প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানের উত্থান ও পতন (পর্ব ২): জ্যোতির্বিদ্যা

image_print

জ্যোতির্বিদ্যায় ভারত একসময় বাইরের দেশগুলির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতো। সেখান থেকে কিভাবে পিছিয়ে পড়লো ভারত, সেই অনুসন্ধান করছেন অধ্যাপক ডি. পি. রায়।


 

আমি ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা, আয়ুর্বেদ, রসায়ন ও ধাতুবিদ্যার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি। এই আলোচনার উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে কিভাবে নিম্নমানের বিজ্ঞানশিক্ষা এবং  পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক বিজ্ঞানচর্চার অবক্ষয় প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান ও সভ্যতার পতন ঘটিয়েছে। প্রথমেই বলে নিতে চাই, এই লেখার বিষয় আর আমার গবেষণার বিষয় এক নয়। তবে একজন ভারতীয় বৈজ্ঞানিক হিসেবে ভারতের বিজ্ঞান চর্চার অবক্ষয় অবশ্যই আমার জন্য চিন্তার বিষয়তাই আমি কয়েকজন বরেণ্য ভারতীয় বৈজ্ঞানিকের উদ্ধৃতির উপর ভিত্তি করেই এই বিষয়টি উপস্থাপন করতে চলেছি।

 

এর আগের পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম রসায়ন ও ধাতুবিদ্যা নিয়ে। এই পর্বে আমরা জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা  করবো। আমরা দেখবো কিভাবে একসময়ের প্রভাবশালী ভারতীয় জ্যোতিবিদ্যা শাস্ত্রসর্বস্ব ও সংকীর্ণমনা হয়ে পড়লো।

 

স্বাধীনতার ঠিক পরেই, মেঘনাদ সাহার তত্ত্বাবধানে সৃষ্ট “ক্যালেন্ডার সংস্কার পরিষদ” ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার তিনটি মূল পর্ব নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করে। এই তিনটি পর্ব হল:

 

   ১. বৈদিক

        (১৩০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত),

     ২. বেদাঙ্গ

         (১৩০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ – ৪০০ খ্রিষ্টাব্দ)  

     ৩. সিদ্ধান্ত

         (৪০০ খ্রিষ্টাব্দ – ৯০০ খ্রিষ্টাব্দ)

 

ক্যালেন্ডার সংস্কার পরিষদের মতে, বেদাঙ্গ পর্বে ক্রমে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে গণনাকে নিখুঁত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সময় শক ও কুষাণরা ব্যক্ট্রিয়া [১] থেকে সমসাময়িক জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান উত্তরপশ্চিম ভারতে নিয়ে আসে। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার সাথে এই পরিচয়ের ফলে বেদাঙ্গ পর্বের শেষ দিকে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় হঠাৎ একটা নতুন জোয়ার আসে, মূলত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমেই।

 

এইভাবেই ‘সিদ্ধান্ত’ যুগের সূত্রপাত ঘটে [২]। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে লেখা হয় সূর্যসিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত যুগে ভারতবর্ষে বহু স্বনামধন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীর জন্ম হয়, যেমন:

  • আর্যভট্ট ও বরাহমিহির (৫০০ খ্রিষ্টাব্দ),
  • ব্রহ্মগুপ্ত ও প্রথম ভাস্কর (৬০০ খ্রিষ্টাব্দ),
  • লাল্লা (৮০০ খ্রিষ্টাব্দ),

 

প্রমুখ। আর্যভট্ট আর্যভট্টীয় লেখেন এবং  সূর্যসিদ্ধান্তের একটি সংশোধিত সংস্করণ তৈরি করেন। পরবর্তীকালে, মুসলিম জ্যোতির্বিদ্যার বিকাশেও আর্যভট্টের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

 

অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত পর্বে, ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার সাথে অন্যান্য সভ্যতার একটা উভমুখী আদানপ্রদান ছিল। স্পষ্টতই, এই আদানপ্রদানের মাধ্যমে সবাই উপকৃত হয়েছিল, কারণ তারা একে অন্যের শক্তি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত। কিভাবে, সেটাই এবার দেখবো [৩]।

 

ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার উপর বহির্বিশ্বের প্রভাব

 

খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে, শকরাজ রুদ্রদমনের আমলে, যবনেশ্বর মূল গ্রীক থেকে সংস্কৃতে অনুবাদ করলেন যবনজাতক নামের একটি পুঁথি। এই রুদ্রদমনের রাজধানী উজ্জয়িনী ছিল এক অর্থে “ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার গ্রিনউইচ”, ভিন্ন সভ্যতার মিলনস্থল। তারপর, আরেকটু পরে গেলে খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে, বরাহমিহির রচনা করলেন পঞ্চসিদ্ধান্ত। সেই পঞ্চসিদ্ধান্তের পাঁচখানি বইয়ের অন্যতম দুটি বই ছিল রোমাকা সিদ্ধান্ত ও পালিশা সিদ্ধান্ত, যার আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়াবে রোমান ও পালদের গ্রন্থ। তিনি লিখছেন:

 

গ্রীকরা যতই অপবিত্র হোক, তাদের কৃতিত্ব দিতে হবে কারণ তারা বিজ্ঞানের বিষয়গুলিতে সুশিক্ষিত ছিল এবং তার জোরেই ছাপিয়ে গেছিলো সমসাময়িকদের।

 

একইভাবে গার্গী-সংহিতায় বলা হয়েছে,

 

“যদিও যবনগণ বর্বর, তবু এ কথা মানতেই হবে যে বিজ্ঞানের জ্যোতির্বিদ্যা শাখাটি তাদের হাত ধরেই শুরু হয় এবং এ কারণে তারা ঈশ্বরীয় সম্মান পাওয়ার যোগ্য।”

 

ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার স্বর্ণযুগে এই মতামতগুলি বাইরের প্রভাবের প্রতি তৎকালীন জ্যোতির্বিদদের ইতিবাচক মানসিকতারই পরিচয় দেয়।

 

বহির্বিশ্বের জ্যোতির্বিদ্যার উপর ভারতের প্রভাব

 

চীন: অন্যদিকে, হান রাজত্বের সময় (২৫ – ২২০ খ্রিষ্টাব্দ) চীনে বৌদ্ধ ধর্মের সাথে সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যারও প্রসার ঘটে। জ্যোতির্বিদ্যার কিছু বইয়ের অনুবাদ হয় ‘থ্রি কিংডম’ রাজত্বের সময় (২২০ – ২৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)। তবে, ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার সবচেয়ে গভীর প্রভাব দেখা যায় টাং রাজত্বের সময়কালে (৬১৮ – ৯০৭ খ্রিষ্টাব্দ)।

 

আরব: ভারতীয় গণিতশাস্ত্র থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরবদেশে সাইন অপেক্ষকের (sine function) ব্যবহার চালু হয়। আগে হেলেনীয় গণিতশাস্ত্র অনুযায়ী, ‘বৃত্তচাপের জ্যা’ (chords of arc) ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। সময়ের হিসেব রাখতেও মুসলিম জ্যোতির্বিদরা ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা থেকে নেওয়া একখানি সরলীকৃত সূত্র ব্যবহার করতেন।

 

ইউরোপ: আরবীয় অনুবাদের মাধ্যমেই ইউরোপীয় জ্যোতির্বিদ্যায় ভারতের প্রভাব পড়তে শুরু করে। সূর্যসিদ্ধান্ত থেকে অনুপ্রাণিত ‘গ্রেট সিন্দহিন্দ’ (মুহম্মদ আল-ফাজারি বিরচিত) ও ব্রহ্মগুপ্তের লেখাগুলি ল্যাটিনে অনূদিত হয় ১১২৬ খ্রিষ্টাব্দে।

 

ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার শেষের দিনগুলি

 

খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীর পর থেকে ধীরে ধীরে ‘সিদ্ধান্ত’ জ্যোতির্বিদ্যার অবনতি শুরু হয়। যদিও দ্বিতীয় ভাস্কর (খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী), নীলকণ্ঠের কেরালা স্কুল (খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী), বা সামন্ত চন্দ্রশেখর (খ্রিষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দী)-দের মত জ্যোতির্বিদরা ছিলেন, তবে তাদের উপস্থিতি ‘সিদ্ধান্ত’ সময়কালের স্বর্ণযুগের তুলনায় খুবই স্তিমিত বলা যায়। এই প্রসঙ্গে, সামন্ত চন্দ্রশেখরের উপর একটি জাতীয় অধিবেশনে অধ্যাপক এম. কে. পাল-এর মূল ভাষণ থেকে কয়েক লাইন উদ্ধৃত করছি [২। অধ্যাপক পাল একজন স্বনামধন্য অণু-পদার্থবিদ ও সাহা ইনস্টিটিউট অফ্‌ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স-এর প্রাক্তন অধিকর্তা।

 

ভারতীয় সিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদ্যার সর্বশেষ প্রতিভূ সামন্ত চন্দ্রশেখর ১৮৩৫ থেকে ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বাস করতেন ওড়িষ্যায়। তিনি নিজেই নিজের গবেষণার যন্ত্রপাতি বানিয়ে নিতেন। সেগুলি ব্যবহার করে সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্রের নির্ভুল পর্যবেক্ষণে বিশেষ নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। বারবার পরীক্ষা করে যখন তিনি বুঝতে পারলেন তার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বহু বিখ্যাত সিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদের গণনা মিলছে না, তিনি জোর গলায় ঘোষণা করলেন যে ঐ গণনাগুলি ভুল, তাঁর পর্যবেক্ষণগুলি নয়। তিনি তাঁর পরীক্ষালব্ধ ফলাফল ওড়িয়া লিপিতে কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন তালপাতার পুঁথিতে। ত্রিশ বছর পরে, ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে কটকের র‍্যভেনশ কলেজের অধ্যাপক জে. সি. রায় ক্যালকাটা প্রেসের সহায়তায় দেবনাগরীতে এগুলি প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।

 

শাস্ত্র আর পরীক্ষার দ্বন্দ্ব

দিন গণনার ক্ষেত্রে ‘নমন’ (Gnomon) নামের একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হত।

 

সনাতন ভারতীয় সিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদদের একটা মস্ত বড় ভুল ছিল গ্রীষ্ম ও শীতকালীন অয়নান্ত-বিন্দুগুলির (summer and winter solstices) এবং শরৎ ও বসন্তকালীন বিষুবগুলির (autumn and vernal equinoxes) গণনার ক্ষেত্রে। শীতকালীন অয়নান্ত-বিন্দুর দিনটিকে আমরা মকর সংক্রান্তি আর বসন্তকালীন বিষুবর দিনটিকে আমরা বিষুব সংক্রান্তি বলে জানি। এই দিনগুলির গণনার ক্ষেত্রে ‘নমন’ (Gnomon) নামের একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হত। ভারতবর্ষে এটি শঙ্কু নামে পরিচিত। এই যন্ত্রে একটি উল্লম্ব দণ্ডের ছায়ার দৈর্ঘ্য ও দিক মাপা হত এবং তা থেকে সময় ও চারটি প্রধান দিক নির্ণয় করা হতো।

 

সিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদরা একটি উল্লম্ব দণ্ডের ছায়ার দৈর্ঘ্য ও দিক মেপে সময় ও চারটি প্রধান দিক নির্ণয় করত।

 

ছায়ার দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম হলে বেলা দুপুর বোঝায়। ছায়াটি তখন উত্তর-দক্ষিণ দিক বরাবর থাকে। পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলে (tropical region) উত্তরদিক বরাবর দুপুরের ছায়া যখন সবচেয়ে লম্বা হয়, তাকে শীতকালীন অয়নান্ত-বিন্দু বলা হয়। একইরকমভাবে, দক্ষিণদিক বরাবর দীর্ঘতম দুপুরের  ছায়া মানে গ্রীষ্মকালীন অয়নান্ত-বিন্দু বোঝায়। এই দুই অয়নান্ত-বিন্দুর ঠিক মাঝখানের দিন দুটি বিষুব দিন বোঝায়।

 

৪০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ যখন এই গণনাগুলি করা হচ্ছিল, তখন মকর বা ক্যাপ্রিকর্ন (capricorn) নক্ষত্ররাশির বার্ষিক সৌরউদয়ের দিনটি [৪] শীতকালীন অয়নান্ত-বিন্দু দিনের সাথে (২১-২২ ডিসেম্বর) মিলে যেত। একইরকমভাবে, কর্কট বা ক্যানসার (cancer) নক্ষত্ররাশির বার্ষিক সৌরউদয়ের দিন ও গ্রীষ্মকালীন অয়নান্ত-বিন্দু দিনটি (২১-২২ জুন) একই ছিল [৫]। তবে খুব ধীরে হলেও, পৃথিবীর নিজের সাপেক্ষে ঘুর্ণন অক্ষটি দিশা পাল্টাচ্ছে (অনেকটা লাট্টুর মতো) [৬]। এই গণনাগুলির সময় থেকে ১৬০০ বছর পর এই দুটো ঘটনা আর একই দিনে হয়না। জাগতিক আর মহাজাগতিক গণনার মধ্যে এখন প্রায় ২৩ দিনের ফারাক।

 

তাই ঋতু পরিবর্তন বা শস্য বপনের মত জাগতিক ঘটনাবলী প্রকৃত অয়নান্ত-বিন্দু বা প্রকৃত বিষুবের সাথেই মেলে, পুরনো গণনার সাথে নয়। পুনর্গণনা না করে অন্ধভাবে প্রাচীন শাস্ত্রনির্দিষ্ট দিন বা তারিখের সাথে এখনকার জাগতিক ঘটনা মেলাতে গেলে আমরা মস্ত ভুল করব।

 

কাকে মানবো, শাস্ত্র না পরীক্ষা

 

নিচের চিত্রটি অধ্যাপক এম. এন. ভাহিয়া-র লেখা “Why we observe Makara Samkranti on 14 January” থেকে নেওয়া হয়েছে [৭]। এর থেকে দেখা যাচ্ছে সূর্যের সাপেক্ষে মকররাশির নক্ষত্রের বর্তমান উদয়কাল আসলে জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি, শাস্ত্রে বলা শীতকালীন অয়নান্ত-বিন্দু দিনে (২১-২২ ডিসেম্বর) নয়। অয়নান্ত ও বিষুব দিনের এই ধীর পরিবর্তনের ধারণা প্রাচীন গ্রীক জ্যোতির্বিদদের মধ্যে ছিল। তাই, তা ভারতের সিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদদেরও জানার কথা । এখন প্রশ্ন ওঠে: জানা থাকা সত্ত্বেও, এই ধীর পরিবর্তনের বিষয়টি কেন হিসেবের মধ্যে ঢোকানো হল না?

 

হতে পারে কারণটা সামাজিক। প্রথমত, পরিশ্রম করে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তারপর, এই সময় ও পরিশ্রমসাপেক্ষ পরীক্ষার ফল যখন প্রাচীন শাস্ত্র-নির্দেশিত অনুমানের সাথে মিলবে না, তখন সমাজ হয়তো এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা মানতেই চাইবে না। তাই জ্যোতির্বিদরা মোটের ওপর প্রাচীন শাস্ত্র অনুসরণ করার সহজ পথটিই গ্রহণ করলেন। এই অজুহাত দেওয়া হলো যে মকররাশির নক্ষত্রের সঙ্গে সূর্যের সরলরৈখিক অবস্থানের দিনটিকেই শীতকালীন অয়নান্ত-বিন্দুদিন হিসেবে মেনে নেওয়া যেতে পারে। যদিও পৃথিবীর ঘটনাবলীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

 

অয়নান্ত ও বিষুব দিনের ধীর পরিবর্তনের ধারণা প্রাচীন গ্রীক জ্যোতির্বিদদের মধ্যে ছিল, তবুও তা ভারতের সিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদদের হিসেবে ঢোকানো হল না। 

 

ভারতবর্ষের বহু জায়গায় বৈশাখের প্রথম দিনটি অর্থাৎ ১৪-ই এপ্রিল বিষুব সংক্রান্তি হিসাবে পালিত হয়। অনেক জায়গায় এটি মকর সংক্রান্তির থেকেও বেশী তাৎপর্যপূর্ণ। বাঙলা ও উড়িষ্যায় এটি একটি নতুন বছরের সূচনা করে। কেরালাতে এই দিনটিকে বিষু সংক্রান্তি বলা হয় এবং সেখানেও এটি বছরের প্রথম দিন হিসাবে পালিত হয়। এই দিনটিকে ম্যাঙ্গালোরে বিষু ও আসামে বিহু বলা হয়। এই দিনটিও প্রকৃত বসন্তকালীন বিষুবদিনের ২৩ দিন পরে আসে। এবং মজার ব্যাপার হলো, এই ক্ষেত্রে কোন নক্ষত্ররাশির সাথে পৃথিবী ও সূর্যের অবস্থানেরও কোন তাৎপর্য নেই। ভারতীয় ক্যালেন্ডার সংস্কার পরিষদ ভারতীয় ক্যালেন্ডার থেকে ঐতিহাসিক ভাবে ভুল বৈশাখ ও মাঘ সংক্রান্তি (যথাক্রমে ১৪-ই এপ্রিল ও ১৪-ই জানুয়ারী) নামদুটি বাদ দিতে পরামর্শ দেয়। পরিবর্তে, প্রকৃত বসন্ত ও শরৎকালীন বিষুবদিনদুটিকে বিষুবরেখা দিবস ও মকরক্রান্তি দিবস হিসেবে চালু করতে বলে। কিন্তু এই পরামর্শ কখনই মানা হয়নি।

 

যেসব মহাজাগতিক ঘটনার উল্লেখই নেই

 

প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার আরেকটি সীমাবদ্ধতা ছিল কিছু দর্শনলব্ধ (empirical) ঘটনার ব্যাপারে একদম উদাসীন থাকা। এইজাতীয় অনেক ঘটনা ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় লিপিবদ্ধ হয়নি।

 

চীনারা উল্কাপাত, হ্যালির ধূমকেতুর ২৯-টি  আবির্ভাব, ৯০-টি নোভা বা সুপারনোভা থেকে শুরু করে সৌরকলঙ্কের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছে [২]। কিন্তু ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় এসবের কোন উল্লেখ পাওয়া যায়নি। হতে পারে এর কারণ ছিল, এই ঘটনাগুলির সাথে তৎকালীন জ্যোতির্বিদ্যার কোন তত্ত্বের সংযোগ ছিল না।

 

এ ব্যাপারে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে খ্রিষ্টীয় একাদশ শতাব্দীতে ক্র্যাব সুপারনোভা (Crab supernova) বিস্ফোরণের কথা। চাঁদের পরে দ্বিতীয় উজ্জ্বলতম বস্তু হিসাবে বেশ কয়েক সপ্তাহ রাতের আকাশে তা দৃশ্যমান ছিল। চীন, আরব ও মেক্সিকোর মায়া জ্যোতির্বিদরা এই ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু এই ঘটনার উল্লেখ ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় কখনোই পাওয়া যায়নি। প্রখ্যাত বিঞ্জানী, অধ্যাপক জে. ভি. নারলিকার UGC-র একটি প্রকল্পে সমসাময়িক ভারতীয় পুঁথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ঘেঁটে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

 

এইভাবে দেখা যায়, পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞান থেকে দূরে সরে আসার ফলে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার কি মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল। এককালের স্বর্ণযুগ থেকে হঠাৎ করে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা শাস্ত্রসর্বস্ব ও কিছু ক্ষেত্রে সংকীর্ণতর হয়ে পড়েছিল। এরপরে আমরা আলোচনা করবো ভারতীয় বিজ্ঞানের আরেকটি শাখা নিয়ে: আয়ুর্বেদ।

প্রচ্ছদের ছবি: সূর্যের সাপেক্ষে মহাকাশে নক্ষত্ররাশি গুলির সারা বছরের অবস্থান (ছবির সূত্র)

 

তথসূত্র ও অন্যান্য টুকিটাকি:

[১] ব্যাক্টরিয়া – মধ্য এশিয়ার হিন্দুকুশ পর্বত ও আমু-দরিয়া নদীর মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল, অধুনা মূলত আফগানিস্থান, উজবেকিস্থান ও তাজিকিস্থান এর অন্তর্গত অঞ্চল।

[২] M. K. Pal, Key Note Address : Proc. National Symp. on Scientific Contributions of Samanta Chandra Sekhar to Astronomy, Allied Publishers (2006).

[৩] Wikipedia

[৪] ইংরেজিতে এই দিনটি হল Helial rising day। কোনো নক্ষত্র বেশ কিছুদিন আকাশে উদিত না হওয়ার পর বছরের যে দিনটিতে পূর্ব-দিগন্তে ঠিক সূর্যোদয়ের আগে প্রথমবার অল্পক্ষণের জন্য দেখা দেয় সেই দিনটিকে সেই নক্ষত্রের Helial rising day বলা হয়।

[৫] এই কারণে, উত্তর ও দক্ষিণ ক্রান্তি রেখাদুটিকে যথাক্রমে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখা বলা হয়। অন্যদিকে দুটি বিষুব দিনে সূর্য বিষুবরেখার উপর উল্লম্বভাবে অবস্থান করে আর তাই এই রেখার এমন নাম।

[৬] একে ইংরেজিতে Axial precession বলে – https://en.wikipedia.org/wiki/Axial_precession।

[৭] M. N. Vahia: DNA daily news paper, 9 March 2014.

 

লেখক পরিচিতি: অধ্যাপক ডি. পি. রায়-এর সম্বন্ধে আরো জানতে  এখানে দেখুন

 

প্রশ্ন পাঠান এই লিঙ্কে ক্লিক করে।

‘বিজ্ঞান’-এ প্রকাশিত লেখার বাছাই সংকলন ‘বিজ্ঞান পত্রিকা’ ডাউনলোড করুন।

 

image_print
(Visited 456 times, 1 visits today)

Tags: , , , , , , , , ,