বাংলার কীট-পতঙ্গ -গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭৫

image_print

ছবি : তরুণ কর্মকার, এন. সি. বি. এস., ব্যাঙ্গালোর

নিশাচর প্রজাপতি

শিশুসুলভ খেয়ালের বশে কিছু দিন মাটির খুরি চাপা দিয়ে রাখবার পর একটা শোঁয়াপোকা ফড়িং হয়ে গেছে, সমবয়সীর এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শুনে বিস্ময় বোধ করলেও ঘটনাটা সম্পুর্ণ বিশ্বাস করতে পারি নি। অলক্ষ্যে দৈবাৎ একটা ফড়িং ঢাকনার নিচে চাপা পড়া আশ্চর্য নয় এবং কোনও গতিকে হয়তো শোঁয়াপোকাটা বের হয়ে গিয়েছিল। কোনও ঘটনা বোধগম্য না হলে এরূপ সিদ্ধান্ত করা স্বাভাবিক। তথাপি প্রত্যক্ষদর্শীর দৃঢ় উক্তিও একেবারে উপেক্ষা করা চলে না। কিন্তু কেমন করে এরূপ একটা ঘটনা সম্ভব হতে পারে ? কারণ ফরিঙের সঙ্গে শোঁয়াপোকার কোনও সাদৃশ্য বা সম্বন্ধ খুঁজে পাওয়া যায় না। পরীক্ষার সাহায্য সাহায্যে সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করা ব্যতীত এ সম্বন্ধে কৌতূহল নিবৃত্তির অন্য কোনও উপায় ছিল না, অথচ শোঁয়াপোকা সম্বন্ধে একটা ভয়মিশ্রিত ঘৃণা এই সাধারণ পরীক্ষা সম্পাদন করবার পক্ষে যথেষ্ট অন্তরায় হয়ে উঠেছিল। একবার গাছে চড়তে গিয়ে হাতের নিচে কী যেন নরম নরম বোধ হল। চেয়ে দেখি – ভীষণ দৃশ্য। প্রায় দু-তিন ইঞ্চি লম্বা অসংখ্য শোঁয়াপোকা গায়ে গায়ে ঠেসাঠেসি করে গাছের গুঁড়ির খানিকটা অংশ ঘিরে রয়েছে।গায়ের রং ঠিক গাছের বাকলের রঙের মতো – চট করে কিছুই বোঝবার উপায় নেই। হাত লাগা মাত্রই সাপের মতো ফণা তুলে এক প্রকার অস্ফুট শব্দ করতে লাগলো। এই বিষাক্ত প্রাণীগুলি পূর্ববঙ্গে ‘ছেঙ্গা-বিছা’ নামে পরিচিত।

এদের  শোঁয়াগুলি হাতে বিঁধে কয়েক দিন অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিলো। এই ঘটনা থেকেই শোঁয়াপোকা সম্বন্ধে একটা বিজাতীয় ঘৃণা ও ভয় যেন বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিলো। কাজেই সন্দেহ ভঞ্জনার্থ পরীক্ষা করাও হয়ে ওঠে নি। অবশেষে দৈবাৎ একদিন প্রায় আড়াই ইঞ্চি লম্বা কালো রঙের একটা শোঁয়াপোকা নজরে পড়লো। সেটাকে ছোট একটা বাটি চাপা দিয়ে রেখে দিলাম। দিন তিনেক পরে বাটি তুলে দেখি – যেমন শোঁয়াপোকা তেমনই রয়েছে। পাত্রটার একপাশে সে গুটিসুটি হয়ে বসেছিল। ফড়িং হবার কাহিনী সম্বন্ধে অবিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। আর পাঁচ-সাত দিন কাটবার পর ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম। প্রায় মাস খানেক পর হঠাৎ একদিন বাটিটা নজরে পড়ায় তুলে দেখি – অবাক কান্ড ! শোঁয়াপোকার চিহ্নও নেই। ডানার উপর লাল ও হলদে রঙের ডোরাকাটা প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা ধূসর বর্ণের প্রজাপতির মতো একটা পতঙ্গ চুপ করে বসে আছে। ধরবার চেষ্টা করতেই উড়ে গেলো। বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলাম! এমন একটা বিদঘুটে শোঁয়াপোকা কেমন করে একটা পতঙ্গে রূপান্তরিত হলো কিছুই স্থির করতে পারলাম না, তবে এটুকু বুঝলাম যে, শোঁয়াপোকার এরূপ রুপান্তর পরিগ্রহণ অসম্ভব নয়। তবে শোঁয়াপোকা ফড়িং হয় না, প্রজাপতির মতো পতঙ্গের আকৃতি ধারণ করে।

<আগের পাতা                                                                                                               পরের পাতা>

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সংকলন

image_print

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53