বাংলার কীট-পতঙ্গ -গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭৫

image_print

পিঁপড়ের লড়াই

কীট-পতঙ্গের মধ্যে পিঁপড়েদের জীবনকাহিনী খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। এরা সামাজিক প্রাণী এবং দলবদ্ধভাবে বাস করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণীর বহু পিঁপড়ের সন্ধান পাওয়া  গেছে। বিভন্ন জাতের অধিকাংশ দলেই সাধারণত স্ত্রী , পুরুষ ও কর্মী – এই তিন শ্রেণীর পিঁপড়ে দেখতে পাওয়া যায়। কোনও কোনও জাতের কর্মীদের আবার ছোট কর্মী, বড় কর্মী ও যোদ্ধা এই তিনরকমের বিভিন্ন আকৃতি বিশিষ্ট পিঁপড়ে দেখা যায়। বাসগৃহ নির্মাণ, খাদ্যসংগ্রহ, সন্তানপালন – এমন কী, যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত যাবতীয় কাজ ক্রীতদাসের মতো এই কর্মীদেরই করতে হয়। স্ত্রী ও পুরুষ পিঁপড়ের একমাত্র কাজ বসে বসে খাওয়া এবং বংশবৃদ্ধি করা। আমাদের দেশেও বিভিন্ন জাতীয় বহুবিধ পিঁপড়ে দেখতে পাওয়া যায়। কোনো কোনো জাতের  পিঁপড়ের দলে হাজার হাজার কর্মী থাকে ; আবার কোনো কোনো জাতের পিঁপড়ের দলে কর্মীর সংখ্যা ত্রিশ-চল্লিশটি মাত্র। অধিকাংশ পিঁপড়েই গর্তের মধ্যে অথবা বৃক্ষ-কোটরে বাস করে থাকে। আবার কেউ কেউ বড় গাছের উপরে সবুজ পত্র-পল্লবের সাহায্যে বাসগৃহ নির্মাণ করে বসবাস করে। উগ্র প্রকৃতি ও বিষাক্ত দংশনের জন্যে নালসো নামে এক জাতীয় লাল রঙের পিঁপড়ে আমাদের দেশে সর্বজন পরিচিত। হাজার হাজার নালসো এক বাসার মধ্যে একসঙ্গে বাস করে। বাসস্থান নির্মাণ, খাদ্য-সংগ্রহ ও যুদ্ধবিগ্রহের সময় এরা যেরূপ বুদ্ধিবৃত্তির পরিচয় দেয়, তা কতকটা সংস্কারমূলক হলেও এতে সহজেই তাদের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।

নালসো-পিঁপড়েরা গাছের উঁচু ডালে অনেকগুলি সবুজ পাতা একসঙ্গে জুড়ে বড় বড় গোলাকার বাসা নির্মাণ করে এবং তার মধ্যে শত শত পিঁপড়ে একসঙ্গে বসবাস করে থাকে। এদের বাসা নির্মাণপ্রণালী অতি অদ্ভুত। কতকগুলি নালসো কর্মী একসঙ্গে পাশাপাশি ভাবে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পরস্পর সন্নিহিত দুটি পাতাকে একত্রিত করে টেনে ধরে রাখে। তখন অপর কর্মীরা তাদের কীড়া মুখে করে উপস্থিত হয়। শুঁড়ের সাহায্যে এই কীড়াগুলির মুখের কাছে সুড়সুড়ি দিলেই তারা এক প্রকার আঠালো সুতা বের করতে থাকে। কাপড় বোনবার সময় তাঁতিরা যেমন একবার এদিকে আবার ওদিকে মাকু চালায়, কতকটা সেই কায়দায় কর্মীরা কীড়াগুলির মুখ একবার এ-পাতায় আবার ও-পাতায় ঠেকিয়ে সূক্ষ সুতার সাহায্যে পাতার ধারগুলি জুড়ে দেয়। এইরূপে বুনন শেষ হলে বড় বড় ফাঁকগুলিকে বারবার সুতা বুনে সাদা কাগজের মতো পাতলা পর্দায় ঢেকে দেয়। বাইরে বেরোবার জন্যে একটি কী দুটি মাত্র পথ রাখে। পাতার পর পাতা জুড়ে ক্রমশ বাসা বড় করে তোলে। বাসা বড় করবার জন্যে যদি কোনও সময়ে একটু দূরবর্তী নিচের ডাল থেকে পাতা নেবার প্রয়োজন হয়, তখন এরা দলে দলে বাসার নিচের দিকে জড়ো হতে হতে পরস্পর একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে শিকলের মতো নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। ক্রমে ক্রমে অপরাপর কর্মীরা এসে সেই শিকল বাড়াতে বাড়াতে সর্বশেষ পাতার নাগাল পেলেই কয়েকজন সেটাকে কামড়ে ধরে থাকে। অপর কর্মীরা তাদের পা কামড়ে ধরে।

< আগের পাতা                                                                                                             পরের পাতা >

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সংকলন

image_print

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53