বাংলার কীট-পতঙ্গ -গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭৫

image_print

ছবি : Arkive.org

বোলতার জীবন-রহস্য

জীবজগতের অনেকে এককভাবে বাস করলেও কেউ কেউ আবার সমাজ-বদ্ধভাবে বসবাস করে থাকে। জাতীয় উৎকর্ষ বিধানের দিক থেকে বিবেচনা করলে একক ভাবে বসবাস করার অসুবিধা অনেক। কারণ জীবনধারনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যেকটি কাজই নিজে নিজে সম্পন্ন করতে হয়। কিন্তু সমাজ-ব্যবস্থায় কর্ম-বিভাগের সুযোগ পাওয়া যায়। মানুষ সামাজিক জীব। আদিম মনুষ্যসমাজে প্রয়োজন অথবা অভাববোধ অনেক কম ছিল বলে বোধ হয় কতকটা স্বাভাবিকভাবেই কর্ম-বিভাগের গোড়াপত্তন শুরু হয়েছিল। অপেক্ষাকৃত আধুনিক যুগে জাগতিক ব্যাপার সম্পর্কে অধিকতর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ ব্যষ্টিগত প্রয়োজনে পার্থিব সম্পদ আহরণ এবং সুশৃঙ্খলার সঙ্গে বিবিধ দৈনন্দিন কার্য-নির্বাহের নিমিত্ত বল প্রয়োগে দাসত্বপ্রথার প্রচলন করে। পরবর্তীকালে অস্ত্রপ্রয়োগের সহায়তায় মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিসমূহ বিনষ্ট করে কৃত্রিম উপায়ে চিরজীবন তাদের দাসত্বকার্যে লিপ্ত রাখবার উপায় অবলম্বিত হয়। তৎপরবর্তী যুগে হয়তো নৈতিক কারণে এই প্রথা ক্রমশ পরিত্যক্ত হলেও সামাজিক এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বুদ্ধি এবং কূট-কৌশল প্রয়োগে দাসত্বপ্রথা অব্যাহত রাখবার উপায় অবলম্বিত হয়। ধর্মের অনুশাসন, ইহকাল এবং পরকালের কাহিনী শুনিয়ে সেবা-ধর্মের মহিমা কীর্তন হয়তো এই উপায়েরই একটা বিশিষ্ট দিকমাত্র। যা এমন এক জাতীয় মানুষ উৎপাদনে সক্ষম হতো, যাদের,  একমাত্র সেবাধর্মে অনুরক্তি ছাড়া ক্ষুৎ-পিপাসা ব্যাতিরেকে অন্য কোনও প্রবৃত্তি থাকবেনা অর্থাৎ তারা যদি যান্ত্রিক মানুষের মতো রক্তমাংসের মানুষ সৃষ্টি করতে পারত, তবে এই সমস্যা সমাধানে এতটা বিব্রত হয়ে পড়ত না। কিন্তু মানুষ এ ব্যাপারে কিছুদূর অগ্রসর হলেও আজও সেরূপ কিছু অব্যর্থ উপায় আবিষ্কারে সক্ষম হয় নি।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যা করতে পারেনি নিম্নস্তরের কীট-পতঙ্গেরা সুদূর অতীত যুগ থেকে তা আয়ত্ত করে সাফল্যের সঙ্গে কাজে লাগাচ্ছে। সমাজবদ্ধভাবে বাস করতে অভ্যস্ত মৌমাছি, বোলতা, ভীমরুল, পিঁপড়ে প্রভৃতি প্রাণীদের কথা ধরা যাক। হাজার হাজার মৌমাছি, হাজার হাজার পিঁপড়ে একই বাসায় বাস করে। সমাজের বিভিন্ন কার্যনির্বাহের জন্যে এদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণী-বিভাগ দেখা যায়। তাদের এই শ্রেণীবিভাগ স্বাভাবিক, কারণ রাজা, রানী, সৈনিক, শ্রমিক বা কর্মী প্রভৃতি বিভিন্ন শ্রেণীর প্রাণীগুলির আকৃতি ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ বিভিন্ন। মৌমাছি, বোলতা, পিঁপড়ে প্রভৃতি বিভিন্ন জাতীয় প্রত্যেকটি সমাজেই কর্মীদের সংখ্যা অগণিত। রাজা ও রানীদের সংখ্যা কর্মীদের তুলনায় অনেক কম। মৌমাছিদের ক্ষেত্রে এক একটি চাকে সাধারণত একাধিক রানী মৌমাছি দেখা যায় না। রাজা এবং রানীরা অলস ভাবে দিন কাটায়। তাদের কোনই কাজকর্ম করতে হয় না। কর্মীরাই সংসারের যাবতীয় কাজ করে থাকে। খাদ্য আহরণ ও তার বিলিব্যবস্থা, বাসগৃহ পরিষ্কার, শিশু ঘেঁষাঘেঁষি করে চলাফেরা করে বলে গর্তগুলির অভ্যন্তরস্থ ডিম ও বাচ্চার অবস্থা লক্ষ করবার উপায় ছিল না। অগত্যা দিবাবসানে বাসাটাতে একদিন আগুন ও প্রচুর ধোঁয়া প্রয়োগ করলাম। অধিকাংশ বোলতা মারা পড়লেও কতকগুলি উড়ে পালিয়েছিল। পরের দিন গিয়ে দেখালাম যারা পালিয়ে গিয়েছিলো তারা বাসায় ফিরে এসেছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই কম। উত্তেজিত ভাবে তারা প্রত্যেপ্রতিপালন এমন কি, রাজা ও রানীদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া ও তাদের পরিচর্যার যাবতীয় ব্যবস্থা কর্মীরাই করে থাকে। রানী কেবল ডিম পেড়েই খালাস। কর্মীরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, কোনও না কোনও ক্ষেত্রে দিনরাত্রি, প্রায় সমভাবেই বাসার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কার্যে ব্যাপৃত থাকে। কর্মীদের মধ্যে ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব, আলস্য অথবা প্রয়োজনাতিরিক্ত বিশ্রামের প্রবৃত্তি দেখা যায় না। এদের কোনও কর্ম-নিয়ন্ত্রণকারী পরিদর্শকও নেই; প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে স্বাভাবিক প্রবৃত্তির বশেই যন্ত্রের মত নিজের কাজ করে যায় এবং প্রত্যেক ব্যাপারেই প্রয়োজনমত বুদ্ধি খাটিয়ে অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা অবলম্বন করতে চেষ্টা করে। যত তুচ্ছই হোক, এরা কর্তব্যকার্য সম্পাদনে মৃত্যু বরণ করতেও কিছুমাত্র ইতস্তত করে না। কর্মীদের আর একটি অদ্ভুত ক্ষমতা দেখা যায়। কোনও কারণে রাণীর অভাব ঘটলে বাসায় নতুন নতুন কর্মী উৎপন্ন হতে পারে না। যথেষ্ট সংখ্যক কর্মীর অভাবে সহজেই নানা প্রকার বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়; এবং ফলে তাদের সমাজ অতি দ্রুত ধ্বংসের মুখে অগ্রসর হয়। এরূপ ব্যাপার ঘটলে কর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ পুরুষ-সংস্রব ব্যতিরেকেই ডিম প্রসব করে নতুন নতুন কর্মী উৎপাদন করে থাকে।

মৌমাছি, বোলতা, ভীমরুল, পিঁপড়ে প্রভৃতি একই বর্গভুক্ত প্রাণী। মোটামুটি কতকগুলি বিষয়ে মিল থাকলেও এই বিভিন্ন জাতীয় প্রাণীদের পরস্পরের মধ্যে গুরুতর কতকগুলি বৈষম্যও আছে। কাজেই মৌমাছি-সমাজের শ্রেণীভেদের কারণ নিষিক্ত বা অনিষিক্ত ডিম্ব এবং ‘রয়েল জেলী’ প্রয়োগের তারতম্যের বিষয় অবগত থাকলেও বোলতা, ভীমরুল, পিঁপড়ের মধ্যে প্রকৃত ব্যাপার কি ঘটে, তা জানবার জন্যে পিঁপড়ে সমন্ধে অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হয়েছিলাম। কিন্তু পিঁপড়েরা ক্ষুদ্রকায় প্রাণী এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে বাস করে বলে তাদের সম্পূর্ণ একটা বিরাট দলকে কৃত্রিম বাসস্থানে প্রতিপালন করে পর্যবেক্ষণ করা খুবই অসুবিধার ব্যাপার। তথাপি কয়েকবার চেষ্টা করেও সাফল্য লাভ করতে পারিনি। তখন অপেক্ষাকৃত বৃহদাকৃতির ভীমরুল, বোলতার কথা মনে পড়লো। কিন্তু ভয়ানক বিপজ্জনক বলে ভীমরুল পুষে পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল না। বোলতা বিপজ্জনক হলেও ভীমরুলের মতো ততটা গুরুতর নয়। কাজেই সর্তকতা অবলম্বন করে বোলতার কর্যকলাপ পর্যবেক্ষণে মনোনিবেশ করেছিলাম। কলকাতার উপকণ্ঠে একটা পরিত্যক্ত স্থানে গাছের ডালে বোলতার প্রকাণ্ড একটা বাসার সন্ধান পাওয়া গেল। বাসাটাতে প্রায় পাঁচ-ছয় শতেরও অধিক বোলতা ছিল। বাসাটার অনেকটা অংশ লতাপাতার আড়ালে পড়লেও কিয়দংশ অনাবৃত ছিল। নিকটে না গেলে এদের কার্যকলাপ ভাল করে দেখা যায় না। কাছে যেতেও বিশেষ ভরসা হলো না; কারণ বাসা থেকে হাত দুই ব্যবধানে উপস্থিত হলেই এরা ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কাজেই টেলি-মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিলাম।

প্রায় ৫০ গজ দূর থেকে টেলি-মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে বাসার মধ্যে বোলতার কার্যকলাপ পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছিল। দু-তিন দিন পর্যবেক্ষণের ফলে বোলতাগুলির গতিবিধি ও কার্যকলাপ সমন্ধে অনেক কিছু দেখতে পেলাম বটে, কিন্তু এতগুলি বোলতা বাসাটার উপর প্রায় কটি গর্তে মাথা ঢুকিয়ে বারংবার পরীক্ষা করে দেখেছিল। বাসার দিকে অগ্রসর হতেই তারা ডানা প্রসারিত করে ঊত্তেজিত ভাবে আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলো। কেউ কিন্তু বাসা ছেড়ে উড়ে এলো না। তথাপি ভয়ে পিছিয়ে গেলাম এবং টেলিমাইক্রোস্কোপের সাহায্যেই গর্তগুলির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। বাসার মধ্যস্থান কতকগুলি গর্তের মুখে সাদা টুপির মতো পদার্থে আবৃত! বাকী গর্তগুলি সম্পূর্ণ অনাবৃত। বাসাটা থালার মত চ্যাপ্টা এবং কতকটা গোলাকার। গর্তগুলি বাসার ধারের দিকে থেকে মধ্যভাগে ক্রমশ লম্বায় বড় হয়ে গেছে। ছোটবড় বিভিন্ন গর্তের মধ্যে বয়সের তারতম্য অনুযায়ী বিভিন্ন আকৃতির বাচ্চা ও ডিম দেখা যাচ্ছিল। গর্তগুলির মুখ নিচের দিকে। বাচ্চাগুলিও নিচের দিকেই মুখ করে রয়েছে। অপেক্ষকৃত ছোট বাচ্চাগুলি প্রায় নিশ্চল ভাবেই অবস্হান করছিল ; কিন্তু সর্বাপেক্ষা লম্বা গর্তগুলির  অভ্যন্তরে হলুদ বর্ণের পরিপুষ্ট বাচ্চাগুলির অদ্ভুত একটা গতিভঙ্গী লক্ষ করলাম। সর্বাপেক্ষা বড় বাচ্চাগুলি প্রত্যেকেই তাদের ঊর্ধ্বভাগ ধীরে ধীরে চক্রাকারে আন্দোলিত করছিল ; বাচ্চাগুলি যে কেন এরূপ করছিল, তার কারণ কিছুই বুঝতে পারলাম না। পরের দিন দেখলাম বাসায় বোলতার সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছুক্ষণ লক্ষ করতেই বোঝা গেল ঢাকনায় আবদ্ধ গর্তগুলি থেকে নতুন নতুন বোলতা বের হয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি করছে।

যাহোক বোলতার সংখ্যা অধিক বৃদ্ধি পাবার পূর্বেই বাসাটা তুলে আনবার মতলব করলাম। ধোঁয়া প্রয়োগে বোলতাগুলিকে তাড়িয়ে দিয়ে বাসাটাকে তুলে এনে পরীক্ষাগারে স্হাপন করলাম। দু-তিন দিন পরেই পুনরায় কিছু নতুন বোলতার আবির্ভাব ঘটলো। কিন্তু তারা কেউ বাসা ছেড়ে বাইরে বেরুত না। ইতিমধ্যে বাচ্চাগুলির মস্তক আন্দলনের প্রকৃত কারণ বোঝা গেল। বড় বাচ্চাগুলি পুত্তলীতে রূপান্তরিত হবার সময় এরূপভাবে সুতা বুনে গর্তের মুখ বন্ধ করে দেয়। সুতা এত সূক্ষ্ম যে ম্যাগ্নিফায়িং গ্লাসের সাহায্য ছাড়া দেখা যায় না। মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বারংবার এরূপ সূক্ষ্ম সুতা জড়াবার ফলে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক সময়ের মধ্যেই গর্তের মুখে সাদা টুপির মতো একটা আবরণী গড়ে ওঠে। ঢাকনা নির্মিত হবার পর বোলতার আপরিণত বাচ্চাটা সেখানে নিশ্চিন্ত মনে নিশ্চল্ভাবে অবস্থান করে। কিছুকাল পরে ধীরে ধীরে কীড়াটা পুত্তলীর আকার ধারণ করে। এই অবস্থান কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর উপরের পাত্‌লা খোলস পরিত্যাগ করে ডানা সমেত পূর্ণাঙ্গ বোলতা গর্তের ঢাক্‌না কেটে বেরিয়ে আসে।

যাহোক বাসাটাকে পরীক্ষাগারে রাখবার পর দিন-দশেকের মধ্যাই প্রায় দু-শতাধিক নতুন বোলতা বেরিয়ে এসে পুনরায় বাসাটাকে ঢেকে ফেলবার উপক্রম করলো। এদের অনেকেই বাসা নির্মাণের উপযোগী পদার্থ সংগ্রহ করে পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক ভাবেই কাজ চালাতে আরম্ভ করেছিল।

এই সময় একদিন পরীক্ষাগারে কয়েকজন দর্শক এসেছিলেন। বোলতা পুষতে দেখে তাঁরা বিশেষ কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। একটু দূরে দাঁড়িয়েই তাঁদের নিকট ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলছিলাম। ইতিমধ্যে দর্শকদের মধ্যে একজন ধূমপান করতে আরম্ভ করেছিলেন। দু চার মিনিট পরেই বোলতাগুলি যেন অকস্মাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলো এবং দুই একটি বাসা ছেড়ে উড়ে এসে একজন দর্শককে দংশন করে ! পরে বুঝেছিলাম – তামাকের ধোঁয়াই এই উত্তেজনার কারণ। যাহোক এই ঘটনার পরে আর বোলতাগুলি সমন্ধে নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। অবশেষে ক্লোরফর্ম গ্যাস প্রয়োগে বোলতাগুলিকে অজ্ঞান করে একে একে অধিকাংশ বোলতার ডানা কেটে দিলাম। তার ফলে বোলতাগুলি এসে কাকেও দংশন করার সাধ্য ছিল না। যাদের ডানা কাটা হয়নি – অল্প সংখ্যক হলেও তারাই বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিয়ে আসতো। কিন্তু তার ফলেই বোধ হয় বিপদ দেখা দিল। বাসার প্রয়োজনানুরূপ সরবরাহ হচ্ছিল না। গায়ের রঙের পরিবর্তন দেখে বোঝা গেল, খুব সম্ভব উপযুক্ত খাদ্যাভাবে অনেকগুলি বাচ্চাই রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। হঠাৎ একদিন দেখা গেল মাছির মতো অতি ক্ষুদ্র এক জাতীয় অদ্ভুত পতঙ্গ কোন কোন গর্তে ঢুকে রুগ্ন বাচ্চাগুলিকে চুষে খেয়ে ফেলেছে। বাসাটায় গর্ত অনেক এবং প্রায় প্রত্যেক গর্তেই ডিম অথবা বাচ্চা ছিল। অল্প সংখ্যক বোলতার পক্ষে এতগুলি বাচ্চার তদারক সম্ভব হচ্ছিল না। কাজেই মড়ক অনিবার্য হয়ে উঠেছে ! তদুপরি মাছির আক্রমণে অতি শীঘ্রই বাসার অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়লো। এই নানা অসুবিধার জন্যে কিছুকাল পরে পুনরায় লাল-পিঁপড়ে নিয়ে অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হতে হলো। যাহোক, বোলতা প্রতিপালনের সময় তাদের জীবনযাত্রা প্রণালী সম্পর্কে যা লক্ষ করেছিলাম, সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করছি।

পৃথিবীতে বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন জাতীয় অনেক রকম বোলতা দেখা যায়। কয়েক জাতীয় বোলতা বৃক্ষকোটরের অন্ধকার ঘহ্বরে অথবা অনেক সময় মাটির নীচে গর্ত খুঁড়ে বলের মতো গোলাকার বাসা নির্মাণ করে। আবার কতকগুলি ঘরের চালার নীচে, গাছের ডালে অথবা নির্জন স্থানে কোনও কিছুর আড়ালে থালার মতো চ্যাপ্টা বাসা তৈরি করে বসবাস করে। গর্তবাসী বোলতারা প্রথমত অসংখ্য গর্ত সমন্বিত চ্যাপ্টা থালার মতো তিন-চার স্তরে বাসা নির্মাণ করে সর্বশেষে সেগুলির চর্তুদিকে গোল করে একটা শক্ত আবরণে ঢেকে দেয়। এজন্য বাসাটাকে বাইরে থেকে বলের মতো গোলাকার দেখায়, কিন্তু ভিতরে কুঠুরিগুলি বিভিন্ন স্তরে পরপর সজ্জিত থাকে। শীতের কিছু পূর্বে এই জাতীয় রানী বোলতার যৌনমিলন ঘটে। যৌনমিলনের পর পুরুষগুলি মরে যায় ! গর্ভবতী রানী সারা শীতকালটা সুবিধামত কোনও স্থান নির্বাচন করে খড়কুটা বা অন্য কোনও শক্ত জিনিস আঁকড়ে ধরে শীত ঘুমে কাটিয়ে দেয়। শীতের অবসানে সে বাসা বাঁধার জন্যে স্থান নির্বাচনে বহির্গত হয়। স্থান নির্বাচন হবার পর সে বারংবার পরিভ্রমণ করে দেখে এবং আনন্দে অধীর হয়েই যেন নানা প্রকার গতিভঙ্গী করে অবশেষে অনেকক্ষণ ধরে প্রসাধনে রত হয়। তারপর বাসার চতুর্দিকে বারংবার চক্রাকারে উড়তে উড়তে কোনও পুরাতন বৃক্ষকান্ড বা অন্য কোনও শুকনো কাঠের উপর বসে তার কিয়দংশ কুরে নেয়। সেই পদার্থের সঙ্গে মুখের লালা মিশ্রিত করে মণ্ডের মতো প্রস্তুত করে। এই মণ্ডই বোলতার বাসা নির্মাণের প্রধান উপকরণ। বার বার এই মণ্ড সংগ্রহ করে রানী প্রথমত চারটি কোষ বা গর্ত নির্মাণ করে তার মধ্যে ডিম পাড়ে। ডিম ফোটবার পর নানা প্রকার কীট-পতঙ্গ বা ক্ষুদ্র মাংসের টুকরা মণ্ডের মতো করে বাচ্চাগুলিকে খাওয়াতে থাকে। ইতিমধ্যে আরও কয়েকটি গর্ত নির্মাণ করে তার মধ্যেও ডিম পেড়ে রাখে। এগুলিকে প্রতিপালন করতে করতেই প্রথম চারটি গর্ত থেকে চারটি কর্মী বোলতা নির্গত হয়ে বাসার কাজে রানীকে সাহায্য করতে আরম্ভ করে। আরও কিছুকাল পর যখন দশ-বারোটি কর্মী জন্মগ্রহণ করে, তারাই বাসা নির্মাণ, খাদ্য আহরণ প্রভৃতি যাবতীয় কাজ করে থাকে। রানীকে তখন থেকে আর কোনও কাজ করতে হয় না। সে কেবল র্গতে ডিম পেড়ে যায়।

আমাদের দেশের হলদে রঙের বড় বোলতা ও খয়েরি রঙের ক্ষুদে বোলতারা গাছের ডালে, চালার নীচে অথবা আনাচে-কানাচে বাসা নির্মাণ করে। মৌমাছির চাকের র্গতগুলি যেমন সমানভাবে পাশের দিকে প্রসারিত থাকে, হলদে বোলতার চাকের র্গতগুলি সেরূপে নির্মিত হয় না। এদের র্গতগুলি থাকে নীচের দিকে মুখ করে খাড়া ভাবে। শীতের অবসানে রানী বোলতাই প্রথমে বাসা নির্মাণ শুরু করে। র্গতের পত্তন হয়ে গেলেই তার দেয়ালের গায়ে সমকোণে অবস্থান করে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবার সঙ্গে সঙ্গে র্গতটাকে লম্বায় ক্রমশ বাড়াতে থাকে। বাচ্চাটা নীচের দিকে মুখ করে থাকলেও কোনও ক্রমেই র্গত থেকে পড়ে যায় না। এইরূপে প্রথমত কয়েকটি কর্মী নির্গত হলে তারাই গৃহস্থালীর যাবতীয় কাজের ভার গ্রহণ করে এবং নতুন নতুন র্গত নির্মিত হওয়া মাত্রই রাণীরা তার মধ্যে ডিম পেড়ে দেয়। এক-একটা বাসায় কতকগুলি রানী এবং কতকগুলি পুরুষ বোলতা থাকে। কিন্তু কর্মীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশী। বাসার উপর অথবা আশেপাশেই এদের মিলন সংঘটিত হয়ে থাকে। মিলনের পর পুরুষেরা সাধারণত মৃত্যুমুখে পতিত হয়। রানী-বোলতা নতুন বাসার পত্তন করে সারা বছর ডিম পাড়বার পর মৃত্যু বরণ করে। বছরের শেষের দিকে অর্থাৎ শীত আগমনের পূর্বেই বাসার মধ্যে নতুন নতুন পুরুষ ও রানী-বোলতার আর্বিভাব ঘটতে থাকে। পুরুষ বোলতাগুলি রানীদের আগে জন্মগ্রহণ করে। রানীদের আর্বিভাবের পূর্ব পর্যন্ত পুরুষ বোলতাগুলি শ্রমিকদের সেবা-শুশ্রূষায় অতি সুখে পরিবর্ধিত হতে থাকে। তারা বাসার মধ্যে অলস ভাবে ঘুরে বেড়ায় অথবা স্বেচ্ছা-বিহারে বহির্গত হয়ে নতুন পত্রপল্লবের মধু খেয়ে সন্ধ্যার পূর্বে বাসায় আসে। মৌমাছি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা অপরিণত বাচ্চাগুলিকে ‘রয়েল জেলী’ প্রদান করে ইচ্ছামত রানী-মৌমাছি উৎপাদন করে থাকে। ‘রয়েল জেলী’ কম পরিমাণে দেওয়া হয় বলেই কর্মী-মৌমাছির উৎপত্তি হয়। রানী-মৌমাছি আকৃতিতে অনেক বড়। তার জন্যে চাকের মধ্যে অনেক বড় গর্ত নির্মিত হয় এবং কর্মীরা তাতে প্রচুর পরিমাণে ‘রয়েল জেলী’ রেখে দেয়। পরীক্ষার ফলে দেখা গেছে কর্মীদের গর্ত অথবা যে কোনও স্থান হতে ডিম এনে ‘রয়েল জেলী’ পূর্ণ রানীর গর্তে রাখলে সেখান হতে রানীই উৎপন্ন হয়ে থাকে। এতেই বোঝা যায় -‘রয়েল জেলীর’ পরিমাণের তারতম্যের উপরই পুরুষ, রানী অথবা কর্মীদের উৎপত্তি নির্ভর করে। বোলতাদের মধ্যেও রানীর গর্তটা কর্মীদের গর্ত অপেক্ষা কিঞ্চিৎ বড় হয়। তাছাড়া কর্মীদের গর্তের মুখের ঢাকনাটি প্রায় চ্যাপ্টা ; কিন্তু রানীর গর্তের ঢাকনা গোলাকার টুপির মতো। এরাও বাচ্চাগুলিকে ‘রয়েল জেলীর’ মতো অপূর্ব পদার্থ খাইয়ে ইচ্ছামত কর্মী, পুরুষ অথবা রানী উৎপাদন করে থাকে। এই শক্তিশালী পদার্থের প্রভাবে কোনও অজ্ঞাত উপায়ে রানীরা ডিম পাড়বার যন্ত্ররূপে পরিণত হয় আর কর্মীরা ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ উপেক্ষা করে সমাজের জন্য আত্মোৎসর্গ করে থাকে।

চৈত্র, ১৩৫০

প্রবাসী

বাংলা প্রবন্ধ সংগ্রহ

image_print