অঙ্ক নয় কঠিন



সংখ্যার জগতের হাতছানি এক ইস্কুল শিক্ষককে নিয়ে গিয়েছিলো বহুদূর। সেই যাত্রা নিয়ে লিখছে
শ্রীনন্দা ঘোষ এবং অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায়


 

বন্ধুরা, টেনিদার গল্পের স্বামী ঘুটঘুটানন্দকে মনে আছে তো?  সেই  যিনি টেনিদাকে বলেছিলেন, যোগবলে নাকি সাপকে হাঁড়িতে পুষে রাখা যায়! আজ আমরা জানব সত্যিকারের ‘গণিতানন্দ’-এর কথা, যিনি পোষ মানিয়েছিলেন ঠিকই, তবে সাপকে নয়, অঙ্ককে!  ‘গণিতানন্দ’-এর কথা বলার আগে একটা ছোট্ট ম্যাজিক দেখাই।

 

একটা চার অঙ্কের সংখ্যা ভাবো, যার চারটি অঙ্কই সমান নয়। অর্থাৎ ১১১১ কিংবা ২২২২ ইত‍্যাদি বাছা যাবে না। এই ৪ টি অঙ্ক ছোট থেকে বড়ো করে সাজাও, যে সংখ্যাটা হলো সেটা লেখো। এবার সংখ্যাটা উল্টে দাও, যাতে অঙ্কগুলো বড়ো থেকে ছোট করে সাজানো থাকে। বড়ো সংখ্যাটা থেকে ছোটটা বাদ দাও। উদাহরণ হিসেবে ধরো, তুমি ভাবলে ২৬৩৫, তাহলে তুমি যে বিয়োগ-টা করলে সেটা হলো ৬৫৩২ – ২৩৫৬ = ৩১৭৬।

 

বিয়োগ করার ফলে একটা নতুন সংখ্যা পেলে। নতুন সংখ্যাটার উপর আবার ওই ধাপগুলো করো। অর্থাৎ সংখ্যাটার অঙ্কগুলো ছোট থেকে বড়ো আর বড়ো থেকে ছোট করে সাজিয়ে দুটো নতুন সংখ্যা বানাও। বড়ো থেকে ছোটটাকে বিয়োগ করো।

 

এরকম বার সাতেক করো। তুমি প্রথমে কি সংখ্যা ভেবেছিলে জানি না, কিন্তু ওই সাতবার বড়ো-ছোট-বিয়োগ খেলাটার পর যে সংখ্যাটা পেলে, সেটা বলে দিতে পারি:

 

৬১৭৪

 

কি, ঠিক ধরেছি তো? ক্রেডিট-টা আমার নয়, এই “ম্যাজিক”-টা এবং আরও অনেক অদ্ভুত সংখ্যা যিনি খুঁজে বার করেছিলেন, তাঁকে এবং তাঁর সংখ্যাগুলোকে নিয়েই এই লেখাটা। দত্তথ্রেয় রামচন্দ্র কাপ্রেকার ওরফে ডি.আর.কাপ্রেকার। পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষক, কিন্তু তাঁর শখই ছিল অঙ্ক নিয়ে খেলা করা।

 

অঙ্কে হাতেখড়ি

 

১৯০৫ সালের ১৭ই জানুয়ারী তিনি মহারাষ্ট্রের দাহানু শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে মাতৃহারা ছেলেকে বাবা নিজের সর্বস্ব দিয়ে বড় করে তুলেছিলেন। পেশায় কেরানি, অঙ্কশাস্ত্রের বিশদ জ্ঞান হয়তো ছিলনা, কিন্তু তাঁর শখের বিষয় ছিল জ্যোতিষবিদ্যা। ছেলেকেও সেই বিদ্যা শিখিয়েছিলেন তিনি। বাবার হাত ধরে জ্যোতিষবিদ্যার মাধ্যমে ছোট্ট কাপ্রেকারের প্রথম পরিচয় হয়  সংখ্যাজগতের সাথে।

 

থানে শহরে মাধ্যমিক স্তরে, তারপরে পুণেতে ফারগুসন কলেজে শিক্ষালাভ করেন তিনি। অঙ্ক কষা ছিল তাঁর কাছে রোমাঞ্চকর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি ডুবে থাকতেন অঙ্কের ধাঁধাঁর সমাধানে। সবসময়েই তিনি খুঁজে বার করার চেষ্টা করতেন সমস্যার সমাধানে পৌঁছনোর সহজতম উপায়টা। ১৯২৭ সালে তাঁকে র‍্যাংলার আর. পি. ম্যাথেমেটিকাল পুরষ্কার দেওয়া হয়। এই পুরষ্কারটা দেওয়া হতো শ্রেষ্ঠ মৌলিক গণিত-সংক্রান্ত গবেষণার জন্য। অর্থাৎ কাপ্রেকার তাঁর  প্রতিভার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন অল্প বয়েসেই। অবশ্য পরবর্তী জীবনে যে এই স্বীকৃতির ধারাটা অক্ষত ছিল, সেরকম বলা যায় না।

 

মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে তিনি স্নাতক হন। পরবর্তী জীবনে দীর্ঘ ৩২ বছর তিনি নাসিক-এর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এবং সাথে সাথে খুঁজে বার করেন সংখ্যার জগতের কিছু অদ্ভুত সদস্যদের।

 

কাপ্রেকার’স কনস্ট্যান্ট

 

উপরে যে ম্যাজিক-টার কথা বললাম, সেটা সংখ্যাতত্ত্বের জগতে কাপ্রেকারের সবথেকে পরিচিত কাজ। ম্যাজিক-টা দেখতে এবার একসাথে অঙ্কটা করা যাক। ধরো, আমি ভাবলাম ২০১৬, গত বছরের সংখ্যাটা।

 

এই চারটি অঙ্ক ওলটপালট করে সবচেয়ে বড় যে সংখ্যা পেতে পারি, তা হল ৬২১০ আর সবচেয়ে ছোটটি হলো ০১২৬ অর্থাৎ ১২৬।

 

বিয়োগের ধাপগুলি হলো এইরকম। এই অঙ্কগুলিকে সাজানো আর বড়ো সংখ্যা থেকে ছোটটাকে বিয়োগ করা, একে ‘কাপ্রেকার’স রুটিন’ (Kaprekar’s routine) বলা হয়ে থাকে।

 

৬২১০ – ০১২৬ = ৬০৮৪

৮৬৪০ – ০৪৬৮ = ৮১৭২

৮৭২১ – ১২৭৮ = ৭৪৪৩

৭৪৪৩ -৩৪৪৭  = ৩৯৯৬

৯৯৬৩ – ৩৬৯৯ = ৬২৬৪

৬৬৪২ – ২৪৬৬  = ৪১৭৬

৭৬৪১- ১৪৬৭  = ৬১৭৪

৭৬৪১- ১৪৬৭  = ৬১৭৪

 

দেখতেই পাচ্ছো, এরপর বিয়োগটা যতবার-ই করো, ওই ৬১৭৪-ই আসবে। ওই সংখ্যাটাকে বলা যায় ওই কাপ্রেকার’স রুটিন-এর ‘কার্নেল’ (kernel) বা কেন্দ্রস্থল। ভেবে দেখো, প্রায় ন’হাজার-টা সংখ্যার মধ্যে যেখান থেকেই শুরু করো না কেন, একই সংখ্যাতে গিয়ে ঠেকবে। সাতবার বিয়োগটা করতে হবে, সেরকম কথা নেই। তাড়াতাড়িও পৌঁছে যেতে পারো কেন্দ্রস্থলে। তবে সাতবারের মধ্যে ঠিক পৌঁছবে।

 

সংখ্যার ভিড়ে লুকিয়ে থাকা এই একটি সংখ্যাকে টেনে বার করেছিলেন কাপ্রেকার। ৬১৭৪ সংখ্যাটা ‘কাপ্রেকার’স কনস্ট্যান্ট’ (Kaprekar’s constant) নামে পরিচিত। তিন অঙ্কের সংখ্যাতেও এরকম একটা কেন্দ্রস্থল পাওয়া যায়, সেটা হলো ৪৯৫। নিজেই কয়েকটা সংখ্যা নিয়ে অঙ্কটা করে দেখো। ৪৯৫-এ গিয়ে ঠেকবে।

 

তবে এর বাইরে, অর্থাৎ দুই অঙ্কের সংখ্যা, পাঁচ অঙ্কের সংখ্যা, ইত্যাদি ইত্যাদিতে একটাই কেন্দ্রস্থল আছে, এরকম নয়।

৬১৭৪ সংখ্যাটা ‘কাপ্রেকার’স কনস্ট্যান্ট’ (Kaprekar’s constant) নামে পরিচিত।

অনেকগুলি কেন্দ্রস্থল থাকে এবং কেন্দ্রস্থলে অনেকসময় একাধিক সংখ্যা থাকে। ধরো, পাঁচ অঙ্কের একটা সংখ্যা ভাবলে, দিয়ে কাপ্রেকার-এর রুটিন-টা চালাতে থাকলে। দেখবে একটা জায়গায় গিয়ে এই সংখ্যাগুলোর গোলকধাঁধায় আটকে গেছো:

 

৫৩৯৫৫→৫৯৯৯৪→৫৩৯৫৫,

বা  

৬১৯৭৪→৮২৯৬২→৭৫৯৩৩→৬৩৯৫৪→৬১৯৭৪,

বা

৬২৯৬৪→৭১৯৭৩→৮৩৯৫২→৭৪৯৪৩→৬২৯৬৪।

 

গণিতের জগতে কাপ্রেকার প্রথম প্রথম পাত্তা পাননি। তাঁর কয়েকটা কাজ তিনি কিছু নিম্নস্তরের গবেষণাপত্রে ছাপাতে পেরেছিলেন। যেমন, এই কাজটা তিনি ছাপিয়েছিলেন Scripta Mathematica জার্নালে ১৯৫৩ সালে। কাজটির নাম দিয়েছিলেন, Problems involving reversal of digits। তবে অনেক কাজই ওনাকে প্রাইভেটে ছাপাতে হয়েছে প্যামফ্লেট আকারে।

 

শেষে ১৯৭৫ সালে পপুলার ম্যাথমেটিক্স লেখক মার্টিন গার্ডনার কাপ্রেকার-কে আন্তর্জাতিক স্তরে আনেন। উনি ‘সাইন্টিফিক আমেরিকান’ পত্রিকাতে একটি জনপ্রিয় কলাম লিখতেন, ‘ম্যাথেমেটিক্যাল গেমস’ নামে [২]। মার্চ ১৯৭৫-এর কলামে উনি লেখেন কাপ্রেকারের কাজ নিয়ে। অবশেষে গণিত জগতে তাঁর যোগ্য স্বীকৃতি পান কাপ্রেকার। তারপর বহু সংখ্যাতত্ত্ববিদ তার কাজ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন, তাঁর আবিষ্কৃত সংখ্যাগুলোর পিছনে আরো গূঢ় রহস্য আছে কিনা, সেই সন্ধানে মেতেছেন।

 

সংখ্যায় আনন্দ

 

কাপ্রেকার আরো অদ্ভূত সব সংখ্যার চরিত্র খুঁজে বার করেন। যেমন এক জাতীয় সংখ্যা রয়েছে, যাদের অঙ্কগুলোকে যোগ করলে সংখ্যাটা সেই যোগফলের দ্বারা বিভাজ্য। হার্ডি-রামানুজন সংখ্যাটাই ধরা যাক [৩]: ১৭২৯।

 

অঙ্কগুলো যোগ করো: ১ + ৭ + ২ + ৯ = ১৯।  দেখা যাবে, ১৭২৯ সংখ্যাটি এই যোগফলটা অর্থাৎ ১৯-এর দ্বারা বিভাজ্য। এরকম সংখ্যার একটা পুরো সিকোয়েন্স পাওয়া যায়। ১ থেকে ৯ অব্দি সংখ্যাগুলো বাদ দিলাম, কারণ তাদের অঙ্কের যোগফল তারা নিজেই। তারপর থেকে সংখ্যাগুলি হলো:

 

….,১০, ১২, ১৮, ২০, ২১, ২৪, ২৭, ৩০, ৩৬, ৪০, ৪২, ৪৫, ৪৮, ৫০, ….

 

এই সংখ্যাগুলোকে উনি ‘হর্ষদ নাম্বার’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। এখানে ‘হর্ষ’ হলো আনন্দ, হয়তো এই সংখ্যাগুলোকে খুঁজে পেয়ে উনি যে আনন্দ পেয়েছিলেন, সেটাকেই বোঝাতে চেয়েছেন। সংখ্যাই ছিল তাঁর জীবনের ধ্যানজ্ঞান। উনি বলতেন:

 

একজন মদ্যপ যেমন পান করা থামাতে চায় না, সুরাপানের উন্মত্ত স্থিতিতে পড়ে থাকতে চায়, সংখ্যার ক্ষেত্রে আমারও সেই একই অবস্থা।

 

এই ‘হর্ষদ নাম্বার’ পরে তুমুল গবেষণার বিষয় হয়েছিল: কিভাবে বিস্তৃত তারা পূর্ণসংখ্যাদের মধ্যে, অন্য ধরণের সংখ্যার সিকোয়েন্স-এর সাথে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

এরকমই আরেক জাতীয় সংখ্যা তিনি বার করেছিলেন, যাদের ‘সেল্ফ নাম্বার’ বা ‘স্বয়ম্ভূ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। সেল্ফ নম্বর-এর সংজ্ঞা বুঝতে হলে আগে দেখতে হবে  কারা ‘সেল্ফ নাম্বার’ নয়। যেমন, ২১, ২২, ২৩-এর কথা ধরা যাক।

 

  • ২১ সেলফ নম্বর নয়, কারণ এমন একটা সংখ্যা পাওয়া যায় যেটাকে তার অঙ্কের যোগফলের সাথে যোগ করলে ২১ পাওয়া যাবে। সেই সংখ্যাটা ১৫। ১৫ + ১ + ৫ = ২১।
  • ২২ সেলফ নম্বর নয়, কারণ এমন একটা সংখ্যা পাওয়া যায় যেটাকে তার অঙ্কের যোগফলের সাথে যোগ করলে ২২ পাওয়া যাবে। সেই সংখ্যাটা ২০। ২০ + ২ + ০ = ২২।
  • ২৩ সেলফ নম্বর নয়। ২৩ এর ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ১৬। ১৬ + ১ + ৬ = ২৩।…

 

কিন্তু কিছু সংখ্যার ক্ষেত্রে এইটা করা যায় না। তারাই ‘সেল্ফ নাম্বার’। অর্থাৎ এমন কোনো সংখ্যা পাওয়া যায় না, যাকে তার অঙ্কের যোগফলের সাথে যোগ করলে সেই সংখ্যাটাই ফেরত আসবে।

এরকমই আরেক জাতীয় সংখ্যা তিনি বার করেছিলেন, যাদের ‘সেল্ফ নাম্বার’ বা ‘স্বয়ম্ভূ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

 যেমন, ২১,২২, ২৩, এরা সেল্ফ নম্বর না হলেও ২০ কিন্তু সেল্ফ নম্বর। দেখো তো, এমন কোনো সংখ্যা খুঁজে পাও কিনা যাকে তার অঙ্কগুলোর সাথে যোগ করলে ২০ পাবে? বা এই ‘সেল্ফ নম্বর’ সিকোয়েন্স-এর অন্য যেকোনো কোনো একটা সংখ্যা নিয়ে দেখো (এক অঙ্কের সংখ্যাগুলো দিলাম না):

 

…, ২০, ৩১, ৪২, ৫৩, ৬৪, ৭৫, ৮৬, ৯৭, ১০৮, ১১০, ১২১, ১৩২, ১৪৩, ১৫৪, ১৬৫, ১৭৬, ১৮৭, ১৯৮, ২০৯, ২১১, ২২২, ২৩৩,…

 

কাপ্রেকার এই ‘সেল্ফ নাম্বার’-গুলোকে প্রকাশ করার একটা সূত্র দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, সম্ভাব্য ‘সেল্ফ নাম্বার’-টির নিচে যত সংখ্যা আছে, সব কটাকে ধরে ধরে না দেখলেও চলবে। ফর্মুলাটা ব্যবহার করেই পেয়ে যাবে একটা সংখ্যা ‘সেল্ফ-নাম্বার’ কিনা [৪]।

 

আরও আছে। তবে উৎসাহী হলে নিজেই পড়ে দেখো সেসব।

 

১৯৮৮ সালে কাপ্রেকারের জীবনাবসান ঘটে। সংখ্যা নিয়ে স্রেফ খেলা করে কি কাণ্ড করা যায়, সেটা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। ‘রিক্রিয়েশনাল ম্যাথমেটিক্স’ অর্থাৎ অবসর-সময়ে গণিতচর্চা, এটা একটা স্বীকৃত ‘হবি’ বা শখ।

অবসর-সময়ে গণিতচর্চা করতে করতে গণিত গবেষণার জগতে যে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলা যায়, সেটা দেখিয়ে গেছেন কাপ্রেকার।

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছি যারা এটা অল্পবিস্তর করে থাকি। সেটা করতে করতে যে গণিত গবেষণার জগতে কি দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলা যায়, সেটা দেখিয়ে গেছেন কাপ্রেকার।

 

তথ্যসূত্র ও অন্যান্য টুকিটাকি:

[১] লেখার প্রধান সূত্র: http://www-history.mcs.st-andrews.ac.uk/Biographies/Kaprekar.html

[২] ‘ম্যাথেমেটিক্যাল গেমস’ বলে মার্টিন গার্ডনার-এর একটি মাসিক কলাম বার হতো ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ ম্যাগাজিনে। এই কলাম-এর মাধ্যমেই কাপ্রেকার-এর নাম উঠে এসেছিলো গণিত গবেষণার জগতে। সেই কলাম সম্পর্কে কিছু কথা: https://blogs.scientificamerican.com/guest-blog/the-top-10-martin-gardner-scientific-american-articles/

[৩] হার্ডি-রামানুজন সংখ্যা ১৭২৯ হলো সবচেয়ে ছোট সংখ্যা যাকে দুটো সংখ্যার ঘনফলের যোগফল হিসেবে দুভাবে লেখা যায়:

১৭২৯ = ১ + ১২ = ৯ + ১০

সংখ্যাটার পিছনে একটা মজার গল্প আছে। উইকিপিডিয়া-তে দেখতে পারো: https://en.wikipedia.org/wiki/1729_(number)

[৪] Kaprekar, D. R. The Mathematics of New Self-Numbers Devaiali (1963): 19 – 20

 

লেখক পরিচিতি:

 

শ্রীনন্দা ঘোষ বর্তমানে জার্মানি-তে টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ ড্রেসডেন-এ পদার্থবিদ্যায় গবেষণারত। শ্রীনন্দা ‘বিজ্ঞান’ দল-এর একজন অন্যতম সদস্যা। এছাড়াও, শ্রীনন্দা ‘পদক্ষেপ’ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাথে যুক্ত।

অনির্বান গঙ্গোপাধ্যায় বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যে ‘ম্যাথওয়ার্কস’ নামক একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে কর্মরত। অনির্বান ‘বিজ্ঞান’ দল-এর একজন সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সদস্য।

 

প্রশ্ন পাঠান এই লিঙ্কে ক্লিক করে।

‘বিজ্ঞান’-এ প্রকাশিত লেখার বাছাই সংকলন ‘বিজ্ঞান পত্রিকা’ ডাউনলোড করুন।

 




প্রোটন ট্রান্সফার বিক্রিয়া সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা

স্নেহাশিস দাশচক্রবর্ত্তী

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় বোল্ডার, কলোরাডো, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

আমরা সেই কোন ছোটবেলা থেকেই জেনে আসছি যে একটি শক্তিশালী অ্যাসিডকে জলের মধ্যে মিশিয়ে দিলে অ্যাসিডটি তৎক্ষণাৎ একটি হাইড্রোজেন আয়ন (H+) জলকে দান করে আর তার ফলে একটি আয়ন যুগল (ion pair)  তৈরী  হয়। একটি  উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝা যাক।  আমরা সবাই জানি সালফিউরিক অ্যাসিড (H2SO4) একটি শক্তিশালী অ্যাসিড। এটি জলের মধ্যে হাইড্রোজেন আয়ন দান করে নিজে বাইসালফেটে পরিণত হয় আর ওই হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করে জল হাইড্রোনিয়াম আয়নে (H3O+) রূপান্তরিত হয়।  নিচে সমীকরণটি দেওয়া হলো

H2SO4 + H2O →  HSO4 +  H+ + H2O →  HSO4 + H3O+   – – – – (১)

হাইড্রোজেন আয়নকে প্রোটন নামেও অভিহিত করা হয় কারণ হাইড্রোজেন আয়নে কোনো ইলেক্ট্রন থাকে না, একটিমাত্র প্রোটন থাকে নিউক্লিয়াসে। উপরের সমীকরণটা প্রোটন ট্রান্সফার বিক্রিয়ার একটি অতি সাধারণ পদ্ধতি।

আমাদের মাথার মধ্যে এই ধরণের বিক্রিয়ার এই একটি ছবিই খুব স্পষ্ট ভাবা গাঁথা হয়ে আছে। এটি ছেলেবেলায় আমার অপরিণত মাথায় এমন ভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে কোনো অণুতে একটি হাইড্রোজেন পরমাণু থাকলেই আমি চেষ্টা করতাম কিভাবে ওটিকে হাইড্রোজেন আয়ন হিসেবে বের করে দেওয়া যায়! উদাহরণস্বরূপ কস্টিক সোডা (NaOH) ওই ভুলের স্বীকার হত মাঝে মাঝেই (NaOH → NaO + H+ !!), যদিও এর জন্য মাস্টারমশাইদের থেকে তিরস্কারও শুনতে হয়েছে বিস্তর!

যাইহোক, এখন জেনে গেছি NaOH ক্ষার, তাই হাইড্রোজেন আয়ন দান করে না। বরং একটি হাইড্রক্সিল আয়ন (OH) ত্যাগ করে সহজেই।  এই ভুল হয়ত আর করব না। কিন্তু শক্তিশালী অ্যাসিড এর বেলায় যে সমীকরণটি (সমীকরণ-১) আমরা জেনে এসেছি সেটিই বা কতটা সত্যি, তা ভাববারও বোধহয় সময় এসেছে। আমার বিশ্বাস, অনেকেই হয়ত আকাশ থেকে পড়বেন যদি বলা হয় এটি সর্বৈব মিথ্যে, কল্পনা প্রসূত এবং বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই ! প্রত্যেকের এরকম ধারণা হওয়াই খুব স্বাভাবিক, কারণ অন্য কোন চিত্র আর তো ভাবাই যায় না।

কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণা এক জায়গাতে কখনই আটকে থাকতে পারে না, আর স্বভাবতই এ ক্ষেত্রেও তা নেই।  কিন্তু বিপদ হলো উপরের এই সমীকরণটি যদি মিথ্যে হয় তাহলে তো আমাদের ছোটবেলায় পড়া এই সম্পর্কিত অনেক কিছুই ওলোট পালট হয়ে যাবে। কিন্তু সবকিছু উল্টে গেলেও বাস্তবকে অস্বীকার করার স্পর্ধা না করাই ভালো, আর তাই নতুন কিছু যদি শেখা যায় তাহলে মন্দ কি! আর যদি তা সত্যি প্রমাণিত হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। আচ্ছা তাহলে এখন আমরা একটু উন্মুক্ত মনে শিখতে বসি, জেনে নিই কি ভুল ওই সমীকরণটিতে আর আসল সত্যিটাই বা কি।

প্রোটন ট্রান্সফার বিক্রিয়া ঘটবার সময় আসলে কি হয় তা জানার আগে কয়েকটি বিষয় বলে নেওয়া দরকার। এই বিক্রিয়ায় একটি অণু প্রোটন দান করে আর অন্য একটি অণু তা গ্রহণ করে। যে প্রোটন দান করে তাকে আমরা দাতা আর যে তা গ্রহণ করে তাকে আমরা গ্রহীতা বলে এখানে সম্বোধন করব। ১৯৫২ সালে, প্রফেসর মুলিকেন প্রথম একটি তত্ত্ব খাড়া করলেন। প্রোটন ট্রান্সফারের আগে দাতা আর গ্রহীতার মধ্যে একটি হাইড্রোজেন বন্ধনী গড়ে ওঠে। এবং ঠিক তখন থেকেই কিছু পরিমাণ নিঃসঙ্গ ইলেক্ট্রন যুগল (lone pair of electrons) গ্রহীতার সাথে যে বন্ধনীতে হাইড্রোজেন যুক্ত আছে তার এন্টি-বন্ডিং অরবিটালে চলে আসে। এই ইলেক্ট্রন ট্রান্সফার ঘটে দাতা এবং গ্রহীতার অরবিটাল গুলির ওভারল্যাপ এর জন্য। এরকম ইলেক্ট্রন আদান প্রদান অণুতে অণুতে প্রতি নিয়তই চলতে থাকে যতক্ষণ তারা হাইড্রোজেন বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ থাকে।

এখানে একটি বিষয় বলে নেওয়া দরকার। এন্টি-বন্ডিং বা বন্ডিং এই শব্দবন্ধ গুলি ব্যবহার করা হবে মাঝে মাঝে। এগুলি সহজ ভাবে বোঝার জন্য মলিকুলার অরবিটাল তত্ত্বের সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা প্রয়োজন। সীমিত পরিসরে বিশদে বলা এখানে সম্ভব নয়। শুধু এটুকু মাথায় রাখলেই আপাতত চলবে যে কোন সমযোজী বন্ধনী (covalent bond) তৈরী হতে গেলে দুটি পরমাণুর অরবিটাল এর মধ্যে ওভারল্যাপ এর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এর ফলে একটি কম শক্তিসম্পন্ন অরবিটাল, যার নাম বন্ডিং অরবিটাল, আর একটি তুলনামূলক বেশি শক্তিসম্পন্ন এন্টি-বন্ডিং অরবিটালের উৎপত্তি হয়। এখন আউফবাউ নীতি (Aufbau Principle) অনুযায়ী কম শক্তি সম্পন্ন অরবিটালে আগে ইলেক্ট্রন বসাতে হবে তারপর বেশি শক্তিসম্পন্ন অরবিটালে ইলেক্ট্রন বসবে। সুতরাং এক্ষেত্রে বন্ডিং অরবিটালে ইলেক্ট্রন আগে বসবে। যেহেতু পাউলির অপবর্জন নীতি (Pauli’s exculsion principle) বলে একটি অরবিটালে দুটির বেশি ইলেক্ট্রন বসতে পারবে না, উদ্বৃত্ত ইলেক্ট্রন এন্টি-বন্ডিং অরবিটালে যাবে। এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে এন্টি-বন্ডিং অরবিটালে ইলেক্ট্রন যত বেশি হবে সেই বন্ধনিটিও ততই দুর্বল হয়ে পড়বে।

ফিরে আসি আগের আলোচনায়। দুটি অণু যখন একটি হাইড্রোজেন বন্ধনী গঠন করে তখন থেকেই ইলেক্ট্রন আদানপ্রদান চলতে থাকে। যেমন, দুটি জলের অণু যখন কাছাকাছি আসে এবং তাদের মধ্যে একটি হাইড্রোজেন বন্ধনী তৈরী হয় তখন থেকেই ইলেক্ট্রন আদান প্রদানও শুরু হয়ে যায় আর তার ফলে হাইড্রোজেন বন্ধনীটিও আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কিছু ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলে এই ব্যাপারটা আরো ভালো বোঝা যাবে। দুটি মানুষ যখন কাছাকাছি আসে, দুজনের মধ্যে একটি বন্ধুত্ব তৈরী হয়, আর ঠিক তখন থেকেই চাওয়া-পাওয়ার, দেনা-পাওনার সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে, আর সেই দেওয়া-নেওয়া থেকেই সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে। একই রকম ভাবে অণু জগতেও এই ঘটনা ঘটে থাকে প্রোটন ট্রান্সফারের সময়।

ইলেক্ট্রন ট্রান্সফার যত হতে থাকে ততই দাতা এবং গ্রহীতা একই সাথে আধানিত হতে থাকে (charged)। যেহেতু দাতার ইলেক্ট্রনেগেটিভিটি হাইড্রোজেন এর থেকে বেশি হয়, তাই গ্রহীতার নিসঙ্গ ইলেক্ট্রন যুগলের একটি অংশ দাতার সাথে যে বন্ধনীতে হাইড্রোজেন পরমানু যুক্ত আছে তার এন্টি বন্ডিং অরবিটালে আসে এবং আসলে দাতার কাছেই থেকে যায়। এর ফলে ওই বন্ধনীটি আরো বেশি সমবর্তিত (polarized) হয়ে পড়ে কারণ সমবর্তনের নিয়মই হলো বন্ধনীর দুই প্রান্তে অবস্থিত দুটি পরমাণুর অসম ইলেক্ট্রন বন্টন। যতই বন্ধনটি সমবর্তিত হয় ততই দাতা আর গ্রহীতার মধ্যে আকর্ষণ বাড়তে থাকে আর তারা আরো কাছাকাছি আসে এবং এর ফলে ইলেক্ট্রন আদান-প্রদান আরো বেড়ে যায়। এই ঘটনা অবিরত চলতেই থাকে আর এর ফলে হাইড্রোজেন বন্ধনীটিও ধীরে ধীরে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যেহেতু ইলেক্ট্রন ট্রান্সফারটি হচ্ছে উপরিউক্ত বন্ধনীর এন্টি-বন্ডিং অরবিটালে তাই এর ফলে ওই বন্ধনীটিও ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে (আগেই বলা হয়েছে যে এন্টি-বন্ডিং অরবিটাল এ ইলেক্ট্রনের বেশি আসা মানেই বন্ধনীর দুর্বলতা)। এখন উদাহরণ দিয়ে উপরের পুরো ব্যাপারটা একটু সহজ করে নিই।

মনে করি A—H হলো একটি শক্তিশালী অ্যাসিড, আর সে B নামক খার কে প্রোটন ট্রান্সফার করবে। সুতরাং এখানে A হলো দাতা আর B হলো গ্রহীতা। এখন উপরিউক্ত ধাপগুলি নিচে এক এক করে উল্লেখ করা যাক:

১.  A—H – – – – – B ;    প্রথমে তারা কাছাকাছি এসেছে এবং হাইড্রোজেন  বন্ধনীতে আবদ্ধ হয়েছে।

২.  A—H (এন্টি-বন্ডিং অরবিটাল ) এর ইলেক্ট্রন গ্রহণ B -এর নিঃসঙ্গ ইলেক্ট্রন যুগল (lone pair) থেকে।

৩. B -এর পসিটিভ আর A -এর নেগেটিভ  চার্জ  এর প্রাপ্তি।

৪.  A—H বন্ধনীর দুর্বলতা আর একই সাথে হাইড্রোজেন বন্ধনীর আরো শক্তিবৃদ্ধি।   

উপরের এই ধাপগুলি বারংবার আবর্তিত হতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত A—H এতই দুর্বল হয়ে পড়ে যে সেটি ভেঙ্গে যায়, প্রোটন ট্রান্সফার হয় আর তার ফলে A এবং BH+ আয়ন যুগল তৈরী হয়। এটিই হলো প্রোটন ট্রান্সফার বিক্রিয়ার সর্বশেষ জানা সঠিক পদ্ধতি। একেই বলা হয় “Mulliken  Charge  Transfer  Picture in Proton Transfer Reaction”, যার বাংলা তর্জমা করলে দাড়ায় “প্রোটন ট্রান্সফার বিক্রিয়ার মুলিকেন আধান হস্তান্তর চিত্র”। এই নামটি প্রথম পাওয়া যায় প্রফেসর হাইন্স ও তার সহকর্মীর একটি গবেষণা পত্রে, যেখানে প্রথম দেখানো হয় উপরিউক্ত চিত্রটি হাইড্রোজেন ফ্লোরাইড তার প্রোটন ট্রান্সফারের সময় সঠিক ভাবে মেনে চলে। পরে আরও অনেকের কাজেও একই বিষয় উঠে এসেছে বারবার ।

এই পর্যন্ত এসে একটু থামা দরকার। কারও হয়ত একটি প্রশ্ন মনে উঁকি দিচ্ছে যে এতক্ষণ যা বলা হলো তা কিভাবে প্রমাণ করে যে সমীকরণ-১ আসলে ঠিক নয়।  এবার আসব সেই প্রসঙ্গে।

প্রোটন ট্রান্সফারের অনেক আগে থেকেই গ্রহীতা পসিটিভ চার্জ এবং দাতা সমপরিমাণ নেগেটিভ চার্জ লাভ করে এবং এই চার্জের পরিমাণ সর্বোচ্চ মানে পৌঁছায় প্রোটন ট্রান্সফারের ঠিক প্রাক্-মুহূর্তে। যেহেতু  A—H বন্ধনীর এন্টি-বন্ডিং অরবিটালে ইলেক্ট্রন ট্রান্সফার হয়ে থাকে তাই A এবং H -এর সমপরিমাণ ইলেক্ট্রন লাভ করার কথা। কিন্তু সাধারণ ভাবে A বেশি ইলেকট্রোনেগেটিভ H -এর তুলনায়, তাই ইলেক্ট্রন ট্রান্সফার এর সাথে সাথে A—H বন্ধনীর সমবর্তনের এর জন্য লব্ধ ইলেক্ট্রনের শতাংশই A -এর কাছে থেকে যায়। আর তার ফলেই H পরমাণু সামান্য পরিমাণ ইলেক্ট্রনও পায় না আর সেই কারণে নিজের কাছে থাকা কিছু পরিমাণ ইলেক্ট্রন নিয়েই A -এর সঙ্গ ত্যাগ করে আর B -এর সাথে মিলে যায়।

এই “কিছু পরিমাণ ইলেক্ট্রন” মানে আসলে তা কত ? H যদি শূন্য ইলেক্ট্রন নিয়ে B -এর সাথে যুক্ত হত  তাহলে তাকে প্রকৃতপক্ষে প্রোটন ট্রান্সফার বা হাইড্রোজেন আয়ন ট্রান্সফার বলা যেত। অন্য দিকে ১ টি ইলেক্ট্রন নিয়ে ট্রান্সফার হলে তাকে বলা হত হাইড্রোজেন পরমানু ট্রান্সফার বা H ট্রান্সফার। কিন্তু কোয়ান্টাম কেমিকাল ক্যালকুলেশন করে দেখানো হয়েছে যে এই পরিমাণ হলো ০ আর ১ এর মাঝামাঝি অর্থাৎ প্রায় ০.৫।  অনেকেই হয়ত শুনে অবাক হচ্ছেন যে এ কেমন কথা!  ইলেক্ট্রন আবার ভগ্নাংশ হয় নাকি! কোয়ান্টাম বলবিদ্যা অনুযায়ী ইলেক্ট্রন খুব ছোট বস্তু হওয়ার জন্য তাকে ক্লাসিকাল পদার্থ বলা যায় না। তাই সেই অর্থে সঠিক ভাবে এর অবস্থান এবং ভরবেগ নির্ণয় করা অসম্ভব। ঘনত্ব দিয়ে বোঝা যায় কিছুটা। যেহেতু ঘনত্বর ধারণা এখানে আনতে হয় তাই ভগ্নাংশ হিসবে ভাবতে অসুবিধা কোথায়। সুতরাং যেটা দাড়াচ্ছে যে প্রোটন ট্রান্সফার বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে H -এর ট্রান্সফার আয়ন বা পরমাণু হিসেবে নয়, বরং বলা ভালো তার মাঝামাঝি কোনো অবস্থায়।  শুনতে খুব কাল্পনিক শোনালেও এটিই বাস্তব আর বাস্তবকে অস্বীকার না করাই বোধহয় যুক্তিযুক্ত।

এসব জানার পর কি মনে হয়না যে প্রকৃতিকে যতটা সহজ ভাবা হয় তা ঠিক ততটাই কঠিন এবং মজার!  এসব মজার ঘটনা প্রতিমুহূর্তেই ঘটে চলেছে, আর তার কতটুকুই বা আমরা জানি বা বুঝি! 


সূত্র :

১. রবার্ট মুলিকেন, জার্নাল অব কেমিকাল ফিজিক্স, ১৯৫২, ৫৬, ৮০১–২২।

২. কোজি এন্ডো, জেমস হাইন্স, জার্নাল অব ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি A, ১৯৯৯, ১০৩, ১০৩৯৮-৪০৮।




ভিটামিনের এদিক সেদিক

রেজাউল করিম রাব্বি
বসুন্ধরা , ঢাকা , বাংলাদেশ

ভিটামিন শরীরের জন্য ভালো – এটা সবাই জানে। কিন্তু এর আবার মন্দ দিক? হ্যাঁ, সেটাও আছে বৈ কি! ভিটামিন খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আজকাল অনেকেই বেশ সচেতন। আসলে অধিকাংশ প্রকৃতিজাত খাদ্যবস্তুকে আমরা নানাভাবে শোধিত বা process করে, সংরক্ষণের জন্য জীবাণুনাশক রাসায়নিক পদার্থ যোগ করে, খাদ্যগত স্বাভাবিক ভিটামিনগুলোকে বহুলাংশে নষ্ট করে ফেলি। 
এ কারণেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনেক সময় ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণের চিন্তায় না গিয়ে শুধু স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে ভেবে আজকাল অনেকেই সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ভিটামিন খান মুড়ি-মুড়কির মতো করে। বিশেষ করে বি, সি এবং ই – এসব ভিটামিনগুলো। কিন্তু দেহের ভিটামিনের চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা করা উচিত খাদ্যের মাধ্যমে, ‘ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট’ গ্রহণের মাধ্যমে নয়। কেননা এতে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।

 

ভিটামিন বি

মেশিনে ছাঁটা অতিরিক্ত শোধিত চাল বাদ দিয়ে কম ছাঁটা চালের ভাত আর তার সাথে তুষযুক্ত আটার রুটি পরিমাণমতো খেলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায়। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে ‘বি-কমপ্লেক্স’ গোষ্ঠীভুক্ত ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খেলে, বিশেষ করে ভিটামিন বি-১ খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিতে পারে অ্যালার্জি। আবার অতিরিক্ত ভিটামিন বি-২ বা নিয়াসিন খেলে শুরু হতে পারে মাথাধরা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি।

 

‪ভিটামিন সি

মানুষ নিজদেহে ভিটামিন সি তৈরি করতে পারে না। তাই আলাদাভাবে এই ভিটামিন সি গ্রহণের প্রয়োজন হয়। এটা জেনে অনেকে ভাবেন যে শুধু খাদ্যের মাধ্যমে নয়, সাপ্লিমেন্ট হিসেবেও প্রচুর পরিমাণে বাড়তি ভিটামিন সি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ভিটামিন সি-এর দৈনিক প্রয়োজন যা তা ১ টুকরো পেয়ারা বা ১টি লেবু অথবা ২টি টমেটো কিংবা ১টা বড় কমলালেবু থেকেই পাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত সিন্থেটিক ভিটামিন সি খাওয়া আবার স্বাস্থ্যের জন্য বিপদজনক। কারণ এতে নষ্ট হয়ে যায় শরীরে অন্যান্য ভিটামিন এবং খনিজ লবণের ভারসাম্য।
তাছাড়া সিন্থেটিক ভিটামিন সি দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে দেখা দিতে পারে স্কার্ভি রোগ, মেয়েদের কিছু সমস্যা এবং অনেক ক্ষেত্রে বাতের আক্রমণ। ভিটামিন সি ঠাণ্ডা লাগা প্রতিরোধ করতে পারে, এমনকি ঠাণ্ডা লেগে গেলে তার স্থায়িত্বের সময়ও কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি-তেই এ কাজ সম্ভব। তাই যাদের খাদ্যে ভিটামিন সি-এর মারাত্মক অভাব তারা ওই ১০০ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম সিন্থেটিক ভিটামিন সি খেতে পারেন। কিন্তু এজন্য একবারে একগাদা ভিটামিন সি খাওয়া কোনোমতেই ঠিক নয়।

 

ভিটামিন ই

ভিটামিন ই পাওয়া যায় প্রচলিত সবরকম খাদ্যে। বিশেষ করে শস্যদানা এবং শাকপাতায়। বিজ্ঞাপনে বিশ্বাস করে অনেকেই মনে করেন যে, সিন্থেটিক ভিটামিন ই জরা প্রতিরোধ করে এবং হৃদরোগ হতে দেয় না। এগুলোর সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে যথেষ্টই।প্রকৃতপক্ষে ভিটামিন ই-এর অভাব ঘটেছে এরকম রোগীর খবর নেই বললেই চলে। কারণ একে তো এই ভিটামিন সাধারণ খাদ্যের মধ্যে যথেষ্টই আছে, তাছাড়া আমাদের দেহে এই ভিটামিন সঞ্চিতও থাকতে পারে দীর্ঘদিন ধরে।

ঢাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম রাব্বি University of Information Technology & Science এর প্রথম বর্ষের ছাত্র, পড়াশূনো করে কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে। সেই সাথে রহস্যময় বিজ্ঞান জগত নামে একটি ব্লগ চালায় কয়েকজনের সাথে।

প্রচ্ছদের ছবি : By Ragesoss (Own work) [http://creativecommons.org/licenses/by-sa/3.0“>CC BY-SA 3.0 or http://www.gnu.org/copyleft/fdl.html“>GFDL], via Wikimedia Commons




মৌমাছির খাবার খোঁজা

সুমন্ত্র সরকার
ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটি, ম্যাসাচুসেটস

পশু-পাখি, পোকা-মাকড় এরা খাবার পায় কোথা থেকে ? আমাদেরর মতো এদের তো আর পাড়ার মুদির দোকান নেই, তাই এদেরকে খাবার খুঁজতে হয় । খাবার খোঁজাকে ইংরেজীতে বলে ফোরেজিং (Foraging) । যেমন ধরো, তোমরা দূর্গাপুজোর সময় এগরোলের দোকান খুঁজে বেড়াও, খুঁজে বেড়াও কোথায় সবথেকে ভালো ফুচকা পাওয়া যায়, বা কুকুর-বিড়ালরা বাড়ি বাড়ি কাঁটাটা-কুটোটা খুঁজে বেড়ায়,একেই বিজ্ঞানীরা বলেন ফোরেজিং। মানুষ, কুকুর, বিড়ালরা এদের একলা-একলাই জীবন কাটে, বাঁচার জন্য সাধারণত এদেরকে কারোর ওপর নির্ভর করতে হয়না। তাই এইসমস্ত প্রাণীদের বিজ্ঞানীরা বলেন সলিটারী বা একান্তবাসী জীব। আবার, পিঁপড়ে-মৌমাছিরা একা একা কখনো বাঁচতে পারে না , একটা মৌমাছির চাকের বাসিন্দারা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই এদেরকে বলা হয় সোশ্যাল বা সামাজিক জীব। তোমরা হয়ত জানো যে একটা মৌমাছির চাকে মূলত তিন ধরণের মৌমাছি থাকে – রানী, পুরষ আর কর্মী মৌমাছি। রানী মৌমাছি আর পুরুষ মৌমাছির একমাত্র কাজ হলো বংশ বিস্তার করা। খাবার জোগাড়, ডিম-বাচ্চাদের লালন-পালন, মৌচাককে শত্রুদের থেকে রক্ষা করা, রানী-পুরুষ মৌমাছিদের পরিস্কার রাখা, এই সবকিছুরই দায়িত্ব হলো কর্মী মৌমাছিদের। স্বাভাবিক ভাবেই একটা কর্মী মৌমাছির পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়, তাই এক এক দল কর্মী-মৌমাছি তাদের কাজ ভাগ করে নেয়। আমি আজকে যাদের কথা বলব তাদের কাজ হল খাবার খোঁজা। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এদের বলে ফোরেজার বা জোগাড়ে মৌমাছি।

খাবার খোঁজার জন্য  প্রথমে অল্প কিছু মৌমাছি চারিদিকে উড়ে যায়। এবার ধরা যাক, মৌমাছি এমন একটা  পেল যাতে অনেক পরাগরেণু আছে। কিন্তু শুধু নিজে জানলেই তো হবে না, অন্যদেরকেও জানাতে হবে। তাই, এই মৌমাছিটা চাকে ফিরে যায়, আর গিয়ে একটা অদ্ভুত  নাচ নাচে,  যাকে বলে Waggle Dance। এই নাচের থেকে অন্যান্য মৌমাছিরা জেনে যায় একদম ঠিক কোথায় সেই ফুলটা খুঁজে পাওয়া যাবে। কার্ল ফন ফ্রিশ নামে এক অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী গত শতকের চল্লিশের দশকে এটা আবিষ্কার করেন এবং  এই ১৯৭৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু ফুলের অবস্থান বোঝানো তো সহজ ব্যাপার নয় মোটেই। চাক থেকে ফুলের অবস্থান বোঝানোর জন্য শুধু দূরত্ব বোঝালেই তো হবে না, চাকের কোন দিকে ফুলটা অবস্থিত, সেটাও তো জানা দরকার  অর্থাৎ ফুলের অবস্থান একটা ভেক্টর রাশি। কিন্তু একটা নাচের মাধ্যমে মৌমাছি এই অবস্থান বোঝায় কি করে ? ব্যাপারটা খুব আগ্রহজনক।

Honey Bee Waggle Dance

  মৌমাছির নাচ : মৌমাছিটি বাংলার ৪-এর আকারের একটি পথে বারবার ঘুরতে থাকে। মাঝের অংশটাতে মৌমাছিটি শরীরের পিছনের অংশটা পর্যায়ক্রমে নাড়াতে থাকে। ওই মাঝের অংশটি যেদিকে নির্দেশ করে সেই দিকেই ফুলটা থাকে । ছবি : Wikimedia

তোমরা জানো আলো হলো এক ধরণের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। তরঙ্গের একটা চুম্বকীয় ভাগ থাকে আর একটা বৈদ্যুতিক ভাগ থাকে এবং দুটি ভেক্টর রাশি। সুতরাং তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ একটি ভেক্টর তরঙ্গ , যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ বা transverse wave। যেহেতু এটা একটা ভেক্টর তরঙ্গ, তাই এর একটি দিকও থাকে, একে বলা হয় তরঙ্গটির Polarization ( সাধারণত বৈদ্যুতিক ভাগের দিককে polarization  হিসেবে ধরা হয় )। সূর্যের আলো যখন বায়ুমণ্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে প্রবেশ করে তখন বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগের আয়নগুলির প্রভাবে polarized হয়ে যায় এবং এই polarization-এর দিক সূর্যের দিকে হয় ! মানুষের চোখ সেটা ধরতে পারে না কিন্তু মৌমাছির পুঞ্জক্ষিতে তা ধরা পড়ে এবং আমরা যেভাবে ধ্রুবতারাকে দেখে দিক ঠিক করতে পারি সেইরকম মৌমাছিরাও সূর্যকে কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

এর পরের ব্যাপারটা কতকটা সহজ। ফুল খুঁজে পাওয়ার পর মৌমাছিটা চাকে ফিরে উপরের ছবির মত নাচ নাচে। পৃথিবীর অভিকর্ষ যেদিকে হয় ঠিক তার উল্টোদিককে ওরা সূর্যের দিক হিসেবে ধরে ; এইটা হলো ওদের দিকনির্ণয়ের মাপকাঠি। এরপর, মৌমাছিটি বাংলার ৪-এর মতো একটা পথে ঘুরে ঘুরে নাচতে থাকে আর মাঝের অংশটায় শরীরের পিছনের দিকটা নাড়াতে থাকে ( উপরের ছবির মতো , একেই বলে waggle dance )। আশে-পাশে যে সমস্ত মৌমাছিগুলো থাকে ওরা ওই মাঝের অংশতা লক্ষ্য করে। এই মাঝের অংশটা যেদিকে নির্দেশ করে ওটাই ফুলের দিক ! কিন্তু শুধু দিক বললেই তো হবে না, দূরত্বও তো জানাতে হবে।  এটাও ওই নাচের মাধ্যমেই বুঝতে পারে ! মৌমাছিটি মাঝের অংশের নাচটা যত বেশিক্ষণ ধরে নাচে, ফুলটাও তত বেশি দূরে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, এক সেকন্ড ধরে নাচলে ফুলটা মোটামুটি এক কিলোমিটার দূরে থাকে। মজার ব্যাপার হলো মৌমাছিদের দূরত্বের কোনো ধারণাই নেই, আছে শুধু সময়ের জ্ঞান। বেশিরভাগ প্রাণীর ক্ষেত্রেই সেটা সত্যি, এমনকি মানুষের ক্ষেত্রেও ! ভেবে দেখো, কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে যে , “ ভাই অমুকের বাড়িটা কোথায় রে ? ” আমরা কিন্তু বলিনা যে,    “ওই ৫০০ মিটার হবে।” বরং আমরা বলি, “বেশি না, এই দশ মিনিটের হাঁটা পথ।” উল্টোদিক থেকে খুব জোরে হাওয়া দিলে, মৌমাছির কোনো ফুলে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লাগে। তাই যখন হাওয়া দেয়, একই দূরত্বের জন্য মাঝের অংশের নাচটা মৌমাছিরা অনেক বেশি সময় ধরে নাচে। তাই, অন্য মৌমাছিদেরও ফুলে পৌঁছাতে কোনো ভুল হয় না। অবাক করার মত ব্যাপার ! তাই না ?

তথ্যসূত্র:

১) http://en.wikipedia.org/wiki/Polarization_%28waves%29
২)
Honeybee Waggle Dance Video




প্রথম চাষীর দল : পাতা কাটা পিঁপড়ে

অনিন্দিতা ভদ্র
আই. আই. এস. ই. আর.,কলকাতা

মানব সভ্যতার ইতিহাস বলে যে আমাদের আদি প্রজন্মের মানুষ ছিল যাযাবর। তারা ঘুরে ঘুরে শিকার করে, গাছের ফলমূল সংগ্রহ করে খিদে মেটাতো, আর তাই খাবারের খোঁজেই যাযাবরের জীবন কাটাতে হত তাদের। তারপর একসময় মানুষ আবিষ্কার করল যে তারা চাইলে কিছু বীজ রোপণ করে গাছ তৈরী করতে পারে, আর সেই গাছ দিতে পারে শস্য, ফল। চাষের জন্ম হল। মানুষ ঘর বাঁধতে শিখল। গড়ে উঠতে শুরু করল সমাজ, সভ্যতা। ভয় নেই, মানব সভ্যতার চেনা ইতিহাস নিয়ে গল্প করতে আমি বসিনি। আমি বলব আর এক সভ্যতার কথা। সভ্যতা বলাটা ঠিক হলনা অবশ্য, পিঁপড়েদের সমাজ আছে, সভ্যতা নেই – তাই বলা উচিত সমাজব্যবস্থা। কিন্তু পিঁপড়েদের গল্পে মানুষ ঢুকে পড়ল কেন ? কারণটা শুনতে সহজ, হজম করতে যদিও একটু কঠিন হতে পারে – আমি যাদের গল্প বলব, তারা চাষী পিঁপড়ে।

পিঁপড়েরা যে দল বেঁধে থাকে, মাটির নীচের বা গাছের খোঁদলের বাসায়, সে কথা অনেকেরই জানা। আবার তাদের বাসার বেশীর ভাগ অধিবাসীই যে শ্রমিক, আর মোটে একজন ( বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অল্প কয়েকজন ) রাণী, তা অনেকেরই অজানা নয়। এই শ্রমিক পিঁপড়েরা বাসা বানায়, সেই বাসা পরিস্কার রাখে, মেরামত করে, খাবার আনে, রাণী আর তার ছানাপোনাদের খাওয়ায়, বাসা পাহারা দেয়, এমনকি দরকার পড়লে বাসাবদল-ও করে, আর তখন নতুন বাসার জন্য সুবিধেজনক জায়গা খোঁজা থেকে শুরু করে বাসা তৈরী করে রাণীর হাজার হাজার কুঁচোকাঁচাকে ঘাড়ে করে বয়ে নতুন বাসায় নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সবকিছু করতে হয় তাদেরই। এককথায়, জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ আর কি ! এই সব ব্যস্তবাগীশ শ্রমিকদের সাথে প্রায়ই দেখা হয়ে যায় আমাদের, ঘরের দেওয়ালে, রান্নাঘরের তাকে, ঝুড়ি-চাপা মিষ্টির গায়ে, মেঝেতে, রাস্তায়, মাঠে, গাছের ডালে, ফুলের ভেতরে, কোথায় নয় ? মাঝে মাঝেই বেচারারা মারাও পড়ে আমাদের হাতে। অনেক লোক আমি এমনও দেখেছি, যাদের পিঁপড়ে দেখলেই মেরে ফেলতে ইচ্ছে করে। হয়ত কিছু একটা আদিম প্রবৃত্তি জেগে ওঠে এদের ভেতরে, সেই যখন মানুষ চাষবাস শেখেনি, সেই সময় কোনো ছোটোখাটো জীব দেখলেই হয়ত মেরে খাওয়ার জন্য মন আনচান করে উঠত, তেমন কোনো হাত-নিশপিষ করা ইচ্ছে। কিন্তু এমনও অনেক মানুষ আছে যাদের পিঁপড়েদের দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, জানতে ইচ্ছে করে এরা কেন সারাদিন এরকম ছুটে বেড়ায়, কিসের এত ব্যস্ততা এদের, কিসের জন্য এত কাজ করা ? অনেক বৈজ্ঞানিক এই ধরণের নানান প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন নানান প্রজাতির পিঁপড়েদের নিয়ে গবেষণা করে। সেই সব গবেষণার বিশদ বিবরণ না দিয়ে, আমি আজ এক ধরণের পিঁপড়ে নিয়ে গল্প করব। এদের সাধারণ ভাষায় বলা হয় leaf cutter ants বা পাতা কাটা পিঁপড়ে। মধ্য আর দক্ষিণ আমেরিকার দুই প্রজাতি মিলিয়ে ৩৯টি উপজাতি বা species-এর পিঁপড়েকে এই নাম দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে সব থেকে পরিচিত নাম হল Atta sexdens। সেই Atta-কে ধরেই তাহলে গল্পটা চলুক।

পানামার জঙ্গলে বেড়াতে গেলে একটা মজাদার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাবে সহজেই। সারি দিয়ে পাতার টুকরো হেঁটে চলেছে গাছের ডালের ওপর, নেমে যাচ্ছে মাটিতে, ঢুকে যাচ্ছে মাটির ঢিবির মধ্যে। একটু কাছে গিয়ে ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে যে প্রতিটা পাতার টুকরোকে আসলে ঘাড়ে করে বয়ে যাচ্ছে এক একজন পিঁপড়ে। Atta sexdens-এর বাসার বাইরে পাহারা দেয় যোদ্ধা বা soldier-রা। এরা সবচেয়ে বড় মাপের শ্রমিক,আর তেমনই বড় আর শক্ত এদের চোয়াল। বাসার আশেপাশে কাউকে হানা দিতে দেখলেই সেই চোয়ালের কামড়ে তাকে ঘায়েল করে দেয় যৌথভাবে। পাতা কেটে আনা আর মাটির নীচে গর্ত করার কাজ যাদের, তারা হল forager-excavator। এরা যোদ্ধাদের থেকে আকারে কিছুটা ছোট, কিন্তু এদের চোয়ালেও বেশ জোর, নাহলে মোটা, শক্ত পাতা কাটবে কি করে, আর মাটিই বা খুঁড়বে কি করে। মাটির তলায় ঢোকার আগে একবার বাসার বাইরেটা দেখে নেওয়া যাক।

জঙ্গলের মাঝখানে একটা বড়সড় ফাঁকা জায়গায় একটা মাটির ঢিবি। তার মাথার ওপর অনেকগুলো চূড়া ধরণের মুখ, অনেকটাই বাচ্চাদের তৈরী বালির দূর্গের (sand castle) চূড়ার মতো। এই অদ্ভূত গঠনের দুরকম উপযোগীতা : এক, বৃষ্টি হলে বেশী জল বাসার ভেতরে ঢুকতে পারবে না, কারণ ফুটোগুলো ছোট, আর দুই, বাসার ভেতরে বেশী গরম হয়ে গেলে মাঝের অপেক্ষাকৃত বড় মুখ দিয়ে গরম হাওয়া বেরিয়ে যাবে, আর পাশের ছোট ছোট মুখগুলো দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে আসবে – প্রাকৃতিক air conditioning system ! মাটির নীচে রয়েছে এদের বিস্তৃত বাসা। ছোট-বড় মিলিয়ে হাজার দুয়েক খোপ(chamber)- ছোটগুলো চাষের ঘর, আর বাসার বাইরের দিকের বড় খোপগুলো ময়লা ফেলার জায়গা। এই চাষের ঘরগুলোর মেঝেতে বিছিয়ে দেওয়া হয় পাতার সার। সেই সার তৈরী করার কাজ আর একদল শ্রমিকের। এরা আরো ছোট, বাসার বাইরে যায় না এরা কোনদিন। পাতা বয়ে আনার পর forager-দের কাজ শেষ। এবারে এই বাসার ভেতরে থাকা intranidal specialist-রা চাষের কাজে লেগে যায় সেই পাতা নিয়ে। পাতার টুকরো চিবিয়ে মন্ড করে তার সাথে মেশে পিঁপড়ের মল, অনেকটা যেমন আমরা গাছের গোড়ায় গোবর দিই তেমন। তারপর সেই সারের মধ্যে পুঁতে দেয় এক টুকরো fungus। না, যে কোনো fungus হলেই চলবে না, তাকে হতে হবে একটা বিশেষ প্রজাতির। অনেক বৈজ্ঞানিক মনে করেন যে সব প্রজাতির চাষী পিঁপড়েই Leucocoprinus gongylophorus-এর চাষ করে। ঠিক কোন প্রজাতির fungus তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এক বাসায় যে কখনো একাধিক রকমের fungus পাওয়া যায় না তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সবথেকে ছোট মাপের যে শ্রমিক, তারা হল নার্স-কাম-মালি। এদের কাজ রাণী আর তার কাচ্চাবাচ্চাদের খাওয়ানো, আর fungus-দের এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে রোপণ করা। তাছাড়া, মালি যেমন শুধু বীজ রোপণ করেই ক্ষান্ত হয় না, তার চারা গাছের আশেপাশে গজিয়ে ওঠা আগাছাদের উপড়ে ফেলে দিয়ে চারাদের বাড়তে সাহায্য করে, এই মালি-পিঁপড়েরাও তেমন আগাছা fungus দেখলেই সেগুলো উপড়ে ফেলে দিয়ে তাদের সাধের প্রজাতিটিকে ভেজালহীন অবস্থায় লালন করে। এদের এই নিখুঁত monoculture অনেক বৈজ্ঞানিককেই হিংসায় ফেলবে, কারণ bacteria বা fungus নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কোনো না কোনো ‘আগাছা’-র অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি এমন microbiologist বিরল।

এখানেই শেষ নয়। যাতে তাদের এই যত্নে লালন করা বাগানের ক্ষতি না হয়, তাই এই পিঁপড়েরা দিনের অনেকটা সময় ব্যয় করে একে অপরকে পরিস্কার করতে, রাণীকে পরিস্কার করে দিয়ে বাসা থেকে যতটা সম্ভব ময়লা সরিয়ে ফেলতে। গায়ের ময়লা পরিস্কার করে তারা জমিয়ে রাখে মুখের ভেতরে একটা থলেতে। ময়লা ফেলার ঘরগুলো বাসার বাইরের দিকে, সেখানে জমা করা হয় মৃতদের, যত এঁটোকাঁটা, চাষের ঘরের আবর্জনা, আর ওই মুখের ভেতরে জমে থাকা ধুলো-মাটির দানা। ওই ময়লা ফেলার ঘরে জমে থাকা সবকিছু আস্তে আস্তে মিশে যায় মাটির সাথে। পিঁপড়েদের কাজে না লাগলেও, এর থেকে লাভ হয় আশেপাশের গাছেদের। চাষী-পিঁপড়েদের বাসার ময়লা ফেলার ঘরে হানা দেয় গাছের শেকড়, শুষে নেই পুষ্টির উপাদান। প্রকৃতির চাকা ঘুরে চলে।

কিন্তু এত আয়োজন কি শুধুই শখের বাগান সাজাতে ? অবশ্যই নয়। পিঁপড়েদের সাথে fungus-দের এই অদ্ভূত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে আর সেই বন্ধুত্ব দিনে দিনে এমন প্রখর হয়ে উঠেছে যে একজনকে ছাড়া অন্যজনের বাঁচাই দায়। চাষী পিঁপড়েরা এভাবে সযত্নে পুষে রাখে বলেই এই fungus-রা শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বেঁচে থাকে। এক একটা Atta-র  বাসার আয়ু তার রাণীর আয়ুর সমান, মানে বছর কুড়ি। এই কুড়ি বছরে এইসব বাসা মাটির নীচে ৫০-৮০ লক্ষ শ্রমিক নিয়ে এক একটা রাজত্ব হয়ে ওঠে। আর এই শ্রমিকরা, তাদের রাণী আর তার কাচ্চাবাচ্চারা, সবার খাবারের ভাণ্ডার এই fungus-এর গায়ে তৈরী হওয়া gongylidium। এই প্রজাতির fungus-দের শরীরের এই বিশেষ অংশটি এদের নিজেদের কোনো কাজেই লাগে না, এই gongylidium-নামক অংশের একটাই কাজ – পিঁপড়েদের খাদ্য হওয়া ! নার্সরা fungus-এর ছোট ছোট টুকরো কেটে দেয় বাসার বাকিদের খাওয়ার জন্য, আর সেই টুকরো নিয়ে নিজেরা খাওয়ায় রাণী  আর তার বাচ্চাদের। এই fungus না পেলে Atta বা তাদের মতো অন্য পিঁপড়েরা বাঁচবে না, আর তাই  প্রিয় খাবারের অভাব না ঘটতে দেওয়ার জন্য চাষ করে এরা, আদিম মানুষ বা অন্যান্য পিঁপড়েদের মতো খাবারের খোঁজে ছুটে না বেড়িয়ে। প্রথম মানুষের জন্মের বেশ কয়েক কোটি বছর আগে থেকেই এই ক্ষুদে চাষীরা সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে মাটির নীচে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কতজন তার খবর রাখে ?

ছবি : The Telegraph, UK




মায়েরা যেমন হয় – কুমোরে পোকার সন্তান পালন

অনিন্দিতা ভদ্র
আই. আই. এস. ই. আর., কলকাতা

কালচে রঙের কিছুটা বড় মাপের তন্বী বোলতা, ভীষণ ব্যস্তভাবে যাতায়াত করছে ঘরের ভেতরে। তার টারগেট হল আমাদের loft-এ রাখা একটা খালি বাক্স। একটু ভালো করে দেখলেই বোলতা রমণীর মুখে ধরে থাকা মাটির দানা দেখা যাবে। বোলতাটি কুমোরে পোকা বা potter wasp। কিছু কুমোরে পোকা মাটি দিয়ে ভরে দেয় প্লাগ পয়েন্টের গর্ত, আবার কেউ কেউ দেওয়ালের খাঁজে, টেবিলের তলায়, ফেলে রাখা কাগজপত্র বা বাক্স ইত্যাদির গায়ে তৈরী করে ছোট্ট সুন্দর বাসা। আমদের loft-এ একটা পুরনো ব্যাগ অনেকদিন রাখা ছিল একসময়, কারণ তার বিভিন্ন খাঁজে ছিল ডজন খানেক কুমোরে পোকার বাসা। এই বাক্সটার দেওয়ালে ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে বাসার আধখানা, একটা ক্ষুদে বাটির মতো।

জীব জগতে বাসা তৈরী করা হয় প্রধাণতঃ সন্তান পালনের জন্য। বাসা তৈরীতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে পাখিরা। ডিম পাড়ার সময় হলে পাখি দম্পতিরা ব্যস্ত হয়ে ওঠে আগামী প্রজন্মকে নিশ্চিন্ত আশ্রয় গড়ে দেওয়ার চেষ্টায়। বাসার কথা ভাবলে আর যাদের কথা মনে পড়ে, তারা হল মৌমাছি, পিঁপড়ে, আর উইপোকারা। এদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেও বোলতারা সচরাচর ধর্তব্যের মধ্যেই আসে না। অথচ তারা কিন্তু মৌমাছি বা পিঁপড়েদের থেকে খুব পিছিয়ে নেই।  যে সব বোলতারা  সামাজিক তাদের কথা ছেড়ে দিলেও এই কুমোরে পোকারা মাতৃত্বের এক সুন্দর নিদর্শন।

মা বোলতাকে কেউ শিখিয়ে দেয় না কি করে বাসা তৈরী করতে হয়। সবকিছুই programmed হয়ে থাকে gene-এ।  প্রকৃতিতে এদের বিবর্তন এমন ভাবেই ঘটেছে যে মা-বোলতা ‘জানে’ তার কি কাজ। বাসা বানাবার উপযুক্ত মাটি খুঁজে এনে তাকে লালা দিয়ে ভিজিয়ে নরম করে একটু একটু করে গড়ে তুলতে হবে ঘটের মতো ছোট্ট বাসা। বাসা যখন প্রায় তৈরী, তখন খুঁজতে হবে নধর কোনো গুটিপোকা (caterpillar)। এই পোকাকে সে হুল ফুটিয়ে অসাড় করে ভরে দেবে বাসার মধ্যে, তার গায়ে নিজের ডিম পেড়ে আরও মাটি এনে বাসার মুখ বন্ধ করে দেবে। অসাড় গুটিপোকা বেঁচে থাকবে কিন্তু পালাতে পারবে না। কোনো কোনো কুমোরে পোকা একাধিক গুটিপোকা এনে বাসাকে বোঝাই করে, কেউ একই বাসায় অনেক ডিম পাড়ে, কেউ আবার আলাদা আলাদা বাসা তৈরী করে প্রতিটা ডিমের জন্য। বাসার মুখ বন্ধ করে দিয়ে উড়ে যায় বোলতা- মা।

তারপর ? সন্তানদের জন্য রসদ জোগাড় করে, তাদের সুরক্ষিত করে কাহিল হয়ে পড়া মা মারা যায়। ডিম ফুটে বের হয় ছোট্ট larva-ছানারা। প্রজাপতিদের মতো এদেরও ডিম ফুটে বের হয় গুটিপোকা, যাদের কাজ শুধু খাওয়া আর বেড়ে ওঠা। বাড়তে বাড়তে যখন বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়, তখন এক সময় নিজেরাই বুনে নেই গুটি, তার ভেতরে নানারকম শারীরিক পরিবর্তনের (metamorphosis) পর বেরিয়ে আসে প্রাপ্তবয়স্ক পোকারা। বোলতা-মা’র জুগিয়ে যাওয়া রসদ খেয়ে বেড়ে ওঠে larva-রা, সময় মত তৈরী করে cocoon (গুটি )। শেষে মাটির দূর্গ ভেঙে বেরিয়ে আসে বোলতা স্ত্রী-পুরুষেরা।  বেরিয়েই তারা খুঁজে নেয় একে অন্যকে, গন্ধ দিয়ে, মিলিত হয়। প্রকৃতিতে এদের জীবনযাত্রা খুবই হিসেবী , অপচয় খুব কম – পুরুষদের প্রয়োজন ফুরোলে তাদের জীবনও শেষ হয়ে যায়। দিনের আলোয়, খোলা হাওয়ায় উড়ে বেড়াবার সময় তাদের খুবই সীমিত। সদ্য আলো দেখা মা- বোলতাদের সামনে তখন অনেক কাজ – নিজের সন্তানদের ভবিষ্যত গড়ে দিয়ে যেতে হবে তাকে, যেমন তার জন্য দিয়েছিল তার মা।   

ছবি : নাতাশা মাহত্রে