পাঠকের দরবার ৬ – থাইরয়েড কিভাবে শরীরের বিপাক ব্যবস্থায় ও মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে ?


বিভাগ: জীবন বিজ্ঞান (April 24, 2017)

 

 


 থাইরয়েড থেকে নিঃসৃত হরমোন-এর হেরফের হলে মস্তিষ্ক অব্দি প্রভাবিত হতে পারে। আরাধিতা চট্টোপাধ্যায়ের করা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন ডাক্তার লার্স গ্রান্ট


থাইরয়েড কিভাবে শরীরের বিপাক ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে এবং প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি ও অ্যান্টি-থাইরয়েড অ্যান্টিবডি কিভাবে বিপাক ব্যবস্থা ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলে? এই প্রসঙ্গে, থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যাগুলির চিকিৎসার জন্য সম্প্রতি কি কি আবিষ্কার হয়েছে? 

 

এই প্রশ্নটার এক কথায় উত্তর দেওয়া মুশকিল। আমি সংক্ষেপে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।  

 

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে একপ্রকার হরমোন নিঃসৃত হয় যা আমাদের দেহের বিভিন্ন অংশে প্রভাব ফেলে। এই হরমোনটি সাধারণত দেহকোষের শর্করা ও ফ্যাটের বিপাক হার এবং প্রোটিন তৈরীর হার বাড়িয়ে দেয়। এ ব্যাপারটা পরিষ্কার বোঝা যায় এটা লক্ষ্য করলে যে থাইরয়েডের অতিসক্রিয়তায় ভুক্তভোগী রোগীদের দেহের ওজন কমে যায়। অন্যদিকে থাইরয়েডের কম সক্রিয়তার কারণে দেহের ওজন বেড়েও যেতে পারে।

 

প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থিকে এইরকম নামে ডাকা হয় কারণ এই গ্রন্থিটি থাইরয়েড গ্রন্থির ঠিক ওপরেই থাকে।  কিন্তু কাজের দিক দিয়ে প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির সাথে থাইরয়েড গ্রন্থির খুব একটা মিল নেই। প্যারা থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে এক প্রকার হরমোন নিঃসৃত হয় যা রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।

 

মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে থাইরয়েড থেকে নিঃসৃত হরমোন মূলত দুভাবে প্রভাবিত করে। প্রথমত,  শৈশবে থাইরয়েড গ্রন্থির কম কার্যক্ষমতার জন্য যদি কেউ  হাইপোথাইরয়ডিজমে ভোগে, তাহলে তার মানসিক বিকলাঙ্গতা দেখা দিতে পারে। এর সম্ভাব্য কারণ হলো, থাইরয়েডের কম কার্যক্ষমতার ফলে মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেয়। এই রোগটিকে  ‘ক্রেনিটীসম’ বলে এবং এর কোনো চিকিৎসার কথা এখনো জানা নেই। এই রোগটি প্রধানত  সেইসমস্ত  জায়গায় হয় যেখানে আয়োডিনের অভাব রয়েছে। যেহেতু বর্তমানে বিভিন্ন খাবারে এবং লবনে আয়োডিন মেশানো থাকে, এই রোগটি আর দেখা যায় না বললেই চলে।  

 

দ্বিতীয়ত, প্রাপ্তবয়স্ক কেউ যদি প্রচন্ড হাইপোথাইরয়ডিজমে ভোগে, সেক্ষেত্রে তার মানসিক সক্রিয়তা কমে আসে। এর উপসর্গ হিসেবে প্রথম দিকে হতাশা ও উৎসাহহীনতা দেখা দেয় এবং পরবর্ত্তীকালে ধীরে ধীরে চিন্তাশক্তি হ্রাস পেতে থাকে। থাইরয়েডের ক্ষরণ খুবই কমে গেলে রোগী অনেক সময় কোমার মতো অবস্থায়  চলে যায় এবং নিঃসাড় হয়ে যায়। এই কোমার মতো অবস্থাকে মিক্সেডেমা কোমা বলা হয়ে থাকে। এর ফলে জীবনহানিও ঘটতে পারে। যদিও বাইরে থেকে থাইরয়েড দেহে প্রবেশ করিয়ে এর চিকিৎসা সম্ভব।

 

 থাইরয়েড থেকে নিঃসৃত হরমোন-এর অভাব হলে শৈশবে মানসিক বিকলাঙ্গতা আর বার্ধক্যে মানসিক সক্রিয়তার ক্রমশ হ্রাস, এই দুটোই হতে পারে

 

আমাদের দেহে যে কোষগুলি প্রতিরোধ ব্যবস্থায় নিযুক্ত, তারা  অ্যান্টিবডি নামে এক শ্রেণীর প্রোটিন তৈরী করে। এই অ্যান্টিবডি-রা আমাদের দেহে প্রবেশকারী ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসদের গায়ে আটকে যায়। এর ফলে শ্বেতরক্তকণিকাগুলি এই ক্ষতিকারক জীবাণুগুলিকে চিনে ফেলে তাদের ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায় দেহের মধ্যে এমন কিছু অ্যান্টিবডি তৈরী হচ্ছে যা সুস্থ দেহকোষগুলির গায়ে আটকে যেতে পারে। এর ফলে শ্বেতরক্তকণিকাগুলি  সুস্থ দেহকোষগুলিকেই ধ্বংস করতে শুরু করে। আমরা এই ধরণের রোগকে ‘অটো ইমিউন ডিজিস’ বলে থাকি, কারণ এক্ষেত্রে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমাদের দেহকেই আক্রমণ করছে। দুপ্রকারের অ্যান্টিবডি আছে যারা থাইরয়েড গ্রন্থির কোষগুলিকে আক্রমণ করে। এরা হল ‘অ্যান্টি টি পি ও অ্যান্টিবডি’ এবং ‘থাইরোট্রপিন রিসেপ্টর অ্যান্টিবডি’। প্রথমটি থাইরয়েড গ্রন্থিকে ক্ষতিগ্রস্থ করে যার ফলে ‘হাইপো থাইর‍্যেডিসম’ হয়। আর দ্বিতীয়টি থাইরয়েড উদ্দীপক গ্রন্থির সাথে যুক্ত হয়ে অতিরিক্ত থাইরয়েড নিঃসৃত করে। এর ফলে হাইপারথাইরয়ডিজম  হয় -একে  ‘গ্রেভ’স ডিসিস’ বলে ডাকা হয়।

 

হাইপোথাইরয়েডিসমের চিকিৎসা সফল হয়েছে এবং এই চিকিৎসা পদ্ধতি অনেকদিন ধরেই অপরিবর্তিত আছে। এই পদ্ধতিতে থাইরয়েড হরমোনের অভাব মেটানোর জন্য ওষুধ হিসেবে থাইরয়েড হরমোনের বড়ি  দেওয়া হয়। এই ওষুধটির নাম ‘লেভোথাইরক্সিন’ যা ১৯২৭ সালে প্রথম গবেষণাগারে তৈরী করা হয়।

 

কিন্তু হাইপারথাইরয়েডিসমের চিকিৎসা এতটা সহজ নয়। থাইরয়েডের ক্ষরণ হ্রাস করার জন্য কয়েকটি  ওষুধ আবিষ্কার হলেও বেশিরভাগ সময়ই এই ওষুধগুলি কার্যকর নয়। তাই সাধারণত তেজস্ক্রিয় আয়োডিনের সাহায্যে  থাইরয়েড গ্রন্থির ক্ষতি করে হাইপোথাইরয়েডিসম ঘটানো হয়, যা সহজেই সারানো যায় লেভোথাইরক্সিনের সাহায্যে। 

 

গত দশ বছরে একটি নতুন ধরণের ওষুধ তৈরী করা হয়েছে। একে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি বলা হয়। এই কৃত্রিম অ্যান্টিবডিগুলোকে এমন ভাবে তৈরি করা হয় যাতে এরা দেহের বিশেষ কিছু অংশে আটকাতে পারে।  এই  অ্যান্টিবডিগুলিকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করানো হয় এবং তারপর তারা দেহের সেই বিশেষ অংশে গিয়ে আটকে যায়। তখন আমাদের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলি ওই বিশেষ অংশের কোষগুলিকে ধ্বংস করে দেয়। অর্থাৎ, এই ভাবে আমরা দেহের রোগ-প্রতিরোধকারী ব্যবস্থাকে কোনো বিশেষ অংশের কোষ বা প্রোটিন ধ্বংস করার আদেশ দিতে পারি। বেশ কিছু ওষুধ বেরিয়েছে যেগুলো আমাদের দেহের রোগ-প্রতিরোধকারী কোষ বা প্রোটিনগুলি ধ্বংস করতে সক্ষম। এই ওষুধগুলি ব্যবহারের ফলে রোগ-প্রতিরোধকারী ব্যবস্থার কিছু কিছু অংশের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় যা  ‘অটো ইমিউন’ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করে। এই ওষুধগুলি এক বিশেষ ধরণের বাত (রিউম্যাটোইড আর্থরাইটিস) এবং আরও কিছু ‘অটো ইমিউন’ রোগ সারাতে খুবই সফল হয়েছে। বর্তমানে থাইরয়েড গ্রন্থির ‘অটো ইমিউন’ রোগের চিকিৎসার জন্য, বিশেষত গ্রেভের রোগ সারাতে, এই ধরণের ওষুধ তৈরীর চেষ্টা চলছে।

(ইংরাজী থেকে লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করেছে সুমন্ত্র সরকার।)

(প্রচ্ছদের ছবির সূত্র)

লেখক পরিচিতি – ডাক্তার লার্স গ্রান্ট বর্তমানে কানাডার মন্ট্রিওল শহরে জুয়িশ জেনেরাল হসপিটালে কর্মরত। তিনি ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অফ মেডিসিনের সদস্য। ডাক্তারী পড়ার আগে তিনি পদার্থবিদ্যায় PhD করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্ট্রিং থিওরির উপর তার গবেষণার কাজের একটা অংশ তিনি করেছেন মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফাণ্ডামেন্টাল রিসার্চে বসে।

 

 

প্রশ্ন পাঠান এই লিঙ্কে ক্লিক করে।

‘বিজ্ঞান’-এ প্রকাশিত লেখার বাছাই সংকলন ‘বিজ্ঞান পত্রিকা’ ডাউনলোড করুন।

 

Facebook Comments
(Visited 384 times, 1 visits today)

Tags: , , ,