জীবাণুদের যত কথা – ৩

image_print

দেবনাথ ঘোষাল 
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রথমদ্বিতীয় পর্বের পর …

পর্ব ৩ – ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত বৈশিষ্ট্য

এই পর্বে আমরা ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করব। আগের পর্বের আলোচনা থেকে তোমরা জানো যে ব্যাকটেরিয়া এককোষী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জৈবকণা । উন্নত জীবদেহ-ও তো অসংখ্য ক্ষুদ্র  ক্ষুদ্র কোষের সমষ্টি । তাহলে এ প্রশ্ন মনে আসা স্বাভাবিক যে ব্যাকটেরিয়া কোষ এর সঙ্গে উন্নত জীবের কোষ এর কি কোনো পার্থ্যক্য আছে? সঠিক উত্তর হল: হ্যাঁ। ব্যাকটেরিয়া আর উন্নত জীবকোষ এর মধ্যে আকারগত, গঠনগত এবং কার্যগত বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ব্যাকটেরিয়ার বিচিত্র সব বাসস্থান। সাধারণ পরিবেশ ছাড়াও, উষ্ণপ্রসবণ এর ১০০ ডিগ্রী তাপমাত্রায়, মহাসমুদ্রের ৮-১০ কিলোমিটার গভীরতায়, মেরুপ্রদেশের তুষার শীতলতায় বা অন্যান্য উন্নত জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ওদের অবাধ বিস্তার। আর তাই এই বিবিধ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেবার জন্যে ব্যাকটেরিয়া কোষের বাহ্যিক আচ্ছাদন অনেক জটিল এবং শক্তপোক্ত। এই শক্তপোক্ত বাহ্যিক আচ্ছাদন-এর জন্যই কোষরস বা cytoplasm এর সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের অভিস্রবণজনিত চাপ (Turgor pressure) ব্যাকটেরিয়া সহজেই প্রশমিত করে ফেলে। যদিও সেই আচ্ছাদন এর মধ্যে দিয়ে কোষের পরিপোষক পদার্থ প্রবেশ করতে কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না।

একথা বলাই বাহুল্য যে বাসস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাকটেরিয়া কোষের বাহ্যিক গঠন নানাবিধ হয়ে থাকে। আজ থেকে প্রায় একশ ত্রিশ বছর আগে ১৮৮৪ সালে ডেনমার্কের বিজ্ঞানী হ্যানস ক্রিস্টিয়ান জোয়াকিম গ্রাম (Hans Christian Joachim Gram) ব্যাকটেরিয়াদের অণুবীক্ষণযন্ত্রের নীচে আরো ভালো করে কি ভাবে দেখা যায় সেই নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ্য করেন কিছু ব্যাকটেরিয়া তাঁর ব্যাবহিত রঞ্জক পদার্থে (Gram staining) সহজেই রঞ্জিত হচ্ছে এই সব ব্যাকটেরিয়াদের তিনি Gram-positive ও যে সমস্ত ব্যাকটেরিয়া সেই রঙে রঞ্জিত হয়না তাদের তিনি Gram-negative শ্রেণীভুক্ত করেন। আজও ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণ ও শ্রেণীকরণ এর জন্যে Gram staining-এর  বহুল ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে ঠিক কোন কারণে কিছু ব্যাকটেরিয়া Gram-positive এবং অন্যরা  Gram-negative সে বিষয়ে ক্রিস্টিয়ান গ্রাম এর সঠিক ধারণা ছিল না।

(ছবি: ব্যাকটেরিয়া কোষের বাহ্যিক আবরণ)

   পরবর্তীকালে, ইলেক্ট্রন অনুবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কারের পরে ব্যাকটেরিয়ার বাহ্যিক গঠন সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য জানা সম্ভব হয়। ব্যাকটেরিয়া কোষেরও কোষরস বা cytoplasm এর চারপাশে ঠিক আমাদের কোষের মতই কোষ-পর্দা (cell membrane) থাকে।  এই কোষ-পর্দা মূলত দুটি ফসফো-লিপিড এর স্তর দিয়ে তৈরী। তবে এখানেই শেষ নয়। ব্যাকটেরিয়ার কোষ-পর্দার বাইরে আরো দুটি আবরণ থাকে! কোষরস  পরিবেষ্টন করে থাকা কোষ-পর্দাকে বলা হয় অন্তর্বর্তী কোষ-পর্দা (inner membrane), কোষ-পর্দার  পরের আবরণকে বলা হয়  কোষ-প্রাচীর (cell wall) এবং সব শেষে আরো একটি কোষ-পর্দা থাকে একে বাহ্যিক কোষ-পর্দা (outer membrane) বলা হয়। অন্তর্বর্তী কোষ-পর্দা  এবং বাহ্যিক কোষ-পর্দার মধ্যবর্তী স্থান হল পেরিপ্লাসম (periplasm)। বাহ্যিক কোষ-পর্দা অবশ্য কেবলমাত্র Gram-negative শ্রেণীভুক্ত ব্যাকটেরিয়াতেই দেখা যায়। Gram-negative ব্যাকটেরিয়াতে পেরিপ্লাসম এর আয়তন অনেক বেশী এবং তা মোট কোষের আয়তনের চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। Gram-positive ব্যাকটেরিয়াতে বাহ্যিক কোষ-পর্দা থাকে না তাই অন্তর্বর্তী কোষ-পর্দা আর কোষ-প্রাচীর এর মধ্যবর্তী সংক্ষিপ্ত স্থান-ই হল পেরিপ্লাসম । এখন প্রশ্ন হলো,  পেরিপ্লাসমে থাকে কি? পেরিপ্লাসম কি cytoplasm এর মতই?  উত্তরটা হ্যাঁ এবং না!

পেরিপ্লাসমের প্রধান উপাদান হল জলীয় তরল এবং প্রোটিন, অনেকটা কোষ-রস বা cytoplasm এর মতই। তবে পেরিপ্লাসমে প্রোটিন তৈরী হয় না কারণ সেখানে কোষ-রসের মত প্রোটিন তৈরী করার যন্ত্র অর্থাৎ রাইবোজোম থাকে না। অন্তর্বর্তী কোষ-পর্দার মধ্যে দিয়ে সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রোটিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদার্থ কোষ-রস থেকে পেরিপ্লাসমে রপ্তানি হয়ে থাকে। বাহ্যিক জগতের সঙ্গে ব্যাকটেরিয়া কোষের সমন্বয়-রক্ষা, চলা-ফেরা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি নানা কাজে পেরিপ্লাসমের ভূমিকা অপরিসীম।

আমাদের কোন কোষেই অবশ্য কোষ-প্রাচীর, পেরিপ্লাসম  বা বাহ্যিক কোষ-পর্দার অস্তিত্ব  দেখা যায় না। সুতরাং এ কথা বলাই বাহুল্য যে আমাদের কোষের তুলনায় ব্যাকটেরিয়া কোষের বাহ্যিক প্রতিরক্ষা বলয় অনেক বেশি সংগঠিত!

পরবর্তী অংশ – পর্ব ৪

প্রচ্ছদের ছবিটির উৎস:  http://guardianlv.com/wp-content/uploads/2013/11/cholera-virus-or-bacteria-nhbn3b8t.jpg

image_print
(Visited 743 times, 1 visits today)

Tags: , , ,