পরমশূন্য তাপমাত্রার কাছে – ১

image_print

রাজীবুল ইসলাম
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়

প্রথম পর্ব: কত কাছে?

ছোটোবেলায় বিজ্ঞানের বইতে পড়েছি যে একটা গ্যাসের তাপমাত্রা কমতে কমতে প্রায় – 273 ডিগ্রী সেলসিয়াসে এসে পৌঁছলে তার আয়তন শূন্য হয়ে যায়। এই তাপমাত্রাকে বলা হয় পরমশূন্য তাপমাত্রা। তাত্ত্বিকভাবে তো কত কিছু বলা যায়, কিন্তু এই তাপমাত্রায় কি সত্যি সত্যিই পৌঁছনো সম্ভব? আর সত্যি সত্যিই কি গ্যাসের আয়তন শূন্য হয়ে যায়?

বেশীরভাগ গ্যাসকেই ঠাণ্ডা করতে থাকলে একটা তাপমাত্রায় এসে তরল আর তারপর কঠিনে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু পরীক্ষাগারের বিশেষ অবস্থায় কিছু গ্যাসকে (মূলত যাদের অণুতে একটি করে পরমাণু থাকে) তরলে পরিণত না হতে দিয়েই পরমশূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব। একটি বদ্ধ স্থির পাত্রের মধ্যে রাখা কোন গ্যাসীয় পদার্থের অণু পরমাণুগুলো নানান গতিবেগে নানান দিকে অনবরত ছুটতে থাকে। তাপমাত্রা হল গ্যাসের অণু পরমাণুগুলোর এই গতিশক্তির পরিমাপ। ঘরের তাপমাত্রায় এই গতির মান (দ্রুতি বা Speed) গড়ে প্রায় সেকেণ্ডে কয়েকশ’ মিটার হয়- যত হাল্কা গ্যাস তত বেশী এই দ্রুতি। তাপমাত্রা কমানো মানে গ্যাসের মধ্যেকার পরমাণুদের এই গতি কমিয়ে দেওয়া। এই প্রবন্ধের অবতারণা সেই ঘটনা বলার জন্য-   ঠিক কিভাবে ঘরের তাপমাত্রার একটা গ্যাসকে এত ঠাণ্ডা করা যায়, আর ওই ঠাণ্ডায় পদার্থের আচরণ-ই বা কেমন হয়।

আমাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা দিয়েই শুরু করি। হ্যাঁ, পরমশূন্যের খুব কাছাকাছি তাপমাত্রায় পৌঁছনো সম্ভব। কত কাছাকাছি? ল্যাবরেটরিতে সবথেকে ঠাণ্ডা যে পদার্থ তৈরী করা গিয়েছে তার তাপমাত্রা হল কয়েক ন্যানোকেলভিন বা আরো কিছুটা কম (পিকোকেলভিন)। পদার্থবিজ্ঞানীরা তাপমাত্রা মাপতে কেলভিন (K) স্কেল ব্যবহার করে। সেলসিয়াস স্কেলের তাপমাত্রার সাথে 273 ডিগ্রী যোগ করলেই কেলভিন স্কেলে তাপমাত্রা পাওয়া যায়। অর্থাৎ শূন্য কেলভিন হচ্ছে পরমশূন্য তাপমাত্রা। আর আমাদের অত্যন্ত আরামদায়ক ‘ঘরের তাপমাত্রা’ 27 ডিগ্রী সেলসিয়াস কেলভিন স্কেলে হবে 300 K ।

এই ন্যানোকেলভিন কত ছোট তাপমাত্রা? খুলে লিখলে হবে 0.000 000 001 K। এক কেলভিনের একশো কোটি ভাগের একভাগ। এই সংখ্যাটা কত ছোট তা ঠিকভাবে ধারণা করা একটু মুস্কিল। আমরা ডাক্তারী থার্মোমিটারে আমাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপতে অভ্যস্ত। কিন্তু এই ন্যানোকেলভিন কতটা ঠাণ্ডা ঠিকমত বোঝাতে এত ছোট থার্মোমিটারে হবে না। একটা পেল্লায় লম্বা থার্মোমিটারের কথা ভাবা যাক। কয়েক হাজার কিলোমিটার লম্বা সেই থার্মোমিটার, ভারতের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর, তার গায়ে তাপমাত্রার স্কেল আঁকা আছে। ধরা যাক এই থার্মোমিটারের শুরু, অর্থাৎ পরমশূন্য তাপমাত্রা হল স্বামী বিবেকানন্দ কন্যাকুমারীতে যেখানে বসে ধ্যান করেছিলেন সেখানকার একটা নির্দিষ্ট কোন বিন্দুতে, আর ‘ঘরের তাপমাত্রা’ হল একদম শ্রীনগরে! সেই হিসেবে জল যে তাপমাত্রায় জমে বরফ হয় অর্থাৎ শূন্য ডিগ্রী সেলসিয়াস বা 273 K হবে হিমাচল প্রদেশের উত্তরের দিকে। যে তাপমাত্রায় নাইট্রোজেন জমে তরল হয় (77 K বা -196 ডিগ্রী সেলসিয়াস) তা হবে কর্ণাটকের মাঝামাঝি। হিলিয়াম তরল হয় 4 K বা -269 ডিগ্রী সেলসিয়াসের কাছাকাছি- আমাদের বিশাল থার্মোমিটারের স্কেলে সেটা হবে কন্যাকুমারী থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার দূরে। আর এক ন্যানোকেলভিন (1 nK)?

তা হবে থার্মোমিটারের শূন্য অর্থাৎ পরম শূন্য তাপমাত্রা (0 K) যে বিন্দুতে তার থেকে মানুষের মাথার চুল যতটা চওড়া (প্রায় 30 মাইক্রন বা 0.03 মিলিমিটার) তার প্রায় একের তিনভাগ দূরে!

প্রসঙ্গতঃ একটা কথা বলে রাখা ভালো যে পরীক্ষাগারে কোন পদার্থকে এই এত কম তাপমাত্রায় খুব অল্প সময়ের জন্যই আনা যায়। মহাবিশ্বের কোন জায়গার তাপমাত্রা 2.7 কেলভিনের কম খুব বেশী সময় ধরে থাকতে পারে না। এ ব্যাপারে আরো জানতে উৎসাহী পাঠক কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন সম্বন্ধে ইন্টারনেটে খোঁজ করতে পারেন। 

এবার বলি ঘরের তাপমাত্রা থেকে এই এত ঠাণ্ডায় কি করে আসা যায় তার রহস্য। বাজারে মাছকে ঠাণ্ডা রাখতে বরফে ঢেকে রাখা হয়। পরীক্ষাগারে আরো কম তাপমাত্রা লাগলে তরল নাইট্রোজেন বা তরল হিলিয়াম দিয়ে পরীক্ষার ওই অংশকে ঢেকে দেওয়া হয়। কিন্তু এত সব করেও 0.001 K বা মিলিকেলভিনের থেকে কম তাপমাত্রায় কোন পদার্থকে নিয়ে যাওয়া এখনো সম্ভব নয়। আরো কম তাপমাত্রায় কোন গ্যাসীয় পদার্থকে নিয়ে যেতে হলে ব্যবহার করা হয় আলোকে! শুনতে ধাঁধার মত লাগছে? গরমকালের সূর্যের আলোর তাপে তো আমরা জেরবার হয়ে যাই- আবার আলোকে ব্যবহার করেই কোন পদার্থকে ঠাণ্ডা করা যায় নাকি আবার? সে আবার কী করে সম্ভব? এই লেখার পরের অংশে সেই কৌশলের কথা বলব। 

(চলবে)

প্রচ্ছদের ছবিটি রুবিডিয়াম গ্যাসের। তাপমাত্রা কয়েক মাইক্রোকেলভিন বা তারও কম। এক মাইক্রোকেলভিন হল এক কেলভিনের দশ লক্ষ ভাগের একভাগ। এত কম তাপমাত্রা বলে পরমাণুগুলি (ছবিতে সবুজ বিন্দুর মত) প্রায় স্থির, আর তাই তাদের ছবি তোলা সম্ভব। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ান্টাম গ্যাস মাইক্রোস্কোপ যন্ত্রে তোলা। 

পরের অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

image_print
(Visited 2,825 times, 1 visits today)

Tags: , , ,