পাঠকের দরবার ৪ – লাইগোর মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে ?


বিভাগ: পাঠকের দরবার (August 8, 2016)

 

‘বিজ্ঞান’-এর পাঠকদের কাছ থেকে পাওয়া প্রশ্ন থেকে বাছাই করা কিছু প্রশ্ন নিয়ে ‘পাঠকের দরবার’। সম্পাদনায় সুমন্ত্র সরকারলাইগোর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারের উপর ‘বিজ্ঞান’-এ প্রকাশিত লেখা পড়ে পাঠক দিব্যেন্দু দাস প্রশ্ন করেছিলেন – লাইগোর মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে? উত্তর দিয়েছেন লাইগো এবং লাইগো ইণ্ডিয়া বা ইণ্ডিগোর সাথে যুক্ত ক্যালিফোর্ণিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অধ্যাপক রাণা অধিকারী


 

লাইগোর মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাধারণ মানুষের জীবনে কি প্রভাব ফেলবে? 

 

প্রধানত, দুটি কারণে একজন সাধারণ মানুষের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্পর্কে ধারণা থাকা ভালো।

প্রথম কারণটা সামাজিক। আমরা দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে যে সমস্ত বস্তু, যেমন ইলেক্ট্রিসিটি, ইন্টারনেট, লেসার সার্জারি ইত্যাদি ব্যবহার করি, সেগুলির আবিষ্কার বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলেই সম্ভব হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই প্রযুক্তিগত আবিষ্কারগুলির পিছনে মূল যে বৈজ্ঞানিক নীতি কাজ করে, সেটা আবিষ্কার হয়েছে প্রযুক্তিটি আসার অনেক দশক আগে। প্রকৃতিকে জানার তাড়না থেকেই বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার ও চর্চা করে চলেছেন কোয়ান্টাম তত্ত্ব, মহাকাশ বিদ্যা বা কসমোলজী, জীববিদ্যা বা বায়োলজি প্রভৃতির। এই তাড়নাই আমাদের উদ্বুদ্ধ করে প্রকৃতিকে আরো গভীরভাবে জানতে ও বুঝতে, অনুপ্রাণিত করে নতুন কোন প্রাকৃতিক ঘটনা বা রাশিকে সূক্ষ্মভাবে মাপতে। নানান নতুন পদ্ধতির আবিষ্কার যেমন আমাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে, তেমনি ক্রমে ক্রমে, প্রযুক্তিবিদ্যার নানা নতুন দিকের উন্মোচনও করেছে – যার ফলাফল আমরা এখন দৈনন্দিন জীবনে উপভোগ করছি। আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে যখন মহাকর্ষ বলের তত্ত্ব আবিষ্কার করেন, তখন কে-ই বা ভাবতে পেরেছিল যে এই তত্ত্ব ব্যবহার করে আমরা GPS-এর মতো অসাধারণ একটা জিনিস তৈরি করব, যার সাহায্যে আমি রায়গঞ্জে আমার ঠাকুমার বাড়ি চিনে চলে যেতে পারব? সেইরকমই, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারের সামাজিক তাৎপর্য ২১০১ সালে কী হবে তা হয়ত আমি এই মুহূর্তে নিশ্চিত বলতে পারবো না। কিন্তু, এটুকু বলাই যায়, যদি আমরা এখন থেকে নতুন বিজ্ঞান গবেষণার বীজ বুনতে থাকি, তবেই আজ থেকে একশ বছর পরে আমাদের পরের প্রজন্ম অভিনব সব প্রযুক্তি উপভোগ করতে পারবে।

দ্বিতীয় কারণটা একটা গভীরতর প্রশ্নের মধ্যে থেকে আসে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও বিজ্ঞানের সাধনা কি কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আর সমাজের উপকারের জন্যই না তার আরো গভীর উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য রয়েছে? আমাদের এই যে মানবজন্ম, তার উদ্দেশ্যই বা কী? অবশ্যই, বেঁচে থাকা, অন্যের দেখাশোনা করা, জীবনে পূর্ণতা ও পরিতৃপ্তির খোঁজ করা। সেই সাথে ব্যাপকভাবে প্রশ্ন করা যায়, এই মানুষজনকে নিয়ে যে সভ্যতা, তার সাফল্যের মাপকাঠিটাই বা কী? আমার মতে, একটা সফল সভ্যতা তাকেই বলব যেখান থেকে বেরিয়ে আসে অসাধারণ সব সৃষ্টি – যেমন সত্যেন বোস ও রামানুজনের আবিষ্কার করা তত্ত্ব বা রবীন্দ্রনাথের কবিতা। এই সব সৃষ্টি আমাদের অনুপ্রাণিত করে, কারণ এগুলোর মধ্যে এমন এক সৌন্দর্য আছে যা আমাদের ধরার বাইরে। এরাই মানবসমাজের অসাধারণ মেধার পরিচয় বয়ে চলেছে। অন্তরের অদম্য তাগিদেই আমরা এই সৌন্দর্যকে ধরার চেষ্টা করি। এরাই আমাদের বেঁচে থাকার নিরন্তর অনুপ্রেরণা দেয়।

(উত্তরটি ইংরাজী থেকে অনুবাদ করেছে ‘বিজ্ঞান’-এর সদস্যরা।)

 

প্রশ্ন পাঠান এই লিঙ্কে ক্লিক করে।

‘বিজ্ঞান’-এ প্রকাশিত লেখার বাছাই সংকলন ‘বিজ্ঞান পত্রিকা’ ডাউনলোড করুন।

Facebook Comments
(Visited 1,109 times, 3 visits today)

Tags: , , , ,