ধাঁধা: ছোট্ট গাউস আর রেলগাড়ির অঙ্ক


বিভাগ: ধাঁধা (March 25, 2015)

 

অর্ক ব্যানার্জ্জী

ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স, ব্যাঙ্গালোর

আমাদের অনেকেরই স্কুল, কলেজ বা কর্মক্ষেত্রে রোজকার যাতায়াতের এক অতি পরিচিত মাধ্যম হল রেলগাড়ী। মূলত লোকাল ট্রেন। আর এই ট্রেনে যাতায়াতের পথে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতাই না হয়ে থাকে আমাদের। আমার কলেজ আর ইউনিভার্সিটির পাঁচ বছরের পুরোটাই এই লোকাল ট্রেনের সুবাদে টুকরো টুকরো নানা মজার ঘটনার স্মৃতিতে ভরা। তোমাদের কেউ যদি বিকেলবেলায় শিয়ালদহ মেইন্‌ স্টেশন হয়ে কোনো ট্রেন ধরে থাকো, তাহলে অনেকেই হয়তো এক বিক্রেতাকে জোড় গলায় “পচা বাদাম” অতি সাফল্যের সাথে বিক্রি করে থাকতে লক্ষ্য করে থাকবে। তো আজ এইরকমই মজার এক (থুড়ি দুই) ধাঁধার-ছলে-গল্প বা গল্পর-ছলে-ধাঁধাঁ তোমাদের বলি।

প্রথমে ধাঁধাটায় আসি, তারপর গল্পে (শেষপাতে গল্প শুনতে কার না ভাল লাগে!)। তো এই ধাঁধাটা আসলে এক অদ্ভুত ফেরিওয়ালার গল্প: এক অঙ্কের ফেরিওয়ালা। সেদিন দুপুরবেলায় কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছি। রোজকার মত অনেক ফেরিওয়ালাই তাদের বিকিকিনি সারছেন। এমন সময় আমার দুপুরের ঝিমুনিভাবটা পুরোপুরি উড়িয়ে দিল কানে আসা কিছু শব্দ। একটা লোক বলে কিনা “দেখি এই প্রশ্নের উত্তর এখানে উপস্থিত কেউ দিতে পারেন কিনা!” আমিও কান পেতে তৈরি কি প্রশ্ন তা শোনার অপেক্ষায়।

প্রশ্নটা হল এইরকম- “এক বৃদ্ধের ছয় পুত্র, বৃদ্ধ বিপত্নীক। তার পুত্রেরা চায় বৃদ্ধ পিতা তাদের যাকিছু সম্পত্তি সমান ভাগে ভাগ করে দিক। এখন এই বৃদ্ধের সম্পত্তির মধ্যে তার বাড়ি-জমি-অর্থ ইত্যাদি ছাড়াও আছে ৩৬ টি গরু। তারা যেমনতেমন গরু নয়। প্রত্যেকটি গরু তাদের ক্রমিক সংখ্যানুসারে চিহ্নিত, অর্থাৎ ১ নং গরু, ২ নং গরু, ৩ নং গরু……. এইরকম করে ৩৬ নং গরু অবধি। আর আরো মজার ব্যাপার হল ১ নং গরু দেয় ১ লিটার দুধ, ২ নং ২ লিটার, ৩ নং ৩ লিটার……. এই ক্রমামুসারে ৩৬ নং গরু ৩৬ লিটার দুধ। এখন ছেলেরা তাদের বাবাকে বলে গরুও যেন তাদের ভাগ করে দেওয়া হয়, আর এমনভাবে দেওয়া হয় যাতে প্রত্যেকে সমান সংখ্যক গরু পায় এবং প্রত্যেকের ভাগে সমান দুধের পরিমাণও থাকে। অর্থাৎ প্রত্যেক পুত্রই যেন ৬ টি করে গরু পায় আর এই ৬ টি গরুর দুধের সমষ্টিও যেন সমান হয় সবার ক্ষেত্রে। তো বৃদ্ধ এখন কিরকম করে তার এই ৩৬ টি গরু তার ৬ পুত্রের মধ্যে ভাগ করবেন?”

বুঝলাম প্রশ্নকর্তা আসলে এক বই-বিক্রেতা, যে বইতে ছড়িয়ে আছে এইরকমই মজার নানা অঙ্ক। এই প্রশ্নটা তারই একটা মোক্ষম ট্রেইলর্‌-বিশেষ। তোমরাও চেষ্টা কর এর সমাধান কি হবে ভেবে বার করার। এই অঙ্কটা শোনামাত্রই আমার এক অঙ্কের স্যারের বলা একটা গল্প মনে পড়ে গিয়েছিল। সেই গল্পটাই এবার তোমাদের শোনাব। যদিও সেই অঙ্কের বইটা আমার কেনা হয়নি সেদিন আর, সেই বইবিক্রেতাকে কানে কানে উত্তরটা বলে আমার গন্তব্য স্টেশনে নেমে গিয়েছিলাম।

এবার আমাদের অঙ্কের ক্লাসের সেই গল্পটা বলি শোন- আসলে গল্প নয়, এ এক সত্যি ঘটনা। গল্পের হিরো যে তাঁর নাম ইয়োহ্যান কার্ল ফ্রেইডরিচ্‌ গাউস (Johann Carl Friedrich Gauss)। জন্ম ১৭৭৭ সালে জার্মানির ব্রাউনসোয়াইগ (Braunschweig) নামের ছোট্ট এক শহরে। গাউসকে বলা হয় “Princeps mathematicorum” যার ইংরিজী করলে হয় “The Prince of Mathematicians”। প্রকৃত অর্থেই গাউসের নাম গণিতশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যায় বারেবারে ফিরে আসে। মাত্র তিন বছরের বয়সেই গাউস তার বাবার করা হিসাবের খাতার যোগফল মিলিয়ে তাতে কোনো ভুল রয়েছে কিনা বলতে পারতেন।

গাউস স্কুলে ভর্তি হন সাত বছর বয়েসে। আমাদের গল্প শুরু হয় এর ঠিক তিন বছর পর। গাউস তখন মাত্র দশ বছরের। এই প্রথম তাঁকে arithmetic অর্থাৎ গণিতের প্রাথমিক ক্লাসে ভর্তি হতে হয়। তাঁদের ক্লাস নিতেন বুট্‌নার (Büttner) নামের এক খিট্‌খিটে স্বভাবের লোক। বুট্‌নারের কাজই ছিল বাচ্চাদের ভয়ানক বড় বড় যোগফল নির্ণয় করতে দিয়ে অঙ্কের প্রতি ভীতি তৈরি করা। গাউসের সেদিন ছিল বুট্‌নারের ক্লাসে প্রথম দিন। বুট্‌নার ক্লাসে এসেই ভয়ানক এক যোগফল নির্ণয় করতে দিলেন- ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সমস্ত পূর্ণসংখ্যার যোগফল। আর যে যে করতে পারবে তারা তাদের স্লেট এসে জমা করবে বুট্‌নারের কাছে। বুট্‌নার জানতেন সারাদিন পেরিয়ে গেলেও এই যোগফল বার করা কোনো ছাত্রের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই মনে মনে টেবিলে একটু জিড়িয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন অঙ্কটা কষতে দিতে দিতেই।

কিন্তু ক্লাসে আসা নতুন ছাত্রটিকে তার জানা ছিল না। বুট্‌নারের কথা শেষ হতে না হতেই তার স্লেটটি নিয়ে সে এগিয়ে যায় আর বলে “Ligget se” (“এই রইল”)। স্লেটের ওপর লেখা একটাই সংখ্যা “৫০৫০”- ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সকল পূর্ণসংখ্যার যোগফল। বলা বাহুল্য, সারাক্লাসের শেষে আর যে দু একজন স্লেট জমা করেছিল তাদের কারুরই যোগফল নির্ণয় সঠিক হয়নি। একমাত্র প্রথমদিন ক্লাসে আসা গাউসই দিয়েছিলেন সঠিক উত্তর, আর তা বার করতে তাঁর লেগেছিল কয়েক মুহূর্তমাত্র। বুট্‌নারের গাউসের প্রতিভাকে চিনতে কিন্তু দেরি হয়নি সেদিন।

শুরুর রেলগাড়ির প্রশ্ন আর বুট্‌নারের করা প্রশ্নদুটি শুনতে আপাতদৃষ্টিতে আলাদা আলাদা রকমের মনে হলেও আসলে তাদের সহজ সমাধান কিন্তু করা সম্ভব একইরকম যুক্তি খাটিয়ে- কি সেটা এখনই বলছি না, সেটাই এই ধাঁধাঁর ভাব্‌বার বিষয়। ক্লু হিসাবে এইটুকু বলতে পারি আগে গাউস ঐ যোগফলটি কি করে অত সহজে বার করেছিলেন সেটা ভেবে বার কর, তাহলেই রেলগাড়ির অঙ্কের সমাধানও হয়ে যাবে চট্‌পট্‌। বুদ্ধিটা ধরে ফেলতে পারলেই দেখবে এক নিমিষে নিজেরই অজান্তে পৌঁছে গিয়েছ ব্রাউনসোয়াইগের সেই ছোট্ট ক্লাসঘরে এক্কেবারে অষ্টাদশ শতাব্দীতে।

ছবি: Wikipedia

Facebook Comments
(Visited 6,233 times, 1 visits today)

Tags: ,