অঙ্কের যুবরাজ

image_print

বেদদ্যুতি চক্রবর্তী

তিনি জানতেন যে তার আয়ুআর বেশিদিন নেই। ১৯২০ সাল। দুরারোগ্য যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুশয্যায়। বয়েস তখন মোটে ৩৩। 

পৃথিবী থেকে চিরতরে চলে যাবার ৪ মাস আগে জীবনের শেষ চিঠি লিখছেন তাঁর ‘বন্ধুশিক্ষক আবিভাবক’ কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির অঙ্ক বিশারদ জি. এইচ. হার্ডি-কে। সেই লেখাতে নেই কোন মৃত্যুভয়, কোন অনুশোচনা কিংবা ঐ ছোট্ট ৩৩ বছরের জীবনের নানান চাওয়া-পাওয়ার কোনও হিসেব-নিকেশ। চিঠির মুল প্রতিপাদ্য ছিল অঙ্ক নিয়ে তাঁর নতুন আবিষ্কার ‘মক থিটা ফাংশান’। বছর খানেক আগেই, ১৯১৯ সালে, রামানুজন অসুস্থ শরীরে লন্ডন থেকে মাদ্রাজে ফিরে এসেছেন। ১৯১৪ সালে, মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি-র স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাবার আগে মাকে কথা দিয়াছিলেন, তিনি আমিষ ছোঁবেন না। তামিল ব্রান্মন হবার জন্যে তাঁকে আরও অনেক বাধ্যাবাধকতা মেনে চলতে হয়েছিল প্রবাস জীবনে। সব মিলে শারীর-টাকে উপেক্ষা করেছিলেন রামানুজন। অবশেষে দেশে ফিরে আসা। … সময় যে আর বেশি নেই। জীবনের শেষ বছরে, অসুস্থ থেকেও নতুন প্রায় ৬০০ অঙ্কের ফর্মুলা-উপপাদ্য লিখে রেখেছিলেন আলাদা আলাদা লুস কাগজে। মোটামুটিভাবে মাট্রিকুলেশান, ১৯০৩ সালে, পাশ করলেও কলেজ পরীক্ষাতে ফেল-ই করেছিলেন রামানুজন। হাইস্কুলে পড়ার শেষ সময়ে কোথেকে যোগাড় করে ফেলেছিলেন জি. এস. কার-এর সেই বইটা ‘এ সিনপসিস অফ এলিমেন্টারি রেজাল্টস ইন পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথামেটিকস’! ব্যাস, ঐ বইটার ৬১৬৫ -টা উপপাদ্যই রপ্ত করার নিরলস চেষ্টায় লেগে রইলেন। কি অদ্ভুত আনন্দ!নেশা! এভাবেই আধুনিক অঙ্কের মেধায় চুপিচুপি পারদর্শী হয়ে উঠলেন রামানুজন। কলেজ পড়াকালীন, নিজেই অঙ্কের নানান ফর্মুলা- উপপাদ্য আবিস্কার করে উঠতে লাগলেন। আর সেইসব বেশির ভাগ সময়ই নোট করতে লাগলেন এখান ওখান থেকে যোগাড় করা লুস কাগজে। খাতা কিনতে যে পয়সা লাগবে! সেই বিলাসিতা, যা কিনা রামানুজনের অঙ্কের নেশা মেটাবে, তাঁর পরিবার-এর ছিল না।

কোনক্রমে, ১৯১২ সালে, মাস মায়না ২৫ টাকায় মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট-এ কেরানির চাকরি যোগাড় করলেন রামানুজান। ইতিমধ্যে বিয়েও করেছেন জানকী আম্মালকে। এসবের মধ্যেও তাঁর লক্ষ অবিচল। অঙ্ক নিয়ে আরো অনেক নতুন আবিষ্কার করতে হবে। তাঁর নিজের সেই আবিষ্কারগুলোকে সারা বিশ্বকে জানাতে হবে। না হলে আবিষ্কারের সুফল সবাই পাবে কীকরে! কিন্তুকে শুনবে কলেজ ফেল করা রামানুজনের কথা? … তবু তিনি চেষ্টা করে চললেন দেশে বিদেশে যোগাযোগের মাধ্যমে। ১৯১৩ সাল, রামানুজন চিঠি লিখলেন সর্বকালের অন্যতম গনিতজ্ঞ জি. এইচ. হার্ডি-কে। হার্ডি তখন লন্ডনের কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক। চিঠির সাথে রামানুজন জুড়ে দিয়ায়ছিলেন তাঁরই আবিষ্কৃত অঙ্কের ১২০ টি ‘থিওরেম’ বা উপপাদ্য। অঙ্কের ভাষায় উপপাদ্য সেগুলোই, যেগুলো প্রমানিত। যেমন, পীথাগোরাসের সেই বিখ্যাত উপপাদ্য যেখানে প্রমানিত যেকোনো সমকোনী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ, বাকি দুই বাহুর বর্গের সমষ্টি। মানে, a+ b2 = c2 (যেখানে c হল অতিভুজ, এবং a, b হল বাকি দুই বাহুর দৈর্ঘ্য)। এতদিন ধরে অঙ্কের নানান গবেষণায় মেতে ছিলেন প্রফেসর হার্ডি। কিন্তু, অঙ্ককে যে আবিষ্কার করতে পারে, এমন প্রতিভার সন্ধান পেয়ে আর দেরি করেন নি তিনি। তাঁর সাক্রিয় চেষ্টায় মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি রামানুজন-কে বিশেষ স্কলারশিপ অনুমোদন দিল। সেই টাকা সম্বল করে, ১৯১৪ সালে, সাগর পেরিয়ে লন্ডন পৌঁছলেন রামানুজন। শুরুহল তাঁর অঙ্ক সাধনার আরেক অধ্যায়। হার্ডিকে সঙ্গে নিয়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) আস্থিরতাতেও অঙ্কের আবিষ্কার থেমে থাকেনি।

সারা জীবনে প্রায় ৪০০০ অঙ্কের ফরমুলা-থিওরেম আর কনজেকচার (অনুমান) আবিষ্কার করেছেন রামানুজন। সেসবের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে আছে ‘নাম্বার থিওরি’, ‘ইলিপটিক ফাংশান’, ‘ডাইভারজেন্ট সিরিজ’, ‘অ্যাসিম্পটটিক অ্যানালিসিস’-সহ অঙ্কের নানা শাখা-প্রশাখায়। রামানুজন-এর আবিষ্কার আজ ব্যাবহৃত হচ্ছে কম্পুটার প্রোগ্রামিং-এ, ইন্টারনেট সিকিউরিটিতে। রামানুজনের কাজের ওপর ভিত্তি করে ‘অ্যাবেল প্রাইজও’ (অঙ্কে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয় না। ‘অ্যাবেল’ প্রাইজকেই পৃথিবীতে অঙ্কের সর্বোচ্চ পুরস্কার হিসেবে ধরে নেওয়া হয়) প্রাইজ পেয়েছেন একাধিক অঙ্ক-বিশারদ। ১৯১৮ সালে রামানুজন রয়্যাল সোসাইটি অফ লন্ডন’ র ফেলো নির্বাচিত হন। আমেরিকার মহাকাশবিজ্ঞানী ও লেখক, ক্লিফোর্ড স্তোল একবার মন্তব্য করেছিলেন, সুরের ভুবনে যেমন মোজার্ট, পদার্থবিদ্যাতে আইনস্টাইন, অঙ্কের আঙ্গিনাতে তেমনি রামানুজন।

রামানুজনের এই ‘অসম্ভব’ জীবনকে নিয়ে প্র্রায় ৪০০ পাতার যে বইটা রবার্ট ক্যানিগেল লিখেছিলেন তা হল ‘দ্য ম্যান হুনিউ ইনফিনিটি’। বাংলা করলে যা দাঁড়ায়,- সেই মানুষটা, যিনি অসীমকে জেনেছিলেন। হয়তো সেইজন্যেই ৩৩ বছরের জীবন পেরিয়ে অসীমের পথে যাত্রা করতে তিনি ছিলেন উদ্বেগহীন। রামানুজন একবার বলেছিলেন,

– তাঁর কাছে একটা অঙ্কের সমীকরণের কোন মুল্য নেই যদি না তা কোন ঈশ্বর ভাবনার প্রকাশ না ঘটায়। জীবনের শেষ সময়েও রামানুজন মেতেছিলেন তাঁর ‘প্রানের আরাম’, ‘মনের আনান্দ’ অঙ্ককে নিয়ে। … অসীমে পৌঁছেও তিনি মনেহয় খুঁজে চলেছেন ‘পাই’-এর (π) নির্ভুল মানকে, নতুবা নতুন কোন মৌলিক সংখ্যাকে। সেখানেই তার ‘আত্মার শান্তি’।

 

রামানুজনের জিনিয়াসের এক নমুনা – ১৭২৯ সাল। রামানুজন তখন অসুস্থ। লন্ডন- এর অদুরেই পুটনিতে (Putney)-তে বিশ্রামরত। হার্ডি একদিন ট্যাক্সি চেপে রামানুজনকে দেখতে এলেন। সেই ট্যাক্সি -র নাম্বার ছিল ১৭২৯। হার্ডি রামানুজন-কে বলেই ফেললেন- গাড়ির নুম্বের-টা বড্ড বোকা-বোকা! রামানুজন-এর উত্তর মোটেই না বরঞ্চ ইন্টারেস্টিং। ১৭২৯-ই হল সবচেয়ে ছোটো সংখ্যা যাকে কিনা দু’ভাবে, দুটো সংখ্যার ঘনফলের যোগ ফল হিসেবে দেখানো যায়। ১৭২৯= ১২ + ১ = ১০ + ৯। বহুবছর আগে, রামানুজন ১৭২৯-এর এই চরিত্র-কে আবিস্কার করে নোটবই-তে লিখে রেখেছিলেন। ১৭২৯-এর অন্য নাম এখন ‘ট্যাক্সিক্যাব নাম্বার’ ।

রামানুজন ক্যালেনডার

  •  জন্ম তামিলনাড়ুর এরোডে (Erode), ২২শে ডিসেম্বর, ১৮৮৭
  • বাবা কুপ্পুস্বামী, মা কমলাম্মা
  • বাবার জীবিকা ছিল এক কাপড়ের দোকানে খাতা লেখার কাজ।
  • মাট্রিকুলেশান পাশ – ১৯০৩ সালে
  • রামানুজনের বিয়ে – ১৯০৯ সালে
  • মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট-এ চাকরিতে যোগ দেন ১৯১২ সালে।
  • ১৯১৩-সালে ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ হার্ডি-কে চিঠি লেখেন রামানুজন।
  • ১৯১৪ সালে রামানুজন-এর ইংল্যান্ড যাত্রা।
  • ১৯১৬ সালে, বি এ ডিগ্রি পান কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
  • ১৯১৮ সালে, ‘ফেলো অফ রয়্যাল সোসাইটি’ নির্বাচিত হন।
  • ১৯১৯ সালে, অসুস্থ অবস্থাতে ভারতে ফিরে আসেন।
  • ১৯২০ সালে, মৃত্যু

সাহায্য নিয়েছি

  • “The man who knew infinity”- by Robert Kanigel (1991 edition)
  • imsc.res.in • storyof mathematics.com • The Hindu, 26.12.2001- (8 pages tabloid)

(প্রচ্ছদে রামানুজনের ছবি – “Srinivasa Ramanujan – OPC – 1” by Konrad Jacobs – Oberwolfach Photo Collection, original location. Licensed under CC BY-SA 2.0 de via Wikimedia Commons. লেখাটি পূর্বে JUHYDALUMNI স্যুভেনিরে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে লেখকের অনুমতিতে পুন:প্রকাশিত।).

image_print
(Visited 1,301 times, 1 visits today)

Tags: , , , ,