কিভাবে অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট হওয়া যায়

image_print

সায়ন চক্রবর্তী
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়

সায়ন চক্রবর্তী এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র ফেলো। তার গবেষণার বিষয় অ্যাস্ট্রোফিসিক্স। টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ থেকে Ph.D.। নিজের গবেষণার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে খুবই উৎসাহী। আমি (অনির্বাণ) আর রাজীবুল এই উৎসাহের সুযোগ নিয়ে সায়নের সাথে এক বিকেলে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ক্লাসরুমে বসে তার গবেষণার খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা করলাম। নিমেষের মধ্যে ক্লাসরুমের মধ্যে থেকে আমরা চলে গেলাম পৃথিবীর বাইরে, তারাদের দেশে। সেই ক্লাসে আমরা যা শিখলাম আপনাদের সামনে সেটা তুলে ধরছি। আজকে তৃতীয় এবং শেষ ভাগ।

আগের দুটো অংশে আমরা দেখেছিলাম একটা সুপারনোভার জন্ম কিভাবে হয় আর সায়নের মত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টরা লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে তার আলো থেকে কিভাবে মহাবিশ্বের হাঁড়ির খবর জানতে পারে। এই অংশে সেই প্রশ্ন ধরে আরো কিছুদূর যাওয়ার পর ট্র্যাক পালটে আমরা অন্যরকম প্রশ্নে যাবো। যেমন,
অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট হতে গেলে কোন কাঠখড় গুলো পোড়াতে হয়। শেষ করার আগে বাধ্যতামূলক প্রশ্নগুলোও সেরে ফেলবো: অ্যাস্ট্রোফিজিক্স গবেষণার ফল জনসাধারণের কাছে কিছু পৌঁছেছে কি, আর প্রাচীন ভারতীয়রা ঠিক কতটা জানতো।

(আগের অংশের পর)

অনির্বাণ / রাজীবুল: আচ্ছা, এবার তোমার বিশেষ কাজ থেকে একটু বেরিয়ে দেখলে, এই যে সুপারনোভা নিয়ে গবেষণা, এর দ্বারা আমরা ঠিক কি বোঝার চেষ্টা করছি?

সায়ন: আমাদের এই মহাবিশ্ব বেশিরভাগটাই হাইড্রোজেন থেকে শুরু। কিন্তু, আশেপাশে হাইড্রোজেন ছাড়াও তো কত মৌল দেখি। কার্বন, অক্সিজেন, হ্যান ত্যান। মহাবিশ্বের আদিতে এরা তো ছিল না। হাইড্রোজেন ছিল, হিলিয়াম ছিল, একটুখানি লিথিয়াম ছিল, বাকি প্রায় কিছুই ছিল না। হাইড্রোজেন ছাড়া এই যে মৌলগুলো, এরা সব নিউক্লিয়ার ফিউসনের ফলে তৈরী হয়। আর নিউক্লিয়ার ফিউসন কেবলমাত্র তারার মধ্যে হয়।

তারারা নিউক্লিয়ার ফিউসন করতে পারে কারণ তাদের প্রবল মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে। কিন্তু একই সাথে এই মাধ্যাকর্ষণ নিউক্লিয়ার ফিউসনের দ্বারা তৈরী মৌলগুলোকে ধরেও বসে থাকে। তারা থেকে বেরোয় না এরা। তারা থেকে বেরোতে গেলে তারাটাকে ফাটতে হয়। সুপারনোভার দ্বারাই সেটা ফাটে।

আর তখনি আশেপাশে ছড়িয়ে পরে এই ভারী মৌলগুলো। ফলে আশেপাশের পরিবেশে মৌলের বৈচিত্র আরো বাড়ে। একসময় এর থেকেই গ্রহ, ইত্যাদি তৈরী হয়। একসময় মানুষ আসে। ভেবে দেখো, আমাদের রক্তে হিমোগ্লোবিন, তার মধ্যে যে আয়রন, সেই আয়রন  কিন্তু একটা সুপারনোভা থেকে এসেছে।

তাহলে বলছো, এই সুপারনোভা গবেষণার মাধ্যমে তোমরা এই মহাবিশ্বের বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করছো?

হ্যাঁ, আদতে সবকিছুই তারার ভিতরের মালমশলা থেকে আসছে। আমাদের আশেপাশের মহাবিশ্ব যে এতটা বিচিত্র, হাইড্রোজেন ছাড়াও যে এত কিছু আছে, সেইটাতে সুপারনোভার অবদান প্রচুর।

এই গবেষণায় আমরা দেখি, সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে কি বেরিয়ে আসছে। সুপারনোভার এক্স-রে স্পেকট্রামের মধ্যেই নানা মৌলের চিহ্ন পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, কোন মৌল কতটা করে আছে, কি অবস্থায় আছে, সেটা কিভাবে আশেপাশের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে, সেসবও বোঝা যায়।

আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করবে, আমরা আশেপাশের যেসব জিনিস দেখি, সব মৌল কিন্তু তাতে একই পরিমাণে নেই। এই যে, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, এরা এত বেশি, তার কারণ হচ্ছে তারাদের মধ্যে যে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া হয়, তাতে এরা অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় আছে বাকিদের থেকে। তারারা অনেক বেশি সংখ্যায় এদের বানায়। সেই জন্যেই এদের এত রমরমা আমাদের আশেপাশে। তো এইভাবেই আজকের অবস্থার কারণ জানা যায় তারাদের মধ্যে কি ঘটছে সেটা দেখলে।

এবার বিজ্ঞান থেকে একটু বেরিয়ে এসে কিছু প্রশ্ন করি। ছোটবেলায় তো আমরা সকলেই তারা দেখতে খুব ভালবাসি। কিন্তু, ব্যক্তিগতভাবে তোমাকে যদি জিজ্ঞেস করি, তারা দেখার মজা থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করবো, সেই জায়গায়টাতে এলে কি করে?

আমার ছোটবেলায় তারা দেখতে ভালো লাগতো, তাদের সম্বন্ধে জানতেও ভালো লাগতো। কিন্তু এটা ভাবিনি যে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করবো। জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে যে এখনো গবেষণা হয়, সেটাই আমি জানতাম না। কেউ বলেনি। আমি পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে টাটা ইনস্টিটিউটে গেছিলাম। সেখানে দেখলাম: জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ আছে, সেখানে মজার মজার সব কাজ হয়।

তখন, প্রফেসর অলোক রায়ের সাথে কাজ করতে শুরু করলাম। সেই থেকে কাজ শুরু। তবে, আমি অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানিকেই চিনি যারা ছোটবেলা থেকেই জানতো যে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়েই কাজ করবে।

আমাদের ইস্কুলের পাঠ্যক্রমে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অংশটা তো প্রায় নেই বললেই চলে।  

না, জ্যোতির্বিজ্ঞানের কিছু তো ছিলই না। আর ইস্কুলে সবকিছুই কিরকম নিরস ভাবে পড়ানো হতো, মুখস্থবিদ্যার উপর জোর দিয়ে। তাতে বিষয়গুলো পড়ে খুব একটা আনন্দ হতো না।

এই যে পদার্থবিদ্যা পড়বার ফন্দিটা করেছিলাম, সেটার কারণ হলো, তাতে অন্তত কিছুটা নিজে প্রশ্নের সমাধান করবার উপর জোর দেওয়া হতো। এমন নয় যে আমি মনে করি, পদার্থবিদ্যা সবথেকে ইন্টারেষ্টিং বা কিছু। খালি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পদার্থবিদ্যার যে শিক্ষকদের আমি পেয়েছি, তারা নিজে প্রবলেমের সমাধান করার উপর জোর দিতেন। আর সেটা তারা করতে পারতেন, কারণ বোর্ডের পরীক্ষায় সত্যিই সেইধরণের প্রশ্ন আসতো। তো, সেইভাবেই পদার্থবিদ্যা ভালো লেগেছিল।

আচ্ছা, এখন কেউ যদি ছোটবেলায় মনে করে যে সে ভবিষ্যতে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে চায় এবং মনে করে সে নিজেকে আরেকটু ভালোভাবে প্রস্তুত করতে চায়, কি করতে পারে সে? পাঠ্যপুস্তকে তো সেসব পড়ানো হয়না।

প্রথম দরকারী বিষয় হলো অঙ্ক করতে পারা। অঙ্ক তো প্রায় সব স্কুলেই পড়ানো হয়। অনেকসময়, স্কুলে যেসব অঙ্ক শেখানো হয়, আমরা তার পিছনে কারণটা বুঝি না। কিন্তু পরে গিয়ে সেসব কাজে লাগে। বিশেষত, জ্যোতির্বিজ্ঞান বা শুধু পদার্থবিদ্যাতেও সেসব অঙ্ক ব্যবহারে লাগে।

কি জাতীয় অঙ্ক? একটু উদাহরণ দাও।

এই ধরো ক্যালকুলাস। এতে হঠাৎ করে আমাদের ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ সমাধান করতে বলা হয়। তখন মনে হয়, এত জটিল জটিল ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ সমাধান করে কি হবে?

কিন্তু, একটু আগে যে বললাম, তারাদের ভিতরের ঘনত্বের সাথে তারাদের গোটা ভরের একটা সম্পর্ক আছে, এটা একটা ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ সমাধান করে পাওয়া যায়। সেই সমীকরণ টাকে বলে স্ট্রাকচার ইকুয়েশান। তারাদের এক একটা যে স্তর, পেঁয়াজের মত, সেই স্তর উপর নিচ দুদিক থেকে চাপ খাচ্ছে আর সেই চাপগুলো তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এই তথ্যটা থেকেই একটা ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ তৈরী করা যায় এবং তাকে সমাধান করেই তারাদের গঠন সম্বন্ধে জানা যায়।

এবার ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ না জানলে সেটা বোঝা বা তাকে সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই অঙ্কটা ভালো করে শিখে রাখা একটা জরুরি পদক্ষেপ, পরে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার জন্য।

তাহলে ওই যে বললে কেন শিখছি সেই কারণটা অঙ্ক শেখার সময় বোঝা যায় না, এটার একটা সমাধান হতে পারে এইরকম: যখন অঙ্কটা শেখানো হচ্ছে, যদি একটা বাস্তব জীবনের সমস্যা, যেমন জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো প্রশ্ন, তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা যায়, সেটা অনেক বেশি ইন্টারেষ্টিং হবে।

অনেক সময় সেটা করা খুব বেশি কঠিন নাও হতে পারে। অনেক পদ্ধতি, যেগুলো খুব নিরস লাগে, সেগুলো পরবর্তীকালে কোথায় ব্যবহার হবে সেটা যদি বোঝানো হয়, তাহলে হয়তো ছাত্রদের অত অনীহা হবে না সেগুলো শিখতে।

আচ্ছা অঙ্ক ছাড়া আর কি জানতে হবে?

তার পর পদার্থবিজ্ঞান। পদার্থবিজ্ঞানে আমরা যা শিখি, সেগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানেও খুব জরুরি।

এই যে আমি এক্স-রে পর্যবেক্ষণ করি, সেই এক্স-রে নানা প্রক্রিয়ায় তৈরী হয়। সেইসব প্রক্রিয়া – গরম গ্যাস থেকে ব্রেমস্ট্রাহলুং, বা পরমাণুর একটা শক্তি থেকে আরেকটা শক্তিতে যাওয়ার ফলে আলোর স্পেকট্রামে লাইন দেখতে পাওয়া, বা কম্পটন বিক্ষেপণ – এসব তো পদার্থবিদ্যাতেই শেখানো হয়।

তারপর আমরা যে জানি হাইড্রোজেনের লাইনগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কত, সেটাও পদার্থবিদ্যার আওতায় পড়ে। আবার ডপলার এফেক্টের ফলে সেই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের থেকে আলাদা দৈর্ঘ্য যখন দেখি আর বুঝতে পারি যে আলোর উৎস কত গতিতে ছুটছে, সেটাও পদার্থবিদ্যার ক্লাসে শেখা।

আর একটা ইন্টারেষ্টিং ব্যাপার আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে পরিষ্কার এক্সপেরিমেন্ট করা সম্ভব নয়। সুপারনোভা থেকে আলো তো দেখা যায়। কিন্তু কেন দেখা যায়, অন্তত পাঁচ-সাত রকম প্রক্রিয়া তার পিছনে রয়েছে। সেগুলোকে তার ভিতর থেকে আলাদা আলাদা করতে গেলে প্রত্যেকটা প্রক্রিয়াকে আগে ভালো করে বুঝতে হবে। তার থেকে মডেল বানাতে পারতে হবে। সেই মডেলের থেকে কষতে পারতে হবে কিরম স্পেকট্রাম দেখা যায়। তারপর তুলনা করা যাবে বাস্তবে কি স্পেকট্রাম দেখা যাচ্ছে তার সাথে। অতএব একটা পরিষ্কার এক্সপেরিমেন্ট, যেখানে একটাই প্রক্রিয়া করছে, সেটা  সম্ভব নয়, কারণ এক্সপেরিমেন্টগুলো আমাদের হাতেই নেই।

সেইজন্যে, এক্সপেরিমেন্টের দিক থেকে প্রক্রিয়াগুলো আলাদা আলাদা ভাবে বুঝতে পদার্থবিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিই হয়ত আদর্শ জায়গা। তারপর সেই ধারণাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে কাজে লাগানো যায়।

অবশ্যই, এমন কিছু জিনিস আছে যেগুলো ল্যাবরেটরিতে তৈরী করা যাবে না। যেমন, ল্যাবে যে প্লাসমা তৈরী করা যায়, সেটার তাপমাত্রা বা ঘনত্ব কি হবে, সেটা অনেক সময়ই সীমিত। তারার মধ্যে তার থেকে অনেক বেশি তাপমাত্রা বা ঘনত্বের প্লাসমা থাকে।

এই ধরণের কোনো অনলাইন জায়গা আছে যেখানে ধরো কোনো ক্লাস নাইন-টেনের ছাত্র গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জিনিসপত্রের সহজ ব্যাখ্যা পাবে?

হ্যাঁ, নিশ্চয় আছে।

যেমন, NASA-র যেমন খুব ভালো প্রচারব্যবস্থা আছে। ওদের প্রত্যেকটা মিশনের বাজেটে জায়গা রাখে প্রচারের জন্য। যেমন, “চন্দ্র”-র জন্য খুব দারুণ প্রচার হয়েছিল। “চন্দ্র” থেকে পাওয়া ফলাফল, যা অবৈজ্ঞানিকরাও বুঝতে পারবে, সেগুলো ওদের ওয়েবসাইটে ওরা ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের দেশে কি হাই স্কুলের পর সোজাসুজি পড়া যায়, না আগে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়ে তারপর সেদিকে যেতে হয়?

আমাদের দেশে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট লেভেলে জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ানো হয় বলে তো আমার জানা নেই। বেশিরভাগ জ্যোতির্বিজ্ঞানী যাদের চিনি, তারা আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অবস্থায় হয় অঙ্ক নয় পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছে। অনেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ফিসিক্স, মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বা ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং, এইসব থেকেও জ্যোতির্বিজ্ঞানে আসে।

মাস্টার্স লেভেলে কি জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ানো হয়? আর হলে কোন কোন জায়গায়?

যেমন, কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে স্পেশালাইজেশান ওয়ালা একটা ফিসিক্সে মাস্টার্স অফার করা হয়। এরম আরো কিছু কিছু জায়গা আমাদের দেশে আছে, যেখানে মাস্টার্সটা পদার্থবিদ্যায় কিন্তু অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে স্পেশাল পেপার আছে। মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়, পুনা বিশ্ববিদ্যালয়, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, এইসব জায়গাতে এগুলো আছে।

অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে মাস্টার্সের পর কেউ গবেষণা করতে চাইলে, দেশের ভিতরে কোন কোন জায়গা ভালো?

অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে গবেষণা করতে চাইলে পিএইচডি করা খুব জরুরি। ভারতে বেশ কিছু জায়গা আছে, যেখানে অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে পিএইচডি অফার করে। টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স, পুনা-র IUCAA এদের মধ্যে অন্যতম। বেঙ্গালুরুতে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিসিক্সও খুব নামকরা। তারপর বেঙ্গালুরুতে রামান রিসার্চ ইনস্টিটিউট, নৈনিতালে আর্যভট্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, এগুলোতেও অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে পিএইচডি হয়ে থাকে। এছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে পিএইচডি অফার করে।

চার রকমের গবেষণা অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে খুব প্রচলিত। এক ধরণের গবেষক শুধু খাতা কলমে থিওরিটিকাল কাজ করে। তারা পদার্থবিদ্যার নানা জিনিস, যা আমরা এখন বুঝি, সেগুলো ব্যবহার করে মহাকাশে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা বার করার চেষ্টা করে। এক ধরণের গবেষক দূরবীন দিয়ে মহাকাশে কি হচ্ছে, সেটা দেখার চেষ্টা করে। তারপর, এক ধরণের গবেষক সেই দূরবীনগুলো বানায়। আর আছে যারা সিমুলেশন করে। যেসমস্ত প্রশ্নের সমাধান খাতা কলমে করা যায়নি, সেগুলোকে খুব শক্তিশালী কম্পিউটারে সিমুলেশন চালিয়ে সেগুলোর উত্তর পাওয়ার চেষ্টা করে।

এই চারটে জিনিসেই অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে পিএইচডি হয়?

এই চার ধরণের গবেষণার জন্যেই পিএইচডি দেওয়া হয়ে থাকে। অনেকে এর একাধিক মিলিয়েও পিএইচডি করে থাকে।

আমি যেমন খাতা কলমে সহজে করা যায়, এমন থিওরি করি কিছু। আবার যন্ত্রপাতি অন্যরা বানিয়ে রেখেছে, সেই দিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণও করি।

পর্যবেক্ষণ করতে ভারতে কোথায় কোথায় বড় দূরবীন আছে?

এটার উত্তর ভালো করে দিতে হলে পৃথিবীর বাকি টেলিস্কোপের সাথে তুলনা করতে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপগুলোর একটা  হলো GMRT বা জায়ান্ট মিটারওয়েভ রেডিও টেলিস্কোপ। যেটা পুনার কাছে এক জঙ্গলে আছে। রেডিও অ্যাস্ট্রোনমিতে ভারত খুবই এগিয়ে বেশিরভাগ দেশের তুলনায়।

এছাড়া, অপটিক্যাল টেলিস্কোপও আছে ভারতে তিন-চার জায়গায়। কিন্তু সেগুলো বাকি জায়গার তুলনায় অনেক ছোট। অপটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে আমরা ততটা এগিয়ে নয়।

কোথায় আছে অপটিক্যাল টেলিস্কোপ?

অপটিক্যাল টেলিস্কোপের জন্য উঁচু জায়গা খুব ভালো। ভারতের সবথেকে ভালো অপটিক্যাল টেলিস্কোপ লাদাখে। হানলে বলে এক জায়গায়, মাউন্ট সরস্বতী বলে এক পাহাড়ের উপরে। এটা চালায় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিসিক্স।

IUCAA-র একটা টেলিস্কোপ আছে পুনার কাছে ওয়েস্টার্ন ঘাটসের উপরে। GMRT-র কাছেই।

GMRT-র জন্য অবশ্য উঁচু, শুকনো জায়গা লাগেনা, কারণ মেঘ ভেদ করে রেডিও তরঙ্গ আসতে পারে। রেডিও অ্যাস্ট্রোনমির জন্য যেটা অসুবিধে সৃষ্টি করে, সেটা হলো রেডিও ইন্টারফেরেন্স। ভারতের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। এবং সকলের হাতে মোবাইল ফোন। GMRT যে কম্পাঙ্কতে কাজ করে, ৯০০ MHz থেকে ১.৫ GHz অব্দি, সেটার মাঝে  মোবাইলের ব্যান্ডগুলো ইন্টারফেয়ার করে। তবে, নতুন প্রজন্মের মোবাইলগুলো আশা করা যায় আরো উঁচু কম্পাঙ্কে চলে যাবে।

আচ্ছা, বেসিক সাইন্স অর্থাৎ প্রকৃতি কিভাবে কাজ করে সেই খোঁজের বাইরে অ্যাস্ট্রোফিসিক্সের আর কি কার্যকারিতা আছে? ধরো, গবেষণার পৃষ্ঠপোষকরা যদি এই প্রশ্ন করে তোমাকে।

নিশ্চয় আছে। অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে আমরা যা দেখি, সেগুলো বেশ দূরের আর সেগুলো থেকে খুব কম আলো আসে। ওইটুকু আলোকে আমরা ধরতে পারি এবং তাই নিয়ে গবেষণা করতে পারি। শুধু তাই নয়, তার থেকে আলোর উৎস সম্বন্ধেও জানতে পারি। এটা করতে গিয়ে আমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছি। যন্ত্রপাতি বানানো, তার থেকে পাওয়া তথ্য বোঝা, এসবে আমাদের যে দক্ষতা গড়ে উঠেছে সেটা নানা জিনিসে কাজে লাগে।

যেমন, অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে যে ইমেজিং পদ্ধতি, সেগুলো অনেক সময়ই চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাজে লাগে। অ্যাস্ট্রোফিসিক্সে যে রেডিও প্রযুক্তি ব্যবহার হয়, তার দরুণ মোবাইল ফোনের প্রচুর উন্নতি হয়েছে। যেমন, অস্ট্রেলিয়া রেডিও অ্যাস্ট্রোনমিতে খুব এগিয়ে। আমরা যে WiFi ব্যবহার করি, তার অনেকগুলো পেটেণ্ট অস্ট্রেলিয়ার CSIRO-র  রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি বিভাগ থেকে এসেছে। অর্থাৎ, তারা সেই আবিষ্কারগুলো না করলে WiFi আসতো না।

আর, যেটা আগে বললাম, আমাদের আজকের মহাবিশ্ব কেন এইরকম, সেইটা বুঝতে পারি অ্যাস্ট্রোফিসিক্সের গবেষণার মাধ্যমে।

আচ্ছা, শেষ প্রশ্ন। এটা একটু বিতর্কিত ব্যাপার, তবু প্রশ্নটা করি। ভারতের অ্যাস্ট্রোফিসিক্সের ইতিহাস সম্পর্কে তোমার কি বক্তব্য? এইযে এককালে এত উন্নতির কথা আমরা শুনছি, তার মধ্যে কতটা মিথ আর কতটা সত্যি?

ভারতের যারা পুরনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী, আর্যভট্টর সময়কার কথা বলছি, তারা অনেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানিও বটে, গণিতজ্ঞও বটে, আবার রাজজ্যোতিষও বটে। নানান ভূমিকা ছিল তাদের। তারা সত্যি কতটা জানতেন বা জানতেন না, সেটা বোঝা সবসময় সোজা নয়। তারা অনেকসময় হিসেব একরকম করতেন, তারপর বলার জন্য আরেকরকমভাবে বলতেন। তারা কষে বার করতে পারতেন যে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ কখন হবে কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলেন পৃথিবী কি চাঁদের ছায়ার জন্য এই গ্রহণগুলো হয়। কিন্তু জনসাধারণকে বোঝানোর সময় রাহু, কেতূ এসব বলতেন।

বর্তমান সরকারের ইতিহাস নিয়ে কাটাছেঁড়ার ওপর একটা ভালো লেখা লিখেছেন টাটা ইনস্টিটিউটের মায়াঙ্ক ভাহিয়া।

তার বক্তব্যের সাথে আমি একমত। তিনি বলছেন, ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বা ভারতীয় গণিতজ্ঞরা হয়ত নানা আবিষ্কার করেছিলেন এবং পৃথিবীর ইতিহাসে সেইসব আবিষ্কার নিঃসন্দেহে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তারা সত্যিই কি করেছিলেন, তা নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে, আরো অনেক কাজ প্রয়োজন। কিন্তু, সবই বেদে আছে, এইটা বলা এই কাজের জন্য ক্ষতিকর। কারণ যত এইরম করা হবে, তত বর্তমান বিজ্ঞানীরা বা ইতিহাসবিদরা নিজেদের এই কাজের থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করবে। এইসব কাজে যারা নামবে, তাদের সেই শিক্ষা বা ট্রেনিং থাকবে না।

(হেসে) আমি এই বিষয়টা নিয়ে শুধু এটুকুই বলতে চাই। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সত্যিই কি কি করেছিলেন, সেই নিয়ে আমাদের গবেষণা করা উচিত এবং তা নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত। তারা কি করলে আমরা খুশি হতাম, সেই নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়। সেটা এক অর্থে তাদেরই অপমান করা।

এইখানেই আমাদের ইন্টারভিউ শেষ করা যাক। তোমাকে এখনকার মত রেহাই দিলাম। এই দের ঘন্টায় অনেক কিছু শিখে ফেললাম মনে হচ্ছে। আশা করছি, আমাদের পাঠকদেরও এই অনুভূতিটাই হবে।

ছবি: উপরের সারিতে — নিকোলাস কোপারনিকাস, গ্যালিলিও গালিলেই, জোহান কেপলার, জিওভানি ক্যাসিনি; মাঝের সারিতে — এডমন্ড হ্যালি, চার্লস মেসিয়ে, হেনরিয়েটা সোয়ান লিভিট, মেঘনাদ সাহা; নিচের সারিতে — সুব্রহ্মণীয়ম চন্দ্রশেখর, অমল কুমার রায়চৌধুরী, ডেম জসেলীন বেল বার্নেল, অ্যাডাম রেইস

 

image_print
(Visited 2,051 times, 1 visits today)

Tags: , , , ,