বাংলার কীট-পতঙ্গ -গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭৫

image_print

ছবি : এফিডিয়াস কোলেমানি

নেউলে পোকার জন্ম রহস্য

 

গবেষণাগার-সংলগ্ন উদ্যানে একদিন লজ্জাবতী লতার সংকোচন সম্পর্কে একটা বিশেষ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলাম। বেলা তখন দ্বিপ্রহরের কাছাকাছি। উদ্যানের পাশেই ছোট ছোট আয়াপানের গাছ সারবন্দিভাবে লাগানো হয়েছে। হঠাৎ নজরে পড়লো – প্রায় দেড় ইঞ্চি লম্বা ধূসর বর্ণের একটা শোঁয়াপোকা আমার পাশ দিয়ে অতি দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। অস্বাভাবিক গতিভঙ্গির জন্যে পোকাটার উপর নজর না দিয়ে উপায় ছিল না। কাছেই ছিল আয়াপানের ঝোপ। মনে হলো যেন রোদের প্রখর তাপ সহ্য করতে না পেরে সে আয়াপানের গাছগুলির দিকেই ছুটে যাচ্ছে। যাহোক, পোকাটা আমাকে অতিক্রম করে অগ্রসর হয়ে একটা আয়াপানের পাতার উপর উঠে পড়লো এবং দম নেবার জন্যেই যেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর আবার এ-পাতা ও-পাতার উপর অস্থিরভাবে ছুটাছুটি আরম্ভ করে দিল।  ছুটাছুটি করলেও তার গতিবেগ যে ক্রমশ মন্দীভূত হয়ে আসছে – এটা পরিষ্কারভাবেই মনে হচ্ছিল। প্রায় দশ – বারো মিনিট ইতস্তত ছুটাছুটি করবার পর একটা পাতার উপর সে নির্জীবের মতো চুপ করে রইলো। চলবার সময় শোঁয়াপোকার শরীর অনেকটা প্রসারিত হয়ে থাকে, কিন্তু নিশ্চলভাবে অবস্থান করবার সময় যথেষ্ট সংকুচিত হয়ে পড়ে ! এক্ষেত্রেও দেখা গেল – শোঁয়াপোকাটার শরীর ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে। আধ ঘন্টাকাল এভাবে কাটবার পর কাঠি দিয়ে একটু নেড়ে দেখলাম – পোকাটার জীবনস্পন্দন রয়েছে বটে, কিন্তু তার আর নড়াচড়া করবার ক্ষমতা নেই। কিছুকাল পূর্বেই গতিবেগে জীবনী -শক্তির যে প্রাচুর্য লক্ষ করেছিলাম, অকস্মাৎ এমন কি ঘটলো, যাতে সে একেবারে নির্জীব হয়ে পড়লো ? পুত্তলীতে রূপান্তরিত হবার কিছুকাল পূর্বে এই জাতীয় শোঁয়াপোকা কিছুকাল নিষ্ক্রিয়ভাবে অবস্থান করে বটে, কিন্তু গুটি বাধবার জন্যে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন মুখ দিয়ে গায়ের শোঁয়াগুলিকে ছিঁড়ে ফেলে এবং মুখ-নিঃসৃত আঠালো সুতার সাহায্যে শরীরের চতুর্দিকে ডিম্বাকৃতি আবরণী গড়ে তোলে। এই আবরণীই হলো শোঁয়াপোকার গুটি। যথেষ্ট সময় অতিবাহিত হলেও এক্ষেত্রে কিন্তু সেরূপ গুটি নির্মাণের কোনই লক্ষণ দেখা গেল না। তবে কি এটা খোলস পরিবর্তনের পূর্বাভাস ? খোলস পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করবার জন্যে কৌতূহল তীব্র হয়ে উঠলো। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবার পর দেখা গেল – শোঁয়াপোকার শরীরের চামড়া ভেদ করে তিন – চার মিলিমিটার লম্বা সুতার মতো সূক্ষ্ম একটি কীড়া, শোঁয়াগুলির উপরে উঠে এসে ঠিক জোঁকের মতো এদিক-ওদিক শুঁড় আন্দোলন করতে লাগলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও তিন-চারটা কীড়াকে একই ভাবে কিলবিল করে শোঁয়াগুলির উপরে উঠে আসতে দেখলাম। আট-দশ মিনিটের মধ্যেই আরও প্রায় বিশ-পঁচিশটা পোকা শরীরের নানা স্থান থেকে বেরিয়ে এলো। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, একটি কীড়াও  শোঁয়াপোকাটার দেহ থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়েনি এবং প্রত্যেকটিই শোঁয়াগুলির উপরিভাগে অবস্থান করে শরীরের সূক্ষাগ্র ভাগ উর্ধ্বদিকে প্রসারিত করে কেবলই চতুর্দিকে সঞ্চালন করছিল। মাছ, মাংস বা ময়লা পচে গেলে যেরূপ পোকা উত্পন্ন হয়, এই কীড়াগুলি দেখতে প্রায় সেরকম, কিন্তু আকারে অনেক ছোট। শোঁয়াপোকার শরীর ভেদ করে বের হবার পর কীড়াগুলি শোঁয়া আঁকড়ে অনবরত মস্তক আন্দোলন করছে কেন – তার কারণ বুঝতে না পেরে ব্যাপারটা লক্ষ করতে লাগলাম। সাত-আট মিনিটের মধ্যেই দেখা গেল প্রত্যেকটি কীড়ার শরীরের চতুর্দিকে যবের দানার চেয়ে ছোট ছোট সাদা ডিম্বাকৃতির আবরণী গড়ে উঠেছে। বুঝতে বাকি রইল না যে, পোকাগুলি কোনো এক প্রকার পতঙ্গের বাচ্চা; পুত্তলীতে রূপান্তরিত হবার পূর্বে নিরাপদে অবস্থান করবার জন্য গুটি বাঁধছে। প্রায় মিনিট দশেকের মধ্যেই  ছোট ছোট শ্বেতবর্ণের গুটিতে শোঁয়াপোকার শরীরটা প্রায় ঢেকে গেল। শোঁয়াপোকাটাকে নাড়াচাড়া দিয়ে দেখলাম জীবনের কোনো চিহ্নই নেই। গুটি থেকে কিরূপ পতঙ্গ বের হয়, দেখবার জন্যে গুটিসমেত শোঁয়াপোকাটাকে একটা কাচের পাত্রে আবদ্ধ করে রাখলাম। দিন দশেক পরে দুপুরবেলায় একদিন দেখা গেল – গুটির এক পাশে ক্ষুদ্র ছিদ্র কেটে ক্ষুদে  পিঁপড়ের মতো কালো রঙের একপ্রকার ডানাওয়ালা পতঙ্গ বেরিয়ে আসছে। সবগুলি গুটি থেকে পতঙ্গ বেরিয়ে আসতে প্রায় দু-দিন লেগে গেল। এই ক্ষুদ্রকায় ডানাওয়ালা পতঙ্গগুলি এক জাতীয় নেউলে-পোকা। এই ঘটনার পর অনেক দিনের চেষ্টায় এই জাতীয় নেউলে-পোকাকে শোঁয়াপোকার গায়ে হুল ফুটিয়ে ডিম পাড়তে দেখেছিলাম। শোঁয়াপোকা যখন আহারে ব্যস্ত থাকে তখন নেউলে-পোকা অকস্মাৎ উড়ে এসে তার গায়ের উপর বসে এবং দেহের পশ্চাদ্দেশে অবস্থিত হুলের মতো ডিম পাড়াবার যন্ত্রটি তার দেহে প্রবেশ করিয়ে ডিম পেড়ে যায়। দেহে ডিম প্রবিষ্ট হবার দিন-কয়েক পর্যন্ত  শোঁয়াপোকাটা  কতকটা স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করে থাকে ; আসন্ন মৃত্যুর কথা সে মোটেই বুঝতে পারে না। পাঁচ-সাত দিন পর যখন পোকাগুলি শরীরের সারাংশ চুষে খেয়ে বাইরে আসবার চেষ্টা করে তখন শোঁয়াপোকা যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে ছুটাছুটি আরম্ভ করে দেয়। এর পরই সব শেষ।

কলকাতার  কোনও  একটি বাড়ির প্রাঙ্গনে মাঝারিগোছের একটা শিউলি গাছের পাতায় দেড়  ইঞ্চি লম্বা ধূসর বর্ণের একটা কাঁকড়া-মাকড়সা থলির মতো বাসা নির্মাণ করে ডিম পেড়েছিল।  কয়েক দিন ধরেই তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলাম। অধিকাংশ সময়ই মাকড়সাটা ডিম আগলে বসে থাকত, বাসা ছেড়ে বেশি দূরে যেত না।  বেলা প্রায় চারটার সময় একদিন দেখা গেল মাকড়সাটা  বাসার বাইরে পাতার এক প্রান্তে চুপ করে বসে আছে।  কতক্ষণ এভাবে বসেছিল বলতে পারি না। কিছুক্ষণ বাদে ঘুরে এসে মাকড়সাটাকে সেই স্থানে একইভাবে অবস্থান করতে দেখলাম। কিন্তু এবার একটা অদ্ভূত দৃশ্য নজরে পড়ল।  অনেকটা কুমোরে-পোকার মতো দেখতে প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা একটা সরু লিকলিকে পোকা মাকড়সাটার মাথার উপর এদিক-ওদিক কয়েকবার উড়ে কিছুক্ষণের জন্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।  মাকড়সাটা বোধ হয় কোনও বিপদের আভাস পেয়েছিল। কারণ শেষ মুহূর্তে পোকাটা যখন তার কাছ ঘেঁষে চলে যায়, তখনই সে তরিদ্বেগে ছুটে গিয়ে তার বাসার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে।  পাঁচ-সাত মিনিট নিঃশব্দে কাটবার পর পোকাটা হঠাৎ আবার কোথা থেকে উড়ে এসে মাকড়সার বাসাটার ঠিক উপরেই অবতরণ করলো। শরীরের পশ্চাদ্দেশ অদ্ভূত ভঙ্গিতে সঞ্চালন করতে করতে পোকাটা বাসার চতুর্দিকে ঘুরেফিরে দেখবার পর বাসার এক মুখ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। বলা বাহুল্য যে, সব রকমের মাকড়সারা শিকার ধরবার জন্যে জাল পাতে না।  তাদের বাসায় প্রবেশের জন্যে অথবা বহির্গমনের জন্যে দুটি করে পথ থাকে। পোকাটা বাসার ভিতরে সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ করতে না করতেই মাকড়সাটা  অন্য মুখ দিয়ে যেন ছিটকে বাইরে এসে পড়লো এবং আত্মগোপন করবার জন্যে পাতার তলার দিকে আশ্রয় গ্রহণ করলো। পোকাটাও তার পিছনে বাইরে এসে থেমে থেমে কতকটা কতকটা যেন নৃত্যের ভঙ্গিতে তাকে খুঁজতে লাগলো। পাতার নীচের দিকে যাওয়ামাত্রই মাকড়সাটা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে উপরে উঠে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই পোকাটা এসে তার পিঠের উপর চেপে বসলো এবং দেহের পশ্চাদ্ভাগ ধনুকের মতো বাঁকিয়ে ক্ষুদ্র একটি ডিম পেড়ে সরে পড়লো। চক্ষের নিমেষেই এতগুলি কান্ড ঘটে গেল।

পোকাটা উড়ে যাবার পর মাকড়সাটা  যেন কতকটা অভিভূতের মতো ধীরে ধীরে তার বাসায় প্রবেশ করলো। পরের দিন সকালে গিয়ে মাকড়সাটাকে দেখতে পাওয়া গেল না। বাসার ভিতরেই রয়েছে স্থির করে পাতাটাকে একটু নাড়া দিতেই মাকড়সাটা বাইরে এসে পাতার মধ্যস্থলে এক স্থানে চুপ করে বসে রইলো। দেখা গেল পিঠের ওপরের গতকালের ক্ষুদ্র সাদা পদার্থটি এখন একটা সর্ষের দানার মতো বড় হয়েছে। ব্যাপারটা পরিষ্কার অনুধাবন করতে না পেরে অতি সন্তর্পণে পাতাসমেত মাকড়সাটিকে কাচের পাত্রে বন্দী করে পরীক্ষাগারে রেখে দিলাম। প্রায় ঘন্টাখানেক বাদেই মনে হলো যেন সর্ষের মতো ক্ষুদ্র পদার্থ পূর্বাপেক্ষা অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে। মাইক্রোস্কোপের পরীক্ষায় পরিষ্কার দেখা গেল – গোলাকার পদার্থটা আসলে গোলাকার নয়; লম্বাকৃতি একটি কীড়া বা লার্ভা মাত্র। শরীরটা বাঁকিয়ে দুই প্রান্ত এক স্থানে রেখেছে বলে গোলাকার বোধ হচ্ছিল। কীড়াটা মাকড়সার পিঠের চামড়া কামড়ে ধরে তার রস-রক্ত চুষে খাচ্ছে। বেলা আড়াইটার সময় কীড়াটা বেশ মোটা একটা মুড়ির আকার ধারণ করলো।  অদ্ভূত এদের বাড়বার ক্ষমতা। মাকড়সাটার স্ফীত উদরদেশ অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং তার শরীরে জড়তার লক্ষণ সুষ্পষ্ট। আরও ঘন্টাখানেক বাদে তার হৃত্স্পন্দন একরূপ থেমে এসেছে বলেই মনে হলো।  এখন খালি চোখেই দেখা গেল কীড়াটা মাকড়সার উদরদেশ কুরে কুরে খেতে শুরু করেছে। আরও প্রায় আধ ঘন্টা সময়ের মধ্যেই উদর থেকে মস্তক পর্যন্ত সর্বাংশ নিঃশেষে উদরসাৎ করে ফেললো। ঠ্যাংগুলি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। মনে হয়েছিল সেগুলি হয়তো তার প্রয়োজনে লাগবে না, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় , দেখবার মতো কোনো ইন্দ্রিয়ের অস্তিত্ব না থাকলে বোধ হয় গন্ধ বা স্পর্শের সাহায্যেই বুঝে নিয়ে একাদিক্রমে সব কয়টি ঠ্যাং-ই নিশ্চিহ্ন করে ফেললো। প্রায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে কীড়াটা  তার শৈশব অতিক্রম করে কৈশোরের পুত্তলী রূপ ধারণ করবার আয়োজন করতে লাগলো। খাওয়া শেষ হবার পর কীড়াটা প্রায় আধ ঘন্টাকাল চুপ করে রইলো। তার পরেই সূঁচালো মুখটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সুতা বুনতে লাগলো। পনেরো – বিশ মিনিটের মধ্যেই সুতা বুনে শরীরের চতুর্দিকে পাতলা একটা ডিম্বাকৃতির আবরণী গড়ে তুললো। সূক্ষ্ম সুতার আস্তরণের ভিতর দিয়ে তখনও পোকাটার কার্যপ্রণালী পরিষ্কার দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। ডিম্বাকৃতি গুটির অভ্যন্তরে সে একবার এদিকে মুখ করে আবার বিপরীত দিকে ঘুরে সুতার বেষ্টনী দৃঢ়তর করে তুলছিল। সন্ধ্যার পূর্বেই তার গুটি বাঁধা শেষ হয়ে গেল। গুটির রং হলো এখন গাঢ় বাদামী। গুটির একপ্রান্ত কালো রঙের টুপির মতো পদার্থে আবৃত। আলোর দিকে ধরে দেখা গেল খোলের ভিতর পোকাটা লম্বাটে অবস্থায় নিশ্চেষ্টভাবে রয়েছে। ছয় দিনের মধ্যেই সে পুত্তলীর আকার ধারণ করলো এবং দিন পনেরো পরে গুটির কালো মুখটা কেটে ডানাসমেত একটি পূর্ণাঙ্গ নেউলে-পোকা গুটি থেকে বেরিয়ে এলো।

 জীবন্ত কীট-পতঙ্গের দেহে ডিম পেড়ে ভবিষ্যত্‍ বাচ্চাদের খাদ্যসংস্থানের সুব্যবস্থা করে রাখে, এরূপ অসংখ্য বিভিন্ন জাতীয় পোকা পৃথিবীর সর্বত্রই দেখা যায়। আমাদের দেশেও এ-জাতীয় বহু সংখ্যক রকমারি পোকা অহরহই নজরে পড়ে। এরা সাধারণত নেউলে-পোকা নামে পরিচিত। বিভিন্ন জাতীয় নেউলে-পোকার দৈহিক গঠন যেমন বিভিন্ন, দেহ-বর্ণও তেমনি বিচিত্র। এক বা দুই মিলিমিটার থেকে দেড় ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা নেউলে-পোকা দেখা যায়। এফিডিয়াস নামক এক জাতীয় ক্ষুদ্রকায় নেউলে-পোকা অনায়াসে ছোট্ট একটি সূচের ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে গলে যেতে পারে। এই ক্ষুদ্রকায় নেউলে-পোকারা শস্যাদির অনিষ্টকারী এক জাতীয় সবুজ পোকার শরীরে ডিম পেড়ে থাকে। এই সবুজ পোকাগুলি চারাগাছের কচি পাতা খেয়ে জীবনধারণ করে। এফিডিয়াস পোকার খুঁজে খুঁজে তাদের শরীরে একটি করে ডিম প্রবেশ করিয়ে দিয়ে যায়। যে-সব স্থানে সবুজ পোকা থাকবার সম্ভাবনা, সে-সব স্থানে দুটি শুঁড় উঁচু করে এফিডিয়াস পোকাদের বেপরোয়াভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। বেপরোয়া বললাম এই জন্যে যে, যখন এরা সবুজ পোকার অনুসন্ধানে ঘোরাঘুরি করে, তখন ম্যাগনিফাইয়িঙ্গ গ্লাসের সাহায্যে এদের অতি নিকটে বসে কার্যপ্রণালী পরিদর্শন করলেও এরা কিছুমাত্র ভীত হয় না। পোকার দেখা পেলেই উভয় শুঁড়ের বাঁকানো অগ্রভাগের সাহায্যে স্পর্শ করে তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে নি:সন্দেহ হলেই উল্লাসে যেন অধীর হয়ে ওঠে। তখন শুঁড় দুটিকে অনবরত নাচাতে থাকে। সেই সময় পোকাটার অঙ্গভঙ্গি দেখে তার উল্লাস এবং উত্তেজনার ভাব পরিষ্কার বুঝতে পর যায়। সবুজ পোকাটাকে তখন শুঁড় দিয়ে বারবার পরীক্ষা করে দেখতে থাকে এবং কিছুক্ষণের জন্যে থেমে তার পিছন দিকে উপস্থিত হয়। তারপর পিছনের পায়ের সাহায্যে সবুজ পোকার পিঠ আঁকড়ে ধরে এবং শরীরটাকে সম্মুখের দিকে কিঞ্চিৎ উঁচু করে দ্রুতগতিতে ডানা কাঁপাতে আরম্ভ করে। দু-এক সেকেন্ডের মধ্যেই শরীরের পশ্চাদ্দেশ ধনুকের আকারে বাঁকিয়ে পোকাটার পেটের দিকে হুল ফুটিয়ে দেয়। দু-তিন সেকেন্ডের মধ্যেই ডিম পাড়া শেষ হয় এবং উড়ে গিয়ে অন্য একটা পোকাকে ধরে। এরূপে ক্রমাগত কয়েকটা পোকার শরীরে এক-একটা করে ডিম প্রবেশ করিয়ে দেয়। সবুজ পোকারা সাধারণত অনেকগুলি একসঙ্গে অবস্থান করে। কাজেই একটা নেউলে-পোকার পক্ষে তিন-চার মিনিট সময়ের মধ্যে দশ-বারোটা পোকার শরীরে ডিম পাড়ায় কোনই অসুবিধা হয়না। ডিম শরীরে প্রবেশ করবার পর থেকেই সবুজ পোকা ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে থাকে। দু-এক দিনের মধ্যেই তার শরীরের রং বদলে বাদামি বা ঈষৎ হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং শরীরটা ক্রমশ স্ফীত হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে দেহাভ্যন্তরে ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে তার রস-রক্ত চুষে খেতে থাকে। দশ-বারো দিন পরে ডানাওয়ালা পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ শুষ্ক মৃতদেহের শক্ত বহিরাবরণীর মধ্যস্থলে ছিদ্র করে বেরিয়ে আসে। বিভিন্ন জাতীয় নেউলে-পোকার সাহায্যে প্রতিদিন এভাবে বিভিন্ন জাতীয় বহু সংখ্যক অনিষ্টকারী কীট-পতঙ্গ বিনষ্ট হয়ে যায়। প্রাকৃতিক বিধানে এরূপ সমতা রক্ষিত না হলে কিরূপ গুরুতর সমস্যার উদ্ভব হতো, তা সহজেই অনুমেয়।

আমাদের দেশে যে সকল নেউলে-পোকা দেখা যায় তাদের জাতিগত পার্থক্য হিসাবে দৈহিক গঠন ও বর্ণ-বৈচিত্র্যের পার্থক্য থাকলেও প্রায় প্রত্যেকেরই শরীরের পশ্চাদভাগে দেহের তুলনায় অসম্ভব লম্বা তিনটি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম তন্তুর মতো পদার্থ দেখা যায়। এগুলিকে সাধারণ তন্তুর মতোই মনে হয় বটে, কিন্তু মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করলে দেখা যায় দুটি সূত্রের গায়ে করাতের মতো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অসংখ্য দাঁত রয়েছে। এই সূক্ষ্ম দাঁতের সাহায্যেই তারা নিরীহ পোকার শরীরে ছিদ্র করে সঙ্গে সঙ্গে সূক্ষ্মাগ্র ডিম-নলটি প্রবেশ করিয়ে ডিম পেড়ে দেয়। আক্রান্ত পোকাগুলির শরীরে এই তীক্ষ্ন দাঁত-বিশিষ্ট অস্ত্রটি প্রবেশ করিয়ে দিতে তাকে কিছুমাত্র বেগ পেতে হয়না এবং মুহূর্তের মধ্যেই কার্য সমাধা করে সরে পড়ে। এদের নজরে পড়লে শোঁয়াপোকা বা অন্যান্য পতঙ্গের কীড়াদের আর রক্ষা নেই। বিশেষ ভাবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে বিভিন্ন জাতীয় প্রজাপতি ও পতঙ্গের বাচ্চারা পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে দেহের রং বা আকৃতির সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে অনুকরণ করবার ক্ষমতা আয়ত্ত করে নিয়েছে। আমাদের দেশীয় লেবু-প্রজাপতি, কপি-মথ, দুধলতা প্রজাপতির বাচ্চারা এ-বিষয়ে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছে বলে বোধহয় অনেক ক্ষেত্রে নেউলে-পোকার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে থাকে। কোনও কোনও শোঁয়াপোকা আবার অনুকরণ শক্তির সাহায্য না নিয়ে ভয় দেখিয়ে বা শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ নির্গত করে নেউলে-পোকার হাত থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা অবলম্বন করে থাকে।

এতদ্ব্যতীত আরও অনেক শ্রেণীর নেউলে-পোকা দেখা যায়, যারা কেবল ফলমূল, লতাপাতার গায়ে হুল ফুটিয়ে ডিম পেড়ে থাকে। এরাও দেখতে প্রায় উক্ত নেউলে-পোকার অনুরূপ; কিন্তু কেবল উদ্ভিদ জাতীয় পদার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সেগুলিকে করাতে-পোকা বলা হয়। বিভিন্ন জাতীয় ফলের বহিরাবরণে কোনও ক্ষতচিহ্ন না থাকা সত্ত্বেও ভিতরে বহু পোকা দেখা যায়। এরা করাতে-পোকার ডিম থেকে উদ্ভূত পোকা। তাছাড়া লতা-পাতার কচি ডগায় গ্রন্থির মতো স্ফীত, কারও পাতার গায়ে ফোস্কা অথবা গুটির মতো অদ্ভূত পদার্থ জন্মাতে দেখা যায়। এগুলি করাতে-পোকার কাণ্ড। লতাপাতার মধ্যে ডিম পাড়বার সময় এদের ডিম-নল থেকে এমন কোন পদার্থ নির্গত হয়, যার প্রভাবে পাতার গায়ে গুটি, স্ফীতি অথবা কয়েক রকম উপাঙ্গ আত্মপ্রকাশ করে থাকে।

প্রবাসী

মাঘ, ১৩৪৯

image_print