বাংলার কীট-পতঙ্গ -গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭৫

image_print

( বাঁদিকের ভীমরুল ডানদিকের মৌমাছিকে তাড়া করেছে !)

ছবি : Arkive.org

ভীমরুলের রাহাজানি

জ্যৈষ্ঠের অপরাহ্ণে একদিন বেলগাছিয়া রোড দিয়ে যেতে যেতে দেখতে পেলাম রাস্তার একপাশে কালো রঙের একদল ক্ষুদে পিঁপড়ে সার বেঁধে চলেছে। নিকটেই রাস্তার উপর রেল-লাইনের পুল। পিঁপড়েরা এই রেল-পুলের বাঁধের নীচেই একটা গর্তের মধ্যে ঢুকছিল। একটু লক্ষ করতেই দেখা গেল – মাঝারি গোছের একটা কুনো ব্যাঙ পিঁপড়ের লাইনের প্রায় দু-তিন ইঞ্চি তফাতে ওঁত পেতে বসে আছে। ব্যাঙটাকে এইভাবে নিরিবিলি চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বড়ই কৌতূহল হলো – দেখা যাক কি করে। অনেকক্ষণ কিছুই করলো না – কেবল মাঝে মাঝে অদ্ভুত উপায়ে গলার নীচের পর্দাটাকে কাঁপাতে লাগলো। চলে যাব ভাবছি এমন সময় একটা পিঁপড়ে দল ছেড়ে ব্যাঙটার একটু ধার ঘেঁষে অগ্রসর হওয়া মাত্রই চোখের নিমেষে সে তাকে গলাধঃকরণ করে ফেললো। কেবল টক্‌ করে একটু শব্দ শোনা ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না। কোন ফাঁকে যে জিভে ঠেকিয়ে পিঁপড়েটাকে মুখে পুরে দিল লক্ষ হলো না । এতক্ষণে বুঝতে পারলাম – পিঁপড়ে খাবার লোভেই ব্যাঙটা ওঁত পেতে বসে আছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সে আরও দুটো পিঁপড়েকে টক্‌ টক্‌ শব্দ করে গিলে ফেললো। পিঁপড়ের সারের মধ্যে মাথা মোটা খুব বড় বড় সৈন্য শ্রেণীর পিঁপড়েরা মাঝে মাঝে আনাগোনা করছিল। হঠাৎ ওই রকমের একটা সৈনিক পিঁপড়ে লাইন ছেড়ে ব্যাঙটার সম্মুখীন হওয়া মাত্রই সে টক্‌ করে তাকে মুখে পুরে ফেললো এবং সঙ্গে সঙ্গে কলকল শব্দে একটা করুণ আর্তনাদ শুনতে পেলাম। ব্যাঙটা ছটফট করে এদিক-ওদিক লাফাচ্ছে আর এক রকম অদ্ভুত শব্দ করছে। বিশেষ ভাবে লক্ষ করে দেখতে পেলাম – পিঁপড়েটার অর্ধেকটা তার মুখের বাইরে রয়েছে। বোধহয় জিভ ঠেকিয়ে তাকে গেলবার সময় সে ব্যাঙের জিভ কামড়ে ধরেছে। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সে ইতস্তত লাফালাফি করছিল। পকেটে একটুখানি ‘কঙ্গো-রেড’ ছিল। হাতের কাছে কিছু না পেয়ে তারই খানিকটা ব্যাঙটার গায়ের উপর ছড়িয়ে দিলাম। চিহ্ন রাখবার উদ্দেশ্য এই যে, এইভাবে জব্দ হয়েও সে আবার পিঁপড়ে শিকারের জন্য কালও এখানে আসে কিনা। ব্যাঙটা কিছুক্ষণ ছটফট করে মুখ ঘষে পিঁপড়েটাকে ছাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করলো, অবশেষে বাঁধের পাশেই একটা গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়লো।

তার পরের দিন বেলা প্রায় সাড়ে দশটার সময় সেখানে গিয়ে দেখি – পিঁপড়ের সার আগের মতোই রয়েছে, কিন্ত ব্যাঙের দেখা নেই। অনুসন্ধানের ফলে পরে জানতে পেরেছি যে, ব্যাঙেরা সাধারণত দিনের আলোতে আহারান্বেষণে বের হয় না। পড়ন্ত বেলায় অন্ধকারেই তারা শিকার করে থাকে। যাহোক, ব্যাঙের আগমনের অপেক্ষায় বসে আছি। প্রায় দশ-বারো হাত দূরে ঘাসের উপর এক খণ্ড শুকনো প্যাঁকাটি পড়ে ছিল – একটা ভীমরুল সেই প্যাঁকাটি থেকে চোয়ালের সাহায্যে কুরে কুরে কী যেন সংগ্রহ করছিল। মনে হলো যেন বাসা নির্মাণ করবার উপকরণ সংগ্রহ করছে। একমনে তাই দেখছি। ইতিমধ্যে দেখি – সওয়া ইঞ্চি কী দেড় ইঞ্চি লম্বা একটা সাদা রঙের শোঁয়াপোকা, কখনও বা ঘাসের উপর দিয়ে কখনও বা নীচে দিয়ে দিশাহারা হয়ে দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে ; একটা হলদে রঙের বোলতা তাকে তাড়া করেছে। শোঁয়াপোকাটা বোলতার কাছ থেকে প্রায় সতেরো-আঠেরো ইঞ্চি দূরে ঘাসের নীচে দিয়ে চলে গিয়েছিল বলে বোলতার চোখে পড়েনি। সে একবার ঘাসের নীচে ঢুকে, একবার উপরে উঠে মরিয়া হয়ে যেন শোঁয়াপোকার সন্ধান করছিল। শোঁয়াপোকাটা যদি একস্থানে চুপ করে বসে থাকতো, তবে বোধ হয় বোলতা সহজে তার সন্ধান পেত না ; কিন্ত প্রাণভয়ে ছোটবার ফলেই এবার বোলতা তাকে দেখে ফেললো এবং তৎক্ষণাৎ উড়ে এসে তার ঘাড় কামড়ে ধরলো। তখন শুরু হল একটা ভীষণ ওলট-পালট কাণ্ড। শোঁয়াপোকাটা প্রাণপণে ছুটছে আর বোলতা তাকে ধরে রাখবার চেষ্টা করছে – এর ফলে একবার বোলতা নীচে পড়ছে, শোঁয়াপোকাটা উপরে উঠছে, আবার শোঁয়াপোকা নীচে পড়ছে, আর বোলতা তার পিঠের উপর চেপে বসছে। এরূপ ধ্বস্তাধ্বস্তি  করতে করতে তারা প্যাঁকাটিটার খুব কাছে এসে পড়লো। শোঁয়াপোকাটার আর চলবার সামর্থ্য নেই – বোলতার পুনঃপুনঃ দংশনে একেবারে নির্জীব হয়ে আসছিল। তখন বোলতা তার পেটের দিকের খানিকটা অংশ চিরে ফেললো। সবুজ রঙের নাড়ীভুঁড়ি বের করে সে তা কুরে কুরে খেতে লাগলো। খানিকক্ষণ পরেই আবার উপরে উঠে শোঁয়াপোকার দেহ দ্বিখণ্ডিত করে লেজের দিকের বড় অংশ থেকেই কুরে কুরে খেতে লাগলো। ইতিমধ্যেই হঠাৎ কোত্থেকে একটা ভীমরুল উড়ে এসে ছোট প্যাঁকাটিটার কাছেই বসে ব্যস্তভাবে এদিক-ওদিক কী যেন দেখতে লাগলো। ভীমরুলটার অবস্থা দেখে মনে হল সে যেন ইতিপূর্বেই কিছু একটা ঘটনার আঁচ পেয়েছিল, কিন্ত ব্যাপারটা ভাল করে বুঝতে পারেনি। কারণ ইতিমধ্যেই সে কাজ বন্ধ করে মাথা উঁচিয়ে যেন কিছু একটা অনুধাবন করবার চেষ্টা করছিল। এবার ঘুরে বসতেই বোলতার উপর তার নজর পড়লো এবং তৎক্ষণাৎ উড়ে গিয়ে বোলতাকে আক্রমণ করলো। এইরূপ একটা প্রবল শত্রুর আচমকা আক্রমণে বোলতাটা বিভ্রান্ত হয়ে শিকার ছেড়ে উড়ে গেল, কিন্তু বেশি দূর না গিয়ে আবার ঘুরে এলো। ভীমরুলটা  ততক্ষণে শিকারটাকে খাবার উদ্যোগ করছিল। বোলতাকে পুনরায় আসতে দেখে শিকার ছেড়ে সে তাকে আক্রমণ করতে গেল । বোলতা লড়াই না করে ঘাসের নীচ দিয়ে এসে শোঁয়াপোকার কর্তিত দেহখণ্ড মুখে নিয়ে উড়ে গেল। ভীমরুল কিন্তু  ছাড়বার পাত্র নয় – সেও বোলতার পিছু ধাওয়া করলো। চেয়ে দেখলাম, কিছু দূরে গিয়ে বোলতা ও ভীমরুল উভয়েই পুলের অপর পার্শ্বে সহসা যেন কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। এত শীঘ্র তারা কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল ? কাছাকাছি তেমন কোনও গাছপালাও ছিল না, তবে কোথায় যাবে ? দেখবার জন্যে খানিকটা অগ্রসর হয়ে পুলের অপর পার্শ্বে গেলাম। কোথাও কিছু নেই। কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক লক্ষ করতেই দেখতে পেলাম, বাঁধের ঠিক উপরেই পুলের তলায় বেশ একটু পরিষ্কার স্থানেই প্রকাণ্ড একটা বোলতার বাসা। বাসাটার ব্যাস প্রায় দশ ইঞ্চি হবে। অজস্র বোলতা বাসাটা ঘিরে রয়েছে। তারই একপাশে সেই ভীমরুলটার সঙ্গে বোলতাদের তুমুল লড়াই বেধে গেছে। কাছে যেতে ভরসা হলো না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। ভীমরুলটা যেন বোলতার চাকের মধ্যে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করে দিয়েছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই হুল ফুটিয়ে এবং কামড়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে। বোলতারাও বিপুল পরাক্রমে পাঁচ-সাতটা একত্র হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কামড়াবার চেষ্টা করছে। ভীমরুল একদিকে একটা বোলতাকে কামড়ে ধরছে, তন্মুহূর্তেই অপর দিক থেকে চার-পাঁচটা বোলতা এসে তাকে আক্রমণ করছে। একটা মাত্র ভীমরুলই যেন সমস্ত চাকটাকে চষে ফেলছিল। দেখলাম চার-পাঁচটা ছিন্নশির বোলতা ঝুপ্‌ ঝুপ্‌ করে মাটিতে পড়ে গেল ।

প্রায় মিনিট দশেক পর্যন্ত ভীমরুলটা প্রাণপণে লড়াই করে অবশেষে রণে ভঙ্গ দিয়ে পলায়ন করলো। ভীমরুলটা উড়ে যাবার পর বোলতারা ডানা খাড়া করে শুঁড় উঁচিয়ে চাকটার উপর অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে ঘোরাঘুরি করতে লাগলো। কেউ কেউ আবার প্রত্যেকটি গর্তে মুখ ঢুকিয়ে কী যেন পরীক্ষা করে দেখছিল। প্রায় পনেরো-বিশ মিনিটের মধ্যেই দেখলাম কতকগুলি বোলতা ডানা উঁচু করে শুঁড় খাড়া করে বাসাটার চতুর্দিকে সারবন্দিভাবে জমায়েত হয়েছে। বাকী অধিকাংশই বোলতাই বাসার মধ্যস্থলে জটলা করছে। মনে হলো যেন ভীমরুলের পুনরাক্রমণ আশঙ্কা করেই এরা এভাবে সজ্জিত হচ্ছিল। কিন্তু বহুক্ষণ অপেক্ষা করেও ভীমরুলের আগমনের কোনই লক্ষণ দেখা গেল না। তখন বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হলো। বেলা তিনটার সময় ফিরে গিয়ে দেখি – বাসাটাতে কোন গোলমাল নেই। বোলতারা দস্তুর মত কাজকর্ম করছে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ বাসা থেকে উড়ে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ খাদ্য সংগ্রহ করে ফিরে আসছে। বাসাটার খুব নিকটে যেতেই বোলতাগুলি আমাকে দেখবামাত্রই যেন আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলো। তারা ডানা উঁচু করে সকলেই চুপ করে দাঁড়ালো। বিপদ আশঙ্কা করে আমি সরে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পরেই তাদের সতর্কতার ভাব কেটে গেল এবং পুনরায় বাসার গর্ত তৈরি ও বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়ার কাজে মনোনিবেশ করলো। সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কোন গোলমালের লক্ষণই দেখতে পেলাম না।

তার পরদিন সকাল বেলায় আবার গিয়ে দেখি – ইতিপূর্বেই বাসাটার উপর একটা ভীমরুলের সাথে বোলতাদের তুমুল লড়াই বেধে গেছে। ভীমরুলটা যেন মরিয়া হয়ে যাকে পাচ্ছে তাকেই কামড়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে। ইতিমধ্যেই দেখি আর একটা ভীমরুল এসে বাসাটার চতুর্দিকে চক্রাকারে উড়তে লাগলো। দু-চার বার এরূপভাবে ঘুরে বাসাটার উপর বসেই একটা গর্তে মুখ ঢুকিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই চার-পাঁচটা বোলতা এসে তাকে চেপে ধরলো। ভীমরুলটা তাতে ভ্রূক্ষেপ না করে আর একটা গর্তে মুখ ঢুকিয়ে একটা অপরিপুষ্ট বোলতার কীড়াকে টেনে বার করলো এবং ঘাড়ের দিকে কামড়ে ধরে উড়ে পলায়ন করলো। বোলতাগুলি যেন অসহায়ভাবে কতক্ষণ সেদিকে চেয়ে থেকে সকলে মিলে অত্যন্ত উত্তেজিত ভাবে ঝন্‌ ঝন্‌ শব্দে ডানা কাঁপাতে লাগলো। কিন্তু কেউই ভীমরুলের পশ্চাদ্ধাবন করলো না। অপর ভীমরুলটার সঙ্গে মারামারি তখনও থামেনি। প্রায় পাঁচ-ছয়টা বোলতা ভীমরুলের দংশনে বিকলাঙ্গ হয়ে নীচে পড়ে ছটফট করছিল। এতক্ষণ লড়াইয়ের ফলে ভীমরুলটাও বিশেষভাবে জব্দ হয়ে পড়েছিল – তার একদিকের পা বোধহয় বোলতার দংশনে অসাড় হয়ে যাওয়ায় সে কাৎরাতে কাৎরাতে এক দিক থেকে আর একদিকে পালাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বোলতারা সুযোগ পেয়ে তাকে যেখানে-সেখানে তাকে অবিশ্রাম দংশন করতে লাগলো। ভীমরুলটা অবশেষে একটা বোলতার সঙ্গে জড়াজড়ি করে একেবারে চাকটার কিনারায় এসে পড়তেই আরও দুটা বোলতা এসে আক্রমণ করলো এবং সকলে জড়াজড়ি করে মাটির উপর পড়ে গেল। তাতেও কি লড়াই থামে ! ধূলায় গড়াগড়ি দিয়ে কামড়াকামড়ি করতে লাগলো। এদিকে চাকের বোলতাগুলি পুনরায় ব্যূহ রচনা করে ফেলেছে। চাকটার চতুর্দিকে ডানা উঁচু করে অসংখ্য সান্ত্রী প্রায় নিশ্চলভাবে শ্রেণীবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সান্ত্রীদের পরেই একদল কর্মী-বোলতা কেবল গর্তের মধ্যে মুখ গুঁজে গুঁজে বাচ্চাদের তদারক করছে। বাসার মধ্যস্থলে সাদা টুপি দিয়ে মুখ বন্ধ করা কতকগুলি গর্তের চতুর্দিকে চাকের বাকী বোলতাগুলি সমবেত হয়ে মাঝে মাঝে ডানা কাঁপাচ্ছে। তাদের ডানা কাঁপানোর ঝন্‌ঝন্‌ আওয়াজ  কানে আসছিল। রোদ প্রায় পড়ে এসেছে – এমন সময় দেখি আর একটি ভীমরুল বাসার কাছে এসে উড়তে শুরু করেছে। বোলতাগুলি ভীমরুলের আগমন বুঝতে পেরেই এক সঙ্গে সকলে ডানা কাঁপাতে কাঁপাতে মুখ বাড়িয়ে প্রস্তুত হয়েছিল। ভীমরুলটা একবার বাসার খুব কাছে উড়ে এসে আবার দূরে চলে গেল । কিন্তু মিনিট পাঁচেক পরেই হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এসে বাসার উপর পড়লো এবং বোলতাদের সমবেত বাধাদান সত্ত্বেও প্রায় দু-এক মিনিটের মধ্যেই আর একটা বাচ্চা মুখে করে উড়ে গেল। আলো পড়ে আসাতে বোলতারা তখন কী করছিল, দূর থেকে তা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারা গেল না। কেবল কতকগুলি বোলতাকে বাসার চতুর্দিকে উড়ে বেড়াতে দেখলাম। কাছে গেলে যদি উড়ে এসে দংশন করে এই ভয়ে তার পরদিন টেলি-মাইক্রোস্কোপের সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে গেলাম। ভীমরুলেরা যখন বোলতার বাচ্চাদের সন্ধান পেয়েছে তখন নিশ্চয় আজ তারা আরও বেশী সংখ্যায় এসে বাচ্চা চুরি করবে – এটা আমার নিশ্চিত ধারণা হয়ে গিয়েছিল। বেলা প্রায় দশটার সময় এসে দেখি – যা ভেবেছিলাম, তাই ঘটেছে। ইতিমধ্যেই তারা বাচ্চা ছিনিয়ে নেবার অভিযান শুরু করে দিয়েছে। সকাল থেকে এতক্ষণ পর্যন্ত হয়তো তারা বোলতার অনেক বাচ্চা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। যাহোক, রাস্তার অপর পার্শ্বে বাসা থেকে প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে টেলি-মাইক্রোস্কোপ খাটিয়ে বাসার অবস্থা দেখতে লাগলাম। বাসার সান্ত্রীদের বুহ্য পূর্বের মতই রয়েছে, কিন্তু বোলতার সংখ্যা অনেক কম বলে মনে হল। তারা অনেকেই কেবল ঘন ঘন গর্তের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে বাচ্চাদের তদারক করছিল। আর কতকগুলি কেবল ডানা উঁচু করে নিশ্চল অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। ইতিমধ্যেই একসঙ্গে দুটো ভীমরুল উড়ে এসে বাসার উপর পড়লো। বোলতাদের সঙ্গে দুই স্থানে ভীমরুলের জড়াজড়ি কামড়াকামড়ি শুরু হয়ে গেল।  দু-এক মিনিটের মধ্যে প্রায় তিন-চারটা বোলতা সাংঘাতিকভাবে আহত হয়ে বাসা থেকেও পড়ে গেল। এর মধ্যে কোন ফাঁকে যেন ভীমরুল দুটো বাচ্চা মুখে করে উড়ে গেল। রাস্তার উপরে এসে দেখলাম, নীচে কয়েকটা বোলতা পড়ে ছট্‌ফট্‌ করছে। একটা বিকলাঙ্গ ভীমরুলও দেখতে পেলাম। পিঁপড়েদের মহোৎসব লেগে গেছে। তারা অনেকে মিলে বোলতাদের মৃতদেহ গর্তের দিকে বয়ে নিয়ে চলেছে। একটা অর্ধমৃত ভীমরুলকেও তারা আক্রমণ করেছে, কিন্তু তার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছে না। পিঁপড়েরা তার ঠ্যাং ধরে টেনে আনবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে, কিন্তু সে তাদের নিয়েই কাৎরাতে কাৎরাতে লাইন ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে। এদিকে বোলতাদের অবস্থা দেখে বোধ হলো যেন তারা খুবই ভয় পেয়ে গেছে। কারণ এই দৃশ্য দেখতে রাস্তায় অনেক লোক জড়ো হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ একটু এগিয়ে যেতেই বোলতাদের অনেকেই পিছু হঠতে হঠতে একেবারে বাসার পিছন দিকে গিয়ে লুকিয়ে রইলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবার পূর্ব স্থানে ফিরে আসতে লাগলো। যতই বেলা বাড়ছিল ভীমরুলের সংখ্যা যেন ততই বৃদ্ধি পেতে লাগলো। একটার পর একটা তো আসছিলই, আবার মাঝে মাঝে একসঙ্গে দু-তিনটা এসেও বোলতার বাচ্চাগুলি মুখে করে পালাচ্ছিল। এখন মারামারি বড় একটা দেখতে পাওয়া গেল না। খণ্ড যুদ্ধে দু-একটা বোলতা প্রাণ হারাচ্ছিল। ইতিমধ্যে কয়েকটা ছেলে ভীমরুলগুলিকে অনুসরণ করে তাদের বাসস্থান খুঁজে বের করেছে। সন্ধ্যার সময় তারা এসে বললে – প্রায় মাইল খানেক দূরে রাস্তা থেকে কিছু তফাতে একটা নাটা ঝোপের ভিতর ভীমরুল প্রকাণ্ড বাসা বেঁধেছে। সেখান থেকেই উড়ে এসে তারা বোলতার চাকের উপর এরূপ রাহাজানি করছে।

চতুর্থ দিন সকালে গিয়ে দেখলাম – বোলতার সংখ্যা খুবই কম। তারা সকলে মিলে চাকটার মধ্যস্থলে জমায়েত হয়েছে। পূর্বেই বলেছি, মধ্যস্থলে সাদা টুপি-ঢাকা কতকগুলি গর্ত ছিল। তার আশেপাশের গর্তগুলির মুখ খোলা এবং টেলি-মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে ভিতরের বাচ্চাগুলিকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু বাসার চতুর্দিকের গর্তগুলিকে সম্পূর্ণ খালি দেখা গেল। বোধ হয় ভীমরুলেরা ঐ সব গর্তের সবগুলি বাচ্চাই নিয়ে গিয়েছিল। আজও দেখলাম, ভীমরুলেরা পূর্বের মতোই আনাগোনা করছে। কেউ কেউ বাচ্চাগুলিকে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছে। লড়াই তখন একপ্রকার নেই বললেই চলে। ভীমরুল আসবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই স্থানের বোলতাগুলি পিছু হটে গিয়ে বাসার পিছনদিকে লুকিয়ে থাকে, আবার চলে গেলেই তারা স্বস্থানে এসে জমায়েত হয়। এই সময়েও ভীমরুলের সন্মুখে পড়ে দু-একটা বোলতা মারা যাচ্ছিল। এবার খুব ভালভাবে লক্ষ করে দেখলাম অনাবৃত গর্তের বাচ্চাগুলি অনবরত কেবল মাথা ঘোরাচ্ছে। ব্যাপার কী বুঝতে না পেরে টেলি-মাইক্রোস্কোপ যন্ত্রটাকে আরও নিকটে এনে বসালাম । অনেকক্ষণ লক্ষ করার পর বোঝা গেল বাচ্চাগুলিও বিপদের কথা আঁচ করেই যেন মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সুতা বের করে গর্তের মুখে ঢাকনা প্রস্তুত করছে। প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কয়েকটা গর্তের ঢাকনা গড়ে উঠতে দেখলাম। বাচ্চারা নিজেই মুখ থেকে সুতা বের করে গর্তের ঢাকনা বন্ধ করে দেয়। পুত্তলীতে রূপান্তরিত হবার পূর্বেই এরা ঢাকনা বুনতে শুরু করে। এই ঢাকনা এত শক্ত যে হাতে টেনে ছেঁড়া যায় না। ভীমরুলেরা এতক্ষণ ঢাকনা কেটে পুত্তলী বের করে নেবার চেষ্টা করে নি, খোলামুখ গর্তের ছোট ছোট বাচ্চাগুলিকেই নিয়ে গেছে। এবার অন্য কিছু না পাওয়ায় তারা ঢাকনা ছিঁড়ে পুত্তলী বের করবার চেষ্টা করতে লাগলো। এই কাজে অনেক সময় লাগছিল। এই সুযোগে বোলতারা এসে আবার দলবদ্ধভাবে তাদের আক্রমণ করতে লাগলো। কিন্তু ভীমরুল একে বাচ্চার স্বাদ পেয়েছে তাতে অতি দুর্ধর্ষ কোপন স্বভাব ; কিছুতেই হঠবার পাত্র নয়। মারামারিতে দু-একটা স্থানচ্যুত হলেও অন্যেরা এসে সেই স্থান দখল করে টুপি কেটে পুত্তলী বের করে নিতে লাগলো। বোলতারা দলে দলে প্রাণ দিয়েও তাদের রক্ষা করতে পারলো না। পাঁচ–ছয় দিনের মধ্যেই ভীমরুলেরা বোলতাদের প্রায় সমস্ত বাচ্চা ও পুত্তলী ছিনিয়ে নিয়ে গেল। অবশিষ্ট বোলতারা ভীমরুল দেখলেই আর ভয়ে কাছে ঘেঁষতো না – বাসার পিছনে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করতো। বাসায় যে দু-চারটা  বাচ্চা তখনও অবশিষ্ট ছিল, কর্মী ও খাদ্যের অভাবে তাদের মধ্যে আর এক নতুন উপদ্রব আরম্ভ হল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একপ্রকার ক্ষুদে মাছি এসে তাদের আক্রমণ করে শরীরের রস চুষে খেতে লাগলো। এইরূপে প্রায় আট–নয় দিনের মধ্যেই অতবড় বোলতার বাসাটা প্রবল অত্যাচারীর কবলে পড়ে একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল।

চৈত্র, ১৩৪৪

প্রবাসী

বাংলা প্রবন্ধ সংগ্রহ

image_print