September 14, 2018)

 

বাসমতী চাল, মহুয়া ফুল আর বাঘের মধ্যে যোগসূত্র বের করেন আচরণ পাঠের বিখ্যাত গবেষক রতনলাল ব্রহ্মচারী! তাঁর জীবনী লিখছেন মানস প্রতিম দাস।


ছোটখাটো অকৃতদার মানুষটি থাকতেন একা, কাজ করতেন প্রগাঢ় নিষ্ঠার সঙ্গে, গবেষণার কাজে পাড়ি দিতেন দূর-দূরান্তে, কথা বলতেন কম, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের কথা লিখতেন খুব সরসভাবে আর এভাবেই হয়ে উঠেছিলেন তাঁর সময়ের এক অনন্য বিজ্ঞানী। তিনি রতনলাল। পুরো নাম রতনলাল ব্রহ্মচারী। তাঁর লেখাপড়া, ছাত্রজীবন এসব দিয়ে শুরু করা যেত লেখাটা কারণটা তেমনটা পড়তেই অভ্যস্ত আমরা। কিন্তু ব্যতিক্রমী একজন মানুষের কথা বলতে গিয়ে নিয়ম ভাঙাই যায়। সরাসরি চলে যাব সেই গবেষণায় যা তাঁকে বেশি পরিচিত করেছে বিজ্ঞানপিপাসুদের কাছে। প্রাণীদের শরীর থেকে নিঃসৃত গন্ধবাহী রাসায়নিক ফেরোমোন সম্পর্কে তাঁর কাজকে সংক্ষেপে অসামান্য বলা যায়। কেউ হয়ত এটাকে যুগান্তকারী বলতে চাইবেন। কীভাবে বাঘ থেকে বেড়াল এই রাসায়নিক ছিটিয়ে নিজের এলাকা চিহ্ণিত করে, কত দিন পর সেই রাসায়নিক উবে যায়, কেমন সেই রাসায়নিকের গঠন – এ সবই রতনলাল খোঁজ করে বের করেছেন তাঁর সহযোগীদের নিয়ে। 

গন্ধ গবেষক

নিজের উদ্যোগেই তিনি প্রকাশ করেছিলেন একখানা ছোট্ট পুস্তিকা। প্রকাশের তারিখ নেই, কোনো প্রকাশকের নামও নেই। লেখক হিসাবে তাঁর নাম অবশ্য ছাপা রয়েছে মলাটে। পুস্তিকার নাম ‘বাঘ থেকে মুগডাল (একটি গবেষণার কাহিনী)’। কয়েক পাতার এই পুস্তিকা শুরু হচ্ছে এইরকম কয়েকটা কথা দিয়ে – ‘বাঘ থেকে বাসমতি চাল, আর তারপর সোনামুগ ডাল – এই হল এ গবেষণার গতিপথ। এটা কোন রূপকথার গল্প নয়, নয় কোন কল্পবিজ্ঞান। এ বাস্তব কাহিনীতে দেখা যাবে বাঘ-ও এসেছে শামুকের হাত ধরে।’ রূপকথার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এই গতিপথেই রতনলাল থেকেছেন দশকের পর দশক। নিরীক্ষণ করেছেন বাঘ থেকে শামুকের যোগাযোগের কৌশল। সাধারণ মানুষের পড়ার জন্য যেমন তিনি লিখেছেন এই পুস্তিকা তেমনই বিজ্ঞানের গবেষকদের জন্য সঙ্কলিত গ্রন্থ ‘নিউরোবায়োলজি অফ কেমিক্যাল কমিউনিকেশন’এ মৌসুমী পোদ্দার-সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছেন সুচিন্তিত প্রবন্ধ। সেই বইয়ের প্রকাশ উপলক্ষে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ‘নেচার ইন্ডিয়া’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান এই গতিপথের অন্যান্য অগ্রণী পথিকদের সম্পর্কে। কিন্তু বিজ্ঞানীর বক্তব্যকে মূলতঃ খুঁজতে হয় সংশ্লিষ্ট জার্নালে। এ ব্যাপারে কোনো খামতি রাখেন নি রতনলাল। গোটা বিশ্বের নানা জার্নালে ছাপা হয়েছে তাঁর গবেষণাপত্র। দেশের জার্নালেও কম লেখেন নি। কারেন্ট সায়েন্সে ছাপা হওয়া তাঁর লেখা পড়ার সুযোগ রয়েছে বিনা পয়সাতেই। এই জার্নালে তাঁর শেষ লেখাটি প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। এটাকে বলা যেতে পারে ফেরোমোন নিয়ে তাঁর গবেষণার একটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। শিরোনাম ছিল ‘ফিফটি ইয়ারস অফ টাইগার ফেরোমোন রিসার্চ’।

উনবিংশ শতকের শেষের দিকে ফরাসী প্রকৃতিবিজ্ঞানী জাঁ অঁরি ফাবার ফেরোমোন গবেষণার সূত্রপাত করেন। তাঁর কাজ ছিল মথ নিয়ে। তিনি সঠিকভাবেই নির্দেশ করেন যে স্ত্রী মথের দেহ থেকে নিঃসৃত এক ধরণের রাসায়নিক পুরুষ মথকে আকর্ষণ করে। কিন্তু এর পর কিছুটা পথভ্রষ্ট হন তিনি। স্ত্রী মথের দেহ থেকে এক অজানা বিকিরণ এই আকর্ষণে অংশ নেয় বলে আন্দাজ করেন তিনি। সেটা ভুল ছিল। যাই হোক, বিজ্ঞানের গবেষণা তো আর থেমে থাকতে পারে না। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে ফেরোমণের গবেষণায় আসা যাক। ১৯৬৪ সালে জর্জ শালার ভাবতে লাগলেন যে বাঘেরা গন্ধ-রাসায়নিক ছড়িয়ে কোনো বার্তা রেখে যায় কিনা। এই মার্কিন বিজ্ঞানীর সঙ্গে ওই বছরেই রতনলাল চললেন মধ্যপ্রদেশে। কান্‌হার জঙ্গলে তাঁরা দু’জনে রইলেন প্রায় দশ দিন। সময়টা জৈষ্ঠ মাস। গরমটা তখনও দুঃসহ হয়ে ওঠে নি। তাঁরা লক্ষ্য করলেন যে বেশ কিছু চিতল হরিণ একটা ছোট পলাশ গাছের সামনে দাঁড়িয়ে পাতা শুঁকছে আর তারপর চলে যাচ্ছে। কৌতূহল হল দুই বিজ্ঞানীর। তাঁরা গিয়ে দেখলেন যে পলাশ পাতায় বাঘের গন্ধ। তবে ওই গন্ধ কটু না, প্রকৃত অর্থে সুবাস। আমরা তবে এই সুবাস চিড়িয়াখানায় পাই না কেন? তার কারণ মল, মূত্র, পচে যাওয়া খাবারের গন্ধে চাপা পড়ে যায় এটা। চারপাশে তাকিয়ে সবই দেখছেন দু’জন বিজ্ঞানী। তাঁরা দেখলেন যে চলার পথে বাঘ ও বাঘিনী বেশ কয়েকবার লেজ তুলে গাছে বা পাথরে কিছু একটা ছিটিয়ে দিচ্ছে। সেই তরলের গন্ধ বেশ তীব্র। এমন কথা বিষয়ের কথা কোনো বিজ্ঞানী বা শিকারি লিখে যান নি। জিম করবেটও উল্লেখ করেন নি এমন কোনো বিষয়।

চলার পথে বাঘ ও বাঘিনী বেশ কয়েকবার লেজ তুলে গাছে বা পাথরে কিছু একটা ছিটিয়ে দিচ্ছে। সেই তরলের গন্ধ বেশ তীব্র। এমন কথা বিষয়ের কথা কোনো বিজ্ঞানী বা শিকারি লিখে যান নি। জিম করবেটও উল্লেখ করেন নি এমন কোনো বিষয়।

তিনি তো এমনও মনে করতেন যে বাঘের ঘ্রাণশক্তি একেবারেই নেই। জর্জ শালার প্রথম এই তরল ছেটানো এবং সেটা থেকে ঘ্রাণ নেওয়ার ব্যাপারটা তুলে ধরেন।

এখন আমাদের প্রশ্ন হতে পারে যে কী এই তরল? কোথা থকে এটাকে ছেটায় বাঘ? এ ব্যাপারে বাঘ কি একা? অন্য কোনো প্রাণী কি এমন কাজ করে না? সিদ্ধান্তে পৌঁছতে প্রচুর তথ্য দরকার পড়ে বিজ্ঞানীদের। রতনলাল খুঁজছিলেন এমন একটা বাঘ যার আচরণ লক্ষ্য করা যাবে নিবিড়ভাবে। পোষা অথচ খাঁচায় বন্দী নয়, এমন একখানা শার্দূল এ কাজে খুব উপযুক্ত। সে সময়ে খবর পাওয়া গেল যে ওড়িশার যশীপুরে খৈরি নামে এক যুবতী বাঘিনী রয়েছে যাকে কাছ থেকে লক্ষ্য করা সম্ভব। দেখতে গিয়ে কান্‌হা অরণ্যে যা দেখেছিলেন তারই সমর্থন পেলেন তিনি। দেখলেন একাধিকবার তরল ছেটানোর অভ্যাস রয়েছে খৈরির। এক দিন তো বাহান্ন বার অমনভাবে তরল ছেটাল সেই বাঘিনী। পলাশ পাতায় সেই তরলের ঘ্রাণ নিলেন রতনলাল।

এক দিন তো বাহান্ন বার অমনভাবে তরল ছেটাল সেই বাঘিনী। পলাশ পাতায় সেই তরলের ঘ্রাণ নিলেন রতনলাল।

সেই একই সুবাস। এমন আচরণের খোঁজে আরও বহু জায়গায় যেতে হয়েছে তাঁকে। একবার, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে একটা বাঘের বাচ্চা চেয়েছিলেন তিনি। সেটা ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর মাস। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটের সুবর্ণ জয়ন্তী সমারোহে এসেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজেও বন্যপ্রাণ বাঁচানোর ব্যাপারে আগ্রহী। সেই প্রসঙ্গেই কথা হচ্ছিল রতনলাল ব্রহ্মচারীর সঙ্গে। তখনই গবেষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাঘের বাচ্চা চান রতনলাল। শুনে হেসেই ফেলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু চট করে বাঘের মত বন্যপ্রাণকে তুলে আনা কঠিন, বিশেষ করে যেখানে তাদের সংরক্ষণের জন্য ১৯৭৩ সালে প্রজেক্ট টাইগার শুরু করা হয়েছে। কিন্তু অর্থসাহায্য তো এমন আইনের জাঁতাকলে আটকে নেই। সে সাহায্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন রতনলাল। তিনি নিজে যেমন স্বীকার করেছেন এই কথা তেমনই প্রাক্তন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী জয়রাম রমেশ নিজের বইতে উল্লেখ করেছেন এই তথ্য। বইয়ের নাম ‘ইন্দিরা গান্ধীঃ আ লাইফ ইন নেচার’। তবে বাঘ পাওয়ার কোনো অসুবিধে হয় নি সেভাবে। এব্যাপারে প্রভূত সাহায্য পাওয়া গিয়েছিল ওড়িশার নন্দনকানন থেকে।

গবেষণায় বোঝা গেল যে কোনোভাবেই পায়ুগ্রন্থি থেকে তরল ছেটাচ্ছে না বাঘেরা। মূত্রনালীর মধ্যে দিয়েই ছেটানো হয় সেই তরল। এ ব্যাপারে জাপানের বিজ্ঞানী হাসিমোটো ও তাঁর সহযোগীদের সাহায্যও স্বীকার করেছেন রতনলাল। ধীরে ধীরে বোঝা গেল যে এই রাসায়নিকের প্রধান গন্ধবাহী অণু হল 2AP. বিস্তারে বললে 2-acetyl-1-pyrroline. এর সাহায্যে নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করে বাঘ বা বাঘিনী। এটাও দেখা গিয়েছে যে মূত্রত্যাগের সংখ্যার তুলনায় এই রাসায়নিক ছেটানোর সংখ্যা অনেক বেশি। ওড়িশার নন্দনকাননে রতনলাল হিসাব করে দেখেছিলেন, দশটা বাঘ ও বাঘিনী যে সময়ের মধ্যে ৯৬৬২ বার পিচকারির মত করে ওই রাসায়নিক ছিটিয়েছে, সেইটুকু সময়ের মধ্যে তাদের মূত্রত্যাগের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮৯। বাঘের ছেটানো পদার্থ থেকে মূল রাসায়নিক অণু আলাদা করার কাজে দু’জনের সহযোগিতা পেয়েছিলেন রতনলাল। একজন হলেন বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় দত্ত। এছাড়াও ছাত্রী ও গবেষক মৌসুমী পোদ্দার সরকার এই কাজে অংশ নেন। নানা পদ্ধতিতে অণুকে আলাদা করার কাজ চলে। সবথেকে উন্নত যে যন্ত্রটা তখন ব্যবহার করেছিলেন বিজ্ঞানীরা তাকে সংক্ষেপে GCMS বলা হয়। দুটো প্রক্রিয়া পরপর চলে এই যন্ত্রে। প্রথমে গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফির (GC) সাহায্যে বিভিন্ন অণুকে আলাদা করে মাস স্পেক্‌টোগ্রাফির (MS) মাধ্যমে আণবিক ওজন নির্ধারণ করা হয়। খুব বেশি জায়গায় যন্ত্রটিকে পান নি বিজ্ঞানীদল। কলকাতা, ব্যাঙ্গালোর আর কেমব্রিজে এটা ব্যবহার করার সুযোগ হয়েছিল তাঁদের। আর একটা যন্ত্র HPLCMS তারা ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কলকাতায় অন্ততঃ পান নি। এই যন্ত্রেও দুটো পদ্ধতির মিশ্রণ রয়েছে। হাই পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি আর মাস স্পেক্‌টোগ্রাফি।

এবার একটা বড় প্রশ্ন হল, সব বাঘই যদি একই অণু ছেটায় তবে একটা বাঘ থেকে আর একটা বাঘকে আলাদা করা যায় কীভাবে? আসলে ওই 2AP ছাড়াও ছেটানো তরলে মিশে থাকে অনেকগুলো ফ্যাটি অ্যাসিড। সেটা এমনি এমনি নয়। গন্ধের অণু যাতে তাড়াতাড়ি উবে না যায়, সেটাকে বেঁধে রাখতে সক্রিয় ফ্যাটি অ্যাসিডের সমাহার। নানা বাঘের ছেটানো তরলে এই ফ্যাটি অ্যাসিডের উপস্থিতি নানারকম বা বলা যায় যে তাদের অনুপাত একইরকম নয়। এটাই পরিচিতি দেয় বাঘকে। রতনলাল খুব স্পষ্ট করে লিখেছেন তাঁর পুস্তিকায় – ‘প্রাণীজগতে এ অণুটি আমরাই প্রথম পেলাম – আমাদের জাতীয় পশু বাঘে। ১৯৯৭ তে সুমন মিদ্যা আর আমি একই অণু (2AP) পাই মহুয়া ফুলে। ফুলের জগতে এটাই রেকর্ড। …’ বাসমতি চালের গন্ধও যে এই অণুর জন্য তাও আজ প্রমাণিত। অন্যদিকে পায়েস পাতা বা অন্নপূর্ণা পাতায় (Pandanus foetoedus) ওই একই অণুর উপস্থিতি ধরা পড়েছিল আগেই, ১৯৮২ সালে। ফিলিপিন্সের ম্যানিলায় আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রে কয়েকজন মার্কিন বিজ্ঞানী এই কাজটা করেন বলে জানা যায়। এদিকে সোনা মুগ ডালে এই অণুর উপস্থিতিও রতনলাল ও তাঁর সহযোগীরা নির্দেশ করেন ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে। সুতরাং 2AP অণুটিকে পাওয়া গেল প্রাণী থেকে শুরু করে উদ্ভিদে। যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য দূত হিসাবে। এই পদার্থকে ফেরোমোন হিসাবে অভিহিত করা হয়। এভাবেই কেমিক্যাল কমিউনিকেশনের মানচিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেন রতনলাল ব্রহ্মচারী।

শ্রদ্ধাশীল বিজ্ঞানী

বিজ্ঞানের কোনো গবেষণা রাতারাতি দারুণ ফল দেবে, এটা কেবল বিজ্ঞানের নিয়মকানুনে অনভ্যস্ত একজন মানুষই আশা করতে পারেন।

বিজ্ঞানের কোনো গবেষণা রাতারাতি দারুণ ফল দেবে, এটা কেবল বিজ্ঞানের নিয়মকানুনে অনভ্যস্ত একজন মানুষই আশা করতে পারেন। বছরের পর বছর ধরে, নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত ফল আসে হাতে। প্রত্যেক বিজ্ঞানীর আজকের কাজের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন অতীতের খ্যাত এবং অখ্যাত শতশত বিজ্ঞানী। ভালো গবেষক হতে গেলে এমন পূর্বসুরীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়। সে গুণ পূর্ণমাত্রায় ছিল রতনলালের মধ্যে। বাংলা বলি কিংবা পশ্চিমবঙ্গ, আচরণ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। তাঁর গুণমুগ্ধ রতনলাল সুন্দরভাবে জানিয়েছেন গোপালচন্দ্রের কীর্তির কথা। লিখেছেন, ‘আজকের দিনে সারা বিশ্বেই ইথোলজি বা অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ার একটি সুপরিচিত বিজ্ঞানের শাখা এবং তিন জন বিজ্ঞানী নোবেল প্রাইজ পেয়ে এ বিষয়টিকে ‘জাতে তুলেছেন’। কিন্তু শ্রী ভট্টাচার্্যের গবেষণাকালে এর কদর সামান্যই ছিল, বিশেষ করে পোকামাকড়ের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ সাধারণ লোকের কাছে ছিল পাগলামির আর এক নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইওরোপে পতঙ্গজগতের দিক্‌পাল ছিলেন ফ্যাবার। তিনিই প্রথম বিপুল উদ্যমে শত বাধাবিঘ্নের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের নানা কীট-পতঙ্গের স্বভাব পর্যবেক্ষণ করে কাব্যিক ভাষায় তা পরিবেশন করেন। … বাংলাভাষায় গোপালবাবুর প্রবন্ধগুলি ফ্যাবারের রচনাবলীর সঙ্গে তুলনীয় – সহজ এবং কাব্যিক ধাঁচে মৌলিক পর্যবেক্ষণের ফল মাতৃভাষায় পরিবেশিত। …’ ১৯৭৪-৭৫ সালের রবীন্দ্র পুরস্কার জয়ী, গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য-র ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ গ্রন্থে রতনলাল ব্রহ্মচারীর এই লেখাটি সঙ্কলিত হয়েছে ‘গোপালচন্দ্রের বৈজ্ঞানিক গবেষণা’ নামে। এখানে যোগ করা যেতে পারে, যে তিন জন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর উল্লেখ করেছেন রতনলাল তাঁরা হলেন কার্ল ফন ফ্রিশ, কনরাড লোরেঞ্জ এবং নিকোলাস টিনবার্জেন। প্রাণিজগতে যোগাযোগের রহস্য উন্মোচনের জন্য ১৯৭৩ সালে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন এই ত্রয়ী। গোপালচন্দ্রের অবদান সম্পর্কে নিজের লেখায় রতনলাল আরও বলছেন, ‘… কত অধ্যবসায় নিয়ে, পুরোনো দিনের ক্যামেরা নিয়ে এই বিজ্ঞানী তাঁর অনুসন্ধান চালিয়েছেন। ফটো তোলবার চেষ্টা করেছেন মাছ শিকারী মাকড়সার, চামচিকে শিকারী মাকড়সার। আজকের দিনের দামী বিলিতি-মার্কিনি বই আর জার্নালের ছবির তুলনায় এগুলি খেলো মনে হতে পারে বটে কিন্তু তখনকার অবস্থা কল্পনা করলে এই ছবি দেখলেই বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। …’

শুধুমাত্র এই বাঙালি বিজ্ঞানীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শেষ কথা নয়, তাঁর গবেষণা ক্ষেত্রের প্রত্যেক উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানীকে রতনলাল স্মরণ করতেন উৎসাহের সঙ্গে। ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের বিজ্ঞানী রাঘবেন্দ্র গডককরের গবেষণাগারে বোলতার যোগাযোগের পথ নিয়ে উন্নত গবেষণার কথা জানিয়েছেন তিনি। হাতি নিয়ে রমন সুকুমারের কাজ এবং ডুমুর গাছ ও পোকামাকড়দের নিয়ে রেনে বর্জেসের গবেষণাও যে বিজ্ঞানকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে তা বিশ্বাস করতেন রতনলাল। এই তালিকায় আরও রয়েছেন ভারতীদশন ইউনিভার্সিটির গোবিন্দরাজু অর্চুনন যিনি কাজ করেছিলেন গবাদি পশুর ফেরোমোন নিয়ে। ইঁদুরদের ফেরোমোন নিয়ে ভালো কাজ করেছিলেন বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির সি জে ডমিনিক এবং চেন্নাইয়ের কে এম আলেকজান্ডার। জর্জ শালারের কথা তো বারবারই উচ্চারণ করেছেন তিনি। পাশপাশি বাঘের ফেরোমোন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এনেছেন কর্নেল লকের কথা যিনি মালয়ে কর্তব্যরত ছিলেন। ইনি ‘টাইগারস অফ ত্রেনগান্নু’তে বাঘেরদের যোগাযোগের প্রসঙ্গটা আনেন। ১৯৬৭ সালে ‘দ্য ডিয়ার অ্যান্ড দ্য টাইগার’ বইতে বিষয়টাকে আরও বিস্তারিত করেন শালার। বিজ্ঞানীরা এই প্রথম একটা ধারাবাহিক নিরীক্ষণের কথা জানল। গ্রেট ব্রিটেনের এরিক অ্যালবোন সবার প্রথম বাঘের ছেটানো রাসায়নিক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন বলে জানিয়েছেন রতনলাল। আর ইথোলজিতে ভারতের সবথেকে অগ্রণী প্রতিষ্ঠান যে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স তা নিয়ে কোনো দ্বিধা ছিল না তাঁর মনে।

জীবনকথা

অমেরুদন্ডী প্রাণী সায়োনা ইন্টেস্টিনালিস (ciona intestinalis)
ছবি: Eric Burgers

১৯৩২ সালে ঢাকায় জন্ম হয় রতনলাল ব্রহ্মচারীর। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ায় তিনি বেছে নিয়েছিলেন জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানকে। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাছে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়েছিল। পরে অবশ্য লেখাপড়ার শাখা বদলান। ঢাকা ছাড়া কলকাতা আর হামবুর্গেও পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৫৭ সালে যোগ দেন কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে। তাঁর গবেষণার যে বিষয় তার পোশাকি নাম এমব্রায়োলজি। ভ্রূণতত্ত্ব। এই নামে ইনস্টিটিউটের যে বিভাগ সেখানেই কাজ করতেন তিনি। তবে মূল লক্ষ্যটা ঠিক রাখলেও কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বা চেনা বৃত্তে আবদ্ধ থাকার মানুষ ছিলেন না রতনলাল। তাঁর খ্যাতিমান সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ জানা যায় যে পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব এবং পরিসংখ্যানের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছিল তাঁর গবেষণার আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। মোট চোদ্দ বার আফ্রিকা সফর করেন তিনি। বেশিরভাগ সময়ে নিজের খরচাতেই। সিংহের আক্রমণের মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। ভ্রূণতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার কাজেও রতনলাল ঘুরেছেন বহু জায়গায়, এসেছেন কিছু নামী বিজ্ঞানীর সংস্পর্শে। অমেরুদন্ডী সামুদ্রিক প্রাণীদের নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি গিয়েছেন ইতালিতে। কাজ করেছেন নেপলস আর পালেরমোর সামুদ্রিক গবেষণাগারে। খ্যাতিমান ভ্রূণতত্ত্ববিদ গিসেপ্পে রিভেরবেরির সঙ্গে তাঁর যৌথ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। অমেরুদন্ডী সামুদ্রিক প্রাণী সায়োনা ইন্টেস্টিনালিসের ভ্রূণের উপর ক্রোমোমাইসিন বা অ্যাক্টিনোমাইসিনের মত অ্যান্টিবায়োটিক কী ধরণের কাজ করে তার পরীক্ষা করেন দুই বিজ্ঞানী। বিভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রভাবও পরীক্ষা করে দেখা হয়। দেখা যায় যে ভ্রূণের মধ্যে প্রথম বিভাজন (cleavage) তৈরি হওয়ার আগে মানে মাইটোসিস পদ্ধতিতে এককোষী ভ্রূণটি বিভাজিত হয়ে দুটো হওয়ার আগে এইসব পদার্থ প্রয়োগ করলে কোনো বিকৃতি আসে না। লার্ভা তৈরি হওয়া অবধি পরবর্তী দশাগুলোতে এমন প্রয়োগ ঘটলে নানা ধরণের বিকৃতি দেখা যায়। এই গবেষণা দেখাতে সাহায্য করে যে ভ্রূণের মধ্যে থাকা রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিডের মাধ্যমে প্রতিলিপি তৈরি (transcription of embryonic RNA) শুরু হতে কিছুটা সময় লাগে। ব্লাসচুলা-গ্যাস্ট্রুলা দশায় এটা শুরু হয়।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১৯৯২ সালে অবসর নেওয়ার সময় তিনি ছিলেন ভ্রূণতত্ত্ব বিভাগের প্রধান। এর পরেও তাঁর যোগ ছিল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ইনস্টিটিউট তাঁকে সম্মানিত করে ডি-এস-সি (অনারিস কজা) দিয়ে। অবসর নেওয়ার পরে কাজ করেছেন রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের কেমিক্যাল টেকনোলজি বিভাগে। ইংরেজিতে যাকে বলে কনজার্ভেশনিস্ট, প্রকৃতি ও পশুপাখি সংরক্ষণের পক্ষে থাকা ব্যক্তি – তাই ছিলেন রতনলাল। তবে তিনি শুধু সংরক্ষণের প্রয়াসকে সমর্থন করেই ক্ষান্ত থাকেন নি, নিজে উদ্যোগী হয়ে অবদানও রেখেছেন। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জু চেক’ নামে একটা সংগঠন। পশুপাখিদের চিড়িয়াখানায় না রেখে মুক্ত অরণ্যে রাখার পক্ষে সওয়াল করত এই সংগঠন। পরে এর নাম হয় ‘বর্ন ফ্রি ফাউন্ডেশন’। শুরু থেকেই এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রতনলাল। এ প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে বর্ন ফ্রি বইয়ের বিখ্যাত লেখক এবং ব্রিটিশ সংরক্ষণবাদী জর্জ অ্যাডামসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করতেই হয়।

সঠিক বিজ্ঞানচর্চার জন্য আবেদন

শুধু যে নিজের গবেষণার কথা লিখতেন রতনলাল তাই নয়, বিজ্ঞান চর্চার সঠিক পথ যাতে অবলম্বন করা হয় তার আবেদন জানাতেও কলম ধরতেন তিনি। ১৯৯৫ সালের ২৫শে জুন কারেন্ট সায়েন্স জার্নালে প্রকাশ পেল তাঁর একটা চিঠি। ইংরেজি শিরোনামের অনুবাদ করলে দাঁড়ায় – অবহেলিত বিজ্ঞান। কী লিখেছেন সেখানে? অনুবাদ করা যাক।

‘গডককর (অবজার্ভেশনাল স্টাডি অফ অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ার, কারেন্ট সায়েন্স, ১৯৯৫, ৬৮, ১৮৫) ঠিকই বলেছেন যে ভারতে ইথোলজি বিজ্ঞানের এক অবহেলিত শাখা এবং মলিকিউলার বায়োলজির তুলনায় এর অনেক বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। তিনি আরও বলেছেন, ভ্রান্তিবশত (আমি দুঃখিত), যে জীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্যও উচ্চস্তরের গণিত বাধ্যতামূলক করা উচিত, আপাতভাবে ম্যাথামেটিক্যাল ইকোলজির জটিলতার সঙ্গে তারা যেন খাপ খাওয়াতে পারে সেই লক্ষ্যে। কিন্তু এমন একটা পাঠ্যক্রম ধ্বংস করে দেবে ভারতে পক্ষীতত্ত্বের অগ্রণী গবেষক সেলিম আলির মত মানুষকে যিনি নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন কীভাবে অঙ্কের চাপে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। প্রকৃত তথ্য জোগাড় করতে আমাদের দরকার নিবেদিত ক্ষেত্র নিরীক্ষক যাদের কাজকে আরও বিশ্লেষণ করবে ম্যাথামেটিক্যাল ইকোলজিস্টরা।

সুতরাং সঠিক কাজ হবে বিদ্যালয় স্তর থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে ইথোলজি এবং ইকোলজির গুরুত্ব প্রচার করা (কেমিক্যাল ইকোলজি সহ, যা ভারতে অবহেলিত বিজ্ঞানের আর একটিশাখা) এবং জীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা অঙ্ক বা জীবরসায়নের (বা উভয় বিষয়ে) ঐচ্ছিক পাঠ্যক্রমে যোগ দিতে। এই সব পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের আটকাতে পারবে সমাজের বাঁধা গৎ অনুসরণ করা থেকে, যার বক্তব্য হল সেরা দলটি যাবে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে, মধ্যম মানের যারা তারা যাবে রসায়নে আর পিছিয়ে পড়ারা প্রাণিবিজ্ঞান আর উদ্ভিদবিজ্ঞান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে। একেবারে সাম্প্রতিককালে মলিকিউলার বায়োলজি গ্ল্যামারাস বিষয় হিসাবে গৃহীত হয়েছে এবং বন্যপ্রাণের জীববিজ্ঞান পড়াও একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হায়, ফ্যাশনই জগৎ চালাচ্ছে।‘

২০১৮ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন এই পথপ্রদর্শক। অনেকে হয়ত বলবেন পরিণত বয়সে তবু যেন আকস্মিকভাবেই বিদায় নিলেন বহু মানুষের প্রিয় এই বিজ্ঞানী।

তথ্যসূত্র

  1. শ্রীরতন লাল ব্রহ্মচারী, বাঘ থেকে মুগডাল (একটি গবেষণার কাহিনী), প্রকাশকের নাম ও প্রকাশের তারিখ উল্লিখিত নয়।
  2. গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, বাংলার কীটপতঙ্গ, দে’জ পাবলিশিং, জানুয়ারী ১৯৮৬
  3. The smelly world of tiger pheromones, Nature India, doi: 10.1038/nindia. 2014.168 Published online 11 December 2014
  4. Fiorenza De Bernardi, Professor Giuseppe Reverberi and the ascidian school in Palermo, ISJ – Invertebrate Survival Journal, ISJ 6: S3-S8, 2009 ISSN 1824-307X
  5. R L Brahmachary, Mahua Ghosh (Basu), Vaginal pheromone and other unusual compounds in mung bean aroma, Correspondendence, Current Science, 25 June 2000
  6. R L Brahmachary, Neglected Science, Correspondence, Current Science, 25 June 1995
  7. R. L. Brahmachary and Mousumi Poddar-Sarkar, Fifty years of tiger pheromone research, CURRENT SCIENCE, VOL. 108, NO. 12, 25 JUNE 2015
Facebook Comments
(Visited 1 times, 1 visits today)