অটিজম: ভারতের চিত্র

Filed in জীবন বিজ্ঞান by on September 19, 2016 Comments
image_print

 


Aloka

ভারতে অটিজম-এর প্রকোপ কতটা, সেটা জানতে হলে আগে রোগনির্ণয় পদ্ধতিগুলোকে আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করতে হবে। অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জানাচ্ছেন অটিজম গবেষক অলকানন্দা রুদ্র


 

যাদবপুরের সরু গলির ভিতর ‘অটিস্টিক সোসাইটি অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল’-এর হলুদ সাইনবোর্ডটি দেখা যায়। একটু উঁকি দিলেই দেখা মেলে বাবা-মা, শিক্ষক, স্পেশাল এডুকেটর ও ছাত্র-ছাত্রীদের সামঞ্জস্যপূর্ণ সহাবস্থান। সেখানে কেউ নাচ নিয়ে ব্যস্ত, কেউবা রেওয়াজ করছে গান, আবার কেউ কেউ এক মনে খেলা করছে। এদের মধ্যে কিছু শিশু খুবই কম কথা বলে, আবার কিছু আছে যারা অনর্গল বকে চলে সারাক্ষণ। আমাকে দেখে বড় বড় উৎসাহী চোখ নিয়ে এগিয়ে এল কয়েক জন। এক জন আমার হাত ধরলো, হাতে হাত ঘষতে লাগল যেন কত দিনের পরিচয় আমাদের। সম্পূর্ণ অচেনা একজন ব্যক্তিকে প্রথম আলাপেই যে এভাবে স্পর্শ করতে নেই, সেই বোধটা তার জন্মায়নি। আবার উল্টো ব্যাপারও ঘটে যেখানে একটি শিশু মুখ লুকিয়ে বসে থাকে ঘরের কোনে। সামাজিকতা থেকে বহু যোজন দূরে।

আগের লেখাটাতে বলেছিলাম, অটিজম স্পেকট্রাম কন্ডিশন (ASC) বিভিন্ন শিশুর মধ্যে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ পায়। বেশ কিছুদিন এখানে থেকে, এদের সরাসরি সংস্পর্শে এসে আমার ASC-র ব্যাপারে ধারণার অনেক পরিবর্তন এলো। এই অবস্থাটা সম্পর্কে আমার আরো কত জানতে বাকি, সেটা জানলাম। একজনকে দেখেছিলাম অনবরত জানালার রডে মাথা ঠুকতে, মনে হচ্ছিল আমার মাথাতেই যেন ব্যাথা লাগছে, কিন্তু তার বিরাম নেই। সে কি ব্যাথা অনুভব করছে না, নাকি জোর করে ব্যাথা অনুভব করতে চাইছে? একটা বাচ্চা দেখি জুতো নিয়ে একনাগাড়ে তার গন্ধ শুঁকে চলেছে। অন্য দিকে আর একজন বাচ্চা টেবিলে বসে সারিবদ্ধ ভাবে ব্লক সাজাচ্ছে আর তার ঠিক পাশেই এক জন সমানে খেলনা গাড়ির চাকা ঘুরিয়ে চলেছে। ASC-র শিশুদের নিয়ে এই সংস্থার কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়। এর সঙ্গে আর একটা চিন্তা মাথায় এলো আমার, এক জন ASC-র গবেষক হিসাবে আমার ধারণা যদি এই স্তরে হয়, তবে আমার দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থানটা ঠিক কোথায়!

মার্কিন অভিভাবকদের চেয়ে ভারতীয়দের অন্তত ৭ মাস বেশি লেগে যায় অটিজমের লক্ষণ  নির্ণয় করতে।

অজ্ঞানতা সব সময়ই সমস্যা সমাধানের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অভিভাবকদের দেরি হয়ে যায় শিশুকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে। দেরি হয় রোগ নির্ণয় ও নিরাময় করতে, তৈরি হয় নতুন জটিলতা। একটি গবেষণা অনুযায়ী, মার্কিন অভিভাবকদের চেয়ে ভারতীয়দের অন্তত ৭ মাস বেশি লেগে যায় অটিজমের লক্ষণ  নির্ণয় করতে

তার কয়েকটি কারণ নির্ধারণ করা গেছে:

১। দক্ষিণ ভারতের অনেকেই এই ধরণের সমাজ-বিমুখ মুখচোরা ও লাজুক আচরণকে স্বাভাবিক মনে করেন।

শ্রীলঙ্কায় অনেকে এই পরিবর্ত আচরণকে ধর্মীয় বিশ্বাস দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, যেমন – পুনর্জন্ম ইত্যাদি। কম বয়সে পরিণত কথা বলাকে কেউ কেউ মনে করেন অগ্রিম পরিণত মানসিকতা।

২। সঠিক চিকিৎসার পরিবর্তে অনেক দম্পতি দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার কথা ভাবেন, যে সন্তান তাদের বয়সকালে দেখাশোনা করবে।

৩। কন্যা সন্তানের বিবাহে অসুবিধা হতে পারে এই ভেবে অনেক অবিভাবক জিনগত ত্রুটির কথা মানতে চান না। ধরা পড়ে গেলে সমাজ কি চোখে দেখবে, সেই ভয়টাই যেন সর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায়; এবং সেই ভয়ের কারণও আছে: বেশিরভাগ দম্পতিকেই সন্তানের অটিজম ধরা পড়ার পর অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় (ডিভোর্স থেকে শুরু করে নিজের পরিবারের মধ্যে একঘরে হয়ে যাওয়া অব্দি)।

৪। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলেই এটাকে অন্য মানসিক ব্যাধি হিসাবে লঘু করে দেখেন।

৫। সচেতন নাগরিকদের ক্ষেত্রে চিকিৎসাপদ্ধতিগত ত্রুটির কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, অ্যাকুপ্রেসার, ভিটামিন থেরাপি, স্পিচ থেরাপি এবং দুঃখজনক ভাবে জ্যোতিষ বিদ্যা, এই সবগুলোই প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। স্বভাবতই এগুলির পার্শ প্রতিক্রিয়া হয় মারাত্মক।

৬। তিন বছর বয়স পর্যন্ত কথা না বলতে পারাকে অনেক বিশেষজ্ঞ বিশেষ আমল দেন না।

শুধু অভিভাবক নয়, স্কুলেও সেই একই গল্প। সচেতনতার অভাবে একজন স্কুলের শিক্ষক একটি ASC-র শিশুকে চিহ্নিত করতে পারেন না। সহমর্মিতার অভাব ও অজ্ঞানতা, এই দুইয়ের ফলে ASC-র স্পষ্ট লক্ষণকেও (যেমন, অতি মাত্রায় চঞ্চল বা ভীষণ মুখচোরা) উপেক্ষা করে চলেন অনেকেই।

এই অস্বীকার ও উপেক্ষা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সমাজের সচেতনতাই এই সমস্যার প্রথম ও প্রধান সমাধান সূত্র। সেই সঙ্গে চাই সহমর্মিতা ও সাহচর্যের মানসিকতা, যা শিশুকে আরোগ্যলাভে সাহায্য করবে।

children_with_autism

ধামাচাপা দেওয়া নয়, সচেতনতা এবং সহমর্মিতাই অটিস্টিক শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে। (সূত্র)

ভারতে অটিজম সম্পর্কে আমরা কতটা জানি

১৯৪০ সালে ভারতবর্ষে দার্জিলিং-এ প্রথম অটিজম নির্ণয় করেন এ. রোনাল্ড নামে ভিয়েনার এক শিশু বিশেষজ্ঞ। ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত কিছু গবেষণা থেকে আন্দাজ করা যায়, ভারতে অটিজম-আক্রান্ত ব্যাক্তির সংখ্যা ২০ লক্ষেরও বেশি হতে পারে। ভারতবর্ষে এই ধরণের গবেষণা খুবই ছোট স্কেলে হয়েছে। ১৯৬৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত অটিজম-আক্রান্ত ব্যাক্তির সংখ্যার গণনা বিভিন্ন সমীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হোল বিভিন্ন হাসপাতালের ভর্তির তালিকা অনুসন্ধান। এই পর্যবেক্ষণগুলি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলির নিজস্ব পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে, আবার অনেক সময় অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। মনে রাখা দরকার যে বড়ো হাসপাতালে ভর্তি তখনই হয়, যদি পাড়ার চেম্বারের ডাক্তারবাবু সেরকম প্রয়োজন মনে করেন। অতএব অনেক অটিজমের কেস এইসব সমীক্ষায় অধরাই থেকে যায়।

অস্বীকার ও উপেক্ষা অটিজম স্পেকট্রাম কন্ডিশনকে আরও জটিল করে তোলে। সমাজের সচেতনতাই এই সমস্যার প্রথম ও প্রধান সমাধান সূত্র।

ভারতে অটিজম নিয়ে আলোচনার মূলে পৌঁছাতে গেলে এখানকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও আর্থসামাজিক অবস্থানের প্রভাব আলোচনা করা আবশ্যক বলে মনে করি। এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অটিজম গবেষণার মঞ্চকে আরও রঙিন করে তুলেছে এবং একই সাথে বড় জটিল। বিশেষত অটিজমের সংজ্ঞা, পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ও নিরাময়ের উপায় সংস্কৃতি বিশেষে ভিন্ন হয়, ফলত এগুলি গভীর গবেষণার দাবী রাখে। ব্যাপারটা ঠিক কতটা কঠিন তার পরিচয় দেখব একটু পরেই।

তবে এই গবেষণা যে প্রয়োজনীয়, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশজুড়ে অটিজমের চিত্র কেমন, সেটা না জানলে সরকারি বাজেটে এর পিছনে কতটা বরাদ্দ রাখা উচিত, সেটা ঠিক হবে কি করে? ব্রিটেনে প্রতি বছর শিশুদের অটিজম বিষয়ে ২.৭ বিলয়ন পাউন্ড ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২৭ বিলিয়ন পাউন্ড খরচ বরাদ্দ হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র খরচ করে (lifetime per capita societal) ৩.২ মিলিয়ন ডলার। ইউরোপে প্রতিজনের বাৎসরিক স্বাস্থ্য বিমা সহ সরাসরি চিকিৎসা খরচ ২৭,২৬১ ইউরো

ভারতে অটিজম নিয়ে আলোচনার মূলে পৌঁছাতে গেলে এখানকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও আর্থসামাজিক অবস্থানের প্রভাব আলোচনা করা আবশ্যক।

পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশগুলির তুলনায় ভারতের অটিজম গবেষণা অনেকটাই পিছিয়ে। ১৯৬৬ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ১৫টির বেশী দেশ এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছে। তাদের মধ্যে ব্রিটেন, সংযুক্ত আরব আমিরসাহী, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, কানাডা, জার্মানি, সুইডেন, ফ্রান্স, ইরান, চিন ও আইসল্যান্ড উল্লেখযোগ্য। সবথেকে কম প্রকোপ ব্রিটেনে, দশ হাজার জনের মধ্যে ৪.১ জন অটিজম আক্রান্ত আর সর্বোচ্চ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে দশ হাজারে ১১৩ জন অটিজম আক্রান্ত। ভারত এই তালিকার কোথায়, সেটা এখনো জানা নেই।                                 

ভারতে ASC নির্নায়ক পদ্ধতি

আজ পর্যন্ত অটিজমের কোন নির্দিষ্ট জৈবিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সুতরাং আচরণগত তারতম্যকে এই রোগ নির্ণয়ের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। রোগের সম্ভাবনা নির্ধারণ করার পদ্ধতিগুলির (screening tool) মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সোশাল কম্যুনিকেশন ডিসঅর্ডার চেকলিস্ট (SCDC), চেকলিস্ট ফর অটিজম ইন টডলারস (CAT), অটিজম স্কেল ফর অ্যাস্পারগারস সিন্ড্রোম (ASAS) ১০। নির্দিষ্ট নির্ণায়ক পদ্ধতিগুলির (standard diagnostic tool, SDT) মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গিলান অটিজম রেটিং স্কেল (GARS)১১, অটিজিম ডায়াগনিস্টিক ইন্টারভিউ রিভাইসড (ADIR)১২, দ্য পেরেন্ট ইন্টারভিউ ফর অটিজম (PIA)১৩, দ্য চাইল্ডহুড অটিজম রেটিং স্কেল (CARS)১৪ এবং দ্য অটিজিম ডায়াগনিস্টিক অবসার্ভেশন স্কেডিউল-জেনেরিক (ADOS)১৫। এগুলির সাথে সাথে শিশুর জন্ম, চিকিৎসা, বেড়ে ওঠা ও পারিবারিক ইতিহাস অটিজম নির্ণয়ে সাহায্য করে।  

অটিজমের পরিসংখ্যান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান কোনভাবেই আশাপ্রদ নয় ২,৭,১৬। যেখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশগুলিতে, যেমন, চিন, জাপান, কোরিয়াতে, SDT-গুলির অনুবাদ করা হয়েছে এবং অনুদিত SDT-র সাহায্যে অটিজমের প্রকোপ নির্ণয় করা হয়েছে, সেখানে ভারতে আজ অব্দি সেরকম কিছুই হয়নি ২,৭,১৭। বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষাতে, যথা, স্প্যানিস, ইতালীয়, পর্তুগীজ প্রভৃতিতেও অনুদিত হয়েছে ১৮,১৯,২০। বেশীর ভাগ স্বীকৃত SDT-গুলি ইংরাজিতে, অথচ আমাদের দেশে কটা লোক ইংরাজিতে কথা বলে? সঠিক অনুবাদের অভাব চিকিৎসা পদ্ধতির অগ্রগতি ও রোগনির্ণয়ে ব্যাঘাত ঘটায়।

২০১৪ পর্যন্ত ভারতের আঞ্চলিক ভাষাগুলিতে কোন SDT ছিল না। আমরা তিনটি বিশ্বস্বীকৃত পদ্ধতির অনুবাদ বাংলা ও হিন্দিতে করেছি ২১। পৃথিবীর জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ এই দুটো ভাষার একটা বলতে পারে২২, অতএব আশা করা যায় অনেকের কাছে পৌঁছনো যাবে। আমাদের এই কাজটির পর ভারতে অটিজম নির্ণয়ের মানচিত্রে আরও দুটি নতুন মাত্রার সংযোজন করা হয়েছে যথা, ASD -র জন্য INCLEN নিরাময় পদ্ধতি (INDT-ASD)২৩ এবং Indian scale for assessment of Autism to assess the severity of Autism২৪.

অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা   

বৈচিত্র্যময় ভারতবর্ষে নানা ভাষা, নানা মত ও নানান সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করেন। তাই গোটা ভারতজুড়ে ASC-র প্রকোপ কতটা, সেটা মাপতে গেলে এই বৈচিত্র্যগুলিকে মাথায় রাখতে হবে। ASC নির্ণয়ের পদ্ধতিগুলি মূলত আচরণবিধি ও সামাজিকতার উপর নিবদ্ধ এবং ভাষা এই সব কিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। এই পদ্ধতিগুলিকে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রযোজ্য করতে গেলে সেই অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। অতএব সুষ্ঠ ও উপযোগী অনুবাদ কাম্য।

উদাহরণস্বরূপ, বাংলা (বা হিন্দি)-তে পারস্পরিক সম্পর্ক, বয়স ও পরিচিত-অপরিচিতের পার্থক্যবিশেষে আমরা তুই, তুমি বা আপনি ব্যবহার করি। ইংরাজিতে তেমন কিছু নেই। আমাদের দেশে ASC-র শিশুদের মধ্যে সর্বনামের সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অসুবিধা দেখা যায়। কাকে তুই বলা উচিত আর কাকে আপনি, সেই জ্ঞান থাকে না। কিন্তু ইংরেজিতে রচিত রোগ-নির্ণায়ক পদ্ধতির মধ্যে এই বিষয়টার জায়গা কই? স্পষ্ট ভাবেই দেখা যাচ্ছে যে পাত্র ও দেশ বিশেষে ASC-র চিহ্নগুলি আলাদা। বুঝতেই পারছেন, আমাদের দেশে ASC-র উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য ভাষার গণ্ডি অতিক্রম করা কতটা জরুরী।

শুধু ASC নির্ণায়ক পদ্ধতির প্রশ্নগুলি অনুবাদ করলেই চলবে না। সেই প্রশ্নের উত্তরগুলোকেও আমাদের সমাজের নিরিখে বিচার করতে হবে। যেমন, পূর্বের দেশগুলিতে মনে করা হয়, স্বভাবে লাজুক এবং আজ্ঞাবহ হওয়াই কাম্য। এই ধারণাটির ফলে অনেক সময় অটিজমের স্পষ্ট চিহ্নও চাপা পড়ে যেতে পারে। ছেলে ঘরের কোণে মুখ গুঁজে পড়ে থাকলেও কারো সন্দেহ হয়না। তাই, আমাদের সমাজে ASC নির্ণায়ক প্রশ্নের উত্তরগুলোকেও অন্য স্কেলে মাপতে হবে। তবে সেটা পরের ধাপ, আগে প্রশ্নের অনুবাদ করা প্রয়োজন।

ASC নির্ণায়ক পদ্ধতির প্রশ্নগুলি অনুবাদ করা ছাড়াও সেই প্রশ্নের উত্তরগুলোকে আমাদের সমাজের নিরিখে বিচার করতে হবে।

আশা করা যায়, সেই ধাপটা পেরোতে কিছুটা সাহায্য করবে আমাদের অনূদিত প্রশ্নাবলী। প্রশ্নগুলি এমনভাবে পরিকল্পনা করা যে তাদের উত্তরের সমন্বয়ে নির্ণয় করা সম্ভব অটিজমের মাত্রা কতটা। প্রত্যেকটি প্রশ্ন একটা চারিত্রিক বৈশিষ্টের কথা বলে এবং শিশুটির অভিভাবক বা শিক্ষকদের বলতে হয়, সেই বৈশিষ্টটি শিশুটির মধ্যে কতটা বর্তমান। যেমন:

  • সে নিজে কাজ করার থেকে অন্যের সঙ্গে কাজ করতে বেশি পছন্দ করে: সম্পূর্ণ বা কিছুটা সত্যি, না সম্পূর্ণ বা কিছুটা মিথ্যে?
  • সে যে কোনো কাজ একই রকমভাবে বার বার করতে পছন্দ করে: সম্পূর্ণ বা কিছুটা সত্যি, না সম্পূর্ণ বা কিছুটা মিথ্যে?

সম্পূর্ণ প্রশ্নাবলী এখানে দেওয়া হলো।

living_with_autism

সাধারণ মানুষ যত সহজে বাইরের জগৎ থেকে আসা তথ্য ফিল্টার করতে পারে, একজন অটিস্টিক ব্যক্তি সেটা পারে না। (সূত্র)

একজন ASC আক্রান্ত ভারতে কী কী সুবিধা পায়?

ভারতে অটিজম আইনত স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালে যখন ন্যাচারাল ট্রাষ্ট ফর দ্যা ওয়েলফেয়ার অফ পার্সনস উইথ অটিজম, সেরিব্রাল পালসি, মেন্টাল রিটারডেসন অ্যান্ড মাল্টিপল ডিস্‌এবিলিটি অ্যাক্ট তৈরি হয় (অ্যাক্ট ৪৪, ১৯৯৯)। এই আইনের আগে অটিজম আক্রান্তদের জন্য রাষ্ট্রের তরফ থেকে সুযোগ-সুবিধা খুবই অল্প ছিল। ১৯৯৫ সালে Persons With Disabilities (Equal Opportunities, Protection of Rights and Full Participation) Act অর্থাৎ “প্রতিবন্ধীদের সমান অধিকার, সুরক্ষা ও পূর্ণ অংশগ্রহণ” আইন পাশ হয়েছিল বটে। যদিও সেই আইন শিশুদের শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার কথা বলে, বাস্তবে অনেক স্কুলই এই আইনটিকে আমল দেয় না। সরকারি স্কুলগুলিতে প্রতিবন্ধীদের জায়গা করে দেওয়ার জন্য কোনো অনুদান নেই২৫ আর বেশিরভাগ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তিই নেয়না এই অজুহাত দেখিয়ে যে আলাদা করে সময় দিতে পারবে না। এই সমস্যাগুলির সমাধান করতে ২০১০ সালে একটি নতুন আইনের খসড়া তৈরী হয়েছে। আশা করা যায় খুব শীঘ্র এটি পাশ হবে।

ভারতে অটিজম আইনত স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালে (অ্যাক্ট ৪৪, ১৯৯৯)।

এত সমস্যা সত্ত্বেও অ্যাকশন ফর অটিজম-এর মত বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দেশে অনেকগুলি কেন্দ্র খুলেছে, যেখানে ASC সংক্রান্ত থেরাপি বা ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা আছে২৬। বলাবাহুল্য, এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সূচনা করেছেন আটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের অবিভাবকরাই।  

পূর্ব আলোচনা থেকে আমরা বুঝতেই পারছি যে চোস্ত ইংরাজি না জানা, বহু ভাষিতা, দেরিতে কথা বলার ক্ষেত্রে সংস্কৃতিগত ভুল ধারণা, জড়তা, গ্রামাঞ্চলে সঠিক চিকিৎসার অভাব, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ব্যায়বহুল চিকিৎসার সুযোগ না নিতে পারা — এইসব কারণগুলির জন্য আমাদের দেশে অটিজম-এর চিত্রটা এখনো স্পষ্ট নয়। এই চিত্রটাকে সঠিকভাবে বুঝতে গেলে এবং শৈশবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অটিজম নির্ণয় করতে গেলে, আগে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও সম্প্রতি কিছু বলিউড সিনেমা সাধারণ মানুষের মনে অটিজম সম্পর্কে কিছুটা উৎসাহ এনেছে, সেইসব সিনেমার অতিনাটকীয় চিত্রনাট্য সমস্যাটির মূলে কতটা আলোকপাত করতে পেরেছে, তা সন্দেহের ব্যাপার। আমরা কয়েকটি SDT–র অনুবাদ করার যথাযথ চেষ্টা করেছি। এগুলির কতটা সদ্ব্যবহার করা যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সবচেয়ে ভালো হয় যদি প্রত্যন্ত গ্রামের হাসপাতাল অব্দি ট্রেনিং পৌঁছে দেওয়া যায়। গ্রামীণ সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ সুনিশ্চিত করলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষদের একটি বড় অংশকে এই চিকিৎসা পরিষেবার আওতায় আনা সম্ভব হবে। তবে প্রাথমিকভাবে জনসাধারণের মনে সচেতনতা প্রসারের জন্য ব্যাপক হারে প্রচার অভিযান, বিজ্ঞাপন ও ওয়ার্কসপ-র প্রয়োজন। আশা করতে পারি এই প্রচার ও অনুদিত প্রশ্নাবলীর সমন্বয়ে আমরা সঠিক ও দ্রুত চিকিৎসা করতে পারব। এক্ষেত্রে দেশ জুড়ে সরকারী সহযোগিতা ও পরিকাঠামো অবশ্য কাম্য। পরিস্থিতির গভীরতা জানার জন্য ভারত সরকারের উচিত আবশ্যিক রূপে যৌথভাবে বেসরকারি সংস্থা, ডাক্তার, রোগীর অবিভাবক ও বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ শুরু করা এবং একটি সুষ্ঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে অসুস্থদের ভবিষ্যত সুযোগসুবিধার ব্যাপারে নীতি নির্ধারণ করা।

যদিও একথা স্বীকার করতে বাধা নেই যে এখনও পর্যন্ত ASC–র নিরাময় সম্পূর্ণরূপে সম্ভব নয়, কিন্তু বর্তমান চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধার দ্বারা সাময়িকভাবে হলেও রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

প্রচ্ছদের ছবির সূত্র (অ্যাকশন ফর অটিজম, নিউ দিল্লী-র সৌজন্যে)

(লেখাটি ইংরাজী থেকে অনুবাদ করেছে অমলেশ রায়।)

লেখক পরিচিতি: ডঃ অলকানন্দা রুদ্র বর্তমানে ইজরায়েলের বেন-গুরিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট-ডক্টরেড গবেষক। তিনি অটিজম সহ বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের গঠন ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ে গবেষণা করেন। অলকানন্দার পিএইচ.ডি. গবেষণার বিষয় ছিল ভারতবর্ষে অটিজম রোগের সাইকোমেট্রিক ধর্মাবলীর পরিমাপ। সেই গবেষণা নিয়েই এখানে লিখেছেন তিনি।

 

লেখার উৎস:

[১] Daley, T. C., & Sigman, M. D. (2002). Diagnostic conceptualization of autism among Indian psychiatrists, psychologists, and pediatricians. Journal of Autism and Developmental Disorders, 32(1), 13–23

[২] Malhotra, S., & Vikas, A. (2005). Pervasive developmental disorders: Indian scene. Journal of Indian Association for Child and Adolescent Mental Health, 1(5). Retrieved from http://www.jiacam.org/0103/Jiacam05_3_5.pdf

[৩] Krishnamurthy, V. (2008). A clinical experience of autism in India. Journal of Developmental & Behavioral Pediatrics, 29(4), 331–333.

[৪] Knapp, M., Romeo, R., & Beecham, J. (2009). Economic cost of autism in the UK. Autism, 13(3), 317–336. http://doi.org/10.1177/1362361309104246

[৫] Ganz, M. L. (2007). The lifetime distribution of the incremental societal costs of autism. Archives of Pediatrics & Adolescent Medicine, 161(4), 343–349.

[৬] Olesen, J., Gustavsson, A., Svensson, M., Wittchen, H.-U., Jönsson, B., on behalf of the CDBE2010 study group, & the European Brain Council. (2012). The economic cost of brain disorders in Europe: Economic cost of brain disorders in Europe. European Journal of Neurology, 19(1), 155–162. http://doi.org/10.1111/j.1468-1331.2011.03590.x

[৭] Elsabbagh, M., Divan, G., Koh, Y.-J., Kim, Y. S., Kauchali, S., Marcín, C.,Fombonne, E. (2012). Global Prevalence of Autism and Other Pervasive Developmental Disorders: Global epidemiology of autism. Autism Research, 5(3), 160–179. http://doi.org/10.1002/aur.239

[৮] Skuse, D. H. (2005). Measuring autistic traits: heritability, reliability and validity of the Social and Communication Disorders Checklist. The British Journal of Psychiatry, 187(6), 568–572. http://doi.org/10.1192/bjp.187.6.568

[৯] Baron-Cohen, S., Wheelwright, S., Cox, A., Baird, G., Charman, T., Swettenham, J., Doehring, P. (2000). Early identification of autism by the CHecklist for Autism in Toddlers (CHAT). Journal of the Royal Society of Medicine, 93(10), 521.

[১০] Attwood, T., & Garnett, M. (1998). Australian scale for Asperger’s syndrome. Asperger’s Syndrome, A Guide for Parents and Professionals. London and Philadelphia: Jessica Kingsley Publishers.(-)

[১১] Gilliam, J. E. (1995). Gilliam Autism Rating Scale: Summary response form. Pro-ed.

Juneja, M., Mukherjee, S. B., & Sharma, S. (2005). A descriptive hospital based study of children with autism. Indian Pediatrics, 42(5), 453

[১২] Lord, C., Rutter, M., & Le Couteur, A. (1994). Autism Diagnostic Interview-Revised: a revised version of a diagnostic interview for caregivers of individuals with possible pervasive developmental disorders. Journal of Autism and Developmental Disorders, 24(5), 659–685

[১৩] Stone, W. L., Coonrod, E. E., & Ousley, O. Y. (2000). Brief report: screening tool for autism in two-year-olds (STAT): development and preliminary data. Journal of Autism and Developmental Disorders, 30(6), 607–612

[১৪] Schopler, E., Reichler, R. J., & Renner, B. R. (1986). The Childhood Autism Rating Scale (CARS): For diagnostic screening and classification of autism. Irvington New York. Retrieved from http://scholar.google.com/scholar?cluster=7853716889221713591&hl=en&oi=scholarr

Sharan, P. (2006). Need for epidemiological Work on Autism in India. J. Indian Assoc. Child Adolesc. Ment. Health, 2(3), 70–71

[১৫] Lord, C., Risi, S., Lambrecht, L., Cook Jr, E. H., Leventhal, B. L., DiLavore, P. C., Rutter, M. (2000). The Autism Diagnostic Observation Schedule—Generic: A standard measure of social and communication deficits associated with the spectrum of autism. Journal of Autism and Developmental Disorders, 30(3), 205–223

[১৬] Sun, X., & Allison, C. (2010). A review of the prevalence of Autism Spectrum Disorder in Asia. Research in Autism Spectrum Disorders, 4(2), 156–167. http://doi.org/10.1016/j.rasd.2009.10.003

[১৭] Matson, J. L., & Kozlowski, A. M. (2011). The increasing prevalence of autism spectrum disorders. Research in Autism Spectrum Disorders, 5(1), 418–425. http://doi.org/10.1016/j.rasd.2010.06.004

[১৮] Canal-Bedia, R., García-Primo, P., Martín-Cilleros, M. V., Santos-Borbujo, J., Guisuraga-Fernández, Z., Herráez-García, L.,Posada-de La Paz, M. (2011). Modified checklist for autism in toddlers: Cross-cultural adaptation and validation in Spain. Journal of Autism and Developmental Disorders, 41(10), 1342–1351

[১৯] Pereira, A., Riesgo, R. S., & Wagner, M. B. (2008). Childhood autism: translation and validation of the Childhood Autism Rating Scale for use in Brazil. Jornal de Pediatria, 0(0). http://doi.org/10.2223/JPED.1828

[২০] Ruta, L., Mazzone, D., Mazzone, L., Wheelwright, S., & Baron-Cohen, S. (2012). The Autism-Spectrum Quotient—Italian Version: A Cross-Cultural Confirmation of the Broader Autism Phenotype. Journal of Autism and Developmental Disorders, 42(4), 625–633. http://doi.org/10.1007/s10803-011-1290-1

[২১] Rudra, A., Banerjee, S., Singhal, N., Barua, M., Mukerji, S., & Chakrabarti, B. (2014). Translation and Usability of Autism Screening and Diagnostic Tools for Autism Spectrum Conditions in India: Translation of autism screening tools in India. Autism Research, 7(5), 598–607. http://doi.org/10.1002/aur.1404

[২২] Total number of speakers of Bengali and Hindi estimated over 360 million people (estimates from www.ethnologue.com)

[২৩] Juneja, M., Mukherjee, S. B., & Sharma, S. (2005). A descriptive hospital based study of children with autism. Indian Pediatrics, 42(5), 453

[২৪] Chakraborty, S., Thomas, P., Bhatia, T., Nimgaonkar, V. L., & Deshpande, S. N. (2015). Assessment of severity of autism using the Indian scale for assessment of autism. Indian Journal of Psychological Medicine, 37(2), 169

[২৫] http://www.disabled-world.com/news/asia/india/

[২৬] http://www.autism-india.org/afa_otherlinks.php

প্রশ্ন পাঠান এই লিঙ্কে ক্লিক করে।

‘বিজ্ঞান’-এ প্রকাশিত লেখার বাছাই সংকলন ‘বিজ্ঞান পত্রিকা’ ডাউনলোড করুন।

 

image_print
(Visited 420 times, 1 visits today)

Tags: , ,