সুপারনোভা দেখতে হলে

image_print

সায়ন চক্রবর্তী
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়

সায়ন চক্রবর্তী এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র ফেলো। তার গবেষণার বিষয় অ্যাস্ট্রোফিসিক্স। টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ থেকে Ph.D.। নিজের গবেষণার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে খুবই উৎসাহী। আমি (অনির্বাণ) আর রাজীবুল এই উৎসাহের সুযোগ নিয়ে সায়নের সাথে এক বিকেলে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ক্লাসরুমে বসে তার গবেষণার খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা করলাম। নিমেষের মধ্যে ক্লাসরুমের মধ্যে থেকে আমরা চলে গেলাম পৃথিবীর বাইরে, তারাদের দেশে। সেই ক্লাসে আমরা যা শিখলাম আপনাদের সামনে সেটা তুলে ধরছি। আজকে দ্বিতীয় ভাগ।

আগের অংশে আমরা দেখেছিলাম তারাদের কেন্দ্রস্থলে নিউক্লিয়ার ফিউসনের ফলে একটা লোহার বল তৈরী হয়। লোহা জমতে জমতে এক সময় তার ওজন একটা লিমিট ছাড়িয়ে যায়। সেই লিমিটের পর মাধ্যাকর্ষণের ফলে বলটা ছোট হতে থাকে। এক সময় এত ছোট হয়ে যায় যে সেই জমে থাকা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি একটা প্রকাণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে বের হয়। যাকে আমরা সুপারনোভা বলি। বিস্তারিত জানতে এখানে দেখুন।

এই অংশে আমরা দেখবো, সুপারনোভা যে ঘটলো, সেটা লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে আমরা কি করে জানতে পারি।

সায়ন: (আগের অংশের পর) শেষ চোখে দেখা সুপারনোভা ঘটেছিল কেপলারের সময়। ১৬০৪ সালে কেপলার আমাদেরই ছায়াপথে হওয়া একটি সুপারনোভা নিজের চোখে দেখেন এবং লিখে যান।

অনির্বাণ / রাজীবুল: তিনি কি এটাকে সুপারনোভা হিসেবে লিখে যান?

সায়ন: তিনি ওটাকে একটা উজ্জ্বল তারা হিসেবে সনাক্ত করেন। তিনি লক্ষ্য করেন সেটা সারপেন্স বলে একটা নক্ষত্রমন্ডলের পায়ের কাছে। তিনি ল্যাটিনে তার খাতায় লেখেন স্টেলা নোভা , অর্থাৎ নতুন তারা। এন পেদে সারপেন্তারি  অর্থাৎ সারপেন্সের পায়ের কাছে।

ছবিটবি এঁকে কোন নক্ষত্রমন্ডলের কোথায় আছে সেটা দেখিয়ে যান। এখন আমরা সেটাকে কেপলার সুপারনোভার ভগ্নাবশিষ্ঠ বলে জানি। সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে যেসব জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে, সেগুলো তার আশেপাশের জিনিসকে শক ওয়েভ বা অভিঘাতের তরঙ্গের মাধ্যমে এত গরম করে তোলে যে সেই জায়গা এখনো গরম হয়ে আছে। সেই জায়গা থেকে এখনো এক্স-রে আলো বেরিয়ে চলেছে। এক্স-রে দূরবীনের সাহায্যে কেপলারের সুপারনোভার  সেই গরম জায়গাগুলোকে এখনো আমরা দেখতে পাই।

কেপলারের নোভা শব্দটা আমরা এখনো ব্যবহার করি।

হ্যাঁ, যদিও নোভা মানে নতুন। বৈজ্ঞানিক মহলে এক ধরণের বিস্ফোরণের শ্রেণীকে নোভা নাম দেওয়া হয়। আর যেগুলো খুব বেশি আলো দেয়, তাদের সুপারনোভা বলা হয়।

আচ্ছা, এই সুপারনোভার আলো যখন সনাক্ত করো তোমরা, মহাকাশে অন্য কোনো ঘটনার সাথে একে আলাদা করো কি করে? সুপারনোভার আলো সেটা নিশ্চিত হও কি করে?

যারা আলো দেখে সুপারনোভা সনাক্ত করে, তারা প্রত্যেক রাতে একটা নক্ষত্রমণ্ডলের ছবি তোলে। আগের রাতের ছবির সাথে মিলিয়ে দেখে কিছু তফাৎ আছে কিনা। সাধারণত যে তফাৎটা দেখা যায়, সেটা হলো এইরকম: একটা ফুটকি থেকে এত আলো বেরোচ্ছে যে গোটা নক্ষত্রমণ্ডলের আলোকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। একটা দূরের নক্ষত্রমণ্ডলে এমন একটা ঘটনা, যেখানে একটা ছোট্ট জায়গা থেকে এত আলো বেরোচ্ছে যে নক্ষত্রমণ্ডলের আলো ছাপিয়ে যাচ্ছে, এরকম একমাত্র সুপারনোভারাই করতে পারে বলে আমাদের ধারণা।

সেইভাবে সুপারনোভাদের সহজেই সনাক্ত করা যায়। আমি নিজের গবেষণার কাজে অপটিক্যাল আলোর সুপারনোভা সনাক্ত করি না যদিও। অন্য লোকে সনাক্ত করলে সেই সুপারনোভাকে নিয়ে আরো গভীরে গবেষণা করি।

কি ধরণের গবেষণা করো তুমি?

আমার গবেষণার বিষয়, সুপারনোভার ফলে আশেপাশের জিনিসের কি হয়। তার জন্য আগে জানা জরুরি, আশেপাশে আছে কি। আমি যখন ছোট ছিলাম, আমাকে লোকজন বলেছিল যে মহাশূন্য হচ্ছে হচ্ছে একটা ভ্যাকুয়াম বা শুন্যস্থান। একদম ঠিক নয় সেটা।

কেন, মহাশূন্য শুন্যস্থান নয় কেন?

গ্যাস আছে, ধূলিকণা আছে। এই গ্যাসই একসময় মাধ্যাকর্ষণের ফলে দানা বেঁধে তারা তৈরী হয়, গ্রহ তৈরী হয়। মহাশূন্যে কিছু না থাকলে আজ আমরাও থাকতাম না।

সুপারনোভার ফলে যে জিনিসপত্র ছিটকে যায়, এদের সাথে এই গ্যাস, ধূলো, বা যাকে বলা হয় ইন্টারস্টেলার পদার্থ,  তাদের ঠোকাঠুকি হয়। সেই ঠোকাঠুকি মোটেও শান্তিপূর্ণ নয়। একটা শক ওয়েভের মাধ্যমে হয় এটা। সেই শক ওয়েভের ফলে আশেপাশের জিনিস এত গরম হয়ে ওঠে যে তার থেকে এক্স-রে রশ্মি বের হয়।

আমি সেই এক্স-রে আলো দূরবীন দিয়ে পাকড়াও করি। এটা করার জন্য সবথেকে ভালো দূরবীন কিন্তু পৃথিবীর উপর নেই। কারণ পৃথিবীতে এক্স-রে আলো এসে পৌঁছয় না। বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর আমাদের বাঁচিয়ে দেয় এই এক্স-রে থেকে। এই দূরবীন সেইজন্য থাকে কৃত্রিম উপগ্রহের মধ্যে। বর্তমানে যে এক্স-রে দূরবীনটা সুপারনোভা সনাক্তকরণের কাজে আমি ব্যবহার করি, সেটা NASA চালায়। সুব্রহ্মণীয়ম চন্দ্রশেখরের স্মৃতিতে সেই দূরবীনের নাম দিয়েছে চন্দ্র। চন্দ্র এক্স-রে অবসারভেটরি নামে এই টেলিস্কোপের সাহায্যে আমি সুপারনোভা থেকে বেরোনো এক্স-রে আলো দেখি, আর বোঝার চেষ্টা করি সুপারনোভার ধাক্কায় আশেপাশের কি অবস্থা হয়েছে।

এই গবেষণা থেকে আমরা কি বুঝবো আশা করি?

সুপারনোভারা কিভাবে ফাটে, তার নানারকম মডেল আছে। এই যে এতক্ষণ যা বললাম সুপারনোভাদের ফাটার গল্প, সেটা বেশ মোটা দাগে আঁকা। এর সুক্ষ্ম ছবি আমাদের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়। নানা ডিটেল এখনো জানি না আমরা। যার ফলে একটা মডেল থেকে আরেকটার তফাৎ করার রসদ নেই। অনেক মডেলই টিকে আছে। কোনটা যে ঠিক, কোনটা ভুল, আমরা স্পষ্ট জানি না। শুধু তাই নয়, কোন রকমের তারা ফেটে সুপারনোভা হয়, সেই নিয়েও আমাদের কিছু প্রশ্ন এখনো আছে।

আমার কাজে আমি যেটা করি, পর্যবেক্ষণের সাহায্যে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। তারারা তাদের জীবৎকালে তাদের আশেপাশের পরিবেশকে, যাকে বলে স্টেলার উইন্ড বা নাক্ষত্রিক ঝড়ের মাধ্যমে প্রভাবিত করে। এক একটা তারার প্রভাব আলাদা। তারার আশেপাশের ইন্টারস্টেলার পদার্থের ঘনত্ব বা বিন্যাস সেই ঝড়ের মাধ্যমেই সেট হয়েছে। তাই সেইসব ইন্টারস্টেলার পদার্থ এক অর্থে তারার পরিচয় বহন করে।

এদিকে, সুপারনোভা বিস্ফোরণও হয় নানা ধরণের।

কোন তারা কিভাবে ফাটছে, তার উপর নির্ভর করে ইন্টারস্টেলার পদার্থের মধ্যে কিভাবে তার প্রকাশ ঘটবে। এক্স-রে  নির্গমন কতটা হবে, কতক্ষণ ধরে হবে, গ্যাসের তাপমাত্রার বিন্যাস কিরকম হবে, এইসব খুঁটিনাটি আলাদা হয়। আমি এইসব খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করে জীবৎকালে তারাদের আর সুপারনোভাদের মধ্যে যোগসাজশটা বোঝার চেষ্টা করি। এর থেকে বোঝা যাবে কোন মডেলগুলো সত্যি।

আচ্ছা, এই যে তারার জন্ম থেকে আয়রন কেন্দ্রস্থল তৈরী হওয়া, দিয়ে সেটা সুপারনোভাতে গিয়ে শেষ হওয়া। কতটা সময়ের ব্যবধানের কথা বলছি আমরা?

একটা চালু কথা আছে, যত ভারী তারা, তত কম বাঁচে। যে তারারা সুপারনোভাতে গিয়ে শেষ হয়, তারা সবচেয়ে কম দিন বাঁচে। কিন্তু সেই কম দিন মানে লক্ষ লক্ষ্ বছর। ১০ লক্ষের ঘর থেকে ৫০০-১০০০ লক্ষ অব্দি বাঁচতে পারে।

কিন্তু এটা খুবই কম, এই ধরো সূর্যের তুলনায়। সূর্য কয়েকশো কোটি বছর ধরে বেঁচে আছে। আরো কয়েকশো কোটি বছর বেঁচে থাকবে আশা করা যায়।

তারা যত বড়, তার ভিতর নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার হার অনেক বেশি। তাদের কাছে মজুত জ্বালানিও বেশি কিন্তু তাকে ছাপিয়ে যায় এই বিক্রিয়ার হার। কয়েকশো লক্ষ বছর পর এরাই ফেটে সুপারনোভা হয়। একবার সুপারনোভা হলে ভিতরের আয়রন  কেন্দ্রস্থলটা চুপসে যেতে সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে।

তার মানে আয়রন  কেন্দ্রস্থলটা তৈরী হতে লক্ষ বছর লাগে?

তাও না। মালমশলা যত ভারী হয়, নিউক্লিয়ার ফিউসন গুলো তত কম সময় লাগে। হাইড্রোজেন পোড়াতে সবথেকে বেশি সময় লাগে, হিলিয়াম তার থেকে কম। একবার একটা সিলিকনের বল বানিয়ে ফেললে সেখান থেকে আয়রন  অব্দি পৌঁছতে গোটা ব্যাপারটাই সপ্তাখানেক মত লাগে। শেষের স্টেজ গুলো কয়েকদিনের ব্যাপারে গিয়ে দাঁড়ায়।

শেষে কোলাপ্সটা কয়েক সেকেন্ডের ব্যপার। নিউট্রিনোও বেরোয় সঙ্গে সঙ্গেই, কিন্তু গোটা জিনিসটা থেকে অপটিক্যাল রেঞ্জে আলো বেরোতে আরো কিছুদিন লাগে। সেই আলো সপ্তাখানেক ধরে বেরোতে থাকে, তারপর সেটা ঝিমিয়ে পরে।  বিস্ফোরণ কিন্তু তখনও হয়ে চলেছে। অর্থাৎ আশেপাশের পরিবেশের সাথে ক্রিয়াবিক্রিয়াও হয়ে চলেছে। বছরখানেক ধরে তার থেকে এক্স-রে বা রেডিও তরঙ্গ বেরোয়। সেগুলোকে আমি পর্যবেক্ষণ করি।

এই বিস্ফোরণ শান্ত কখন হবে? যত জিনিস বেরিয়েছে, সবাই কিছু না কিছুর সাথে ধাক্কা খাবে, তবে শান্ত হবে। এই সময়টা কত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেদভ, ভন নয়মান আর টেলর নামে তিন বিজ্ঞানী আলাদা আলাদা ভাবে হিসেবটা কষেছিলেন। পৃথিবী যদি আজ ফেটে পড়ে, সেই সময়টার মান কয়েক সেকেন্ড হবে। কিন্তু সুপারনোভার ক্ষেত্রে সেটা শয়ে শয়ে বছর থেকে হাজার বছর অব্দি হতে পারে। সেজন্য আমরা কেপলারের সুপারনোভার চিহ্ন এখনো অব্দি দেখতে পাই।

কেপলারের সুপারনোভাই কি শেষ? তারপর আর দেখা যায়নি? এত তো তারা!

খুব কম তারারাই তত ভারী। আর একদম দেখা যায়নি, তা নয়। তবে এটা ঠিক যে আমাদের ছায়াপথে  খুব বেশি ফাটেনি বা ফেটে থাকলেও আমরা তাদের দেখিনি। দু’একটা আছে, যার ভগ্নাবশেষ সাইজে কেপলারের সুপারনোভার থেকে ছোট, তাই আমাদের আন্দাজ সেগুলো পরে ফেটেছে। কিন্তু ফাটাটা কারো চোখে পড়েনি। এক হতে পারে কেউ দেখছিল না। অথবা হতে পারে গ্যাস আর ধূলিকণার আড়ালে এই সুপারনোভা ঘটেছে। তার ফলে দেখা যায়নি।

সেই কেপলারের সময়কার সুপারনোভা নিয়েই এখনো গবেষণা চলছে? দূরের ছায়াপথগুলো নিয়ে আমরা গবেষণা করি না?

না, সেরম নয়। আমি দূরের সুপারনোভার চিহ্নগুলো নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করি।

তবে, এটা ইন্টারেষ্টিং ব্যাপার যে খুব কম তারা, ১% মত, যথেষ্ট ভারী এবং সুপারনোভায় গিয়ে শেষ হয়। আমাদের এই ছায়াপথে কতগুলো তারা, কারা সুপারনোভা হয়ে ফাটতে পারে, তাদের বয়েস কত, এইসব হিসেব কষে দেখা গেছে যে প্রত্যেক শতাব্দীতে একটা করে সুপারনোভা ফাটা উচিত। শেষ একশো বছরে একটাও ফাটেনি, সেটা একটু বেমানান বটে। হতেই পারে ফাটেনি, কারণ এইসব হিসেব তো প্রবাবিলিটির অঙ্ক। একটা পয়সার হেড পড়ার সম্ভাবনা অর্ধেক মানেই যে চার বারে দুবার হেড পড়বে তার মানে নেই।

কিন্তু আমার ধারণা, আরো কিছু সুপারনোভা ফেটেছে – লোকে দেখেনি বা গ্যাস কি ধূলিকণার আড়ালে ফেটেছে।

সব ছায়াপথ ধরলে কত সুপারনোভা দেখা গেছে?

ওহ তাহলে তো রোজ একাধিক সুপারনোভা দেখা যায়। এতো এতো ছায়াপথ!

এদের নামকরণ কিভাবে হয়, একটার থেকে আরেকটাকে আলাদা করতে?

প্রথমে সাল, তারপর A,B,C,D জুড়ে। ১৯৮৭-এ প্রথম যে সুপারনোভাটা দেখা গেল সেটা ১৯৮৭A। পরেরটা ১৯৮৭B, এইরকম। আগে ভাবা হয়েছিলো বছরে দু তিনটেই বেরোবে, তাই এই নামকরণের পদ্ধতি ছিল। তারপর একসময় দেখা গেল বছরে ছাব্বিশটার থেকে বেশি সুপারনোভা দেখা যাচ্ছে। তখন Z-এর পর AA এইরম নাম দেওয়া শুরু হলো। করতে করতে এখন তিনটে অক্ষর লাগবে কিনা লোকে চিন্তা করছে!

আমাদের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের ছাদে একটা দূরবীন ছিল। ১৪ ইঞ্চি ব্যাস, ছোট দূরবীন। সেই দূরবীন দিয়ে কাছের একটা ছায়াপথের সুপারনোভা আমি একবার দেখেছিলাম। অবশ্য, সেটা ঠিক আবিষ্কার করিনি। দেখা গেছিল আগেই, আমি যাচাই করে দেখলাম ঠিক কিনা।

কিন্তু তার মানে ওই টেলিস্কোপটা দিয়েও সুপারনোভা আবিষ্কার করা যেত। ছায়াপথের ছবি ফাটার আগে আর পরে তুলে দুটোকে তুলনা করলে ধরা পড়তো। ওইরকম সাইজের দূরবীন দিয়ে প্রচুর অপেশাদাররাও প্রচুর সুপারনোভা খুঁজে পায়।

অপেশাদাররা আবিষ্কার করলে সেটা কিভাবে জানা যায়?

সেন্ট্রাল বুরো ফর অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেলিগ্রাম্স বলে একটা সংস্থা আছে। টেলিগ্রামের যুগে সেটা তৈরী হয়েছিল। সংস্থাটির সদর দপ্তর এই পাড়াতেই (হার্ভার্ডে)। আগেকারদিনে কেউ যদি মনে করতো সুপারনোভা দেখেছে, তাহলে তাদের তার মারফৎ জানাতো। তারা তখন বাকি সব জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তার পাঠাতো, যাতে কেউ সেটা যাচাই করতে পারে।

এখন তো তার উঠে গেছে। এখন ই-মেল মারফৎ সেই যোগযোগটা হয়।

ধরো আজকে কেউ একটা সুপারনোভা দেখলো, তাকে কি করতে হবে সেটা ক্যাটালগ করাতে?

সে এইরম একটা ই-মেল করবে এদের: এই দেখো, এত তারিখে আমি ছায়াপথের এই ছবিটা দেখেছিলাম। তখন এইখানে কোনো ফুটকি ছিল না। এখন আবার ছবি তুলেছি, তাতে একটা ফুটকি রয়েছে। নিশ্চয় সুপারনোভা।

তারা তখন দেখবে, এটা যে অন্য হাজারটা জিনিস নয়, সেটা কি করে জানা গেল? নানান জিনিস দেখা হবে। যেমন, ওই সময়ে আকাশে কোনো উপগ্রহ যাচ্ছিল কিনা, প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম। কৃত্রিম উপগ্রহগুলো অনেক সময় আবার চকচকে হয়।

তারপরেও, সাধারণত একটা ছবিতে হয় না। কাউকে একটা সুনিশ্চিত করতে হয় আরো ছবি তুলে। আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিলো সেটা বলি। আমি একটা ই-মেল অ্যাড্রেসে সাবস্ক্রাইব করে বসে থাকতাম, যেখানে পরপর প্রচুর ছবি আসতো, বেশিরভাগই লো কোয়ালিটির। যা ই-মেল আসতো সেখানে, সব আমার কাছেও আসতো।

একবার টেলিস্কোপ সাইটে বসে আছি, হঠাৎ ওরম মেল এলো। আমার কাছে তখন একটা বিশাল টেলিস্কোপ।

কোথায় ছিল টেলিস্কোপটা?

লাদাখে। আমি নিজে লাদাখে নেই, তখন লাদাখে -৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। আমি আছি বেঙ্গালুরুর কাছে একটা গ্রামে, কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে টেলিস্কোপটাকে পরিচালনা করছি। ই-মেলটা পেয়ে আমি টেলিস্কোপটাকে নির্দিষ্ট ছায়াপথের দিকে তাক করে সুপারনোভাটার একটা স্পেকট্রাম নিয়ে ফেললাম। অর্থাৎ, আলোটাকে তার বিভিন্ন বর্ণে ভেঙ্গে ফেললাম, দিয়ে দেখলাম কোন বর্ণের কতটা যোগদান। একবার স্পেকট্রাম দেখতে পেলে সুপারনোভার টাইপটাও বোঝা যায় সহজেই।

তখন, টেলিগ্রামওয়ালাদের বললাম যে ঠিকই খবর এসেছে, এটা একটা সুপারনোভাই বটে। তখন ওটা অফিসিয়ালি একটা সুপারনোভা হিসেবে চিহ্নিত হলো।

এইরকমভাবে অনেকসময় পেশাদাররা টেলিস্কোপের সামনে থাকলে চটপট স্পেকট্রাম নিয়ে নিতে পারে। সেক্ষেত্রে আর সন্দেহ থাকে না সুপারনোভা কিনা আর সুপারনোভা হলেও তার কি টাইপ। কারণ একটা সুপারনোভার স্পেকট্রাম খুব বিচিত্র হয়, অন্যসবকিছুর স্পেকট্রামের থেকে বেশ আলাদা।

সুপারনোভার স্পেকট্রাম কিভাবে আলাদা বাকিদের থেকে?

সূর্যের স্পেকট্রামে যেমন ফ্রনহফার লাইন দেখা যায় নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘে। ওই তরঙ্গদৈর্ঘ্যতে ঝপ করে আলোর তেজ কমে গেছে। সেরমই, সুপারনোভার স্পেকট্রামেও ওরম লাইন দেখা যায়। লাইনগুলোর কারণ হলো, ওই তরঙ্গদৈর্ঘের আলো খেয়ে নিতে পারে সুপারনোভার মধ্যে থাকা মৌলগুলো।

কিন্তু, সুপারনোভার পরিচয় পাওয়া যায় এর থেকে যে লাইনগুলো ভীষণ মোটা। মোটা মানে লাইনটা অনেকগুলো তরঙ্গদৈর্ঘের উপর ছড়িয়ে আছে। তার কারণ আলোর উৎসের গতির ফলে ডপলার এফেক্ট। মহাকাশে অন্য কোনো কিছুই যেহেতু ১০ হাজার কিলোমিটার পার সেকেন্ডের গতিতে ছুটছে না, তাই এতো মোটা স্পেক্ট্রাল লাইন আর কারো নেই।

ডপলার এফেক্টের জন্য লাইনের আপাত তরঙ্গদৈর্ঘ্য পাল্টানোর কথা। অনেকগুলো তরঙ্গদৈর্ঘের উপর ছড়িয়ে যাওয়ার কারণ কি?

কারণ আলোর উৎস সব তো তোমার দিকে আসছে না। কিছু তোমার দিকে, কিছু অন্য দিকে। শুধু তোমার দিকে গতিটুকু দেখলে সেই গতির মান অনেক কিছু হতে পারে। তাই স্পেক্ট্রাল লাইনগুলোও মোটা।

কতটা মোটা সুপারনোভার লাইনগুলো?

৬০০০ অ্যাঙ্গস্ট্রমের কাছাকাছি একটা লাইন আছে, হাইড্রোজেন খেয়ে নেয় সেই আলোটাকে, তার নাম H-আলফা। সেই লাইনটা খুব সহজেই দেখা যায়। এই লাইনটার তরঙ্গদৈর্ঘ যতটা ছড়িয়ে পড়ে, সেটা ওই মূল তরঙ্গদৈর্ঘের কয়েক পার্সেন্টের কাছাকাছি।

মানে, ৬০০০ অ্যাঙ্গস্ট্রম লাইন ৬০০ অ্যাঙ্গস্ট্রম জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে?

হ্যাঁ, তার থেকে ডপলার এফেক্টের অঙ্কটা কষলে আলোর উৎসের গতি দাঁড়ায় আলোর গতির প্রায় ১/৩০ ভগ্নাংশ মত। অত গতি একমাত্র সুপারনোভার থেকে ছিটকে যাওয়া বস্তুরই হতে পারে। তাই, স্পেকট্রাম নিলে সুপারনোভাদের খুব সহজেই চেনা যায়।

এদ্দূর যখন বললাম, আমার একটা গবেষণার বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে একটু বলি। যেরম বললাম, আমি সুপারনোভা থেকে বেরোনো এক্স-রে আর রেডিও তরঙ্গ দেখি। এরা কিন্তু নানারকম প্রক্রিয়া থেকে বের হয়। কিছু এক্স-রে বের হয়, স্রেফ গ্যাসটা গরম বলে। যাকে বলে ব্রেমস্ট্রাহলুং।

রেডিও তরঙ্গ সাধারণত যাকে বলে সিনক্রোটন বিকিরণের মাধ্যমে বের হয়। সেটা কি? সুপারনোভার শক ওয়েভস বা অভিঘাত তরঙ্গ এক অর্থে পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটরের কাজ করে। এই তরঙ্গগুলি এত বেশি শক্তি অব্দি তারার ইলেক্ট্রনগুলোকে পৌঁছে দেয়, যে তারা রিলেটিভিস্টিক হয়ে যায়। অর্থাৎ, আলোর কাছাকাছি তাদের গতি। এই অবস্থায় তাদের যদি একটা চৌম্বকক্ষেত্রে ফেলা হয়, তাদের থেকে সিনক্রোটন বিকিরণ বের হয়। যা আমরা রেডিও তরঙ্গ হিসেবে দেখি।

আমার একটা কাজ হলো বোঝার চেষ্টা করা, এই সুপারনোভা কত এফিসিয়েন্ট ভাবে ইলেক্ট্রনের গতিবৃদ্ধি করে। এটা শুধু কতটা রেডিও তরঙ্গ আসছে তার থেকে বোঝা মুশকিল। অল্প শক্তির চৌম্বকক্ষেত্রে অনেক ইলেক্ট্রন ফেললেও যতটা বিকিরণ হয়, অনেক বেশি শক্তির চৌম্বকক্ষেত্রে কয়েকটা ইলেক্ট্রন ফেললেও ততটাই হয়।

আমরা তফাৎটা করার একটা উপায় বার করেছি। এই যে প্রচণ্ড গতির ইলেক্ট্রন, এদের সাথে সুপারনোভা থেকে বেরোনো অপটিক্যাল আলোর ইনভার্স কম্পটন বিক্ষেপণ হয়। কম্পটন বিক্ষেপণ আগেই বললাম, এটা তার উল্টো। খুব কম শক্তির আলোককণার সাথে বেশি শক্তির ইলেক্ট্রন ধাক্কা খেলে, এখানে ইলেক্ট্রনটা শান্ত হয়ে যায়, আলোককণার শক্তি বেড়ে যায়। শক্তি বেড়ে যাওয়ার ফলে অপটিক্যাল আলোর কম্পাঙ্ক বেড়ে এক্স-রের ঘরে চলে যেতে পারে। আর তার ফলে আমি যে এক্স-রে দেখছি, তাতে ওই ইনভার্স কম্পটন বিক্ষিপ্ত আলোককণা মিশে থাকতে পারে। সেই মিশে থাকা আলোককণাগুলোকে ধরতে পারলে, কত ইলেক্ট্রন ছিল সেটা বার করে ফেলা যায়। সেটা বার করে ফেললে রেডিও তরঙ্গের সাহায্যে কতটা চৌম্বকশক্তি ছিল, সেটাও বার করে ফেলা যায়।

এইভাবে বোঝা যায়, সুপারনোভা কত এফিসিয়েন্ট ভাবে একটা পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটরের কাজ করে। তিনটে তরঙ্গের আলো, অপটিক্যাল, এক্স-রে আর রেডিও, এদের মিলিয়ে আমি এইটা বোঝার চেষ্টা করছি।

 

এইবার ভয় পাচ্ছিলাম যে মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। তাই, সায়নকে একেবারে অন্যরকম প্রশ্ন করা শুরু করলাম। আমি বা আপনি বা আপনার ছাত্র যদি সায়নের মত অ্যাস্ট্রোফিসিক্স নিয়ে গবেষণা করতে চায়, তাহলে তার পথটা কিরকম হবে? পরের অংশে দেখবো সেই আলোচনা।

ছবি: Chandra X-ray Observatory (via Wikimedia Commons)

image_print
(Visited 1,679 times, 1 visits today)

Tags: , , , ,