বাংলার কীট-পতঙ্গ -গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭৫

image_print

ছবি : Butterflies of India
URL : Saji, K. and G. Mohan. 2014. Euripus consimilis Westwood, 1850 – Painted Courtesan. In K. Kunte, S. Kalesh & U. Kodandaramaiah (eds.). Butterflies of India, v. 2.10. Indian Foundation for Butterflies.

শোঁয়াপোকার মৃত্যু অভিযান

লেমিংস্ নামক ইঁদুরের মতো এক জাতীয় প্রাণী পাহাড় -পর্বতের আশে-পাশে দলবদ্ধ ভাবে বাস করে। এতো দ্রুতগতিতে এদের বংশবৃদ্ধি ঘটতে থাকে যে, কিছুদিনের মধ্যেই  চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রীষ্মকালীন প্রখর রোদের তাপে ঘাসপাতা শুকিয়ে গেলে তাদের মধ্যে দারুণ খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তখন হঠাৎ একদিন দেখা যায়, তারা যেন পরামর্শ করে – শীত নেই, রোদ নেই এবং খাদ্যের অভাব নেই – এমন এক অজানা কল্পিত সুখের রাজ্যের অভিমুখে ছুটতে থাকে। পাহাড় -পর্বত, নদ-নদী, শহর-বন্দর অতিক্রম করে লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি লেমিংস্ দলে দলে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শত-সহস্র বাধাবিঘ্ন, প্রাকৃতিক বিপ্লব, নানাবিধ শত্রুর আক্রমণ – কিছুই এদের অগ্রগতি প্রতিরোধ করতে পারে না। জীবন থাকতে এইরূপ অজানা কোনো সুখের রাজ্যে, পৌঁছুতে না পারলেও সম্মুখের দিকে অগ্রসর হতে হতে অবশেষে সমুদ্রে এসে উপস্থিত হয়। সমুদ্রই হোক বা যা কিছুই হোক – কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই, অগ্রসর হতেই হবে। যতক্ষণ সমুদ্রের ঢেউ তাদের অতলে নিমজ্জিত না করে অথবা সামুদ্রিক হিংস্র প্রাণীর কুক্ষিগত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সাঁতরে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।  অদ্ভুত এদের সংস্কার। এই সংস্কারের দ্বারাই হয়ত প্রকৃতি প্রাণী-জগতের ভারসাম্য রক্ষা করছে।

ক্যারিবু নামক এক জাতীয় হরিণের মধ্যেও এই ধরনের অদ্ভুত সংস্কার দেখা যায় তাদের চারণভূমিতে কোনো প্রাকৃতিক উত্পাত অথবা খাদ্যাভাবের আশঙ্কা দেখা দিলেই হাজার হাজার হরিণ দলবদ্ধ হয়ে কোনো এক কল্পিত নন্দনকাননে উপনীত হবার জন্যে নদ-নদী, পাহাড়- পর্বত সব রকম বাধাবিঘ্ন অগ্রাহ্য করে অগ্রসর হতে থাকে। কবে যে এদের যাত্রাপথ সমাপ্ত হবে তা জানে না – বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই, অভিযান চলতে থাকে – এমনি দৃঢ় একটা সংস্কার।

শ্রেষ্ঠতম প্রানীদের মধ্যেও অনুরূপ দৃষ্টান্ত বিরল নয় ! মানুষ, পশু,পাখি প্রভৃতি প্রাণীদের মধ্যেও যাযাবর বৃত্তি অনেক ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া যায় এমন কী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিম্নশ্রেনীর কীট- পতঙ্গের মধ্যেও। কিন্তু কাল্পনিক সুখের আশায় (একমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী ছাড়া ) লেমিংসের মত মহাযাত্রার এরূপ দৃষ্টান্ত বোধ হয় উন্নত বা অবনত সকল শ্রেণীর প্রাণীর মধ্যে একান্ত বিরল। কিন্তু সম্প্রতি কীট-পতঙ্গ শ্রেণীর এক জাতীয় শোঁয়াপোকার লেমিং-এর মত মৃত্যু অভিযান প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ ঘটেছিল। গ্রীষ্মের প্রারম্ভে আমাদের দেশীয় জবা বা কাঁঠালী চাঁপা প্রভৃতি গাছের পাতার নীচের দিকে ঈষৎ সবুজাভ শাদা রঙের এক জাতীয় শোঁয়াপোকা দেখতে পাওয়া যায়। এরা মথ জাতীয় এক প্রকার কালো রঙের প্রজাপতির বাচ্চা। পাতার গায়ে প্রজাপতি একসঙ্গে ২০-২৫ টা ডিম পেড়ে রেখে যায়। দশ-বারো দিন পরে ডিম ফুটে ছোট ছোট শোঁয়াপোকা বেরিয়ে এসে একসঙ্গেই অবস্থান করে। এক-একটা গাছে এরূপ পাঁচ-সাতটা বা আরও বেশি বিভিন্ন দল দেখতে পাওয়া যায়। এরা দলবদ্ধ ভাবেই গাছের পাতা খেয়ে নিঃশেষ করে দেয় – কখনো দলছাড়া হয়ে ইতস্তত ছড়িয়ে পরে না। খুব ছোট অবস্থায় যখন এক ডাল থেকে অন্য ডালে যাবার প্রয়োজন হয়, তখন মাকড়সার মত মুখ থেকে সুক্ষ্ম সুতা বের করে ঝুলে পড়ে অন্যত্র যাতায়াত করে – সকলেই একসঙ্গে সুতা ছেড়ে কতকটা জালের মত যাতায়াতের রাস্তা সৃষ্টি করে বলে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় না, সহজেই অন্যত্র গিয়ে একসঙ্গে জড়ো হতে পারে।

< আগের পাতা                                                                                                            পরের পাতা>

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সংকলন

image_print

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53