বিশ্বসৃষ্টির আদিতে

Filed in Uncategorized by on December 1, 2014
image_print

সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়
(বিজ্ঞান শিক্ষক)

সে কালে কোনকিছুর অস্তিত্ব ছিল না। শূন্যও ছিলনা। ছিল না পৃথিবী, ছিল না মহাকাশ। কি ছিল যে কোথাও কার স্থান ছিল? তখন মৃত্যু ছিল না, অমরত্ব ছিল না। আলো ছিল না অন্ধকারই বা কোথায় ছিল? কেবল এক অনন্যসহায় চেতনা-সর্বস্ব আত্মা ছিলেন। তিনি ব্যতীত আর কিছু ছিল না। অন্ধকার এর মধ্যে লুক্কায়িত ছিল অন্ধকার। ……… এ নানা সৃষ্টি যে কোথা থেকে হল? কার দ্বারা হল? কেউ সৃষ্টি করেছেন কি করেননি, তা তিনিই জানেন যিনি এসবের প্রভু অথবা তিনি না জানতে পারেন।

এটি ঋকবেদের দশম মন্ডলের নাসদীয় সূক্তের অংশবিশেষের ভাবানুবাদ । সেদিন বৈজ্ঞানিক গবেষনার যুগ ছিল না, বৈজ্ঞানিক চেতনা ছিল না।

আধুনিক বিজ্ঞান কি বলছে ? মহাবিস্ফোরণ (Big Bang) এর পূর্বে ছিল না পৃথক কোন বস্তু, ছিল না শক্তি। এক আয়তনহীন বিন্দুর মহাবিস্ফোরক মহাপ্রসারণে (Big Bang) বিশ্বের সৃষ্টি। শুরু হয় আজ থেকে ১৩৮০ কোটি বছর আগে। ১০-১৮ সেকেন্ডে বিশ্ব একটি আলপিনের ডগার কোটি কোটি ভাগের এক ভাগ (১০-১৫ মিলিমিটার) অপেক্ষাও ছোট। ১০-১২ সেকেন্ড পরে তা হয়ে ওঠে একটি ফুটবলের মত। তখনই পদার্থকণা ও শক্তিকণার আবির্ভাব। তার পরে হয়ে চলেছে ক্রমাগত রূপান্তর। ক্রমাগত প্রসারণের লীলা। সৃষ্টি হয় মহাশূন্য। ধূমকেতু ,তারকা, গ্রহ, উল্কা, মহাজাগতিক ধূলি আর তরঙ্গমালা। বিশ্বের সামগ্রিক গঠন-আকৃতি আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব নয় যেহেতু আমরা এর ভিতরে আছি। যেমন পৃথিবীর মধ্যে থেকে পৃথিবীকে দেখা যাবে না ভূ-গোলক রূপে , দেখা যাবে তার অংশবিশেষ পৃথক পৃথকভাবে। এইভাবে আমরা সনাক্ত করেছি সূর্য ও সৌরপরিবার, সূর্যের মত অজস্র তারা নিয়ে গঠিত আকাশগঙ্গা (milky way) ছায়াপথ (galaxy)। আকাশগঙ্গা দশ হাজার কোটি তারা (star), অজস্র মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলিময় স্থান, নেবুলা (nebula) বা জায়মান নক্ষত্রের অঞ্চল, গ্রহ, ধূমকেতু অন্ধকার পদার্থ (dark matter) ও বিশাল শূন্য (void) নিয়ে গঠিত যা সমস্ত একই কল্পিত মহাকর্ষকেন্দ্রের বন্ধনে আবদ্ধ যে কেন্দ্রটি ধনুরাশিতে (Sagiittarius constellation) অবস্থিত। এর ব্যাস এক লক্ষ আলোকবর্ষ এবং উপাক্ষ (minor axis) ১০০০০ আলোকবর্ষ। আকৃতি পরস্পরের উপর উবুর করা একজোড়া উপবৃত্তাকার প্লেটের মত। অনুমান করেছি পৃথিবীর উভয় গোলার্ধ থেকে পর্যবেক্ষণের সমন্বয় (simulation) করে। বিভিন্ন আয়তন আকৃতির ৪০ টি ছায়াপথ নিয়ে গঠিত স্থানীয় দল (Local Group) নামক ছায়াপথগুচ্ছ (Cluster of galaxies) যার অন্তর্গত আমাদের আকাশগঙ্গা (Milky Way)। কয়েকটি ছায়াপথগুচ্ছ (galaxy cluster) নিয়ে গঠিত হয় একটি ছায়াপথ অধিগুচ্ছ (super-cluster of galaxies), মধ্য মধ্যে বিপুল শূন্য (huge void) দ্বারা পৃথককৃত অসংখ্য ছায়াপথ-অধিগুচ্ছের বহুধাবিস্তৃত বুনটজাল (extended web-like network) এই মহাবিশ্ব (Universe)। যেখানে নূন্যতম ২২৫০০ সূর্যের অভ্যন্তরে প্রায় ১৩ লক্ষ পৃথিবীর জায়গা হতে পারে, সূর্য আছে আকশগঙ্গার কেন্দ্র থেকে ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে, সূর্যের কাছাকাছি তারাগুলি গড়ে পরস্পর থেকে ৪ আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে। আজ সূর্যের ব্যাস ১৪ লক্ষ কিলোমিটার। আজ থেকে ৫০০ কোটি বছর পরে সূর্য সাদা বামনে পরিণত হলে তার ব্যাস হবে ১৪০০০ কিলোমিটার। কিন্তু শূন্য প্রসারিত হতে হতে কত বড় হবে তা ধারণার বাইরে। কারণ সেই আদিম বিন্দু ১৩৮০ কোটি বছর বছর ধরে বেলুনের মত ফুলেই চলেছে , বিশ্বের সামগ্রিক আয়তন ক্রমবর্ধমান, বিশ্বপ্রসারণের গড় বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রতি মেগাপার্সেক স্থানে ৭২ km.। 

বিজ্ঞানীরা বারবার পরীক্ষা করে দেখেছেন কোন আলোক উৎস যদি বর্ণালীবীক্ষণ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তাহলে বর্ণালীটা লালের দিকে সরে যায়। আবার আলোর উৎস যদি যন্ত্রের দিকে এগিয়ে আসে ত বর্ণালী বেগুনীর দিকে সরে যায়। লালসরণ বা বেগুনীসরণ পরিমাপ করে অঙ্ক কষে বলে দেওয়া যায় আলোর উৎস কত বেগে এগিয়ে যাচ্ছে অথবা পেছিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি গ্যালাক্সিগুচ্ছ থেকে যে বিকিরণ পৃথিবীর দিকে আসছে তা সব ঐ লালের দিকে সরে যেতে চায়। তার অর্থ মহাকাশের প্রতিটি নক্ষত্র বা ছায়াপথ, সৌরমন্ডল তথা আমাদের গ্যালাক্সি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমাদের সবচেয়ে কাছে যে গ্যালাক্সিগুচ্ছ আছে যা প্রায় চারকোটি আলোকবর্ষ দূরে (অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা বা গ্যালাক্সি) তার অপসারনের বেগ প্রতি সেকেন্ডে ১২০০ কিমি। আরো অদ্ভূত কথা যে যত দূরে সে তত জোরে পিছিয়ে যাচ্ছে। ষাটের দশক থেকে আমাদের পর্যবেক্ষনযোগ্য মহাকাশের শেষ প্রান্তের দিকে কতকগুলি অতিকায় ভারী বস্তু আবিষ্কার হওয়া শুরু হল যারা অতি তীব্র মাত্রায় আলোকতরঙ্গ, রেডিওতরঙ্গ ইত্যদি বিকিরণ করে , যেগুলি দানব তারকার চেয়েও লক্ষ লক্ষ গুন ভারী। সহস্র সুভারনোভার অবিছিন্ন ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শক্তির চেয়েও এদের শক্তি নিঃসরণের হার বেশি। এদের নাম দেওয়া হল কোয়াসার (quasar = quasi-stellar objects)। পৃথিবীর সাপেক্ষে এদের পশ্চাদপসরণের গতিবেগ দেখা গেল শূন্যে আলো গতিবেগের অর্ধেকের বেশি। বিতর্কিত কোনটির জন্য আলোর বেগের ৯০% এর কাছাকাছি। 

মহাকর্ষের নিয়ম হল সমস্ত বস্তুপরস্পরকে তাদের কেন্দ্র সংযোজক সরলরেখা বরাবর আকর্ষণ করে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা (general theory of relativity) তত্ত্বে এই ধারনাকে সংশোধন করে বলা হয়—শুধুপদার্থ (matter) দ্বারা গঠিত বস্তুসমূহই (objects) অভিকর্ষের কবলে পড়ে তা নয়, শক্তি (energy) দ্বারা গঠিত শক্তিকণা (energy particles or quanta , e.g., photons) ও অভিকর্ষের কবলে পড়ে। যে বস্তুর ভর যত বেশী তার মহাকর্ষ তত বেশী। আর অতি বিশাল ভরসম্পন্ন অর্থাৎ বেশী মহাকর্ষশক্তিসম্পন্ন বস্তুর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আলোকরশ্মি বা যে কোন বিকীর্ণ শক্তিকে অনুধাবনযোগ্যভাবেই তার মহাকর্ষের কবলে পড়তে দেখা যায়। আলোকরশ্মি যে কোন বস্তুর মত , কোন বিশাল ভরের বস্তুযেমন সূর্য বা অন্য কোন তারার অভিকর্ষক্ষেত্রে (gravitational field) আলোর গতিপথ বেঁকে যায়। অতি বিশাল তারার শেষ পরিণতি কৃষ্ণবিবর (black hole) যেখানে ভরের ঘনত্ব অসীম, অকল্পনীয় তার মহাকর্ষ এত বেশী যে শুধুপদার্থকণা নয়, শক্তিকণাও তার মধ্যে আকর্ষিত হয়ে শোষিত হয়। যেন আলোর ভর আছে ; চলার পথে সে মহাকর্ষীয় টান অনুভব করে। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে হিসাবনিকাশ পাওয়া গেছে; মহাকর্ষর মান ও অভিমুখ পাওয়া গেছে ; কিন্তু মূল ধারণাটা নয় , অভিকর্ষ কি ও কেন জানা যায় নি । কাউকে টানতে হলে দড়ি দিয়ে বাঁধা প্রয়োজন, অথবা হাত দিয়ে ধরা প্রয়োজন। শূন্যে গতিশীল পৃথিবী সূর্যের আকর্ষণ এর দরুন সূর্যকেন্দ্রিক একটি পথে গতিময় থাকতে বাধ্য, কিন্তুমহাশূন্যে সূর্য কেমন করে বিনা ল্যাসোয় পৃথিবীকে টানছে? কেনই বা টানছে ? এর উত্তর বিগ ব্যাং এ যে শূন্য সৃষ্টি হয়েছে সেটা নিছক ত্রিমাত্রিক শূন্যস্থান (void or space) নয় তা আসলে স্থানকাল সম্পৃক্তি (space-time continuum)। মহাকর্ষের নিয়ম যেটাকে বলছি সেটা বস্তুত চতুর্মাত্রিক বিশ্বব্যাপারের—স্থানকাল সম্পৃক্তির এক ব্যঞ্জনা। আইনস্টাইন বললেন, এটা কোন টানাটানির ব্যপার নয়, সূর্য পৃথিবীকে টানছে বলে পৃথিবী ক্রমাগত তাকে প্রদক্ষিন করে চলেছে, এ ধারণা সম্পূর্ণ ধারণা নয়। আসলে সূর্যের ভর তার সন্নিকটস্থ স্থানকালসম্পৃক্তিকে বাঁকিয়ে দিচ্ছে; আর সেই বঙ্কিম মহাশূন্যে পৃথিবীর ঐভাবে চলাছাড়া গত্যন্তর নেই। অন্য কোন নক্ষত্র থেকে আসা আলো সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেঁকে যায়, তার মূল অর্থ মহাকাশই এখানে বঙ্কিম। মহাকাশে যেখানেই নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি আছে সেখানে মহাকাশ একটুতুবড়েছে বা টোল খেয়েছে। এখানে মহাকাশ শুধু স্থানবাচক মহাশূন্য নয়, স্থানকাল সম্পৃক্তি (space-time continuum)। মহাকাশের ত উপর নিচ নেই, তাই তুবড়েছে বা টোল খেয়েছে না বলে ফুলে উঠছে বললেও চলে, মহাকাশের গালে ব্রণ উঠেছে। মহাশূন্যে যেখানে কৃষ্ণবিবর রয়েছে সেখানে আকাশ এত বেশী টোল খেয়েছে যে কৃষ্ণবিবর থেকে তীব্রবেগসম্পন্ন যে আলোক কণা তাও বেরিয়ে আসতে পারে না সেখানে যা এসে পড়ে সবই তার মধ্যে পড়ে যায়। 

কিন্তু বিশ্বের সমস্ত বস্তুমহাকাশের গালে ওঠা সমস্ত ব্রণ পৃথিবী থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যায় কেন? পৃথিবী থেকে তাদের পশ্চাদপসরণের বেগ, পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্বের আনুপাতিক মনে হয়? এমন নয় যে তুবড়ীর আলোর ফুলকির মত যে যেদিকে ইচ্ছে ছুটে যায়। তুলনা করতে হবে বেলুনের সঙ্গে। যদি একটি গোলকাকার বেলুন এর গায়ে অসংখ্য ফুটকি আঁকা থাকে, বেলুনটি ফোলালে ফুটকিগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে। বিগব্যাং এর ১০-১২ সেকেন্ড পরের সেই ফুটবলটি যেন গোলকাকার বেলুন। কোন অলক্ষ্য বংশীবাদক ফুঁ দিয়ে ঐ বেলুনটাকে ফোলাচ্ছেন। আজ তার গায়ে মোটামুটি সমদূরত্বে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অসংখ্য গ্যালাক্সির ফুটকি। যে কোন বিন্দু থেকেই মনে হবে অন্যরা তাকেই কেন্দ্রে রেখে যেন দূরে সরে যাচ্ছে। আসলে কেউ রাগ করে দূরে সরে যাচ্ছে না, যে বেলুনের গায়ে তাদের আঁকা হয়েছে সেই তলটাই আয়তনে বাড়ছে বলে এমনটা মনে হয়েছে। গ্যালাক্সিসমূহের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানটাই প্রসারিত হচ্ছে। অথচ মহাব্যোমের এই প্রসারণে প্রত্যেক গ্যালাক্সি থেকে মনে হয় মহাব্যোমে আছি আমি আর ওরা। আমি কেন্দ্রবিন্দুতে স্থির আর ওরা দূরে সরে যাচ্ছে। আসলে কেউ সরছে না নিজে নিজে, বেলুন ফোলার মতন বিশ্বটা ফুলে যাচ্ছে। বিগ ব্যাং এর ১০-১২ সেকেন্ড পরের মহাজাগতিক অন্ড (cosmic egg) আজ এত ফুলেছে যে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ ১ লক্ষ আলোকবর্ষ দৈর্ঘ্যের, স্থানীয় দল নামক ছায়াপথগুচ্ছটি ১ কোটি আলোকবর্ষ দৈর্ঘ্যের ,আর আমাদের ১৩৭০ কোটি (13.7 billion) আলোকবর্ষ দূরেও জগৎ আছে। কিন্তু উপমা কালিদাসস্য হয় নি। বেলুনের প্রতিটি বিন্দুর মনে হবে অন্য বিন্দুগুলি তাদের থেকে সকলে সমান বেগে দূরে সরে যাচ্ছে, বেলুনের তল সর্বত্র একই হারে বাড়ছে, ফলে কাছে থাক আর দূরে থাক অন্যান্যদের দূরে সরে যাওয়ার বেগ একই মনে হবে। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায় যে যত দূরে সে তত জোরে পিছু হটছে, মহাজাগতিক ধর্ম অনুসারে সবাই বোধ হয় তাই দেখছে। উপমা কেন মিলল না? প্রথম কারণ হতে পারে, আমরা যে ত্রিমাত্রিক বেলুনের উদাহরণ নিয়েছি চতুর্মাত্রিক স্থানকালসম্পৃক্তির আকাশে বা ব্যোমে সেটা মেলে নি, মেলার কথাও নয়।

বিশ্বের প্রতিটি বস্তু অপরের তুলনায় গতিশীল। পৃথিবী এই মুহূর্তে মহাকাশের যেখানে আছে পরের মুহূর্তে অন্যখানে সরে গেছে। পৃথিবী সূর্যকেন্দ্রিক কক্ষপথে পরিক্রমণ করছে সেকেন্ডে ৩০ কিমি বেগে। আবার সূর্য সৌরমণ্ডলকে নিয়ে আকাশগঙ্গার কেন্দ্রকে (যেটি Sagittarius constellation বা ধনু রাশিতে অবস্থিত।) পরিক্রমণ করছে সেকেন্ডে ২৬০ কিমি বেগে। ছায়াপথের আজ যেখানে সূর্য আছে সেখানে ফিরে আসতে সূর্যের মোটামুটি সময় লাগার কথা ২৫ কোটি বছর, যা হল ১ ছায়াপথবর্ষ (galactic year)। কিন্তু ৩৬০০ ঘনকোনে একটি পূর্ণঘূর্ণন হয়েও মহাকাশের সে জায়গায় আর ফিরে আসছে না, কারণ মহাকাশে বা ব্রহ্মান্ডে (universe, the cosmic sphere) আমাদের গ্যালাক্সি তখন অনেক দূরে চলে যাবে, যেহেতু প্রতি সেকেন্ডে বিশ্ব বেড়ে চলেছে এবং ছায়াপথগুলি পরস্পর থেকে ১৫০০০০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগে তফাৎ হয়ে যাচ্ছে। 

সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে মহাশূন্য প্রকৃতপক্ষে স্থানকালসম্পৃক্তি। আর আমাদের অভিজ্ঞতায় ত্রিমাত্রিক স্থান বা দেশ তিনদিকেই প্রসারিত হচ্ছে। কাল একটি মাত্রা ,তা শর এর মত একমুখী। কেউ কেউ অনুমান করেন সৃষ্টিমুহূর্ত অর্থাৎ ০ সেকেন্ড থেকে ১০-৪৩ সেকেন্ড পর অবধি চার প্রকার মৌলিক বল বা ক্ষেত্র (fundamental force & fields) একাকার হয়ে একটিমাত্র ক্ষেত্র (unified field) ছিল। চারটি মৌলিক বল হল মহাকর্ষ বল, তড়িৎচুম্বকীয় বল, সবল মিথষ্ক্রিয়াক্ষেত্র বল ও দুর্বল মিথষ্ক্রিয়াক্ষেত্র বল (gravitational force or corresponding field, electromagnetic field & force, strong interactional field and corresponding force, weak interactional field and force)। আদিতে সব বলই প্রতিসাম্যর (isotropy) দরুণ একটি অতিবল (unified force = grand force) রূপে ছিল। পদার্থকণা ও শক্তিকণা ইত্যাদির কোন পৃথক অস্তিত্ব ছিল না। মহাবিস্ফোরণের ১০-৩০ সেকেন্ড পরে সিংগুলারিটি নষ্ট হয়ে কণার আবির্ভাব, এবং অজস্র পরিমাণ অবিরত শক্তির বিকিরন। উদয় হল (force field) ইলেক্ট্রোউইক ফোর্স (gravitational and electroweak force field)। ইলেকট্রোউইক বল ও মহাকর্ষ বল এক হয়ে ছিল কিনা এখনো নিশ্চিত নয়। ১০-১২ সেকেন্ড এর মধ্যে প্রতিসাম্য ভেঙ্গে electroweak force দশান্তরে তড়িৎচুম্বকীয় ও দুর্বল মিথষ্ক্রিয়া বলে বিছিন্ন হয় (electromagnetic & weak interactional force)। বিকিরণ ও ভর তাপগতীয় সমসত্ত্বতা (thermodynamic homogeneity) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। বিগব্যাং এর ১০-৬ সেকেন্ড পরে প্রোটন নিউট্রন ইত্যদি আদি কনা সৃষ্টি হয়। সবলমিথষ্ক্রিয়া (strong interaction)-র প্রাদুর্ভাব হয় আরো আগে। এক সেকেন্ড পরে অন্য কণাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিউট্রিনো আলাদা হল। ১০০০ কোটি বছরে তৈরী হতে শুরু হল কোয়াসার, পালসার. ছায়াপথ, নক্ষত্ররাজি। এখন থেকে ৫০০ কোটি বছর আগে সূর্যের উৎপত্তি, ৪৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর।

১৯৪৬ সাল থেকে জর্জ গ্যামো ও তার সহকর্মীরা সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, কৃষ্ণবস্তুবিকিরণ তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তিতে বলেছিলেন একটি প্রকৃত বিন্দু অবস্থা থেকে (perfect point) মহাবিস্ফোরনের (big bang) ফলে বিশ্ব উদ্ভূত। প্রসারণের প্রথমদিকে বিকিরণ এর প্রাধান্য ছিল। সে সময় বিকিরণ থেকে পদার্থ সৃষ্টির কাল। উষ্ণতা ১০৩২ K, পদার্থ তখন কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা। মহাবিশ্বের প্রসারণে বিকিরণজনিত উষ্ণতার হ্রাস এবং বিকিরণ থেকে বস্তুকণার রূপান্তর ঘটতে থকে নানা সংঘর্ষে। ধীরে ধীরে হেড্রন ও লেপ্টন কনা আবির্ভাব। তা থেকে প্রোটন নিউট্রনের মত অতিপারমানবিক (subatomic) কণা। এর পর তাপকেন্দ্রকীয় বিক্রিয়া (thermonuclear reaction)-য় হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম উৎপাদন। ১০-১০ সেকেন্ড পরে উষ্ণতা ১০১৫ K, ১০-৪ সেকেন্ড পরে হয় ১০১২ K, ১০০ সেকেন্ডে ১০ K। জর্জ গ্যামো বলেন বিশ্বে অধিকাংশ তাপকেন্দ্রকীয় বিক্রিয়া এই সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রথমে অল্প স্থানে প্রবল বিকিরন এর কারণে উষ্ণতা অত্যধিক ছিল। মহাশূণ্য প্রসারনের দরুণ উষ্ণতা কমতে থাকে। তাপের বিকিরন ঘটে আদর্শ কৃষ্ণবস্তু বিকিরনের নিয়ম মেনে। তাপ ছড়িয়ে পড়তে থাকে ক্রমবর্ধমান শূণ্যে আর বিশ্বের গড় উষ্ণতা কমতে থাকে। ৫ x ১০১৭ সেকেন্ড পরে বিকিরনের উষ্ণতা হওয়ার কথা মাত্র ৩ K। ১৯৬৫ সালে পেনজিয়াস ও উইলসন নামে দুই পদার্থবজ্ঞানী হঠাৎ আবিষ্কার করলেন যে ৭.৩ cm. তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরনের স্রোত (incoming flux) পাওয়া যাচ্ছে যা পরিচিত উৎসগুলি থেকে আসা বিকিরনের প্রায় ১০০ গুণ বেশী। এটি যদি কৃষ্ণ বস্তু বিকিরণ ক্ষেত্র র অংশ হিসাবে ধরা হয় তবে বিশ্বের উষ্ণতা ৩K মাত্র। এই উষ্ণতার সঙ্গে জর্জ গ্যামোর গণনা ভালোই মিলে যায়। ৩ K উষ্ণতার একটা অতিরিক্ত অনুদৈর্ঘ্য ক্ষুদ্র তরঙ্গ প্রায় সব দিক থেকে সমানভাবে, সর্বক্ষন সমানভাবে পৃথিবীতে আসছে। প্রমানিত হয়েছে এই অতিরিক্ত (কোন মহাকাশীয় বস্তু বা জ্যোতিষ্ক হতে আগত নয় , তাই অতিরিক্ত) বিকিরণ তরঙ্গের উষ্ণতা সঠিকভাবে ২.৭ K। ফ্রিডম্যান ও লেমেতার এর বিশ্বসৃষ্টির ধারণাকে অনুসরণ করে জর্জ গ্যামো ও তার সহকর্মীরা বিশ্বসৃষ্টির বিগব্যাং তত্ত্বকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন তার সমর্থন পাওয়া যায় পেনজিয়স-উইলসনের আবিষ্কারে। সতত সবদিক থেকে আসা এই ক্ষুদ্রতরঙ্গ (micro-wave) আদিম মহাবস্ফোরণজাত আদিম বিকিরণ এর ক্ষীণ অবশেষ একথা পরবর্তীকালে সকলেই স্বীকার করেছেন। অতএব মহাবিস্ফোরণের সবথেকে বড় সাক্ষ্য হচ্ছে মহাকাশের সবদিক থেকে সবসময় আসা ২.৭ K উষ্ণতার তরঙ্গস্রোত যা আজ মহাকাশের বিপুল বিস্তারের কারণে অতি ক্ষীণ ও শীতল। যেহেতু সমসত্ত্ব ও দিকপ্রতিসম (isotropic) বিশ্বসৃষ্টিসমূহের (created objects) সঙ্গে সঙ্গে অসম হয়ে উঠছিল, নানা দিক থেকে আসা এ পটভূমি বিকিরণ এর (background radiation) উষ্ণতায় সামান্য হেরফের হওয়ার কথা । পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বাইরে স্থাপিত COBE (Cosmic Background Explorer satellite) এর সংগৃহীত তথ্য বিচার করে গত শতাব্দীর শেষ দশকে জানা গেল পটভূমি বিকিরণের উষ্ণতার ২.৭ K থেকে সামান্য, অতি সামান্য হেরফের (৩.৩ x ১০-৮ K মানের) হয়। এই তফাৎ নির্ণীয়মান বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তৎকালীন বস্তুঘনত্বের তারতম্য নির্দেশ করে। এর পরই ১৯৯৮ এ বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করলেন যে এত পরেও বিশ্বপ্রসারণের বেগ কমছে না বরং বেড়েই চলেছে। পৃথিবী থেকে প্রায় দশ লক্ষ কিমি দূরে স্থাপিত WMAP (Wilkinson Microwave Anisotropy Probe) মহাবিস্ফোরণ শূরু হওয়ার মাত্র ১০-১২ সেকেন্ড পরের অবস্থা ছবি তুলে দেখাতে সমর্থ হয়ে জর্জ গ্যামোর বিকিরণ-পরিপূর্ণ (radiation filled model) মডেলের ও মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের প্রমাণ রেখেছে।

( সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখার্জী, M.Sc., B.Ed, বিজ্ঞান শিক্ষার সাথে পেশাগতভাবে যুক্ত। সখের প্রাবন্ধিক ও কবি। ভূগোল ও পরিবেশ, অনির্বাণ, শুভ, শুধু সুন্দরবন, মনের জানালা, বিজ্ঞান ভাবনা ইত্যাদি পত্রিকার সাথে যুক্ত। ছবি: উইকিপিডিয়া )

image_print
(Visited 798 times, 1 visits today)